দুপুরে ঢাকা মহানগরীর একটি রেস্টুরেন্টে লাঞ্চ করতে গিয়ে দেখা হয় হোটেলে কর্মরত পূর্বপরিচিত শ্রমিক রমজান ও রফিকের সঙ্গে। তাদের ভালো-মন্দ খোঁজখবর নিতে গিয়ে চোখেমুখে লক্ষ করলাম গভীর উদ্বেগ ও হতাশার চিত্র। জানা গেল, রমজান মাসে রেস্টুরেন্টটি একবেলা বন্ধ রাখতে পারে। তাই তাদের চাকরি চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। দেশের প্রচলিত শ্রম আইন ও বিধিকে বরাবরই বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে আসছেন অধিকাংশ হোটেল মালিক। কোনো নিয়ম-নীতি ও আইন যেমন তারা মানেন না, তেমনি আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর নির্দেশনা মানতেও তারা নারাজ। ফলে মালিকদের এ ধরনের বেপরোয়া মনোভাবের কারণে প্রতিনিয়ত ভয়-ভীতি, আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয় রমজান ও রফিকের মতো এ খাতের লাখ লাখ শ্রমিকের জীবনে। শুধু বেঁচে থাকার আশায় গ্রাম থেকে উচ্ছেদ হওয়া অগণিত গরিব, ভূমিহীন মানুষের একটা বড় অংশের ঠিকানা হচ্ছে হোটেল সেক্টর। অসহায় মানুষের কোনো রকমে এই বেঁচে থাকার প্রাথমিক চাওয়াটাকে পুঁজি করে খড়্গ হাতে মালিকরা অমানুষিক নির্যাতন চালান। এর অন্যতম উদাহরণ হচ্ছে সন্দেহবশত মোবাইল চুরির অভিযোগে ২০১৫ সালের ১৭ অক্টোবর ঘরোয়া হোটেলের গ্লাস বয় রিয়াদকে (১৪) মালিক কর্তৃক গুলি করে হত্যা করা। সাধারণত এ ধরনের খড়্গের ভয়ে বেশি আতঙ্কে থাকে ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুশ্রমিকরা।

প্রায় ৩০ লাখ (বাংলাদেশ হোটেল রেস্টুরেন্ট সুইটমিট শ্রমিক ফেডারেশনের তথ্যমতে) হোটেল শ্রমিকের একটা বড় অংশই গ্লাস বয় ও প্লেট বয়। কলকারখানা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক জরিপ করলে দেখা যাবে সবচেয়ে বেশি শিশুশ্রমিক কাজ করে এ হোটেল শিল্পে। অভাবের সংসারে জন্ম নেয়া এসব শিশুশ্রমিকের হাতে বই তুলে দেয়ার ক্ষমতা তাদের পরিবারের থাকে না; বরং কোনো একটা কাজ ধরিয়ে দিতে পারলেই যেন পরিবার কিছুটা রক্ষা হয়। হোটেল সেক্টরে নিয়োজিত শ্রমিকদের কাকডাকা ভোরে কাজে যোগদান করতে হয়। কাজের ফাঁকে ফাঁকে এসব শিশুশ্রমিক চেয়ে থাকে তাদেরই সমবয়সী স্কুল ও কলেজগামী ছাত্র-ছাত্রীদের দিকে। অথচ এ নির্মমতা আড়াল করার জন্য প্রচলিত সমাজে শিশুশ্রমিকদের এই শিক্ষাবঞ্চিত হওয়াকে নিয়তির দোহাই দিয়ে চালিয়ে দেয়া হয়।

হোটেলের কাজের ক্ষেত্রে দেখা যায়, বিভিন্ন অভিসন্ধি নিয়ে বাবুর্চি আর প্লেট বয়ের প্রতি মালিক-ম্যানেজারের আচরণ ভিন্ন হয়। ফলে গ্লাস বয়, টেবিল বয় বা হোটেলের অন্য শ্রমিকরা যখন আন্দোলন করেন, শ্রেণী অসচেতন বাবুর্চিদের তখন মালিক নিজের পক্ষে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেন। মালিক ষড়যন্ত্রমূলকভাবে কৌশলে বাবুর্চিদের অন্য শ্রমিকদের থেকে আলাদা করে নেন। বাবুর্চি ছাড়াও কিছু শ্রমিককে প্রলুব্ধ করে সাময়িক কিছু সুযোগ-সুবিধা দিয়ে কাছে টানার চেষ্টা করেন। অথচ একপর্যায়ে দেখা যায়, এসব শ্রমিককে ১৫-২০ বছর কাজ করার পরও খালি হাতে বের করে দেয়া হয়।

আসলে মালিকের কাছে মুনাফাই হচ্ছে মূলকথা। সে কারণে কোনো শ্রমিক তার জীবনের পুরোটা মালিককে ঢেলে দিলেও  শেষ বয়সে তাকে খালি হাতেই ফিরতে হয়। বৃদ্ধ বয়সে এসব বাড়ি ফেরা হোটেল শ্রমিক পরিবারের কাছে বোঝা হয়ে ওঠেন। অনুগ্রহ আর নিগ্রহের পাত্র হয়ে বেঁচে থেকে তাদের ধুঁকে ধুঁকে জীবন পাড়ি দিতে হয়। একপর্যায়ে এসব অসহায় মানুষ মৃত্যুর মাঝে তাদের জীবনের মুক্তি খুঁজে নিতে চান।

বিভিন্ন মাধ্যমে আজ বিভিন্ন মানের হোটেলের বাহারি রকমের বিজ্ঞাপন শহরময় ছড়িয়ে গেছে। এসব বিজ্ঞাপনে মানুষের চোখ জুড়িয়ে গেলেও এর ভেতরে আড়াল হয়ে যায় চোখের জলে বুক ভেজা অধিকারবঞ্চিত হোটেল শ্রমিকরা। চোখ ধাঁধানো শহরে আর চোখ ধাঁধানো হোটেল-রেস্টুরেন্টে কাজ করে গেলেও এসব শ্রমিকের মধ্যে প্রাণ থাকে না। প্রাণহীন এ শ্রমিকদের দুঃখ-কষ্টের গল্প খুব কমই আসে দেশের প্রচলিত গণমাধ্যমে। উপরন্তু, শ্রম নিংড়ানো প্রবৃদ্ধির ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে পরিসংখ্যানের মারপ্যাঁচে আড়াল করা হয় প্রকৃত সত্যকে। তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ হচ্ছে সরকারি হিসাবে মাথাপিছু আয় প্রতি মাসে ১৮ হাজার টাকা আর হোটেলে সর্বনিম্ন মজুরি ৩ হাজার টাকা। সেটাও অনেক প্রতিষ্ঠানে সময়মতো পরিশোধ করা হয় না। এক্ষেত্রেও কোনো সময় কাপ, পিরিচ, প্লেট ভাঙলে বেআইনিভাবে ইচ্ছামতো জরিমানা কেটে বাকি মজুরি দেয়া হয়। শুধু তা-ই নয়, কাপ-পিরিচ ভাঙার কারণে শারীরিক-মানসিক নির্যাতনের শিকারও হতে হয় শিশু হোটেল শ্রমিকদের।

সারা বছর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের মধ্য দিয়ে চলা হোটেল শ্রমিকদের জীবনে রমজান মাস এলে বাড়তি ভয়ভীতি আর আতঙ্কের সৃষ্টি হয়। আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে চলা মালিকরা রমজানে ব্যবসা কিছু কম থাকায় তাদের লাভ ঠিক রাখতে রমজানের পবিত্রতার দোহাই দিয়ে হোটেল-রেস্টুরেন্ট বন্ধ রাখেন। এ অজুহাত দেখিয়ে মালিকরা ছাঁটাই, চাকরিচ্যুতিসহ শ্রমিকদের বেতন-বোনাস থেকে বঞ্চিত করেন। তাই রমজান মাসে চাকরি হারানো অসংখ্য শ্রমিকের ঈদের চাঁদ দেখে চোখেমুখে হাসি ফুটে ওঠে না। কারণ স্ত্রী-সন্তানসহ পরিবারের ভরণ-পোষণ চালিয়ে যাওয়ায় তাদের হিমশিম খেতে হয়। অন্যদিকে হোটেলে যাদের চাকরি অব্যাহত থাকে, তাদের ওপর চাপানো হয় বাড়তি শ্রমঘণ্টা। ৫০ জন শ্রমিকের কাজ ২৫ জনকে দিয়ে করানো হয়। রমজান মাস শেষ হলেও চাকরিচ্যুত শ্রমিকদের কাজে যোগদান করার নিশ্চয়তা থাকে না।

হোটেল শিল্পে রমজান মাসে এ ধরনের প্রবণতা একটা অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে। ফলে ঈদের পরে নতুন-পুরনো মিলে বেকার শ্রমিকদের এক বিশাল বহর ঘুরে বেড়ায় চাকরির জন্য। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে কম মজুরিতে শ্রমিক নিয়োগ দেয়ার জন্য মোক্ষম সময় এটা মালিকদের জন্য। হোটেল শ্রমিকদের জীবনে রমজান মাস হচ্ছে ‘শাঁখের করাতের মতো’। জীবনের নির্মম বাস্তবতার কারণে আনন্দ অনেক আগেই জীবন থেকে হারিয়ে যায় শ্রমিক ও শ্রমজীবী মানুষের। তার পরও প্রচলিত সমাজের মতাদর্শের শক্তির জোরের কারণে জীবন থেকে নেয়া সত্যকে আড়াল করে হাসতে হয় ঈদের দিনে। হোটেল শ্রমিক রমজানরা কীভাবে পার করেন রমজান মাস, তার খবর রাখে না প্রতিক্রিয়াশীল ভোট বাজারের ভোট বেপারিরাও। 

 

প্রকাশ দত্ত: যুগ্ম সম্পাদক, বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন সংঘ

কেন্দ্রীয় কমিটি