নাগরিক বিকাশের ধারায় মানুষ গ্রামের মেঠোপথ ধরে শহরে আসে। শহর অভিমুখে মানুষের এ যাত্রা চলমান। জীবনের বিচিত্র তৃষ্ণা, বেঁচে থাকার রসদ ও স্বাচ্ছন্দ্যের খোঁজে মানুষ শহর বা রাজধানীতে পা বাড়ায়। এ আগমন সবার জন্য মসৃণ নয়। তবু অনেকে নগরে ঠাঁই খুঁজে নেন। সাধ মিটে গেলে অনেকে নিজ নগরেও আর থাকতে চান না। কেউ কেউ পাড়ি দিতে চান ভিন কোনো রাজ্যে। 

যে দেশে মানুষের জন্ম, যেখানে দীর্ঘসময় বসবাস, সে দেশ ছেড়ে মানুষ কখন যান? চেনা-জানার গণ্ডি পেরিয়ে, কেউ যখন দূর দেশে উপস্থিত হন, তখন কি তার জন্য শুধু সুখ আর সুখ অপেক্ষা করে? অন্য ভাষা, অন্য মানুষ ও বিচিত্র ভৌগোলিকতা ভেদে জীবনের সে অধ্যায়ের পাতায় ভাগ্য কতটা সুপ্রসন্ন থাকে?

কথিত আছে, জ্ঞানার্জনের জন্য সুদূর চীন দেশে যেতে হলে যাও। বাংলাদেশী তরুণদের বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা দেখে বলা যায়, এ কথার মর্ম তারা ভালোই বুঝতে পেরেছেন। শুধু চীন নয়, উচ্চশিক্ষার জন্য তারা এখন বিশ্বের সব প্রান্তে ছুটছেন।

যুক্তরাষ্ট্রে অধ্যয়নরত বিদেশী শিক্ষার্থীদের নিয়ে প্রকাশিত ‘ওপেন ডোরস-২০২২’ শীর্ষক প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়া বিশ্বের ২৫ দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান এখন ১৩তম। বর্তমানে দেশটিতে বাংলাদেশী শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১০ হাজার ৫৯৭।

সাকলাইন মোস্তাক নামে এক শিক্ষার্থী লুইজিয়ানা ইউনিভার্সিটিতে ক্যান্সার ফার্মাকোলজি বিষয়ে পিএইচডি করছেন। তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্রে পড়তে যাওয়ার আগে একজন শিক্ষার্থীর তিন-পাঁচ বছরের প্রস্তুতি ও ৩-৪ লাখ টাকা খরচ করতে হয়। জিআরই বা টোফেলে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় আবেদন ও ফাইল পাঠাতে, সেভিস ফি, ভিসা ফি এবং অন্যান্য খরচে এসব অর্থ ও সময় ব্যয় হয়।

এটা শুধু যুক্তরাষ্ট্রের চিত্র। বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের যুক্তরাজ্য, কানাডা, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, ভারত, চীন, মালয়েশিয়া, জার্মানিসহ অন্য ইউরোপীয় দেশগুলো পছন্দের তালিকায় রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতেও এখন শিক্ষার্থীরা যাচ্ছেন। তারা যে শুধু বৃত্তি নিয়ে যাচ্ছেন তা নয়, বিদেশে উচ্চশিক্ষা নিতে যাওয়া অনেক শিক্ষার্থীর পরিবারকে সম্পত্তি বন্ধক কিংবা জমানো সঞ্চয় খরচ করতে হয়। 

কানাডা সরকারের ইমিগ্রেশন, রিফিউজিস অ্যান্ড সিটিজেনশিপ (আইআরসিসি) বিভাগের তথ্যানুসারে, দেশটিতে অধ্যয়নে বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের আবেদন ২০১৬-১৯ সালের মধ্যে ২৭০ শতাংশ বেড়েছে। ইউনেস্কোর তথ্যানুযায়ী, ২০১৫ সালে দেশের বাইরে পড়তে গিয়েছিলেন ২৪ হাজার ১১২ শিক্ষার্থী। ২০২০ সালে সে সংখ্যা চার গুণ বেড়েছিল। ইউনেস্কোর তথ্য বলছে, উচ্চশিক্ষার জন্য প্রতি বছর গড়ে ৭০-৮০ হাজার বাংলাদেশী শিক্ষার্থী বিদেশে ভ্রমণ করছেন। যদিও প্রতি বছর বাংলাদেশে যত শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা দাঁড়ায়, সে তুলনায় এ সংখ্যা খুব কম। কিন্তু মনে রাখতে হবে, বিদেশে যারা যাচ্ছেন, মেধা ও দক্ষতার জোরেই যাচ্ছেন। দুঃখজনক হলো, দেশের শীর্ষস্থানীয় প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বুয়েট থেকে প্রতি বছর বড় একটি সংখ্যা বিদেশ চলে যান, সেখান থেকে খুব কমই দেশে ফিরে আসতে চান। 

শুধু শিক্ষার্থী নন, বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরাও দেশ ছাড়ছেন। অনেক শিক্ষক বিদেশে এমএস ও পিএইচডি করতে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছুটি নিয়ে যান। বিদেশে থাকাকালীন তারা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নিয়মিত বেতন নেন। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ পাঁচ বছরের বেশি সময় তাদের বেতন দিয়ে যায়। কিন্তু ডিগ্রি শেষে দেশে ফিরতে তারাও অনিচ্ছুক। মূলত শিক্ষা বা ডিগ্রিকে বিদেশে ঠাঁই নেয়ার একটা উপায় হিসেবে ব্যবহার করেন তারা। 

আবেগী জায়গা থেকে দেশপ্রেমের কথা আসতে পারে, কিন্তু যারা পরদেশে স্থায়ী হতে চান তাদের কতটা দোষারোপ করতে পারবেন? বাস্তবিক অর্থে তাদের কাছে এ দেশে থাকার মতো কোনো কারণ নেই। মানহীন শিক্ষা কারিকুলাম, অপর্যাপ্ত চাকরির বাজার, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ ও সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার কারণে বিদেশের মাটিতেই তারা স্বপ্ন বুনছেন।

এ সংকট নিয়ে দেশত্যাগী ও সরকার উভয়কেই ভাবতে হবে। কেউ যদি বসবাসের জন্য উপযোগী বা নিরাপদ ভবিষ্যতের কথা ভেবে দেশ ছাড়েন, সেটি আরেকবার ভাবতে হবে। কারণ, যে দেশে তারা ভবিষ্যৎ দেখছেন, সেখানকার পরিবেশ যে অনিরাপদ হয়ে উঠবে না, তার নিশ্চয়তা কি? উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে, ২০১৯ সালে নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে গুলিবর্ষণ ও সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে বন্দুক সহিংসতা বেড়ে যাওয়া। শ্রীলংকার অবস্থাও তো একসময় ভালো ছিল। এছাড়া কানাডা সরকার কিছুদিন আগে দেশটিতে বিদেশীদের বাড়ি কেনা বন্ধ করেছে। এতে অনেক প্রবাসী বিপাকে পড়েন। কারণ কানাডায় স্থায়ী ও আবাসন করার জন্য অনেকে সেখানে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছেন। কেউ নিজের সবটুকু সঞ্চয় নিয়ে সেখানে পাড়ি জমিয়েছেন।

সরকারকে মনে রাখতে হবে, কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে ভাবলে দেশ সুষ্ঠুভাবে এগোবে না। সরকারকে বুঝতে হবে, তরুণদের ছাড়া দেশ স্মার্ট হবে না। তারা নিজ দেশের মাটি, জল, আলো বাধ্য হয়ে ছাড়ছেন। যে কেউ বা কোনো সংস্থা যদি তরুণদের মাঝে জরিপ চালায়, যদি তরুণদের প্রশ্ন করা হয়, ‘বিদেশে যাওয়ার ইচ্ছা বা পরিকল্পনা আছে কিনা’ জবাবে ৭০-৮০ শতাংশ উত্তর আসবে হ্যাঁ। এর কারণ হিসেবে উন্নত শিক্ষা, জীবনমান, স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও সামাজিক মর্যাদার কথাই আসবে। 

উচ্চশিক্ষা অর্জনে বিদেশে যাওয়া অবশ্যই ইতিবাচক, কিন্তু ফিরে না আসাটাই উদ্বেগ ও অর্থহানির। এজন্য সরকারকে শিক্ষার্থীদের জন্য আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা ও বিদেশী ডিগ্রিধারীদের দেশে কাজের সুযোগ করে দিতে হবে। বিকল্প হিসেবে সরকার বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বাংলাদেশে শাখা খোলার অনুমোদন দিতে পারে। ভারত এরই মধ্যে ইয়েল, অক্সফোর্ড ও স্ট্যানফোর্ডের মতো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্যাম্পাস খোলার অনুমতি দিতে একটি খসড়া তৈরি করেছে।

ইউএনএফপিএর তথ্যানুযায়ী, ২০২১ সালে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৪০ শতাংশের বয়স ১৫-৩৫ বছর। এ বয়সে মানুষ দ্রুত শিখতে পারে ও নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে পারে। অন্যদিকে পশ্চিমা বিশ্ব তাদের নিম্নমুখী জন্মহারের কারণে কর্মী চাহিদা মেটানোর জন্য শিক্ষায় বৃত্তি দিয়ে অভিবাসী নিচ্ছে। আর এ সুযোগ লুফে নিচ্ছেন বাংলাদেশী তরুণরা। পাঁচ বছর আগে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম এক জরিপে দেখেছে, বাংলাদেশ থেকে ১৫-২৯ বছর বয়সী ৮২ শতাংশ মানুষ দেশ ছাড়তে আগ্রহী।

দেশে ভালো গবেষণাগার নেই, মানসম্মত পরীক্ষাগার নেই। গবেষণা বাড়ানো ও দক্ষ স্নাতক তৈরির জন্য গবেষণাগার নির্মাণ, ভালো একাডেমিক পরিবেশ নিশ্চিতে সরকারকে মেগা পরিকল্পনা করতে হবে। কারণ দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়লেও স্থানীয় চাকরির জন্য স্নাতক তৈরি হচ্ছে। সে চাকরি পেতেও তারা হিমশিম খাচ্ছেন। আবার ভালো ও দক্ষ একাডেমিক রেকর্ডধারী শিক্ষার্থীরা দেশে পছন্দের চাকরি পাচ্ছেন না। মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীরা একটি চাকরি পেলেও তাদের জীবন এবং পরিবার সহজভাবে চালাতে পারেন না। তবে বিদেশে একটি চাকরি বা কর্ম পেলে তারা কাঙ্ক্ষিত জীবনযাপনের আশা দেখেন। আর্থিক খাত, স্বাস্থ্য, উন্নয়ন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ দেশের প্রতিটি সেক্টরে দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা প্রাধান্য পেয়েছে। এসব দেখে হতাশ হয়ে তরুণরা শিক্ষা ও চাকরির জন্য বিদেশে চলে যাচ্ছেন।

সরকার ২০৪১ সালের মধ্যে স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে কাজ করছে। এ লক্ষ্যে তরুণদের ধরে রাখতে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের বিকল্প নেই। পরিকল্পনা বাস্তবায়নে একটি সমন্বিত চেষ্টা থাকতে হবে। একই সঙ্গে তরুণদেরও দেশের প্রতি তাদের দায়বদ্ধতার কথাটি মনে রাখতে হবে। বিদেশে থেকেও দেশ, দেশের মানুষের জন্য কাজ করার সুযোগ রয়েছে। কারণ, দেশটা আমাদের সবার। প্রত্যেকে যার যার জায়গা থেকে সৎ ও সুন্দরভাবে নিজ দায়িত্ব পালন করলে ২০৪১ সাল লাগবে না, তার আগেই দেশ স্মার্ট হয়ে যাবে।


পাপলু রহমান: সাংবাদিক