সোমবার রাজধানীর উত্তরায় এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটেছে। চলন্ত প্রাইভেট কারের ওপর নির্মাণাধীন বিআরটি প্রকল্পের একটি গার্ডার পড়ে পাঁচজন মারা গিয়েছেন। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন গুরুতর আহত আরো দুজন। এর মধ্য দিয়ে মেগা প্রকল্পের নির্মাণকাজে ন্যূনতম কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকার বিষয়টি আবারো প্রমাণ হলো। এরই মধ্যে বিআরটির কাজ আপাতত বন্ধ ঘোষণা করেছেন ডিএনসিসির মেয়র। সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করেছে ভুক্তভোগী পরিবার। তিন সদস্যের একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কমিটির প্রাথমিক তদন্তে দুর্ঘটনার দায় ঠিকাদারের বলে উঠে এসেছে। প্রধানমন্ত্রী ঠিকাদার কোম্পানিকে কালো তালিকাভুক্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন। এটা আমলে নিয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে নিয়োজিত চারটি সংস্থা। এর মধ্যে তিনটি সংস্থা সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের অধীন। সড়ক পরিবহন বিভাগ রয়েছে সমন্বয়কের দায়িত্বে। কাজেই দুর্ঘটনার দায় বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষও এড়াতে পারে না।
বিআরটি প্রকল্পে এটিই প্রথম দুর্ঘটনা নয়। প্রকল্পটিতে গার্ডার ধসে এ পর্যন্ত চারটি বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটেছে। এর আগে গত ১৫ জুলাই গাজীপুর শহরে গার্ডারের নিচে চাপা পড়ে একজন নিরাপত্তাকর্মী নিহত হন। গত বছর ১৪ মার্চ বিমানবন্দর এলাকায় এবং আবদুল্লাহপুরে একই দিনে দুবার গার্ডার ধসের ঘটনা ঘটে। এতে নির্মাণকাজে যুক্ত ছয়জন আহত হন। তাদের মধ্যে তিনজন চীনের নাগরিক ছিলেন। শুধু বিআরটি নয়, অন্য মেগা প্রকল্পেও এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটেছে। গত ৩০ মে রাজধানীর পল্লবীতে মেট্রোরেলের স্টেশন থেকে ইট পড়ে এক দোকান কর্মচারী মারা যান। ২০১৬ সালের মার্চে মগবাজার-মৌচাক উড়াল সড়ক নির্মাণকাজের সময় রডের আঘাতে এক শ্রমিক মারা যান। ২০১২ সালের ২৪ নভেম্বর চট্টগ্রামের বহদ্দারহাটের ফ্লাইওভারের গার্ডার ভেঙে মারা যান ১২ জন। এছাড়া ২০০০ সালে মিরপুর রোডে ওভারব্রিজের গার্ডার পড়ে মারা যান মাগুরা টেক্সটাইলসের এক কর্মকর্তা। একই বছর নতুনবাজারে আমেরিকান দূতাবাসের সামনে ফুটওভারব্রিজ ভেঙে মারা যান তিনজন। বলতে গেলে নিয়মিত বিরতিতে এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে চলেছে। এদিক থেকে অবকাঠামো প্রকল্পের নির্মাণকাজে নিরাপত্তা বিধানই অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
বিশ্বের সর্বত্রই নির্মাণকাজের ক্ষেত্রে ‘নিরাপত্তাই সর্বাগ্রে’ নীতি অনুসরণ করা হয়। যেকোনো ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরিপালন নিশ্চিত করা হয় সংশ্লিষ্ট বিধির। যুক্তরাষ্ট্রে সব ধরনের নির্মাণকাজে আমেরিকান সোসাইটি অব টেস্টিং ম্যাটেরিয়াল (এএসটিএম) নির্মাণবিধি অনুসৃত হয়। আর বৃটেনে অনুসৃত হয় ব্রিটিশ স্ট্যান্ডার্ড (বিএস) নির্মাণবিধি। এসব বিধিতে নির্মাণ পদ্ধতির মূল বিষয়ই হলো নিরাপত্তা। অন্য উন্নত দেশগুলোয়ও নিজস্ব বাস্তবতা উপযোগী করে নির্মাণবিধি প্রণয়ন করা হয়েছে। শুধু কাগুজে উপস্থিতি নয়, তা মানা হচ্ছে কিনা তাও যথাযথ তদারক করে দেশগুলো। ফলে সেখানে নির্মাণজনিত দুর্ঘটনা নেই বললেই চলে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদ্যমান সড়কের ওপর নির্মাণকাজের সময় যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক রাখার দায়িত্ব প্রকৃত কর্তৃপক্ষের। এজন্য খানাখন্দ মেরামত করতে হয় নিয়মিত। চলাচলকারী যানবাহন ও মানুষের নিরাপত্তা বিধান করাও প্রকল্পের কাজের অংশ। এজন্য নির্মাণ এলাকা ঘিরে রাখার নিয়ম। কিন্তু রাজধানীর ব্যস্ততম বিমানবন্দর সড়কে প্রায় এক দশক ধরে চলা বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্পে এর কিছুই মানা হয়নি। নিরাপত্তাবেষ্টনী ছাড়াই সড়ক খুঁড়ে পাইলিং, পিয়ার ও ভায়াডাক্ট নির্মাণ করা হয়েছে। সোমবার ক্রেন কাত হয়ে গার্ডার পড়ে যে দুর্ঘটনা ঘটে, তাতেও কোনো নিরাপত্তাবেষ্টনী ছিল না। এমনকি দুর্ঘটনা-পরবর্তী গাফিলতিও ফুটে উঠেছে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে। দুর্ঘটনা ঘটার পর-পরই ক্রেনচালক ও সংশ্লিষ্টরা পালিয়ে যান। অল্পক্ষণের মধ্যেই আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে এলেও উদ্ধার তৎপরতা শুরু করতে দেরি হয়। এ ধরনের ভারী গার্ডার সরানোর মতো সরঞ্জাম ফায়ার সার্ভিসের ছিল না। পরে গার্ডার সরাতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তারা আসতে দেরি করায় তাত্ক্ষণিকভাবে উদ্ধার তৎপরতা শুরু করা যায়নি। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজন আসার পর সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে গার্ডার সরিয়ে পাঁচজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। প্রথমত, ব্যস্ত সড়কে কোনো প্রতিবন্ধকতা না দিয়ে ভারী গার্ডার তোলা হচ্ছে। আবার দুর্ঘটনার পর উদ্ধারে ক্রেন কিংবা আহতদের নেয়ার জন্য অ্যাম্বুলেন্স থাকার কথা ছিল, যা ছিল না। এটা প্রকল্প কর্তৃ পক্ষর চরম গাফিলতি ও দায়িত্বহীনতাই তুলে ধরে।
এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, ফ্লাইওভার কিংবা ফুটওভারব্রিজ তৈরির সময় গার্ডার বা নির্মাণসামগ্রী পড়ে মৃত্যুর ঘটনা উত্তরারটিই প্রথম নয়। এর আগেও একই রকম দুর্ঘটনা ঘটেছে বিভিন্ন সময়। হয়েছে প্রাণহানিও। তার পরও বোধোদয় হচ্ছে না প্রকল্প কর্তৃপক্ষের। দেশে ১৯৯৩ সালে প্রণীত জাতীয় নির্মাণবিধি (ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড) রয়েছে। এতে নিরাপত্তার জন্য সুস্পষ্ট নির্দেশনা আছে। শুধু তা-ই নয়, এজন্য প্রতিটি প্রকল্পে আলাদা বরাদ্দও রাখা হয়েছে কিন্তু ঠিকাদার অর্থ বাঁচাতে বিআরটি প্রকল্পে নিরাপত্তাবেষ্টনী ছাড়া নির্মাণকাজ করে যাচ্ছেন দিনের পর দিন। তদুপরি প্রতিটি প্রকল্পে একটি সুপারভিশন এক্সপার্ট টিম থাকে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করে কাজটি করছে কিনা, সেটা তাদের দেখার দায়িত্ব। এ ধরনের প্রকল্পে সারা বছরই তদারকি করার কথা থাকলেও বাস্তবে তা হচ্ছে না। সব মিলিয়ে ঘটছে দুর্ঘটনা।
উত্তরায় সম্প্রতি যে দুর্ঘটনা ঘটেছে, তা নির্মাণকাজে দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনারই পরিণাম। সুনির্দিষ্ট বিধিবিধান মেনে চললে এ ধরনের দুর্ঘটনা সহজেই এড়ানো যেত। কাজেই নির্মাণকাজে সুরক্ষাবিধিগুলোর পরিপালন নিশ্চিতে তদারকি আরো বাড়াতে হবে। এরই মধ্যে প্রাইভেট কারে যে গার্ডার ভেঙে প্রাণহানি ঘটেছে, তার জন্য দায়ীদের খুঁজে বের করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এটা আমলে নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সক্রিয়তা জরুরি। দেশের ভৌত উন্নয়নকাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। কিন্তু নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতিতে কিছুদিন পর পরই দুর্ঘটনা এবং প্রাণহানি ঘটছে। নির্মাণকাজে নিরাপত্তাবিধি থাকা সত্ত্বেও সেগুলো যথাযথভাবে অনুসরিত না হওয়ায় যে হত্যাকাণ্ড ঘটছে, তাকে নিছকই দুর্ঘটনা বলা যায় না। এটা স্পষ্টত কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড। সবক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, জবাবদিাি এবং নজরদারির মাধ্যমে এর অবসান এখন সময়ের দাবি।










