কয়েক মাস ধরে নিত্যপণ্যের দাম বাড়তে থাকলেও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) উপাত্তে তার কোনো প্রতিফলন লক্ষ করা যাচ্ছে না। আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, সংস্থাটির হিসাবে ডিসেম্বরের চেয়ে জানুয়ারিতে মূল্যস্ফীতি কমেছে! অর্থনীতিবিদরা বিভিন্ন সময়ে বিবিএসের পরিসংখ্যান নিয়ে প্রশ্ন তুললেও সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) মাঠ পর্যায়ের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহপূর্বক জানিয়েছে, প্রকৃত খাদ্য মূল্যস্ফীতি বিবিএসের দেয়া তথ্যের চেয়ে অনেক বেশি। দেশে ও আন্তর্জাতিক বাজারে যেভাবে খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের দাম বাড়ছে, তার প্রভাব বিবিএসের হিসাবে দেখা যাচ্ছে না। ফলে নীতি নির্ধারণে মূল্যস্ফীতি হ্রাসের বিষয়টি আড়ালেই থেকে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতি নিয়ে সানেমসহ অর্থনীতিবিদরা যে প্রশ্ন তুলেছেন, বিবিএস তা অস্বীকার না করে যথাযথ ব্যাখ্যা দেবে বলে প্রত্যাশা। একই সঙ্গে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ আমলে নিয়ে মূল্যস্ফীতি পরিমাপের প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনবে, যাতে বাজার ও মানুষের প্রকৃত চিত্র উঠে আসে।
দেশের মূল্যস্ফীতির উপাত্তের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। অবশ্য কেবল মূল্যস্ফীতিই নয়, সামগ্রিকভাবেই দেশের পরিসংখ্যানের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা নতুন কিছু নয়। তবে ইদানীং এ প্রশ্ন বাড়ছে। মূল্যবৃদ্ধির প্রবণতাটি অস্বাভাবিক। সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে, পর্যাপ্ত খাদ্য মজুদ আছে। কিন্তু বাজার পরিস্থিতি গরম হয়ে উঠছে। আর কিছুদিন পরই রমজান মাস শুরু হবে। প্রতি বছরই রমজানে বাজারে প্রভাব পড়ে। বেশ কয়েক বছর ধরে দেখা যাচ্ছে রমজান মাসকে কেন্দ্র করে দেশে নিত্যপণ্যের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়। রমজানে দেশে চিনি, ভোজ্যতেল, ডাল, খেজুর ও পেঁয়াজের চাহিদা কিছুটা বাড়তি থাকার সুযোগ নিয়ে একশ্রেণীর ব্যবসায়ী-আমদানিকারক নানা অজুহাতে এসব পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির মাধ্যমে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করে নিজেদের পকেট ভারী করেন। আর এবার সেই কৃত্রিম পরিস্থিতির সুযোগ তথাকথিত সিন্ডিকেট আরো বেশি করে গ্রহণ করতে পারে—এমন শঙ্কা একেবারে অমূলক নয়। নিত্যপণ্যের দাম বাড়ায় মানুষকে বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হয়, সেই অর্থকে বলা হয় এক ধরনের বাধ্যতামূলক কর। এতে ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়, বিশেষ করে সীমিত আয়ের মানুষের।
সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রায় সব ধরনের পণ্যের দাম বাড়ার পরিপ্রেক্ষিতে পৃথিবীর সব দেশেই উচ্চমূল্যস্ফীতি দেখা যাচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশের বাজারে সব ধরনের পণ্যের দাম বাড়ার পরও সরকারের পক্ষ থেকে মূল্যস্ফীতি কম বলা হচ্ছে। বিবিএসের সিপিআই ও মূল্যস্ফীতি হিসাবের প্রক্রিয়া নিয়ে বড় আকারে সমালোচনা রয়েছে। ২০১৬ সালে খানা আয়-ব্যয়ের একটি জরিপ আছে এবং যার তথ্য-উপাত্ত ২০১৭ সাল থেকেই পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু বিবিএস ২০০৫-০৬ সালের গৃহস্থালি আয়-ব্যয় সমীক্ষার উপাত্ত ব্যবহার করছে। গত ১৭ বছরে সবকিছুর পরিবর্তন হয়েছে। মাথাপিছু আয় এরই মধ্যে বেড়েছে। অন্যদিকে ২০০৫-০৬ সাল থেকে এখন পর্যন্ত দেশের দরিদ্র ও সচ্ছল উভয় শ্রেণীর মানুষের খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন এসেছে। অথচ বিবিএস খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন বিবেচনায় আনছে না। সিপিআই গণনা করার জন্য বিবিএস যে ভোগ্যপণ্যের তালিকা ব্যবহার করে, তাতে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর ভোগ বা ব্যয়ের প্রকৃত চিত্র আড়ালে থেকে যাচ্ছে। শহরের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী আয়ের ৬১ দশমিক ৩১ শতাংশ ও গ্রামীণ প্রান্তিক জনগোষ্ঠী আয়ের ৬৫ দশমিক ৩৬ শতাংশ অর্থ খাদ্যের পেছনে ব্যয় করে। অথচ বিবিএসের হিসাবে এ ব্যয়ের হার যথাক্রমে ৪৫ দশমিক ১৭ ও ৫৮ দশমিক ৫৪ শতাংশ। বাংলাদেশের মানুষের ভোগে সবচেয়ে বড় জায়গা দখল করে আছে চাল। আর এ চালের দাম জাতীয় মূল্যস্ফীতির চেয়ে দ্বিগুণের বেশি হারে বেড়েছে। এসব বিষয় আমলে নিয়ে মূল্যস্ফীতি যথাযথ পরিমাপে হিসাবের দুর্বলতা দূর করতে বিবিএসকেই কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
বিশ্ব খাদ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, ২০১১ সালের পর ২০২১ সালে বিশ্বে খাদ্যপণ্যের দাম সবচেয়ে বেশি ২৮ শতাংশের মতো বেড়েছে। এটা এখনো চলমান। সুতরাং বাংলাদেশ এর বাইরে থাকার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। মূল্যস্ফীতির হিসাব বিশেষত প্রক্রিয়া নিয়ে বেশ কয়েক বছর ধরেই প্রশ্ন উঠছে। ভারতে মূল্যস্ফীতির হিসাব নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় বড় ধরনের সংস্কার আনা হয়েছে। দেশটি নির্দিষ্ট সময় পরপর ‘ফুড বাস্কেট’ সাজায় এবং যে পণ্যের চাহিদা বেশি, তার প্রতি গুরুত্ব দেয়। ভারতের পরিসংখ্যান বিভাগ ২০১১-১২ অর্থবছরকে ভিত্তি হিসেবে ধরে মূল্যস্ফীতি হিসাব করছে। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের কারণে প্রতি মাসের মূল্যস্ফীতির তথ্য প্রতি মাসেই মিলছে। শুধু তা-ই নয়, রিয়েল টাইম মূল্যস্ফীতির তথ্যও ওয়েবসাইট থেকে পাওয়া যায়। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে। ভারতের জাতীয় পরিসংখ্যান অফিস আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের স্পেশাল ডাটা ডিসেমিনেশন স্ট্যান্ডার্ডস (এসডিডিএস) পুরোপুরি অনুসরণ করছে। এতে ভারতের পরিসংখ্যানের মান আরো উন্নত হয়েছে। তারা শুধু ডাটা সংগ্রহই করে না, সেগুলো যাচাই ও পুনর্যাচাই করে তৃতীয় পক্ষের মতামতও নেয়। বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে শক্তিশালী উপদেষ্টা কমিটিসহ প্রতিটি শাখার জন্য ভিন্ন বিশেষজ্ঞ কমিটি রয়েছে। এসব পদক্ষেপই ভারতের পরিসংখ্যান ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করেছে।
বাংলাদেশও বিবিএসকে শক্তিশালী করতে এক দশকব্যাপী উদ্যোগ নিয়েছিল। তাতে অবকাঠামোগত উন্নয়নই গুরুত্ব পেয়েছে। কারিগরি, সময়, পরিসংখ্যানের মান, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন প্রভৃতি বিবেচনায় আসেনি তেমন। পরিসংখ্যানের মান উন্নত করতে হলে প্রথমেই আন্তর্জাতিক কিছু বিধিবিধান ও ফর্মুলা অনুসরণ করা আবশ্যক। তাছাড়া তথ্য সংগ্রহ থেকে শুরু করে তা প্রকাশ—প্রতিটি পর্যায়ে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।
সানেমের জরিপকে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে এ জরিপ পরিচালিত হয়েছে। একে অস্বীকার না করে বরং পরিসংখ্যান ব্যবস্থা সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। করোনা প্রাদুর্ভাবে বিশ্বের সব দেশে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে, পার্শ্ববর্তী দেশেও এটি বাড়ছে। বিষয়টিকে লুকিয়ে না রেখে বাস্তব পরিস্থিতি স্বীকার করে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর জন্য সহায়তামূলক পদক্ষেপ নেয়া অধিক যুক্তিযুক্ত। বিদ্যমান পরিস্থিতিকে এড়িয়ে না গিয়ে বরং মূল্যস্ফীতির অভিঘাত থেকে মানুষকে রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণই সরকারের দায়িত্ব।
পৃথিবীর বিভিন্ন রাষ্ট্র করোনাভাইরাস পরিস্থিতি মোকাবেলায় বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। এরই মধ্যে নিত্যপণ্যের দাম স্বাভাবিক রাখতে নানা উদ্যোগ নিয়েছে তারা। তা সত্ত্বেও অনেক রাষ্ট্রেই দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ঠেকাতে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে। আর সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থা ভয়াবহ হওয়াটাই স্বাভাবিক। বাংলাদেশে নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে নিশ্চিতভাবেই ভয়াবহ সংকটের সামনে পড়বে মানুষ। বিশেষত শিশুখাদ্য ও জরুরি চিকিৎসা সরঞ্জামের বাজার নিয়ন্ত্রণে না এলে বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হতে পারে সবাইকে। বাজারে পণ্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধ করতে পারত একটি বিকল্প বাজার ব্যবস্থা। কিন্তু সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের সেদিকে কোনো দৃষ্টি আছে বলে মনে হয় না। বাজারে নিয়মিত নজরদারিতেও যেন অনীহা যথাযথ কর্তৃপক্ষের। বিদ্যমান অবস্থা থেকে মুক্তির উপায় বাজার স্থিতিশীল রাখা। গবেষণা সংস্থা সানেম পণ্যমূল্য বৃদ্ধির সাতটি কারণ উল্লেখ করেছে। এগুলো হলো চাহিদা ও জোগানের মধ্যে সমন্বয়হীনতা, অতিরিক্ত চাহিদা তৈরি, সরবরাহ ঘাটতি, প্রতিযোগিতামূলক বাজার না থাকা, দুর্বল তদারকি ব্যবস্থা, আমদানি মূল্য, পরিবহন খরচ ও বিদেশী মুদ্রার বিনিময় হারের ঊর্ধ্বগতি, বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ও জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি। সরকার বিষয়গুলো আমলে নিয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেবে বলে প্রত্যাশা।
মূল্যস্ফীতিকে বলা হয় প্রান্তিক মানুষের জন্য নিষ্ঠুরতম কর। এটি স্পষ্ট বাংলাদেশের প্রান্তিক মানুষ যে খাদ্যমূল্যস্ফীতির মুখে পড়েছে, সেটি আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যানে প্রতিফলিত হচ্ছে না। দরিদ্র মানুষের ব্যয়ের বেশির ভাগ খাদ্যের পেছনে যায় বলে তাদের পক্ষে খরচ কমানো সম্ভব হয় না। ফলে মূল্যস্ফীতির কারণে তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় এ উদ্বেগজনক পরিস্থিতিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। পরিসংখ্যান ব্যুরোয় বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন। এর মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত সঠিক নির্ভরযোগ্য, আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন পরিসংখ্যান প্রণয়ন। এ লক্ষ্যে বিবিএস পরিচালিত প্রধান প্রধান জরিপসহ অন্যান্য পরিসংখ্যানগত কার্যক্রমের পরিচালনা পদ্ধতি যুগোপযোগী করা, দ্রুততম সময়ে তথ্য সংগ্রহ, সংকলন, প্রক্রিয়াকরণ ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে যথাসময়ে তথ্য বা রিপোর্ট প্রকাশ পর্যন্ত সামগ্রিক প্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয় করার লক্ষ্যে একটি আইসিটি পরিকল্পনা প্রণয়নে গুরুত্ব দিতে হবে। সীমাবদ্ধ সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহারের মাধ্যমে সর্বাধিক পরিসংখ্যান প্রস্তুতের লক্ষ্যে জরিপের পরিবর্তে প্রশাসনিক উৎস থেকে নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ করার ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। দাপ্তরিক পরিসংখ্যান প্রণয়ন একটি টেকনিক্যাল বিষয়। এ কাজ সঠিকভাবে সম্পাদনের জন্য দক্ষ জনবল অপরিহার্য। বিবিএসের সব শুমারি, জরিপের সংজ্ঞা ও মেথডোলজি আধুনিকায়ন এখন জরুরি হয়ে পড়েছে। আমরা আশা করব, সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে সংস্কার ও মানসম্পন্ন পরিসংখ্যান নিশ্চিতে বিবিএস কার্যকর ব্যবস্থা নেবে।










