প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিশ্বব্যাংক মূলত তিনটি প্রধান কাজ সম্পাদনের গুরুদায়িত্ব নেয়: বিশ্বব্যাপী জনকল্যাণ নিশ্চিত করা, মূল্যবান ডাটা তৈরি ও স্বাধীন বিশ্লেষণ এবং দরিদ্র দেশগুলোয় বিভিন্ন ধরনের সমর্থন প্রদান। সম্প্রতি প্রথম দুটি উদ্দেশ্য ঘিরে ব্যাংকটি নিজেদের বিশ্বাসযোগ্যতা খুইয়েছে। এ অবস্থায় সংস্থাটি এখন যা করতে পারে তা হচ্ছে, তৃতীয় উদ্দেশ্যটির প্রতি গুরুত্ব ও মনোযোগ আরোপ।

আমরা আমাদের আলোচনার শুরুটা করতে পারি জনকল্যাণ দিয়ে। কভিড-১৯ মহামারীটি কিন্তু বিশ্বব্যাংকের বিতর্কগুলো ঘুচিয়ে জনকল্যাণের পক্ষে কাজ করার জন্য আদর্শ একটি সুযোগ। তবে তাদের অবস্থান—বিশেষ করে কোভ্যাক্স উদ্যোগের সময় কোনো রকম পাস কাটিয়ে যাওয়া এবং টিকা সংগ্রহের প্রতিশ্রুতি দিয়েও অর্থ ছাড়ে ব্যর্থতা বিশ্ব স্বাস্থ্য ও অর্থনীতির জন্য ক্ষতি ডেকে এনেছে। এখন তাই বিশ্বব্যাপী জনকল্যাণ নিশ্চিত প্রসঙ্গে বিশ্বব্যাংক ঘিরে আমাদের প্রত্যাশাগুলো কমাতে হবে, বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে।

এ পর্যায়ে আসব তথ্য ও বিশ্লেষণ প্রসঙ্গে। বছরের পর বছর ধরে বিশ্বব্যাংক তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করছে। যেমন বিশ্ব উন্নয়ন সূচক, বৈশ্বিক দারিদ্র্য, ক্রয় সক্ষমতা পরিমাপসহ বিভিন্ন জরিপ পরিচালনার ক্ষেত্রে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। যদিও শোনা যাচ্ছে যে ব্যাংকটির ঊধ্বর্তন ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডুয়িং বিজনেস প্রতিবেদনের একের অধিক সংস্করণে তথ্য কারচুপি করে চীন ও সৌদি আরবকে তালিকায় এগিয়ে রেখেছেন এবং নীতিনির্ধারক ও গবেষকদের ওপর সবার আস্থাহানির ঝুঁকি নিয়েছেন।

এ পদস্খলনের পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্বব্যাংকের স্বাধীনতা কিংবা পারতপক্ষে সংস্থাটির প্রাসঙ্গিকতা ক্রমবর্ধমানভাবে তার অর্থায়ন কার্যকারিতার ওপর নির্ভর করবে। তবে বিশ্ব কতটা পরিবর্তন হয়েছে তাও মাথায় রাখতে হবে। প্রথমত,  ১৯৯০ সালে বিশ্বের নিম্ন আয়ের দেশে বসবাসকারী জনসংখ্যার হার যেখানে ছিল ৬০ শতাংশ, বর্তমানে তা ১০ শতাংশে নেমে এসেছে। গত তিন দশকে উন্নয়নশীল দেশগুলোর দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কারণে—বিশেষ করে চীন ও ভারতে—ধারাবাহিকভাবে নিম্ন আয়ের দেশের সংখ্যা কমেছে। ১৯৯০ সালে বিশ্বব্যাপী নিম্ন আয়ের দেশের সংখ্যা যেখানে ছিল ৪৮ শতাংশ, সেখানে ২০১৯ সালে তা কমে হয় ৩৪ শতাংশ। একই সঙ্গে দরিদ্র দেশগুলোয় বসবাসকারী মোট জনসংখ্যা তিন বিলিয়ন থেকে কমে মাত্র ৭৬০ মিলিয়নে নেমে এসেছে।

নাটকীয় এ পরিবর্তনের অর্থ হলো সমৃদ্ধ বিশ্ব, বিশেষ করে বিশ্বব্যাংকের সম্পদ বণ্টনের দায়িত্ব এখন স্বল্পসংখ্যক দেশের সামগ্রিক মানবতার একটি ক্ষুদ্র অংশের মধ্যে সীমিত হয়ে এসেছে। চীন, ভারত, ইন্দোনেশিয়া কিংবা ভিয়েতনাম, যারা ১৯৯০-এর দশকে মধ্যম আয়ের দেশে উতরে গেছে। এসব দেশে মূলত বিশ্বব্যাংকের ভূমিকাও কমেছে। আমাদের হিসাব অনুসারে ওই সময়কালের মধ্যে এ দেশগুলোয় বেসরকারি ঋণ বেড়েছে ছয় গুণ, যা অর্থনীতিগুলোর মোট বাহ্যিক অর্থায়নকে দ্বিগুণ করে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশে পৌঁছে দেয়।

এদিকে নিম্ন আয়ের দেশগুলোয় বসবাসরত দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ১৯৯০ সালের ৯৩ শতাংশ থেকে ২০১০ সালে ৩০ শতাংশে নেমে এলেও দ্রুতই আবার তা বাড়তে শুরু করেছে, অর্ধেকেরও বেশি। কেননা দরিদ্র দেশগুলো দ্রুত বর্ধনশীল উদীয়মান বাজার থেকে পিছিয়ে রয়েছে। তাই নিম্ন আয়ের দেশগুলোর আর্থিক প্রয়োজনের মূল কারণ মূলত থাকে তাদের দরিদ্রগোষ্ঠীকে সাহায্য করা।

ইথিওপিয়া, মোজাম্বিক, আফগানিস্তান ও নেপালের মতো দেশগুলোর জন্য অনুদান আকারে বৈদেশিক সাহায্য এখনো মোট বহিস্থ অর্থায়নের প্রায় অর্ধেক, এর মধ্যে বিশ্বব্যাংকের ঋণের পরিমাণ ১৫ শতাংশ বা তারও বেশি। নিম্ন আয়ের দেশগুলোয় বৈদেশিক সাহায্যের পরিমাণ ১৯৯০ সালের ৮ বিলিয়ন ডলার থেকে বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে ৩০ বিলিয়ন ডলার হয়েছে। এটি বেড়েছে মূলত জনস্বাস্থ্যের জন্য তহবিল বৃদ্ধির কারণে। তবে এ দেশগুলোয় বাহ্যিক অর্থায়নে বিশ্বব্যাংকের অংশগ্রহণ মোটামুটি ধারাবাহিক।

একই সঙ্গে এ দেশগুলোয় বিশেষ সুবিধাভিত্তিক আর্থিক প্রবাহ মোটামুটি স্থির রয়েছে। বেসরকারি বাজারগুলোকে ধরতে পারার প্রবণতা এখনো কম: সার্বভৌম বন্ড ও বাণিজ্যিক ঋণসহ মোট ব্যক্তিগত অর্থ মূলত তাদের সরকারের বহিস্থ প্রবাহের মাত্র ১০ শতাংশ। এইডডাটার গবেষণা অনুসারে, এ দেশের সরকারগুলো ক্রমবর্ধমানভাবে চীন থেকে সম্পদ অর্জন করেছে, ২০১০-এর দশকে বছরে যার পরিমাণ ৪ বিলিয়ন ডলার। তবে বেশির ভাগ বিদেশী প্রকল্প থেকে ধনী দেশগুলো লাভবান হয়েছে সামান্যই।

বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন প্রক্রিয়া তাই দুটি নীতির ভিত্তিতে করা উচিত—নিম্ন আয়ের দেশগুলোয় অনেক বেশি অর্থ ছাড় এবং সরকারগুলোকেও নীতিগতভাবে বিশেষ গোষ্ঠীর জন্য আরো বেশি রাষ্ট্রীয় সাহায্যের পরিমাণ বাড়াতে সাহায্য করা। বেসরকারি অর্থায়ন ব্যয়বহুল এবং এখনো তা তাদের নাগালের বাইরে। চীনা ঋণও ব্যয়বহুল ও অনেক বেশি অবকাঠামোর সঙ্গে সম্পর্কিত। এছাড়া বিশেষ ছাড়যুক্ত সুবিধাগুলো সম্পর্কিত স্বাস্থ্যের সঙ্গে। এক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংক রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোকে পরিস্থিতি বিচারে বিশেষ ছাড় ও শর্তমুক্ত আর্থিক সাহায্য করতে পারে।

তদনুসারে, বিশ্বব্যাংকের উচিত দরিদ্র দেশগুলোয় নগদ সাহায্য ও ইউনিভার্সেল বেসিক প্রোগ্রামের (ইউবিপি) মতো কর্মসূচিগুলোকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নির্বাচন করা। এ ধারণার সরল সংস্করণ অনুসারে, প্রয়োজনের ওপর ভিত্তি করে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত প্রয়োজনীয় সহায়তা কার্যক্রম গ্রহণ করা যেতে পারে। যার লক্ষ্য হবে ঋণ গ্রহণকারী সরকারগুলোর কাছে সংস্থাগুলোকে ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সাহায্যের প্রক্রিয়া সহজ ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা মুক্ত করা। বিশ্বব্যাংকের অন্যতম সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের (আইডিএ) সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়টি ঘিরে চলমান আলোচনাটা কিন্তু উল্লিখিত এ ধারণারই সংকলন। ব্যাংকের সাম্প্রতিক ব্যর্থতাগুলো মোটেই যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন কিংবা অন্য দাতাদের সহায়তার পরিমাণ কমিয়ে দেয়ার বিপরীতে কোনো অজুহাত নয়; বরং বিশ্বব্যাংক কতটুকু কী করতে পারে সে সম্পর্কিত একটি স্পষ্ট ধারণা তুলে ধরে। তাই সংস্থাটির তহবিলের পরিমাণ নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে দরিদ্র দেশগুলোয় অর্থ সহায়তা দেয়ার মতো অবশিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমটিতে দৃষ্টি দেয়াও জরুরি। 

তবে বিশ্বব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো যে তাদের প্রাসঙ্গিকতা হারাচ্ছে—এটি নিয়ে বিলাপ করার পরিবর্তে আমরা বরং তা উদযাপন করতে পারি। কারণ দেশে দেশে বিশ্বব্যাংকের প্রয়োজন ফুরানোর বিষয়টি নির্দেশ দেয় যে দরিদ্র দেশগুলোর বৈদেশিক সাহায্যের প্রয়োজন কমছে। তবে বিশ্বব্যাংকের প্রাসঙ্গিকতা হারানোর অর্থ বিলুপ্তির দিকে অগ্রসর হওয়া নয়। সংস্থাটি বিশ্বব্যাপী সীমিত জনকল্যাণ সরবরাহকারী কিংবা ক্ষমতার অনিচ্ছুক সমালোচক হতে পারে, তবে এখনো তাদের অর্থায়নবিষয়ক কার্যক্রম—সীমিত হলেও—গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে সক্ষম।

আর তা করতে হলে বিশ্বব্যাংকের জটিল আমলাতান্ত্রিক বিষয়গুলো কমিয়ে আনতে হবে এবং তহবিল সরবরাহের কার্যকরী সমাধান খুঁজে বের করতে হবে। এতে উপকৃত হবে দুই থেকে তিন ডজন দরিদ্র দেশ আর বিশ্বের লাখ লাখ দরিদ্র মানুষ।

[স্বত্ব:
প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
]

 

অরবিন্দ সুব্রামানিয়ান: যুক্তরাষ্ট্রের ব্রাউন ইউনিভার্সিটির সিনিয়র ফেলো

জাস্টিন স্যানডেফার: যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সেন্টার ফর গ্লোবাল ডেভেলপমেন্টের সিনিয়র ফেলো

ভাষান্তর: রুহিনা ফেরদৌস