কভিডের প্রভাব মোকাবেলা ও বাজার স্থিতিশীল রাখতে সরকার খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতা বাড়ানোর চিন্তা করছে। নতুন করে ১০ লাখ পরিবারকে খাদ্যসহায়তা প্রদান ও ওএমএসের আওতা বাড়াতে খাদ্য মন্ত্রণালয় একটি প্রস্তাব অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। গরিব ও নিম্নআয়ের মানুষের ন্যূনতম খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের এ কর্মসূচি নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তবে করোনা পরিস্থিতিতে মানুষের জীবিকার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ায় দারিদ্র্যের হার বেড়েছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। অতিমারী দীর্ঘায়িত হওয়ার কারণে দারিদ্র্যের হার আরো বাড়লে প্রাক্কলিত খাদ্যসহায়তা বিপুলসংখ্যক গরিব মানুষের ন্যূনতম খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। এক্ষেত্রে কার্যক্রম আরো সম্প্রসারণ এবং অনিয়ম রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া চাই। বিগত সময়ে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি নিয়ে অনিয়মের যেসব অভিযোগ উঠেছে তার পুনরাবৃত্তি রোধে প্রযুুক্তি ব্যবহারে জোর দিতে হবে। প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত ও দরিদ্ররা যেন এর সুফল পায়, তা নিশ্চিত করতে তদারকিও বাড়ানো প্রয়োজন।
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি সাধারণ ও স্বল্প আয়ের মানুষকে যে কতটা বিপর্যস্ত করেছে, তা টিসিবির গাড়ির সামনে দীর্ঘ লাইন দেখেই ধারণা করা যায়। আগে দরিদ্র মানুষ টিসিবির পণ্যের জন্য লাইন দিতেন; এখন ধোপদুরস্ত পোশাক পরা মানুষও ভিড় জমাচ্ছেন বাধ্য হয়ে। করোনাকালে মানুষের আয় না বাড়লেও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। চাল, ভোজ্যতেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সব পণ্যের দামের ঊর্ধ্বগতির জন্য আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই দেয়া হচ্ছে। কিন্তু বাইরে কী পরিমাণ দাম বেড়েছে, আর এখানে কতটা বাড়ানো হয়েছে, তাও খতিয়ে দেখা জরুরি। বাজারের নিয়ম হলো, সরবরাহ বেশি থাকলে দাম কমে, আর সরবরাহ কম থাকলে দাম বাড়ে। মন্ত্রীরা মাঝে মধ্যে এ কারসাজির বিরুদ্ধে কথা বললেও কারো বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দেখা যায় না। ফলে একের পর এক প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েই চলেছে। এ অবস্থায় বাজারের ওপর সরকারের তদারকি বাড়াতে হবে। পাশাপাশি হতদরিদ্র ও সীমিত আয়ের মানুষকে সহায়তার জন্য খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন। চালের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পারার কারণ হিসেবে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাবকে দায়ী করছেন অর্থনীতিবিদরা। তারা বলছেন, সরকার বিভিন্ন সময়ে নানা বিষয়ে লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করে কিন্তু সময়মতো সেগুলো বাস্তবায়ন করতে পারে না। তাছাড়া যেকোনো সমস্যা সমাধানে স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপ গ্রহণ করে সাময়িক সমাধানের দিকেই বেশি নজর দিচ্ছে সরকার।
দেশের প্রধান খাদ্যশস্য চাল। এখনো দেশের দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষের মোট আয়ের সিংহভাগ ব্যয় হয় চালের পেছনে। দরিদ্র ও স্বল্প আয়ের মানুষের চাল ভোগের পরিমাণ মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তের চেয়ে অনেক বেশি। সে হিসেবে চালের দাম বাড়লে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হয় দরিদ্ররাই। চালের মূল্যস্ফীতি দরিদ্র ও নাজুক জনগোষ্ঠীর প্রকৃত আয় কমে যাওয়ারই নামান্তর। কোনো কোনো নিম্ন ও দরিদ্র মানুষের মোট আয়ের ৩০-৫০ শতাংশই ব্যয় হয় চাল কেনায়। চালের দাম বাড়লে এর অভিঘাত সবচেয়ে বেশি পড়ে কম আয়ের মানুষের ওপর। চালের মূল্যস্ফীতি দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষের প্রকৃত আয় কমিয়ে দিচ্ছে। স্বল্প আয়ের মানুষের ওপর চালের মূল্যস্ফীতির অভিঘাত জাতীয় মূল্যস্ফীতির চেয়ে বেশি। এদিকে সরকারের দুর্বল মজুদ ব্যবস্থাপনা ও খাদ্য বিতরণ ব্যবস্থায় অপর্যাপ্ততার কারণে বাজারসংশ্লিষ্টরা সুযোগ নিচ্ছে। আমদানি ও অভ্যন্তরীণ সংগ্রহের মাধ্যমে চালের মজুদ ও সরবরাহ পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি করতে হবে। সেটি করতে না পারলে সামনে মূল্যস্ফীতি আরো বাড়বে। মানুষের দুর্গতিও আরো বাড়বে। দরিদ্র মানুষের জন্য স্বল্পমেয়াদে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি জোরদার ও খোলাবাজারে খাদ্যপণ্য বিক্রিসহ রেশন ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। এছাড়া মধ্যমেয়াদে খাদ্য আমদানির মাধ্যমে সরবরাহ বাড়িয়ে দাম কমানোর উদ্যোগও নেয়া যেতে পারে।
সরকার আগামী অর্থবছরে খাদ্যশস্যের মজুদ বাড়াতে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন থেকে সংগ্রহ বাড়ানো ছাড়াও বিদেশ থেকে খাদ্যশস্য আমদানি করবে বলে জানা যাচ্ছে। এটা হবে একটি ভালো সিদ্ধান্ত। করোনা মহামারীর স্থায়িত্বকাল দীর্ঘায়িত হলে রফতানিকারক দেশগুলো হতে খাদ্যশস্যের রফতানি বন্ধ বা সীমিত হয়ে পড়ার আশঙ্কা অমূলক নয়। তাছাড়া খাদ্যশস্য আমদানিকারক বড় বড় দেশ বাড়তি খাদ্যশস্যের চাহিদা মেটাতে আমদানি প্রতিযোগিতায় নামবে। তখন ২০০৭-০৮ অর্থবছরের মতো খাদ্যশস্য, বিশেষ করে চাল আমদানিতে সমস্যা দেখা দিতে পারে। এক্ষেত্রে কৃষিপণ্য উৎপাদনের সঠিক পরিসংখ্যান সংগ্রহ এবং সে অনুযায়ী দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা আবশ্যক। ধান-চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হলেও সেগুলো যেন সময়মতো সংগ্রহ করে বিতরণ করা যায়, সেদিকে গুরুত্ব দিতে হবে। এসব ক্ষেত্রে স্বল্পমেয়াদি চিন্তা না করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা আবশ্যক। এমন পদক্ষেপ নিতে হবে যাতে কৃষক ন্যায্যমূল্য পান, আবার ভোক্তারাও সহনীয় দামে খাদ্যশস্য কিনতে পারেন।
বিশ্বের উন্নত দেশগুলো আইন ও নীতির মাধ্যমে সব মানুষের খাদ্য অধিকার নিশ্চিত করেছে। পাশাপাশি উন্নয়নশীল দেশ আর্জেন্টিনা, বলিভিয়া, ব্রাজিল, একুয়েডর, এল সালভাদর, গুয়াতেমালা, হন্ডুরাস, ইন্দোনেশিয়া, মেক্সিকো, মোজাম্বিক, নিকারাগুয়া, প্যারাগুয়ে, পেরু, দক্ষিণ আফ্রিকা, তানজানিয়া, উগান্ডা ও ভেনিজুয়েলা এরই মধ্যে খাদ্যনিরাপত্তা আইন প্রণয়ন করেছে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত ২০১৩ সালে নেয়া খাদ্যনিরাপত্তা আইন কার্যকরের মাধ্যমে দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী সব মানুষের খাদ্য অধিকার পর্যায়ক্রমে নিশ্চিত করছে। নেপালের সংবিধানে সব মানুষের খাদ্য অধিকারের স্বীকৃতি দেয়ার পাশাপাশি ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে খাদ্য অধিকার ও খাদ্য সার্বভৌমত্ব আইন, ২০১৫ কার্যকর হয়েছে। আমাদের দেশেও খাদ্য অধিকার আইন প্রণয়ন করা প্রয়োজন।
একটা সময় দেশের দরিদ্র জনগণের কাছে খাদ্য বিতরণ ব্যবস্থা হিসেবে গ্রাম ও শহর এলাকায় রেশনিং চালু ছিল। তবে সঠিকভাবে বাস্তবায়নের অভাবে সে কর্মসূচি সাফল্য লাভ করেনি। পরবর্তী সময়ে বিকল্প হিসেবে ২০১৫ সালের দিকে সরকারের পক্ষ থেকে জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশল গ্রহণ করা হয়; যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কাজের বিনিময়ে খাদ্য, খাদ্যের বিনিময়ে শিক্ষা ও দুর্বল জনগোষ্ঠীর জন্য সরকারি খাদ্য বিতরণ ব্যবস্থা। তবে গ্রামের তুলনায় শহরে এ ধরনের কর্মসূচির ব্যাপ্তি সীমিত। টিসিবির মাধ্যমে কয়েকটি পণ্য বিক্রি ছাড়া উল্লেখযোগ্য কার্যক্রম চোখে পড়ে না। বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির জন্য বাংলাদেশ সুপরিচিত হলেও সেগুলো মূলত গ্রামীণ পর্যায়ের দরিদ্রদের জন্যই। কভিড পরিস্থিতিতে নগর পর্যায়ে সরকার বিশেষ কর্মসূচি হিসেবে খোলাবাজারে চাল বিক্রি শুরু করে। টিসিবির ট্রাকে কয়েকটি পণ্যও বিক্রি হচ্ছে। তবে বাস্তবতা হলো, খাদ্য ক্রয়ে সুযোগ বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ এখনো অনুপস্থিত।
কভিড পরিস্থিতিতে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির সম্প্রসারণ কাঙ্ক্ষিত। তবে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত চিহ্নিত এবং সহায়তা বিতরণে অনিয়ম বন্ধ করা গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে ভারতের আধার কার্ডের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় রাখা যেতে পারে। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর তালিকা প্রণয়ন এবং তাদের ডিজিটাল প্রক্রিয়ার মাধ্যমে চিহ্নিত করা জরুরি। ডিজিটাল ডাটাবেজ নিশ্চিত করা গেলে কে কতটুকু সহায়তা পেল তা সহজেই বোঝা যাবে। শুধু তা-ই নয়, কোন এলাকায় কী পরিমাণ সহায়তা প্রয়োজন এবং কতটা বিতরণ হয়েছে ইত্যাদি তথ্যও সহজে পাওয়া সম্ভব হবে, যা পরিকল্পনা প্রণয়নে সহায়ক ভূমিকা রাখবে। খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হলে প্রথমেই এর ত্রুটি চিহ্নিত করে তা সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে। প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তরাই যেন খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি সম্প্রসারণের সুফল পায়, খাদ্য মন্ত্রণালয়কেই তদারকি বৃদ্ধি ও ব্যবস্থাপনা উন্নত করার মাধ্যমে সেটি নিশ্চিত করতে হবে।










