আম বাংলাদেশের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ফসল। দেশে উৎপাদিত মৌসুমি ফলগুলোর মধ্যে আম অত্যন্ত সুস্বাদু ও পুষ্টিগুণে ভরপুর একটি জনপ্রিয় ফল। অন্যান্য ফসলের তুলনায় লাভজনক হওয়ায় দিন দিন বাড়ছে আমের বাণিজ্যিক চাষাবাদ। বর্তমানে ২৩টি জেলায় আমের বাণিজ্যিক চাষাবাদ হলেও সারা দেশেই আম চাষ সম্প্রসারণ হয়েছে। আম উৎপাদনকারী প্রধান জেলাগুলোর ৮০-৮৫ শতাংশ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে আমের ওপর নির্ভরশীল এবং ওই জেলাগুলোর অর্থনীতি ও মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থা অনেকাংশেই আমের ওপর নির্ভরশীল। বর্তমানে উৎপাদিত আমের ৮৫ শতাংশ সরাসরি খাওয়ার জন্য (তাজা ফল হিসেবে) এবং অবশিষ্ট ১৫ শতাংশ প্রক্রিয়াজাতের জন্য ব্যবহার হচ্ছে। সুতরাং বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আমের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে।

দেশে বর্তমানে ৯৫ হাজার ৩০০ হেক্টর জমি থেকে প্রায় ১২ দশমিক ১৯ লাখ টন আম উৎপাদন হয় (বিবিএস-২০২১)। বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত ক্ষুদ্র হলেও আম উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে এ দেশের অবস্থান সপ্তম। তবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, খামারবাড়ি, ঢাকার (২০১৮-১৯) তথ্যানুযায়ী, সারা দেশে জমির পরিমাণ ও উৎপাদন আরো বেশি। তাদের মতে, সারা দেশে আম উৎপাদন এলাকা প্রায় ২ লাখ হেক্টর এবং মোট উৎপাদন ২৫ লাখ টন। তবে আম উৎপাদনের সঠিক চিত্র প্রকাশিত হলে বাংলাদেশ আম উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে পঞ্চম স্থানে উঠে আসবে। দেশে ও বিদেশে প্রতি বছর এ দেশের সুস্বাদু আমের চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। কয়েক বছর থেকে এ দেশের সুস্বাদু আম রফতানি হচ্ছে। গত কয়েক বছরে আম রফতানি ৩০০ টনের আশেপাশে থাকলেও চলতি মৌসুমে এ-যাবত্কালের সর্বোচ্চ ১ হাজার ৬২২ টন আম পৃথিবীর ২৩টি দেশে রফতানি করা সম্ভব হয়েছে। সুতরাং দেশে ও বিদেশে এ দেশের সুস্বাদু আমের দিন দিন কদর বাড়ছে।

কৃষিমন্ত্রী কৃষিপণ্যের রফতানি ও বাণিজিকীকরণের ওপর জোর দিয়েছেন। কৃষিপণ্যের মধ্যে এ দেশের সুস্বাদু আম রফতানির ওপর তিনি বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। আগামী মৌসুম সামনে রেখে এরই মধ্যে তার নেতৃত্বে আম রফতানির রোডম্যাপ, সব অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা এবং সর্বশেষ জাতীয় কর্মশালা আয়োজন করা হয়েছে। সেই জাতীয় কর্মশালা থেকে আগামী দুই-তিন বছরের মধ্যে এক লাখ টন আম রফতানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ হয়েছে। এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য সবাইকে নিজেদের অবস্থান থেকে সহযোগিতা করার জন্য তিনি নির্দেশনা দিয়েছেন। কৃষিমন্ত্রী এখন পর্যন্ত আম রফতানির জন্য যে উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। বিগত বছরে আম রফতানির ক্ষেত্রে এ ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ তেমনটি চোখে পড়ে না। ফলে রফতানিও সে রকম হয়নি। বিগত বছরে আম রফতানি কম হওয়ার পেছনে প্রধান প্রধান কারণ হলো, রফতানির কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা এবং লক্ষ্যমাত্রা না থাকা, সব অংশীজনকে অন্তর্ভুক্ত না করা এবং খুব অল্প সময় আম রফতানি করা (মাত্র ৩০ দিন)।

দেশের প্রধান আম উৎপাদনকারী জেলাগুলো হলো চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, নওগাঁ, নাটোর, রংপুর, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, মেহেরপুর, ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা, যশোর, সাতক্ষীরা, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান। আম রফতানির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন বা ধারাবাহিকভাবে বাড়াতে হলে শুধু এক-দুই জেলা থেকে আম রফতানি না করে প্রধান প্রধান আম উৎপাদনকারী জেলা থেকে পরিকল্পনা করে আম রফতানি করতে হবে। কারণ গত কয়েক বছরের গবেষণা ও অভিজ্ঞতায় আম উৎপাদন ও বাজারজাতের ক্ষেত্রে আম উৎপাদন অঞ্চলের গুরুত্ব বোঝা যাচ্ছে। দেখা যায়, সাতক্ষীরা জেলায় আম বাজারে প্রথম আসে এবং দেশের বিভিন্ন জেলায় সেগুলো বাজারজাত করা হয়। মৌসুমের শুরুতে আমের চাহিদাও বেশি থাকে, ফলে ভালো দামে কেনা-বেচা হয়। অনেক চাষী আবার মানতে নারাজ কেন সাতক্ষীরার আম আগে পাকবে। এ দেশে আমের চাষাবাদ ২০০৫র্২  থেকে ২৬০৬র্০ পর্যন্ত বিস্তৃত। আম পরিপক্ব হওয়ার সঙ্গে অক্ষাংশ ও উচ্চতার একটি সুস্পষ্ট সম্পর্ক রয়েছে। ২০ ডিগ্রি অক্ষাংশ থেকে শুরু করে অক্ষাংশ যতই বাড়তে থাকে, আমের সংগ্রহকাল ততই দেরিতে হয়। অক্ষাংশ বিবেচনায় সারা দেশের আম উৎপাদন জেলাগুলোকে চারটি অঞ্চলে ভাগ করা হয়েছে।

অঞ্চল-১-এর আওতায় জেলাগুলো হলো কক্সবাজার, বরগুনা, চট্টগ্রাম, বান্দরবান, সাতক্ষীরা, খুলনা, রাঙ্গামাটি, বাঘেরহাট, পটুয়াখালী, ঝালকাটি ও বরিশাল। এ জেলাগুলোয় আমের পরিপক্বতা সবচেয়ে আগে আসবে। অর্থাৎ মৌসুমের শুরুতে এ জেলাগুলো থেকে আম রফতানি শুরু করতে হবে। দেশে আগাম আম উৎপাদন বাড়াতে হলে আগাম ও বারোমাসি জাত যেমন গোবিন্দভোগ, গোপালভোগ, রানীপছন্দ, রাজভোগ, বারি আম-১, বারি আম-১১, কাটিমুন ইত্যাদি বেশি চাষ করতে হবে।

অঞ্চল-২-এর আওতায় জেলাগুলো হলো ফেনী, খাগড়াছড়ি, যশোর, নড়াইল, গোপালগঞ্জ, কুমিল্লা, মুন্সীগঞ্জ, ফরিদপুর, ঝিনাইদহ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চুয়াডাঙ্গা, মানিকগঞ্জ, কুষ্টিয়া ও গাজীপুর। এ অঞ্চলে আমের পরিপক্বতা অঞ্চল-১-এর তুলনায় তিন-পাঁচদিন পরে আসবে।

অঞ্চল-৩-এর আওতায় জেলাগুলো হলো পাবনা, সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, রাজশাহী. নাটোর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ (সাপাহার উপজেলা বাদে), সিলেট, নেত্রকোনা ও জামালপুর। এ অঞ্চলে আমের পরিপক্বতা অঞ্চল-২-এর তুলনায় তিন-চারদিন পরে আসবে।

অঞ্চল-৪-এর আওতায় জেলাগুলো হলো জয়পুরহাট, গাইবান্ধা, রংপুর, দিনাজপুর, নওগাঁ জেলার সাপাহার উপজেলা, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড় ও নীলফামারী। এ অঞ্চলের আম সবচেয়ে দেরিতে পরিপক্ব হবে। ফলে নাবীজাতগুলো এ অঞ্চলে চাষ লাভজনক হবে। আমের আগাম জাতগুলো এ অঞ্চলে চাষ না করা উত্তম। পঞ্চগড় ও নীলফামারী জেলার আম সবচেয়ে দেরিতে পরিপক্ব হবে। অর্থাৎ দেশে নাবী জাতের আমের উৎপাদন বাড়াতে হলে এ জেলাগুলোয় এর বাণিজ্যিক বাগান স্থাপন করতে হবে। এ অঞ্চলে আমের পরিপক্বতা অঞ্চল-৩-এর চেয়ে ছয় থেকে আটদিন পরে আসবে।

অর্থাৎ অঞ্চল-১-এ আমের যে জাতটি মে মাসের ১০ তারিখে পরিপক্ব হয়, সেই জাতটি অঞ্চল-৪-এ ১৫-২০ দিন পর পরিপক্ব হবে। এছাড়া সমুদ্র সমতল থেকে যে জেলার অবস্থান যত বেশি উঁচু, সেখানে আম তত দেরিতে পরিপক্ব হবে।

দেশের আম উৎপাদন ও প্রাপ্তিকাল বৃদ্ধির জন্য অঞ্চলভিত্তিক আম চাষ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান সময়ে দেখা যায়, আমের ভরা মৌসুমে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিভিন্ন স্থানীয় আড়তে আমের দাম অনেক কমে যায় এবং বাজারমূল্যও কমে আসে। আম দ্রুত পচনশীল হওয়ায় তা ধরে রাখা সম্ভব হয় না। এ অবস্থা  থেকে উত্তরণের জন্য অঞ্চলভিত্তিক আম চাষ বৃদ্ধি এখন সময়ের ব্যাপার। কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, বান্দরবান, সাতক্ষীরা, খুলনা, রাঙ্গামাটি, বাঘেরহাট, পটুয়াখালী, ঝালকাটি, বরগুনা এবং বরিশাল জেলায় নতুন নতুন বাগান স্থাপন করতে হবে। গোবিন্দভোগ, গোপালভোগ, রাজভোগ, রানীপছন্দ, বারি আম-১, বারি আম-২, বারি আম-৩, বারি আম-৪, বারি আম-৮, বারি আম-১১, বারি আম-১৬, কাটিমুন ইত্যাদি আমের চাষ এ অঞ্চলে সম্ভব।

অন্যদিকে জয়পুরহাট, গাইবান্ধা, রংপুর, দিনাজপুর, নওগাঁ (সাপাহার উপজেলা), ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড় ও নীলফামারী জেলায় আম দেরিতে পাকে। ফলে নাবী ও অধিক নাবীজাত যেমন বারি আম-৩ (আম্রপালি), বারি আম-৪, বারি আম-৭, বারি আম-৮, বারি আম-১১, বারি আম-১২, বারি আম-১৩, বারি আম-১৪, বারি আম-১৫, বারি আম-১৭, কাটিমুন, ফজলি, মল্লিকা, আশ্বিনা ইত্যাদি আমের চাষ বাড়াতে হবে। এ জাতগুলো অন্য যেকোনো জেলায় জন্মানো আমের চেয়ে দেরিতে পরিপক্ব হবে।

বর্তমানে আমের প্রাপ্তিকাল জুন থেকে আগস্টে সবচেয়ে বেশি থাকে। কিন্তু মে, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে বাজারে আমের সরবরাহ কম থাকে এবং দাম অনেক বেড়ে যায়। ফল বিজ্ঞানীরা মনে করেন, অঞ্চলভিত্তিক আম চাষ আগাম ও নাবী মৌসুমে আম সংগ্রহের সুযোগ সৃষ্টি করবে এবং মে, সেপ্টেম্বর, অক্টোবরে বাজারে আমের সরবরাহ বাড়াবে। এভাবে বাণিজ্যিকভাবে আম উৎপাদনের ক্ষেত্রে অঞ্চল চারটি বিবেচনায় রেখে আম বাগান স্থাপন করলে দেশে আমের প্রাপ্তিকাল বাড়বে এবং বেশি সময় ধরে, অর্থাৎ ৯০-১২০ দিন পর্যন্ত রফতানি করা সম্ভব হবে। প্রকৃতপক্ষে আমদানিকারকরা যে দেশ থেকে কোনো একটি পণ্য দীর্ঘ সময় ধরে পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে, সে দেশগুলোকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।

 

ড. মো. শরফ উদ্দিন: ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, ফল বিভাগ, উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র, বারি