বাংলাদেশে ম্যালেরিয়া সবসময়ই একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা। রোগটি এখনো দেশের উত্তর ও পূর্বাংশে ভারত ও মিয়ানমার সীমান্ত-সংলগ্ন স্থানগুলোর একটি আঞ্চলিক রোগ। দেখা গেছে যেসব লোক ম্যালেরিয়ামুক্ত অঞ্চল থেকে বৃহত্তর চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামে বসতি স্থাপন করেছে, তাদের মধ্যে ম্যালেরিয়া আক্রমণ ও মৃত্যু বেশি। এমনকি ঢাকা শহরেও প্রায়ই ম্যালেরিয়ার খবর পাওয়া যায়। আসলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই রোগের ঘটনাগুলো অজানাই থেকে যায় এবং অনেক রোগীই সংগঠিত স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ গ্রহণ করে না। গতকাল বণিক বার্তায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ম্যালেরিয়াপ্রবণ এলাকার চিকিৎসাসেবা অপ্রতুলতার কথা উঠে এসেছে। এতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ম্যালেরিয়া রোগীর ৭০ শতাংশের বেশি বান্দরবানের বাসিন্দা হলেও সংকটাপন্ন রোগীদের চিকিৎসাপ্রাপ্তিতে সেখানে চরম ঘাটতি বিদ্যমান। দুঃখজনক বিষয় হলো, অপ্রতুল চিকিৎসাসেবার কারণে আক্রান্তদের মৃত্যু ঠেকানো যাচ্ছে না। বর্তমানে দেশের মাত্র ১৩টি জেলায় ম্যালেরিয়া আক্রান্ত রোগী পাওয়া যাচ্ছে। এর মধ্যে পার্বত্য তিন জেলার ম্যালেরিয়া পরিস্থিতি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ। এর সঙ্গে সিলেট অঞ্চলের চার জেলা ও চট্টগ্রাম জেলা ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল। কক্সবাজার জেলাকে মধ্য ঝুঁকিপ্রবণ অঞ্চল বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। এক্ষেত্রে ওই অঞ্চলগুলোয় ম্যালেরিয়া প্রতিরোধের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থাও করতে হবে।

পুরো বিশ্ব ম্যালেরিয়ামুক্ত হওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ২০৫০ সালে। বাংলাদেশের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২০৩০ সালে। হাতে রয়েছে মাত্র আট বছর। এ সময়ে ম্যালেরিয়া নির্মূল না করতে পারলেও পর্যাপ্ত চিকিৎসা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা চাই। বর্তমানে বাংলাদেশের ১৩টি জেলা ম্যালেরিয়াপ্রবণ। এর মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলাতেই ম্যালেরিয়া বেশি। অর্থাৎ ম্যালেরিয়া আক্রান্তের ৯০ শতাংশই পার্বত্য তিন জেলায়। এ জেলাগুলোয় ম্যালেরিয়ার উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমানে ম্যালেরিয়া উচ্ছেদের কর্মকৌশল হলো দ্রুত ম্যালেরিয়া শনাক্ত করা এবং চিকিৎসা কেন্দ্রে চিকিৎসা প্রদান। ম্যালেরিয়া সাধারণত ব্লাড ফিল্মস ব্যবহার করে রক্তের দূরবীক্ষণ পরীক্ষা অথবা অ্যান্টিজেনভিত্তিক দ্রুত ডায়াগনস্টিক পরীক্ষার মাধ্যমে নির্ণয় করা হয়। আধুনিক প্রযুক্তিতে প্যারাসাইটের ডিএনএ শনাক্ত করার জন্য পলিমারেজ শৃঙ্খল বিক্রিয়ার ব্যবহার উন্নত করা হয়েছে, কিন্তু এর খরচ ও জটিলতার জন্য ব্যাপকভাবে ম্যালেরিয়া-কবলিত এলাকায় ব্যবহার করা হয় না, যা হতাশাজনক। উঁচু ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী, যেমন জুমচাষী, বাঁশ-গাছ কাটার শ্রমিক, বন বিভাগে কর্মরত কিংবা অল্প সময়ের জন্য কাজ করতে আসা লোকজন কিংবা ভ্রমণকারীদের জন্য নানামুখী প্রতিরোধ কর্মসূচি, রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা পদ্ধতি ব্যবহার জরুরি। এখনো পার্বত্য জেলার কিছু এলাকায় রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য পরিমাণ। এসব রোগীর জন্য মোবাইল ক্লিনিক কিংবা নিবিড়ভাবে সেবা প্রদানের জন্য মাঠকর্মীর সংখ্যা বাড়ানো প্রয়োজন।

চীন ম্যালেরিয়া নির্মূলে জাতীয় কর্মসূচি প্রণয়ন করে তা বাস্তবায়ন করেছে। এর মধ্যে ছিল মশা মারা, মশার প্রজননক্ষেত্র ধ্বংস করা, মশার বংশবৃদ্ধি রোধে কীটনাশক ছিটানো এবং যাদের বা যে স্থানে ম্যালেরিয়া হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, সেখানে অ্যান্টিম্যালেরিয়া ড্রাগ বা ওষুধ সরবরাহ। ষাটের দশকে চীনের নারী গবেষক ও রসায়নবিদ তু ইউইউ ওয়ার্মউড আর্টেমিসিয়া অ্যানুয়া গাছ থেকে ‘আর্টিমিসিনিন’ ওষুধ আবিষ্কার করেন। ম্যালেরিয়া প্রতিরোধে কুইনিনের চেয়েও বেশি কার্যকর ওষুধ হিসেবে এটি প্রমাণিত হয়। চীন এ ওষুধকে ম্যালেরিয়ার বিরুদ্ধে অন্যতম উপাদান হিসেবে কাজে লাগিয়েছে। এ ওষুধ আবিষ্কারে তু ইউইউ ২০১৫ সালে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন। ম্যালেরিয়া থেকে মুক্তি পেতে চীনের জাতীয় কার্যক্রমে ‘১-৩-৭’ কৌশল গ্রহণ করা হয়। অর্থাৎ একদিনের মধ্যে চিহ্নিতকরণ, তিনদিনের মধ্যে তদন্ত এবং সাতদিনের মধ্যে পাল্টা ব্যবস্থা। এভাবেই ম্যালেরিয়ামুক্ত হয় চীন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, প্রতি বছর এখনো বিশ্বের প্রায় ২০ কোটি মানুষ ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয় এবং ৪ লাখ ৩৫ হাজার মারা যায়। এর মধ্যে পাঁচ বছর বয়সী শিশুর সংখ্যাই বেশি। আফ্রিকায় ম্যালেরিয়া এখনো এক আতঙ্কের নাম। বিশ্বে ম্যালেরিয়ায় যত মানুষ আক্রান্ত ও মারা যায়, এর অর্ধেকই আফ্রিকার পাঁচটি দেশে। সেনেগাল থেকে উত্তর-পশ্চিমে মোজাম্বিক পর্যন্ত এলাকা থেকে ম্যালেরিয়া তাড়ানো এখনো কষ্টসাধ্য ব্যাপার। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে, ম্যালেরিয়া প্রতিরোধে অনেকটাই এগিয়েছে পৃথিবী। আফ্রিকায়ও ম্যালেরিয়া পরাস্ত হবে। চীন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ভারত ও এশিয়া মাইনরে ম্যালেরিয়া ছিল একটি অপ্রধান আঞ্চলিক রোগ। কোনো কোনো দ্বীপে, যেমন মধ্য ও দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জ, গ্যালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জ, গুয়াম, হাওয়াই, মিডওয়ে দ্বীপপুঞ্জ ও নিউজিল্যান্ডে ম্যালেরিয়া নেই। রোগটির সর্বাধিক প্রাদুর্ভাব স্বল্প আর্দ্র ও সমুদ্র-তীরবর্তী এলাকায় এবং সর্বনিম্ন মরু ও পার্বত্য অঞ্চলে। এর বিস্তার বাহক মশার উপস্থিতির ওপর নির্ভরশীল। গত ৭৫ বছরে রোগটি পৃথিবীর অনেক অঞ্চলেই হ্রাস পেয়েছে। এককালের ম্যালেরিয়াপ্রবণ ইউরোপের বেশির ভাগ এলাকাই এখন এ রোগমুক্ত এবং দক্ষিণ আমেরিকা থেকেও তা নির্মূলপ্রায়।

এমডিজি-পরবর্তী ২০১৫ সালের পরে ম্যালেরিয়াসহ সমন্বিত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের জন্য কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো যথাযথ ও কার্যকরভাবে পরিচালনা করা প্রয়োজন। সমতল অঞ্চলে ছয় হাজার মানুষের জন্য নির্ধারিত একটি কমিউনিটি ক্লিনিকের পরিবর্তে পাহাড়ি অঞ্চলে এর তুলনায় কমসংখ্যক মানুষের জন্য (যেমন ২০০০-২৫০০ জনের জন্য) একটি কমিউনিটি ক্লিনিক প্রয়োজন হতে পারে। এজন্য প্রায়োগিক গবেষণা জরুরিভাবে প্রয়োজন। একই সঙ্গে ম্যালেরিয়া অঞ্চলে ইউনিয়ন পর্যায়ে স্থাপিত স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের আওতাধীন স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো যথাযথভাবে সমন্বিত প্রথম স্তরের স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের জন্য সরকারের আন্তরিক নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন আবশ্যক। অতীতের ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির তুলনায় বর্তমানে অনেক নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ আছে। জীবাণুবাহিত সাধারণ জনগণকেও অত্যন্ত সূক্ষ্ম মলিকুলার পদ্ধতির মাধ্যমে পিসিআর শনাক্তকরণ করা যেতে পারে।

আর্টিমিসিনিনের কার্যকারিতা শেষ হওয়ার আগেই এসব জীবনসংহারী ফ্যালসিপেরাম ম্যালেরিয়ার জীবাণু ব্যাপক আকারে ধ্বংস করার জন্য মাস ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন নিয়ে পাইলট গবেষণা জরুরি। পরবর্তী সময়ে সীমিতসংখ্যক রোগী হলে তাদের ব্যাপারে স্বাস্থ্য বিভাগ সহজেই ব্যবস্থা নিতে পারবে। একই সঙ্গে ম্যালেরিয়ার চিকিৎসায় ক্লোরোকুইনের সঙ্গে ১৪ দিনের প্রাইমাকুইন যক্ষ্মার চিকিৎসার মতো ‘ডটস’ পদ্ধতির মাধ্যমে নিশ্চিত করার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। ম্যালেরিয়া নির্মূল সম্ভব। তার জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক অঙ্গীকার, আর্থিক সংকুলান, অর্জিত সফলতা ধরে রাখার জন্য কর্মকাণ্ডগুলো চালু রাখা এবং জনগণকে সম্পৃক্ত করা। ম্যালেরিয়াপ্রবণ এলাকাগুলোয় সরকার ও এনজিওগুলোর যৌথ উদ্যোগে কমিউনিটিনির্ভর যেসব কার্যক্রম রয়েছে তা চালিয়ে নেয়া এবং বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। শুধু বিদেশী সহায়তার ওপর নির্ভর করে এসব অঞ্চলে ম্যালেরিয়া প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম পরিচালনা করা বিচক্ষণতার পরিচায়ক হবে না। ধীরে ধীরে নিজেদের সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি এসব অঞ্চলে বিভিন্ন কার্যক্রম ধারাবাহিকভাবে পরিচালনার জন্য অর্থায়নসহ সব দায়দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে নেয়ার চেষ্টা করতে হবে। আর তাতে দেশের ম্যালেরিয়া প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি টেকসই উন্নয়নের একটি উদাহরণ হয়ে উঠতে পারবে।