দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে বিশ্বজুড়ে সংক্রমণ ছড়িয়ে যাচ্ছে কভিড-১৯। আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা বাড়িয়ে চলার পাশাপাশি নতুন নতুন সব তথ্যও সামনে আনছে অদৃশ্য এ ভাইরাস। সারা বিশ্বে নানা গবেষণার পর একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে সম্প্রতি। আশঙ্কা করা হচ্ছে, করোনা মহামারীর প্রকোপ কমে যাওয়ার পর অসংক্রামক রোগের ঝুঁকিতে পড়তে যাচ্ছে বিশ্ব। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে ৬৭ শতাংশ মৃত্যুর কারণ অসংক্রামক রোগ। এর মধ্যেই গতকাল বিশ্বব্যাংকের এক গবেষণা প্রতিবেদনের বরাতে বণিক বার্তায় প্রকাশিত এক খবরে বলা হয়েছে, দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতায় ৬০ শতাংশ মানুষ স্বাস্থ্যসেবার বাইরে থাকছে। এর পেছনে কারণ হিসেবে চিকিৎসা গ্রহণে রোগীর অনীহা ও সেবার অপ্রতুলতার বিষয়টি গবেষণায় উঠে এসেছে। এক্ষেত্রে ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে অসংক্রামক রোগের চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণ ও জনসচেতনতা বাড়ানোর বিকল্প নেই।
বর্তমান বাস্তবতায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রে অসংক্রামক রোগের সেবাকে উন্নত করা প্রয়োজন। অসংক্রামক রোগ একটি নীরব ঘাতক এবং এ রোগগুলো প্রাথমিক অবস্থায় কোনো লক্ষণ নিয়ে হাজির হয় না, তাই কেউ রোগে আক্রান্ত বা রোগের ঝুঁকিতে রয়েছে কিনা, তা পরীক্ষা না করা পর্যন্ত জানা যায় না। অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি সম্পর্কে বেশির ভাগ মানুষেরই প্রয়োজনীয় জ্ঞানের অভাব রয়েছে, তাই সুস্থ অবস্থায় অধিকাংশ মানুষই আচরণগত ঝুঁকিগুলোকে গুরুত্ব দেয় না। গবেষণায় দেখা গেছে, উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত ব্যক্তিরা প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য সাধারণত ওষুধের দোকান বা চিকিৎসকের চেম্বারে যান এবং সরকারি প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে খুবই কম যান। অধিকাংশেরই এ রোগ সম্পর্কে তেমন কোনো ধারণাই নেই। তাই প্রাথমিক অবস্থায় প্রধান অসংক্রামক রোগগুলোর সঠিক নির্ণয়, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাত্রার অভ্যাস তৈরির জন্য প্রতিটি উপজেলা ও জেলা হাসপাতালে চিকিৎসক ও অন্য স্বাস্থ্যকর্মীদের নির্ধারিত গাইডলাইনভিত্তিক কর্মসূচির আওতায় আনা জরুরি। মানসিক চাপ ও দুশ্চিন্তা যেকোনো অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি ও নিরাময়ের ক্ষেত্রে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। তাই মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ বা রেফারেল ব্যবস্থা উপজেলা ও জেলায় অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
অসংক্রামক রোগের চিকিৎসা সারা জীবনের জন্য বিধায় ব্যয়বহুল। হূদরোগ, স্ট্রোক, ডায়াবেটিস জটিলতা, ক্যান্সার, দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসকষ্ট চিকিৎসার জন্য বিশেষায়িত হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ ও জেলা হাসপাতালে ব্যবস্থা আছে। এসব চিকিৎসা ব্যবস্থা উন্নত ধনী দেশের জ্ঞান থেকে নেয়া। দরিদ্র ও নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে সম্পদের ঘাটতি আছে, যেখানে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ধনী দেশের তুলনায় বেশ দুর্বল এবং প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্য পেশাজীবীর মারাত্মক ঘাটতি আছে। এ অবস্থায় অসংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণে জনস্বাস্থ্য পদ্ধতি গ্রহণ করা শ্রেয়, যেখানে সর্বাধিক ব্যক্তিগত পরিচর্যার চেয়ে চিকিৎসায় প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এ পরিপ্রেক্ষিতে সফল জনস্বাস্থ্য পদ্ধতির মূলনীতি হচ্ছে সেবা প্রক্রিয়ার সরলীকরণ, বিকেন্দ্রীকরণ, টাস্ক-শিফটিং, সহকর্মী এবং কার্যক্রমে কমিউনিটির অংশগ্রহণ ও নিজ ব্যবস্থাপনার জন্য সহায়তা প্রদান। দীর্ঘমেয়াদি অসংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ সীমিত সম্পদের যথাযথ ব্যবহারে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অসংক্রামক ব্যাধির নীতি পিইএন জনস্বাস্থ্য পদ্ধতি বেছে নিয়েছে, যার ধারণাগত কাঠামো হলো সীমিত সম্পদ দিয়ে সমতা ও দক্ষতা প্রয়োগ করে প্রাথমিক স্বাস্থ্য প্রদান। এ প্যাকেজের মধ্যে অত্যাবশ্যক ওষুধ ও প্রযুক্তি, ঝুঁকি পূর্বাভাসের সরঞ্জাম, পরিকল্পনা করার সরঞ্জাম, বাস্তবায়ন ও ক্ষমতার মূল্যায়ন এবং কার্যাবলি কীভাবে প্রয়োগ করা উচিত সে সম্পর্কে নির্দেশিকা ও প্রটোকল রয়েছে। অসংক্রামক ব্যাধির জন্য পিইএন হলো ন্যূনতম মানদণ্ড, যা হূদরোগ, স্ট্রোক, হূদরোগ ঝুঁকি, ডায়াবেটিস, ক্যান্সার, দীর্ঘদিনের শ্বাসকষ্ট প্রাথমিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় সীমিত সম্পদের মধ্যে একীভূত সেবা ও পরিচর্যা প্রদানের কথা বলে। এ প্রক্রিয়া যথাযথ অনুসরণ করা আবশ্যক।
স্বাস্থ্যের আর্থিক দিক বিবেচনা করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এরই মধ্যে অসংক্রামক ব্যাধি প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে বৈশ্বিক রূপরেখা প্রণয়ন করেছে, যা তিনটি স্তম্ভের ওপর ভিত্তি করে স্থাপিত—নজরদারি, প্রাথমিক প্রতিরোধ ও শক্তিশালী স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা। জাতিসংঘের ২০১১ সালের সাধারণ পরিষদের সভায় রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানরা অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধে ‘সমগ্র সরকার ও সমগ্র সমাজ প্রচেষ্টা’র মাধ্যমে ‘স্বাস্থ্য প্রবর্ধনমূলক পরিবেশ তৈরির জন্য বহুমুখী জনস্বাস্থ্য নীতি’ বাস্তবায়ন করার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন। বৈশ্বিক নীতির সঙ্গে মিল রেখে বাংলাদেশ সরকার ২০১৮-২৫ সাল পর্যন্ত একটি কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে, যা চতুর্থ স্বাস্থ্য পুষ্টি ও জনসংখ্যা খাত প্রোগ্রামের এইচএনপিএসপির সঙ্গে মিল রেখে প্রণীত।
আশার কথা, এরই মধ্যে দেশের সব উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের বহির্বিভাগে অসংক্রামক রোগের জন্য আলাদা চিকিৎসাকক্ষ (এনসিডি কর্নার) ও চিকিৎসক নিয়োগের ব্যবস্থা করা হয়েছে। উচ্চরক্তচাপ ও ডায়াবেটিস পরীক্ষা করার জন্য কিছু কিছু উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসকের সঙ্গে একজন নার্সও সংযুক্ত করা হয়েছে এবং উচ্চরক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের ওষুধ সরবরাহ বাড়ানো হয়েছে। এমনকি রক্তের কোলেস্টেরল কমানোর ওষুধও বর্তমানে বিনা মূল্যে সরকারিভাবে দেয়া হচ্ছে।
লক্ষ্য অর্জনের জন্য বহু খাতভিত্তিক অসংক্রামক রোগ সমন্বয়, নজরদারি, পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন প্রয়োজন। কর্মপরিকল্পনায় প্রথম পর্যায়ে সীমিতসংখ্যক উপজেলায় উচ্চরক্তচাপ, ডায়াবেটিস সেবা কার্যক্রম শুরু হলেও সেবার আওতা ক্রমে বাড়াতে হবে। দেশব্যাপী এ সেবা কার্যক্রম দ্রুত বিস্তৃত করা প্রয়োজন। অন্যান্য অসংক্রামক রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা ব্যবস্থা এখনো উপজেলা পর্যায়ে অপ্রতুল। উপজেলা হাসপাতালের সঙ্গে মেডিকেল কলেজ ও জেলা হাসপাতালের ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে যোগাযোগ স্থাপনের মাধ্যমে হাব-স্পোক মডেল চিকিৎসা উন্নয়ন সম্ভব, যার মডেল হচ্ছে জাতীয় চক্ষু সেবা কার্যক্রম এনইসি। বহু খাতভিত্তিক অসংক্রামক রোগের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় তুলনামূলক নতুন প্রবর্তিত বিষয়। অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে এনসিডি ব্যবস্থাপনায় সব সেক্রেটারিয়েট প্রতিষ্ঠাসহ প্রয়োজনীয় পদ সৃষ্টি ও প্রশিক্ষিত জনবল ব্যবস্থা করা আবশ্যক।
বাংলাদেশ অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে চিকিৎসা ব্যবস্থা বিকেন্দ্রীকরণের মডেল তৈরি করেছে। এতে কমিউনিটি ক্লিনিকে ও কমিউনিটিতে প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যসেবা কর্মী এবং স্বাস্থ্য স্বেচ্ছাসেবকভিত্তিক (মাল্টিপারপাস হেলথ ভলান্টিয়ার) উচ্চরক্তচাপ ও ডায়াবেটিস শনাক্তকরণ এবং উপযুক্ত চিকিৎসার জন্য উপজেলায় প্রেরণ করে প্রশিক্ষিত চিকিৎসক দল দিয়ে রোগ সুনিশ্চিতকরণ ও ঝুঁকি-জীবনাচরণবিষয়ক স্বাস্থ্য শিক্ষা, ওষুধ সরবরাহ ও কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে ওষুধ পুনর্ভরণ উল্লেখ্যযোগ্য। চিকিৎসা ব্যবস্থায় সমতা আনয়নে এ ধরনের ব্যবস্থা দেশের ৪৯৫ উপজেলায় সর্বত্র দ্রুত রাখার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। এনসিডি রোগীর মধ্যে সবচেয়ে সহজে চিকিৎসা করা যায় এমন রোগী উচ্চরক্তচাপ ও ডায়াবেটিস রোগীদের স্বাস্থ্য জ্ঞান এবং চিকিৎসা পাওয়া মৌলিক অধিকার। অন্যথায় অধিকসংখ্যক স্ট্রোক ও হূদরোগ (হার্ট অ্যাটাক) হওয়া অবশ্যম্ভাবী। এদের যথাযথ রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা এখনো দেশে ব্যাপকভাবে শুরু হয়নি। একইভাবে ক্যান্সার স্ক্রিনিং সহজে করার ব্যবস্থাও সম্প্রসারণ করতে হবে। যদিও জটিল রোগীদের বিশেষায়িত সেবার জন্য জেলা হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফারের ব্যবস্থার মধ্যেই অন্তর্ভুক্ত। তবে অসংক্রামক রোগের চিকিৎসা সরকারি পর্যায়ে বৃদ্ধি প্রয়োজন।
প্রতি পাঁচ হাজার মানুষের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের জন্য একটি কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। একে আরো কার্যকর করার মাধ্যমে অসংক্রামক রোগের প্রাথমিক সেবা ও পরামর্শ প্রদানের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কমিউনিটি ক্লিনিকে নিয়মিত নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত মানসম্পন্ন ডাক্তার ও নার্সের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো এখন প্রসূতি, প্রজনন ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। এগুলো সংকুচিত না করে অসংক্রামক রোগীর সেবা প্রদানের ব্যবস্থা করা যায় কিনা, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম এখন শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সীমিত। কিন্তু শহরগুলোর প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থাপনা মূলত সিটি করপোরেশনের স্বাস্থ্য শাখার মাধ্যমে পরিচালিত হয়। শহরের সরকারি প্রাথমিক চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণের কার্যক্রম এখনো যুক্ত করা হয়নি। এ জন্য শহরাঞ্চলের মানুষকে বেসরকারি চিকিৎসাসেবার ওপর নির্ভর করতে হয়, যা অনেক ব্যয়বহুল। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এরই মধ্যে একটি মাল্টিসেক্টরাল কমিটি গঠন করেছে এবং এর মাধ্যমে অন্যান্য মন্ত্রণালয়কে অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে আরো কার্যকর ভূমিকা পালনে নিয়োজিত করা যাবে বলে প্রত্যাশা করছি।










