বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার আদিবাসী জনগোষ্ঠী। তথ্য বলছে, দেশে প্রায় ৩০ লাখ আদিবাসীর বসবাস। এর মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামে এক-তৃতীয়াংশ আদিবাসী বাস করে। বাকি দুই-তৃতীয়াংশের বাস সমতল ও উপকূল অঞ্চলে। আদিবাসীদের সিংহভাগ এখনো জীবন ধারণের জন্য ভূমি ও বনের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো, ভূমি থেকে তাদের ক্রমাগতভাবে উচ্ছেদ করা হচ্ছে। স্থানীয় প্রভাবশালীরা নানা কৌশলে দখল করে নিচ্ছে তাদের জমি। সাম্প্রতিক এক নাগরিক সমাবেশে বান্দরবানের লামায় রাবার বাগানের নামে দখল করা জমিসহ আদিবাসীদের সব জমি ফিরিয়ে দেয়ার দাবি জানিয়েছে বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন। আন্তর্জাতিক বিধিবিধান ও সাংবিধানিকভাবে আদিবাসীদের ভূমির অধিকার স্বীকৃত। এ অধিকার রক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রের।

ভূমি থেকে আদিবাসীদের উচ্ছেদের বিষয়টি নতুন নয়। ১৯৬০-এর দশকে পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়িদের ভূমিতে কাপ্তাই বাঁধ নির্মিত হয়েছিল। পরিণামে অনেক আদিবাসীকে ভূমি হারাতে হয়। এমনকি বাংলাদেশ জন্মের পর নতুন রাষ্ট্রেও আদিবাসীরা উচ্ছেদের শিকার হয়ে আসছে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ভারতে আশ্রয় নেয়া আদিবাসীদের অনেকের বসতভিটা, চাষযোগ্য জমি অন্যরা দখল করে নিয়েছিল। এরপর শত্রু সম্পত্তি আইনের দোহাই দিয়ে আদিবাসী আরেক দফা উচ্ছেদ হয়। জিয়ার শাসনামলে পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালিদের বসবাসের জায়গা দেয়া হলে আবার আদিবাসীরা উচ্ছেদের শিকার হয়। এছাড়া পাহাড়ে বিভিন্ন সময়ে নানা ধরনের সহিংস ঘটনার রেশ ধরে আদিবাসীরা উচ্ছেদের শিকার হয়েছে। বিভিন্ন কোম্পানির বাণিজ্যিক তত্পরতা ও সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পেও উচ্ছেদ হয়েছে অনেকে। বলতে গেলে সামাজিক বনায়ন, খাস সম্পত্তি রক্ষা, ন্যাশনাল পার্ক বা জাতীয় উদ্যান, ট্যুরিস্ট সেন্টার প্রতিষ্ঠা, ইকো পার্ক স্থাপন, ভূমি জরিপ, বিদ্যুৎ উৎপাদন, শত্রু সম্পত্তি আইন, ভুয়া দলিল, জোরজবরদস্তি, ভীতি সৃষ্টি প্রভৃতির মাধ্যমে আদিবাসীদের ভূমি থেকে উচ্ছেদ চলছে। পাহাড় কি সমতল—সবখানেই সংকুচিত হচ্ছে তাদের জমি।

১৯৫৭ সালে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিকভাবে বিশ্বের মানবগোষ্ঠীর অধিকার সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার এক কনভেনশন অনুষ্ঠিত হয়। এতে আদিবাসী ও ট্রাইবাল জনগোষ্ঠী কনভেনশন ১৯৫৭ (১০৭) গৃহীত হয়। ১৯৮৯ সালে গৃহীত ধারাটি সংস্কার করে ১৯৮৯ (১৬৯) করা হয়। এভাবে জাতিসংঘের শ্রম সংস্থা ক্ষুদ্র জাতিসত্তার অধিকার সংরক্ষণে পদক্ষেপ নেয়। আন্তর্জাতিক বিধিবিধানে আদিবাসীদের প্রথাগত ঐতিহ্য ও সামাজিক মালিকানা স্বীকৃত। বেশির ভাগই এটা মাথায় রেখে নিজেদের আইন প্রণয়ন করেছে, সমষ্টিগত সামাজিক মালিকানার স্বীকৃতি দিয়েছে এবং এর আলোকে আদিবাসীদের ভূমিসহ সব ধরনের অধিকার সুরক্ষা করছে।

আমরা দেখছি সমতলের আদিবাসীদের ভূমির মালিকানা দেশের প্রচলিত আইনে নির্ধারণ করা হলেও তিন পার্বত্য জেলায় আদিবাসীদের ভূমি মালিকানা সামাজিক। ‘সর্বজনীন সম্পদ-সম্পত্তি মালিকানা অধিকার’ নীতিই হলো তাদের ভূমি মালিকানার ভিত্তি। ফলে এ মালিকানা বংশপরম্পরায়  মৌখিক। তিনটি সার্কেলের আওতায় পার্বত্য পাড়ার হেডম্যান ও কারবারিরা এর ব্যবস্থাপনা করেন। কিন্তু এক হিসাব বলছে, গত ৫১ বছরে এ পার্বত্য পাড়ার নিয়ন্ত্রণাধীন ভূমির পরিমাণ ৫০ শতাংশের বেশি কমে গেছে। অন্য কথায় বলা যায়, পাহাড়িদের সামাজিক মালিকানার অর্ধেকেরও বেশি ভূমি ও ভূসম্পদ হাতছাড়া হয়ে গেছে। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার আইএলও কনভেনশন নং ১০৭ অনুসমর্থন করে। এ কনভেনশনে আদিবাসীদের ঐতিহ্যগত ভূমির মালিকানা ও অধিকার স্বীকৃত। এতে বলা হয়েছে, ‘আদিবাসীদের দলিল থাকুক বা না থাকুক, যে জমি ঐতিহ্যগতভাবে তারা ব্যবহার করে, সে জমি তাদের।’ কিন্তু এ কনভেনশনের আলোকে জাতীয় পর্যায়ে আইন বা নীতিমালা হয়নি এখনো। আন্তর্জাতিক সনদের বাস্তবায়ন না হওয়ায় এবং এসবের আলোকে আইন না থাকায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলো তাদের ভূমি রক্ষা করতে পারছে না। যেহেতু বাংলাদেশ সরকার আইএলও কনভেনশন ১০৭-এ অনুস্বাক্ষর করেছে, সেহেতু আদিবাসীদের কাগজবিহীন সমষ্টিগত ভূমি মালিকানার বিষয়টি দেশের আইনে পরিণত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

কিছু বিষয়ে অগ্রগতি লক্ষণীয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ‘ঘ অনুচ্ছেদের ৪ নং ও ৫ নং ধারা’য় ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য কমিশন গঠনের শর্ত ছিল। ওই শর্তপূরণ সাপেক্ষে সেখানে ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন পাস হয়েছে। কিন্তু নানা জটিলতায় সেটি এখনো কার্যকর করা হয়নি। সমরূপভাবে সমতলের আদিবাসীদের জন্য ভূমি কমিশন গঠনের দাবি দীর্ঘদিনের। বিভিন্ন সময়ে নীতিনির্ধারকরা প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন। তবে সেটি এখনো হয়নি। সমতলের আদিবাসীদের জন্য একমাত্র ভূমি রক্ষার কবচ ১৯৫০ সালের রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনের ৯৭ ধারায় বলা আছে, জেলা প্রশাসকের অনুমতি ব্যতীত কোনো আদিবাসীর জমি অ-আদিবাসীরা কিনতে পারবে না। অনেক সময় দেখা যাচ্ছে, এখানেও জাল অনুমতি সংগ্রহ করে আদিবাসীদের জমি বিক্রির ঘটনা ঘটছে। ভুয়া দলিল তৈরি করে উচ্ছেদ করা হচ্ছে আদিবাসীদের।

আদিবাসীদের জীবন ও সংস্কৃতি ভূমিকেন্দ্রিক। সুতরাং তাদের ভূমি সুরক্ষা করা অত্যাবশ্যক। আদিবাসী ও সংখ্যালঘুবিষয়ক সংসদীয় ককাস কয়েকটি বিষয় সুপারিশ করেছে। সেগুলো হলো, আদিবাসীদের

ঐতিহ্য ও প্রথাগত ভূমি অধিকারের স্বীকৃতি প্রদান, সমতলের আদিবাসীদের জন্য অবিলম্বে পৃথক ভূমি কমিশন গঠন, পাহাড়ের ভূমি কমিশনকে আরো কার্যকর করা, বাংলাদেশ আদিবাসী অধিকার আইন প্রণয়ন এবং দেবোত্তর সম্পত্তি রক্ষা আইন কার্যকর করা। আদিবাসী ভূমি অধিকার সংরক্ষণে এগুলো আমলে নেয়া জরুরি।

আদিবাসী উচ্ছেদ থামছে না। দিন দিন কমছে তাদের জমি। এ প্রেক্ষাপটে সারা দেশে দখল হওয়া আদিবাসীদের জমি ফিরিয়ে দেয়ার যে দাবি উঠেছে তা যৌক্তিক ও সময়োপযোগী। ভূমি প্রশ্নটি তাদের অস্তিত্বের সঙ্গে যুক্ত। সুতরাং বিষয়টি বিবেচনায় তাদের ভূমি অধিকার সুরক্ষায় সব রকম ব্যবস্থা সরকার নেবে, এটিই প্রত্যাশা।