নিরাপদ ও উন্নত জীবনের আশায় বাংলাদেশসহ বিভিন্ন স্বল্পোন্নত দেশ থেকে প্রতি বছর হাজারো মানুষ ইউরোপের উদ্দেশে যাত্রা করে। তাদের মধ্যে অনেকেরই বৈধ ভিসা থাকলেও একটি বড় অংশের মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিদেশ নামক এক মরীচিকায় বিভোর হয়ে ছুটে চলে অজানার পথে। বর্তমানে সমুদ্রপথ দিয়ে অবৈধ অভিবাসন দেশের অন্যতম বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোনো বৈধ প্রক্রিয়া ছাড়াই নিয়মিতভাবে এ পথে বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করছে অভিবাসনপ্রত্যাশীরা। সরকারি অভিবাসন প্রক্রিয়া ছাড়াও বিদেশে ভালো জীবিকার জন্য প্রতি বছর অসংখ্য তরুণ যুবক বিভিন্ন দেশ হয়ে স্থলপথ বা সাগরপথে অবৈধভাবে বিশেষ করে ইউরোপ যাচ্ছে। আর ইউরোপ পাড়ি দিতে গিয়ে অনেকেই মারা যাচ্ছে, নিখোঁজ হচ্ছে অথবা কেউ আবার পুলিশ বা কোস্টগার্ডের কাছে গ্রেফতার হয়ে জেল খেটে দেশে ফেরত আসছে। এ ধরনের অবৈধ অভিবাসনের ক্ষেত্রে যেসব দেশে বেশি যাওয়ার চেষ্টা করা হয় তার মধ্যে ইউরোপের ইতালি এখন অন্যতম।

এমন যাত্রায় মৃত্যুঝুঁকি নিশ্চিত জেনেও সোনার হরিণ ধরতে সমুদ্রপথে ইউরোপে প্রবেশ করছে বাংলাদেশীসহ বিভিন্ন দেশের অভিবাসীরা। আর এরই সঙ্গে প্রতারণা ও হয়রানির শিকার হচ্ছে তারা। কয়েক দিন আগে আবারো ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবিতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। কিন্তু এভাবে অবৈধ পথে বিদেশযাত্রায় মৃত্যুর খবর আমাদের দেশের জন্য নতুন কোনো বিষয় নয়। বণিক বার্তার সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে এসেছে, আইওএমের হিসাব অনুযায়ী গত বছর শুধু ইতালিতে পৌঁছেছেন ১৫ হাজারের বেশি বাংলাদেশী। ২০২১ সালে এমন অভিবাসনপ্রত্যাশীদের মধ্যে বাংলাদেশীর হার ছিল ১০ শতাংশ। এ হার প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ২০২২ সালের শেষে দাঁড়িয়েছে ১৯ শতাংশে। এছাড়া ২০২২ সালে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে যাওয়া ২৬ বাংলাদেশী মানব পাচারকারীদের গুলিতে প্রাণ হারায় এবং এর আগে একই বছরের ৫ এপ্রিল ভূমধ্যসাগরে চারদিন ধরে ভেসে থাকা একটি মাছ ধরার নৌকা থেকে বাংলাদেশীসহ ৪৪০ অভিবাসনপ্রত্যাশীকে উদ্ধার করা হয়।

এভাবে অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসনের চেষ্টা বেশি হয়ে থাকে ইউরোপের ইতালি, গ্রিস ও স্পেনে ঢোকার জন্য। সে উদ্দেশ্যে ছোট নৌকা বা ভেলায় করে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেয়াকে বলা হয় বোট মাইগ্রেশন। আর এভাবে অভিবাসনপ্রত্যাশীরা ‘বোট পিপল’ হিসেবে পরিচিত। বর্তমানে ইউরোপের ইতালি সমুদ্রপথে অবৈধ অভিবাসনের সবচেয়ে বড় একটি ট্রানজিট পয়েন্ট হয়ে উঠেছে। আফ্রিকার লিবিয়া, দুবাই বা ইস্তাম্বুল হয়ে লিবিয়া থেকে সমুদ্রপথে ছোট ডিঙি বা নৌকা অথবা ভেলার মাধ্যমে তারা ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালীর উপকূলীয় অঞ্চল দিয়ে প্রবেশের চেষ্টা করে থাকে।

মূলত অবৈধ পথে বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশী তরুণরা কারণ হিসেবে দেখিয়ে থাকে— উজ্জ্বল ও নিরাপদ ভবিষ্যতের জন্য তারা ঝুঁকি নিয়ে জেনে-বুঝেও এমন পন্থায় ইউরোপে যেতে আগ্রহী। এ বিষয়ে অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতামত হচ্ছে দেশে বেকারত্ব, বৈধ পথে বিদেশ যাওয়ার সুযোগ কমে যাওয়া এবং ইউরোপের প্রতি মোহে তরুণরা অনেক সময় ছোট ডিঙি নৌকায়ও ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেয়ার ঝুঁকি নিতে রাজি থাকে। এরই সঙ্গে দালালরা তরুণদের স্বপ্নকে পুঁজি করে তৈরি করে প্রতারণার ভয়াল লোভনীয় ফাঁদ। আবার এদিকে অনেক সময় এসব মানব পাচারকারীর খপ্পরে পড়ে পাসপোর্ট, টাকা-পয়সা সব হারিয়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছে এবং অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। যদিও সংশ্লিষ্ট দেশগুলো অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ এ উপায়ে অভিবাসী গমন ঠেকাতে নানামুখী পদক্ষেপ নিচ্ছে, কিন্তু কোনোভাবেই এ সমস্যা কমছে না। যেমন সম্প্রতি সমুদ্রপথে অবৈধ অভিবাসন ঠেকাতে ইতালি সরকার নতুন একটি আইন প্রণয়ন করেছে। সেই আইনে অবৈধ অভিবাসন ও মানব পাচারে জড়িতদের ৩০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। আবার যেসব নৌকায় অভিবাসনপ্রত্যাশীরা ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিচ্ছে, সেগুলোর চালকদের জন্যও একই সাজার বিধান রাখা হয়েছে সে আইনে। অন্যদিকে আমাদের দেশীয় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থাও কাজ করে যাচ্ছে এ অবৈধ অভিবাসন রোধে। এর পরও ভূমধ্যসাগর তীরবর্তী ইউরোপীয় দেশগুলোয় বাংলাদেশী বোট পিপল সংখ্যা কমানো সম্ভব হচ্ছে না। আমাদের দেশে অবৈধ অভিবাসন তথা মানব পাচার প্রতিরোধে শক্ত আইন রয়েছে। কিন্তু এর যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা দরকার। ২০১২ সালে আইনটি প্রণীত হলেও দুঃখজনকভাবে মানব পাচারবিষয়ক অপরাধের তদন্ত, মামলা পরিচালনা ও অপরাধীর দণ্ড দেয়ার ক্ষেত্রে অগ্রগতি খুবই সামান্য মাত্রায় হয়েছে। 

আমাদের দেশের ক্ষেত্রে অবৈধ অভিবাসনের ক্ষেত্রে ‘পুশ’ ও ‘পুল’ উভয় ফ্যাক্টরই কাজ করছে। দেশে চাকরিপ্রত্যাশীদের তুলনায় বাজার অনেক ছোট। এর সঙ্গে কভিড ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে হওয়া বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, তার ওপর চাকরিপ্রত্যাশীদের অনেকেই অদক্ষ কিংবা কম দক্ষ। এসব কারণে প্রতিযোগিতার বাজারে চাকরিপ্রত্যাশীরা জায়গা করে নিতে পারে না। আবার নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে শ্রমবাজারে বৈষম্য তো রয়েছেই। সামাজিক অস্থিরতা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণেও জীবন অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। এগুলোই হলো পুশ ফ্যাক্টর। আর অন্যদিকে পুল ফ্যাক্টর হলো বিদেশে উচ্চমজুরি, নিরাপদ জীবন মান, নাগরিক সুবিধা, সামাজিক ও রাজনৈতিক স্বাধীনতা ইত্যাদি। এসব মিলিয়ে বেড়েছে ঝুঁকিপূর্ণ অবৈধ অভিবাসন। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে কী পরিমাণ অবৈধ বাংলাদেশী রয়েছে সেটার সঠিক কোনো সরকারি হিসাব পাওয়া না গেলেও বেসরকারি তথ্য মতে, গত বছর শুধু ইতালিতেই বাংলাদেশী বোট পিপল গমনের হার বেড়েছে ৯৪ শতাংশেরও বেশি। এদিকে জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) তথ্য অনুযায়ী, অবৈধপথে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে প্রবেশ করাদের তালিকায় এখন বাংলাদেশ চতুর্থ স্থানে অবস্থান করছে। এখান থেকে স্পট হচ্ছে অবৈধ অভিবাসনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্টে কোনো একটা ফ্যাক্টর কাজ করছে না, বরং একাধিক ফ্যাক্টর কাজ করছে। তাই এ সমস্যা সমাধনে একাধিক পন্থা অবলম্বন করতে হবে।

অবৈধ পথে ইউরোপে পাড়ি দিতে গিয়ে মৃত্যুসহ নানা দুর্দশায় পড়ার জন্য বাংলাদেশীদের অসচেতনতাই দায়ী করা যেতে পারে। কিন্তু এতে করে সরকার তার দায় এড়িয়ে যেতে পারে না। এমন অবৈধ অভিবাসনের ফলে একদিকে যেমন অভিবাসনপ্রত্যাশীদের প্রাণ বিপন্ন হচ্ছে, অন্যদিকে তেমনি দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। অবৈধ অভিবাসন রোধে সরকারকেই আরো জোরালো পদক্ষেপ নিতে হবে। যারা নিজেদের লাখ লাখ টাকা খরচ করে মৃত্যুঝুঁকিসহ বিভিন্ন বিপদের বিষয় ঠিকমতো না জেনে বুঝে যাচ্ছে। সেটা রোধ করার জন্য অভিবাসনপ্রত্যাশীদের পরিবার ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। সঙ্গে সরকারকে আরো দায়িত্বশীল হতে হবে। দেশের মধ্যে থেকেও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে বিভিন্ন দালালগোষ্ঠী ও কুচক্রী মহল মানব পাচারের কার্যক্রম চালাচ্ছে, সেটা বন্ধে কার্যকরী ব্যবস্থা নিতে হবে। অবৈধভাবে ঝুঁকিপূর্ণ পথে বিদেশযাত্রা রোধে ও দালাল-প্রতারকদের দৌরাত্ম্য কমানোর ক্ষেত্রে সরকারি উদ্যোগ ও ব্যবস্থাপনায় জনশক্তি রফতানির উদ্যোগ পূর্বে বেশ আশার আলো দেখিয়েছিল। কিন্তু তা কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় কার্যকর না থাকায় এসব অবৈধ তৎপরতা থামানো যায়নি। তাই এখন জনগণের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো এবং কুচক্রীদের সামাজিকভাবে উচ্ছেদ করার দায়িত্ব সরকারকেই নিতে হবে। তাছাড়া জনশক্তি রফতানিকারক, ট্রানজিট ও জনশক্তি গ্রহণকারী রাষ্ট্রকে একযোগে কাজ করতে হবে। দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণে কূটনৈতিক আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে এগিয়ে আসতে হবে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের সহায়তায়। তাহলেই অবৈধ অভিবাসন রোধ করা সম্ভব হবে।

মো. আবিদ মঈন খান: সাংবাদিক