প্রথমা প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন গবেষক ও বিশিষ্ট লেখক ড. মোশতাক চৌধুরীর লেখা ‘আমার ব্র্যাক জীবন’ বইটি ২০২১ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত হলেও আমার পড়ার সুযোগ হয় অল্প কিছুদিন আগে। প্রকাশের পর থেকেই বইটি পড়ার ভীষণ আগ্রহ ছিল এজন্য যে ব্র্যাকে আমি দীর্ঘ ৩৮ বছর কাজ করেছি। আমার সৌভাগ্য ড. মোশতাক চৌধুরী ব্র্যাকের কর্মজীবনে আমার প্রথম তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন এবং দীর্ঘদিন তার সাহচর্যে আমার কাজ করার সুযোগ হয়েছে।

 কর্মক্ষেত্রে মোশতাক ভাই কিছুটা মৃদুভাষী হলেও লেখায় অত্যন্ত চৌকস, যা আমি ১৯৮০ সালে থেকে দেখে আসছি। তিনি অত্যন্ত মেধাবী ও কর্মক্ষেত্রে ব্যতিক্রমধর্মী একজন মানুষ। বিভিন্ন সময়ে তাকে দেখেছি গবেষণালব্ধ নানা বিষয় ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের অনুষঙ্গ নিয়ে নানামাত্রিক আলোচনায় বাস্তবসম্মত মতামত ও যুক্তি উপস্থাপন করতে।

সদ্য প্রকাশিত বইটি এরই মধ্যে বিভিন্ন মহলে প্রশংসিত হয়েছে। আলোচ্য বইটিতে মোট ১৪টি অধ্যায় ও আনুষঙ্গিক আরো কিছু লেখা আছে। আমার বিবেচনায় ১৪টি অধ্যায়ে বিভাজিত লেখাগুলোকে তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়।

প্রথমত, বইটিতে লিখিত অনেক গবেষণাকর্মের সঙ্গে আমি সরাসরি জড়িত ছিলাম। তাই আমি অত্যন্ত মুগ্ধতার সঙ্গে লক্ষ করেছি মোশতাক ভাই অনেক আগে বাস্তবায়ন হয়েছে—এমন সব কর্মকাণ্ড ও কার্যক্রমের বিবরণ ধারাবাহিকভাবে অত্যন্ত সুন্দর ও সাবলীলভাবে বর্ণনা করেছেন। কাজের ক্ষেত্রে যেসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হয়েছে এবং সেসব বিষয়ে নতুনভাবে শিক্ষণীয় বিষয়গুলো নির্ভুল এবং যথাযথভাবে তুলে ধরেছেন; যা সত্যিই বিশেষ প্রশংসার দাবি রাখে।

দ্বিতীয়ত, বইটিতে লেখা হয়েছে এমন কিছু কার্যক্রমের সঙ্গে আমি যুক্ত ছিলাম না। কিন্তু আমার অন্য সহকর্মী, যারা ওই কার্যক্রমে মোশতাক ভাইয়ের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন, তাদের কাছ থেকে ওইসব কাজ সম্পর্কে ধারণা পেতাম। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় ‘A Tale of Two Wings’ নামে গবেষণা গ্রন্থ সম্পর্কে। এটি পুস্তক আকারে প্রকাশের সময়ে গবেষণার ফল সংশ্লিষ্ট মহলে বেশ আলোচিত হয়েছিল এবং আলোড়নও সৃষ্টি করেছিল। বলা বাহুল্য, কাজটি সংশ্লিষ্ট সবার কাছে বেশ প্রশংসিত হয়েছিল।

তৃতীয়ত, বইটিতে মোশতাক ভাইয়ের ব্র্যাক কর্মসূচির গবেষণা ছাড়া তার অন্যান্য কর্মকাণ্ড, বিশেষত আবেদ ভাইয়ের সঙ্গে তার স্মৃতি, Health Watch ও Education Watch সম্পর্কে চিন্তাভাবনা, প্রকাশনা, রকফেলারে তার কর্মকাণ্ড ও ইউনিভার্সেল হেলথ কভারেজ (ইউএইচসি) অর্জনের কাজে তার অবদান সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যায়।

বইটির প্রতিটি অধ্যায় অত্যন্ত চমত্কারভাবে সাবলীল ও প্রাঞ্জল ভাষায় সহজ করে লেখা হয়েছে। গবেষণা সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয় অথবা ব্র্যাকের বিভিন্ন কর্মসূচির নীতি, উপাদান, মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়ন কৌশল, পরিচালন প্রক্রিয়া, এর সুবিধা-অসুবিধা লেখক বিভিন্ন যুক্তি-তথ্যের মধ্য দিয়ে তা বাস্তবায়নে পথ দেখানোর কথা, বিভিন্ন সময় স্বতঃস্ফূর্তভাবে কর্মসূচি বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট কর্মী-ব্যবস্থাপক-নীতিনির্ধারকদের সহযোগিতা করার অভিজ্ঞতার কথা অত্যন্ত নৈপুণ্যের সঙ্গে লিপিবদ্ধ করেছেন।

উল্লেখ্য, উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য লন্ডনে তার অবস্থানকালীন নানা অনুষঙ্গ বা সময়কালটা লেখক সুন্দরভাবে লিখেছেন। অনেকটা ভ্রমণ কাহিনীর মতো। ডায়রিয়া প্রতিষেধক কর্মসূচির (ওটিইপি) মতো একটা জাতীয় চ্যালেঞ্জিং ও নানা বিবেচনায় বেশ কঠিন একটি স্বাস্থ্য কর্মসূচি ব্র্যাক বাংলাদেশে অত্যন্ত সফলভাবে পরিচালিত করে। আজকে বাংলাদেশে শিশুদের ডায়রিয়াজনিত রোগের মৃত্যুহার কমে গেছে এবং এ অর্জনের জন্য বলা যায়, সরকারের পাশাপাশি ব্র্যাকের কর্মসূচির সফল বাস্তবায়নের ফসল এটি। মোশতাক ভাইয়ের নেতৃত্বে একদল গবেষক এ কর্মসূচির সফল বাস্তবায়নে ইতিবাচক ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। এ-সম্পর্কিত বিভিন্ন তথ্য বইটিতে চমৎকারভাবে বিধৃত হয়েছে। আমার ধারণা, যারা বইটি পড়বেন তারা একমত হবেন যে গবেষণা কর্মকাণ্ড কীভাবে একটি কর্মসূচির সফল বাস্তবায়নে সহায়ক হতে পারে বা সম্পূরক ভূমিকা রাখতে পারে তা সেখানে বলা আছে।

লেখক মোশতাক ভাই বইটিতে ব্র্যাকে তার কর্মজীবনের প্রথম থেকে শেষ কর্মদিবস পর্যন্ত কী ভূমিকা রেখেছেন তা বিস্তারিতভাবে লিখেছেন। একজন সাধারণ কর্মী থেকে বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মসূচিতে উচ্চপদে আসীন হওয়া, বিভিন্ন গবেষণা কর্মকাণ্ডে সরাসরি সম্পৃক্ত থাকা, দেশ-বিদেশে উন্নয়নসংক্রান্ত বিভিন্ন গ্রুপ বা কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে যাচ্ছেন। আমি বিশ্বাস করি, মোশতাক ভাই অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে বড় বড় দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। এমন পর্যায় আসতে কঠিন পরিশ্রম, অধ্যবসায়, ধৈর্য থাকতে হয়, তা তিনি করেছেন এবং আমার দৃষ্টিতে তিনি সফল হয়েছেন।

আমি মনে করি, আলোচ্য বইটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নকাজে নিয়োজিত কর্মীদের জন্য শুধু নয়, অন্যান্য পেশার নিয়োজিতরাও পড়তে পারেন। লেখকের দীর্ঘদিনের কর্মের মাধ্যমে অর্জিত শিক্ষণীয় বিষয়গুলো নিজেদের পেশাগত জীবনেও প্রয়োগ করতে পারেন।

মোশতাক ভাই অত্যন্ত সৌভাগ্যবান, তিনি আবেদ ভাইয়ের মতো এক বিশ্ববরেণ্য উন্নয়ন জগতের মহীরুহের সঙ্গে সরাসরি কাজ করেছেন এবং তার চিন্তা-চেতনা, কর্মকৌশল, জ্ঞান-প্রজ্ঞা অত্যন্ত কাছাকাছি থেকে অবলোকন করেছেন এবং শিখেছেন; যা এ বইয়ের বিভিন্ন অধ্যায়ে সুন্দরভাবে বিধৃত হয়েছে।

বইটির  ইংরেজি সংস্করণ বের হওয়া অত্যন্ত জরুরি। লেখক মোশতাক ভাইয়ের কাছে বইটির ইংরেজি ভাষায় অনূদিত সংস্করণ প্রকাশে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণের জন্য অনুরোধ রইল। কাজটি করা হলে বিশ্বের বিভিন্ন স্তরের উন্নয়ন প্রয়াসী মানুষ জানতে পারবে এক উন্নয়নকর্মীর জীবনের চালচিত্র; জীবনের নানান দিক সম্পর্কে অবগত হতে ও জীবনকে গভীরভাবে উপলব্ধি করতে বইটি সহায়ক হবে বলে আমি বিশ্বাস করি।

জালালউদ্দীন আহমদ
সাবেক পরিচালক, ব্র্যাক আন্তর্জাতিক
jalaluddin2003@yahoo.com