মানি লন্ডারিং বা বিদেশে অর্থ পাচার যেকোনো দেশের জন্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। বাংলাদেশ কয়েক বছর আগে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছে। ২০২৪ সালের আনুষ্ঠানিক গ্র্যাজুয়েশনের পর এলডিসি দেশের সুযোগ-সুবিধা বাংলাদেশ আর পাবে না। দেশের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিদেশে অর্থ পাচার এক বিরাট বাধা হিসেবে বিবেচিত হয়। দেশে অর্থ পাচার নিরোধ বা বন্ধের জন্য মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ পাস হয়েছে; যা ২০১৫ সালে প্রয়োজনের নিরিখে আংশিক সংশোধিত হয়েছে। এ আইন অনুযায়ী বৈধ অনুমোদন ছাড়া দেশের বাইরে অর্থ-সম্পত্তি প্রেরণ বা পাচার কিংবা দেশের বাইরে উপার্জিত সম্পত্তি, যাতে বাংলাদেশের স্বার্থ রয়েছে, তা ফেরত না আনা কিংবা ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে বিদেশে অর্জিত অর্থ বা প্রকৃত পাওনা দেশে না আনা অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে।

বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, নিম্নে বর্ণিত কারণে বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচার হয়ে থাকে—ক. বিদেশে বিনিয়োগের আড়ালে অর্থ পাচার, খ. দুর্নীতি বা অসদুপায়ে অর্জিত অর্থ বিদেশে পাচার, গ. মাদক ও অস্ত্র ব্যবসার মতো অবৈধ ব্যবসা-অর্জিত অর্থ বিদেশে নিরাপদ স্থানে সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে পাচার, ঘ. ‘হিউম্যান ট্রাফিকিং’ বা মানব পাচারের মাধ্যমে অর্জিত অর্থ পাচার, ঙ. উন্নত সুযোগ-সুবিধার জন্য স্ত্রী-সন্তানদের বিদেশে রাখা এবং নিজেও গোপনে ওই দেশের নাগরিক হয়ে ভবিষ্যতের নিরাপত্তার জন্য অর্থ পাচার করে জমা করা, চ. অনেক সময় দেশে সাধারণ নির্বাচনের প্রাক্কালে ভবিষ্যতে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টির আশঙ্কায় রাজনীতিসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা ব্যবসায়ী ‘নিরাপদে’ দেশে অর্থ পাচার করেন এবং ছ. মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির ‘ট্রান্সফার মিস প্রাইসিং’-এর মাধ্যমেও অর্থ পাচারের সম্ভাবনা থাকে।

অর্থ পাচারের মাধ্যমগুলো হলো: ই-ট্রান্সফারের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা প্রেরণ, হুন্ডি, কুরিয়ার সার্ভিস বা ব্যক্তি বাহকের মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তর। তবে বৈদেশিক বাণিজ্যের মাধ্যমে অর্থ পাচার বাংলাদেশে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা বা থিংক ট্যাংক গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটির (জিএফআই) মতে, বাংলাদেশের মোট অর্থ পাচারের প্রায় ৮০ শতাংশ সংঘটিত হয় আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের আড়ালে। মুদ্রা বা অর্থ পাচারের ইচ্ছা থাকলে আমদানির ক্ষেত্রে দ্রব্যের অতি মূল্যায়ন এবং রফতানির ক্ষেত্রে পণ্যের অবমূল্যায়ন করা হয়। কখনো কখনো পণ্য আমদানি-রফতানি না করেও অসদুপায়ে জাল কাগজপত্র তৈরি করে অর্থ পাচার হয়।

অর্থ পাচার রোধে অন্যান্য দেশের ন্যায় বাংলাদেশও বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করে আসছে। ১৯৪৭ সালের বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইনে মুদ্রা পাচার একটি অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হলেও এ আইনে মামলা করার কোনো নজির নেই। ১৯৬৯ সালের শুল্ক আইনে আমদানি-রফতানির মিথ্যা তথ্য প্রদান করলে ৩২ নং ধারার লঙ্ঘন হিসেবে তদন্ত করা হয়। আদালতে মামলা করলেই কেবল শাস্তি দেয়া যায়। সচরাচর এ ধরনের মামলা করা হয় না।

প্রযোজ্য ক্ষেত্রে প্রাপ্ত শুল্ক আদায় করা হয়। সেজন্য বলা হয়, এ আইনও অর্থ পাচার প্রতিরোধে পর্যাপ্ত নয়। ২০১২ সালের মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন জারির মাধ্যামে এ অপরাধের জন্য সুনির্দিষ্ট শাস্তির বিধান করা হয়েছে। বৈধ বা অবৈধ উপায়ে অর্জিত অর্থ বিদেশে পাচার ধরা পড়লে বা প্রমাণিত হলে অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অর্থ বা সম্পত্তির দ্বিগুণ মূল্য বা ১০ লাখ টাকা (যা অধিক) অর্থদণ্ড এবং সর্বনিম্ন চার বছর বা সর্বোচ্চ ১২ বছর কারাদণ্ড দেয়ার  বিধান রয়েছে।

বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে ২০০২ সালে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ বিভাগ চালু হয়েছে। কিন্তু অতীতে এ বিভাগের প্রতিরোধমূলক কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজ চোখে পড়েনি। বিশ্বের মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ ইউনিটগুলোর সংগঠন এডমন্ট গ্রুপ ১৯৯৪ সালে নেদারল্যান্ডসে গঠিত হয়। বাংলাদেশের মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের ভিত্তিতে ২০১২ সালে গঠিত বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) ২০১৩ সালে এডমন্ট গ্রুপের সদস্য হয়। বর্তমানে বাংলাদেশ এ গ্রুপের অন্তর্ভুক্ত ১৬৪ দেশের মধ্যে অন্যতম সদস্য। ২০১২ সালের মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ও ২০১৫ সালের সংশোধিত আইন অনুযায়ী বিএফআইইউ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও পুলিশের সিআইডি পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে অর্থ পাচার প্রতিরোধে কাজ করবে। এ ব্যাপারে বিএফআইইউর সঙ্গে অন্য তিন সংস্থার সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। ঘুষ বা দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ বিদেশে পাচারের অভিযোগ দুদক এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের মাধ্যমে অর্থ পাচার ধরা পড়লে এনবিআর তদন্ত করে মামলা করে। এছাড়া হুন্ডি বা অন্য কোনো উপায়ে অর্থ পাচার হলে তা সিআইডি তদন্ত করবে। বিএফআইইউ বিদেশী রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট ইউনিট বা অন্য কোনো সংস্থা থেকে মানি লন্ডারিং-সংক্রান্ত কোনো তথ্য পেলে কিংবা দেশের ভেতরে সন্দেহজনক লেনদেন সম্পর্কিত তথ্য অভিযোগ বা গণমাধ্যমের খবরে জানতে পারলে তা বিশ্লেষণপূর্বক তদন্ত সংস্থাগুলোর কাছে পাঠায়। তদন্তকালে সংস্থাগুলো ২০১২ সালের আইন ছাড়াও ‘সন্ত্রাস বিরোধী আইন, ২০০৯’-এর সংশ্লিষ্ট ধারা অনুযায়ী অপরাধীকে দোষী সাব্যস্ত করতে পারে।

আইনি ব্যবস্থা থাকেলেও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো এ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি বা সাফল্য দেখাতে পারেনি। তদন্ত করে চার্জশিট প্রদান এবং কোর্টে মামলা করার পর দীর্ঘসূত্রতা এর অন্যতম কারণ। কোনো মামলা সাত-আট বছরের আগে নিষ্পত্তি হয় না। এমনকি ৮-১০ বছরের পুরনো বহু মামলা পেন্ডিং রয়েছে। অনেক সময় চিহ্নিত সন্দেহভাজন অপরাধীর রিরূদ্ধে মামলা ও শাস্তি না হওয়াও অর্থ পাচার প্রতিরোধে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বিদেশে পাচারকৃত সম্পদ দেশে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে অ্যাটর্নি জেনারেল অব বাংলাদেশের নেতৃত্বে গঠিত একটি আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্স কাজ করছে। বিভিন্ন দেশের সঙ্গে পারস্পরিক আইনগত সহযোগিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে অপরাধ সম্পর্কিত বিষয়ে পারস্পরিক সহায়তা আইন, ২০১২ জারি করা হয়েছে। পারস্পরিক সহায়তা প্রক্রিয়া সহজতর করার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে ‘কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের’ দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। কিন্তু বিদেশ থেকে অর্থ ফেরত আনার প্রক্রিয়াটি বেশ জটিল। অপরাধীকে স্বদেশ এবং যে দেশে অর্থ পাচার হয়েছে, উভয় দেশের আদালতে দোষী সাব্যস্ত করতে হয়। এ পর্যন্ত মাত্র দুটি কেসে পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনার নজির রয়েছে।

অর্থ পাচার নিয়ে কাজ করা গবেষণা প্রতিষ্ঠান জিএফআই বিভিন্ন দেশের মুদ্রা পাচারের তথ্য বিভিন্ন উৎস থেকে সংগ্রহ করে প্রচার করে। এ সংস্থার সর্বশেষ প্রচারিত রিপোর্টে বাংলাদেশের ২০১৫ সাল পর্যন্ত অর্থ পাচারের তথ্য রয়েছে। এতে দেখা যায়, ২০১৩ সালে বাংলাদেশ থেকে পাচারকৃত অর্থের পরিমাপ ৮২ হাজার ১১০ কোটি টাকা, ২০১৪ সালে পাচার হয়েছে ৭৭ হাজার ৪৩৫ কোটি এবং ২০১৫ সালে ৯৮ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা। জিএফআইয়ের তথ্য অনুযায়ী আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর প্রায় ৬৪ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়। ২০০৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে পাচারকৃত অর্থের পরিমাণ ৬ লাখ কোটি টাকা অতিক্রম করতে পারে বলে অভিজ্ঞ মহলের ধারণা।

বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচারের গন্তব্যস্থল কোথায়, তার তথ্য সঠিকভাবে জানা যায় না। তবে যেসব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্য রয়েছে, প্রাথমিকভাবে সেসব দেশে এবং পরবর্তী সময়ে অন্যত্র সুবিধামতো অর্থ স্থানান্তরিত হয়। সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশী নাগরিকদের কী পরিমাণ অর্থ রয়েছে, তার হিসাব পাওয়া যায়। ২০১৭ সালে সুইস ব্যাংকে জমার পরিমাণ ৪ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা। ২০১৮-তে ৫ হাজার ৪৯৮ কোটি এবং ২০১৯-এ ৫ হাজার ৩৬৭ কোটি টাকা। তবে সুইস ব্যাংকের সব টাকা পাচারকৃত নয়, অনেকে বিদেশে বৈধভাবে উপার্জন করে সুইস ব্যাংকে টাকা রাখেন। ইউরোপের অন্যান্য দেশ, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায়ও পাচারকৃত সম্পদ জমা করা হয়। এশিয়ার মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরে টাকা রাখতেও অনেকে নিরাপদ মনে করেন। পানামা, ভার্জিন আইল্যান্ড ও বেলিজের মতো ট্যাক্স হ্যাভেনে কেউ কেউ অর্থসম্পদ রাখেন বলে অনেকের ধারণা। মধ্যপ্রাচ্যের দুবাই, কুয়েতসহ অন্যান্য দেশ এবং দক্ষিণ আফ্রিকা ও মরক্কোতে কারো কারো সম্পদ রয়েছে। বিভিন্ন দেশে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, বাড়ি বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে লগ্নি করে পাচারকৃত অর্থ সম্পদ রাখা হয়।

যেহেতু আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আড়ালেই বাংলাদেশ থেকে বেশি অর্থ বিদেশে পাচার হয়, সেজন্য মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে এনবিআরের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন স্থল, বিমান ও নৌবন্দরে স্থাপিত কাস্টমস কমিশনারেটগুলো সুনির্দিষ্ট অর্থ পাচার কেইস শনাক্ত করে মামলা করতে পারে। তবে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর এবং সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল এ ধরনের কাজের জন্য বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান। গত কয়েক বছরে এনবিআরের পক্ষ থেকে ৬৬টি মামলা করা হয়েছে, যার জড়িত টাকার পরিমাণ ২ হাজার ৮৪৪ দশমিক ৪৯ কোটি টাকা। স্বর্ণ চোরাচালানের মামলাগুলো এ সংখ্যায় অন্তর্ভুক্ত নয়। স্বর্ণ চোরাচালানের অসংখ্য মামলাও বিভিন্ন কোর্টে বিচারাধীন রয়েছে, যেগুলোর নিষ্পত্তি সময়সাপেক্ষ।

এরই মধ্যে কাস্টম হাউজ, বাণিজ্যিক ব্যাংক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের মধ্যে অনলাইনে সংযুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়া চালু হয়েছে, যাতে এলসি থেকে শুরু করে আমদানি-রফতানিসংক্রান্ত তথ্য সব পক্ষ জানতে পারে। ব্যবসা-বাণিজ্য অনলাইনভিত্তিক ও সহজীকরণের জন্য এনবিআরে ন্যাশনাল সিঙ্গেল উইন্ডো নামে একটি প্রকল্প চলমান রয়েছে। এটি সফলভাবে বাস্তবায়ন হলে আমদানি-রফতানি বাণিজ্য ও শুল্ক রাজস্ব আহরণে স্বচ্ছতা আসবে এবং অর্থ পাচার অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। সর্বোপরি এ কাজে কাস্টমস, বাণিজ্যিক ব্যাংক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের দক্ষতা, আন্তরিকতা ও জবাবদিহিতা প্রয়োজন।

মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসবাদে অর্থায়ন প্রতিরোধে বৈশ্বিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বে জাতীয় কর্মপন্থা (২০১৯-২১) নির্ধারণসংক্রান্ত একটি কমিটি রয়েছে। ওই কমিটি অর্থ মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, দুদক, এনবিআরসহ সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের নিয়ে সভা করে কর্মপন্থা নির্ধারণ ও নির্দেশনা দেয়। দুদকের এ-সংক্রান্ত বিশেষায়িত কমিটি ছাড়াও এনবিআরের পূর্বোল্লিখিত দুটি সংস্থা এবং এনবিআরের আন্তর্জাতিক কর উইং ও কাস্টমস রিস্ক ম্যানেজমেন্ট ইউনিট এ-সংক্রান্ত কাজ করছে। মামলা তদারকি এবং বিভিন্ন দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয়ের জন্য এনবিআরে ‘মানি লন্ডারিং টাস্কফোর্স’ গঠন অত্যন্ত জরুরি। ২০২০-২১ বাজেটের অর্থবিলে আন্ডার ইনভয়েসিং ও ওভার ইনভয়েসিং রোধে আয়করসংক্রান্ত একটি নতুন ধারা সংযোজন করা হয়েছে। এ বিধান অনুযায়ী যে পরিমাণ অর্থ আন্ডার ইনভয়েসিং ও ওভার ইনভয়েসিং করে পাচার প্রমাণিত হবে, তার ওপর ৫০ শতাংশ হারে করারোপিত হবে। এটি মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর মাধ্যমে প্রদত্ত শাস্তির অতিরিক্ত। এনবিআর, দুদক বা পুলিশের সিআইডি—এ তিন সংস্থার মধ্যে তদন্তকারী যে সংস্থাই হোক, আদালতের সঙ্গে সক্রিয় যোগাযোগ রেখে যথাশিগগির মামলা নিষ্পত্তি করা প্রয়োজন।

অপরাধীকে আদালতে দোষী সাব্যস্ত করে পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনা জটিল ও সময়সাপেক্ষ বিবেচনায় করারোপণের মাধ্যমে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ কার্যকরী পন্থা বলে অনেকে মনে করেন। সেজন্য বাংলাদেশী নাগরিকদের অর্থ পাচারের তথ্য সংশ্লিষ্ট দেশের সঙ্গে দ্বৈত কর পরিহারসংক্রান্ত চুক্তির শর্তানুসারে পাওয়া যেতে পারে। এ পর্যন্ত মাত্র ৩৪টি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের এরূপ চুক্তি রয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিদেশী বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং অর্থ পাচার প্রতিরোধে সহায়তার জন্য আরো অধিকসংখ্যক দেশের সঙ্গে এ চুক্তি সম্পাদন করা প্রয়োজন। এছাড়া এনবিআরের কর অনুবিভাগ নিচের দুটি আন্তর্জাতিক ফোরামের সদস্য হতে পারে—১. Base Erosion and Profit Shifting Inclusive Framework (BEPS) ও ২. Global Forum on Transparency and Exchange of Information for Tax Purposes। ওইসিডির অভিভাবকত্বে পরিচালিত এ সংস্থা দুটি মানি লন্ডারিং ও ট্রান্সফার প্রাইসিং-সংক্রান্ত তথ্য আদান-প্রদান করে এনবিআরকে সহায়তা করতে পারে। ফলে কর ফাঁকি দিয়ে স্থানান্তরিত অর্থ হিসাব করে এনবিআর জরিমানাসহ কর আদায় করতে পারে। এনবিআরের ট্রান্সফার প্রাইসিং সেল জোরদার ও সক্রিয় থাকলে বহুজাতিক কোনো সংস্থা চাইলেও অবৈধ উপায়ে অর্থ স্থানান্তর করতে পারবে না।

বিএফআইইউর তথ্য সংগ্রহেও অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অনেক দেশ নিজ দ্বৈত নাগরিকদের সম্পদসংক্রান্ত তথ্য প্রদান করে না। যেমন কানাডার কথিত ‘বেগমপাড়ায়’ যেসব বাংলাদেশী আস্তানা গেড়ে ওই দেশের নাগরিকত্ব নিয়েছেন, তাদের কিংবা তাদের পরিবারের সদস্যদের তথ্য দিতে কানাডীয় সরকার বাধ্য নয়। তবে বিভিন্ন দেশের ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট এবং জিএফআই ও অন্য অনেক আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে সক্রিয় যোগাযোগ রেখে বিএফআইইউ দেশীয় তদন্ত সংস্থাগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারে।

দেশের জাতীয় আয়ের একটা বিরাট অংশ অর্থ পাচারের মাধ্যমে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বাস্তবায়নের স্বার্থে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে পরিচালক ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নামে-বেনামে ঋণ গ্রহণ ও অর্থ স্থানান্তরে কড়াকড়ি আরোপ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের কঠোর নজরদারি বাড়াতে হবে। বিদেশে বৈধ বিনিয়োগ ও ব্যবসার মাধ্যমে অর্থসম্পদ উপার্জন করে দেশে না এনে অন্যত্র সরানো কিংবা আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের অসত্য তথ্য প্রদানের মাধ্যমে অর্থ পাচার করে পাচারকারীদের ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকা প্রতিরোধ করতে হবে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন অব্যাহত রাখার স্বার্থেই এটি প্রয়োজন।

 

মো. মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া: সাবেক সিনিয়র সচিব ও এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান