দেশের চিকিৎসা শিক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম অনুষঙ্গ বেসরকারি মেডিকেল কলেজ। সরকারি মেডিকেল কলেজের পাশাপাশি বেসরকারি এসব প্রতিষ্ঠানও নাগরিকদের স্বাস্থ্যসেবা জোগাতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। তথ্য বলছে, বর্তমানে বেসরকারি মেডিকেল কলেজের সংখ্যা ৭২। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশই পরিচালন নীতিমালা মানছে না। বেসরকারি অনেক মেডিকেল কলেজের নিজস্ব জমি নেই। কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় ফ্লোর স্পেসও নেই। এসব সমস্যা সমাধানে বারবার তাগাদা দেয়া হলেও কোনো উদ্যোগই নিচ্ছে না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণের বিষয়গুলো উপেক্ষা করেই শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলো। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায়। কাজেই বিষয়টি আমলে নিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।
দেশে বেসরকারি মেডিকেল কলেজের যাত্রা আশির দশকের মাঝামাঝিতে। ক্রমেই এসব প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ছে। নতুন নতুন প্রতিষ্ঠান সরকারি অনুমোদন পাচ্ছে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানগুলো যেভাবে ভূমিকা রাখার কথা, সেভাবে রাখতে পারছে না। এর পেছনে কিছু কারণ দায়ী। চিকিৎসা শিক্ষা হাতে-কলমে শেখার বিষয় হলেও কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আলাদা কলেজ ও আলাদা হাসপাতাল ভবন নেই। ফলে শিক্ষার্থীরা ব্যবহারিকভাবে বিষয়টি শিখতে পারছেন না। কোনো কোনোটির প্রয়োজনীয় ল্যাব সুবিধা নেই। পরীক্ষা নেয়ার জন্য সুনির্দিষ্ট কক্ষ নেই। মিলনায়তন নেই। আবার কোনো কোনোটিতে রয়েছে শিক্ষকস্বল্পতা ও অন্য জনবল ঘাটতি। শুধু তা-ই নয়, কিছু বেসরকারি মেডিকেল কলেজ নির্ধারিত শিক্ষাক্রমও অনুসরণ করছে না। আছে শিক্ষা সরঞ্জামের ঘাটতিও। সব মিলিয়ে দেশে বেসরকারি উদ্যোগে চলা চিকিৎসা শিক্ষার অবস্থা হতাশাজনক।
বিশ্বের অনেক দেশেই সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোগে চিকিৎসা শিক্ষা কার্যক্রম চলছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, নেদারল্যান্ডস, কানাডা প্রভৃতি পশ্চিমা দেশ ছাড়াও এশিয়ার অনেক দেশেও বেসরকারি মেডিকেল কলেজ আছে। বিশেষ করে জাপান, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কাতার, চীনে সাম্প্রতিক দশকগুলোয় এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে। রাষ্ট্রীয় বাধ্যবাধকতা ও মানদণ্ড পূরণ করে এসব প্রতিষ্ঠান মানসম্পন্ন চিকিৎসা শিক্ষা নিশ্চিত করছে। গবেষণা ও স্বাস্থ্যসেবায় তাত্পর্যপূর্ণ অবদান রাখছে। এমনকি প্রতিবেশী ভারতেও বেসরকারি উদ্যোগে চিকিৎসা শিক্ষার প্রভূত বিস্তার ঘটেছে। দেশটিতে অনেক বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল গড়ে উঠেছে। সেগুলোর কোনো কোনোটি গবেষণা ও স্বাস্থ্যসেবায় বিশ্বজুড়ে সুনাম অর্জনে সমর্থ হয়েছে। নিয়ম পরিপালন, শৃঙ্খলাবোধ, সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও পেশাদারি উত্কর্ষের কারণে এটা সম্ভব হয়েছে। সুতরাং দেশে চিকিৎসা শিক্ষার উন্নয়নে বৈশ্বিক অভিজ্ঞতাগুলো আমাদের জন্য শিক্ষণীয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সিংহভাগ বেসরকারি মেডিকেল কলেজই এখন মানহীন চিকিৎসক তৈরি করছে। দেশের জনসাধারণের মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে প্রয়োজনীয় ভূমিকা রাখতে পারছেন না তারা। এর মূল কারণ পরিচালন নীতিমালার ব্যত্যয়। নীতিমালা অনুযায়ী মেট্রোপলিটন সিটির মধ্যে দুই একর নিজস্ব জমিতে কলেজের একাডেমিক ভবনের জন্য এক লাখ বর্গফুট ও হাসপাতাল ভবনের জন্য এক লাখ বর্গফুটের ফ্লোর স্পেস থাকতে হবে। দুই বছর পর ফ্লোর স্পেস আরো বাড়াতে হবে। মেট্রোপলিটন সিটির বাইরে কলেজের নিজস্ব চার একর জমি থাকতে হবে। একই ক্যাম্পাসে কলেজ ও হাসপাতালের জন্য আলাদা ভবন থাকতে হবে। কোনোভাবেই ভাড়া ভবনে কলেজ ও হাসপাতাল পরিচালনা করা যাবে না। হাসপাতালে শয্যা সংখ্যা হবে প্রতি শিক্ষার্থীর বিপরীতে পাঁচটি। আর প্রতি ১০ শিক্ষার্থীর বিপরীতে শিক্ষক থাকবেন একজন। সমরূপভাবে নির্ধারিত শিক্ষাক্রম অনুসরণেরও বাধ্যবাধকতা রয়েছে এতে। অথচ এসব মৌলিক শর্ত লঙ্ঘন করেই চলছে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বেসরকারি মেডিকেল কলেজ।
আমরা দেখছি, অনুমোদন নেয়ার আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সরকারি নীতিমালা ও শর্ত পূরণের অঙ্গীকার করছে। কিন্তু অনুমোদন পাওয়ার পর ঘটছে উল্টো চিত্র। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তারা প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, শিক্ষা সরঞ্জাম ও জনবল সুবিধা নিশ্চিত করছে না। ফলে বেসরকারি উদ্যোগে চালিত চিকিৎসা শিক্ষায় রয়ে যাচ্ছে বড় ধরনের গলদ। বাংলাদেশ মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিল কিংবা স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের নিয়মিত পরিদর্শনে বিরাজমান অনিয়মগুলো উঠে এলেও নেয়া হচ্ছে না কার্যকর পদক্ষেপ। এ পর্যন্ত সরকার দু-একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেও বেশির ভাগই থেকে গেছে জবাবদিহির ঊর্ধ্বে। এখন সময় এসেছে প্রাতিষ্ঠানিক শৈথিল্য ও নিষ্ক্রিয়তা অবসানের। একটি উচ্চপর্যায়ের আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক কমিটি গঠন করে সর্বাগ্রে যাচাই করে দেখতে হবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কী অবস্থা, কোথায় কোথায় ঘাটতি আছে, কোথায় কোথায় অনিয়ম ঘটছে। যেসব প্রতিষ্ঠান মৌলিক শর্ত লঙ্ঘন করছে, তাদের সতর্ক করতে হবে। প্রথমে একটি সময়সীমা বেঁধে দিতে হবে, যাতে তারা ওই সময়ের মধ্যে শর্তগুলো পূরণে উদ্যোগী হয়। এর পরও যারা ব্যর্থ হবে তাদের বিরুদ্ধে নিতে হবে কঠোর ব্যবস্থা। প্রয়োজনে লাইসেন্স বাতিল করতে হবে। সময় অনেক গড়িয়েছে। এখন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কঠোর পদক্ষেপই জরুরি। বেসরকারি মেডিকেল কলেজ পরিচালনবিষয়ক একটি পূর্ণাঙ্গ আইন প্রণয়নের দাবি দীর্ঘদিনের। সম্প্রতি এক্ষেত্রে উন্নয়ন ঘটেছে। খসড়াকৃত বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ও ডেন্টাল কলেজ বিল-২০২২ সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে। দ্রুত বিলটি পাস করে পূর্ণাঙ্গ আইনে রূপ দিতে হবে।
সময়ান্তরে দেশে চিকিৎসা শিক্ষার অনেক প্রসার ঘটেছে। এখন মনোযোগ দিতে হবে মানে। কাজেই মান নিশ্চিতে প্রতিটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ পরিচালিত হতে হবে প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞ ও মেধাবী শিক্ষক দ্বারা। একই সঙ্গে অবকাঠামোগত সুবিধা ও চিকিৎসার সরঞ্জামও নিশ্চিত করতে হবে। চিকিৎসাবিজ্ঞান তাত্ত্বিক কোনো বিষয় নয়, এটি ব্যবহারিক। তাই এখানে ফাঁকি দেয়ার কোনো সুযোগ নেই। স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কর্তাব্যক্তিরা বিষয়টি যত দ্রুত অনুধাবন করবেন ততই মঙ্গল। সরকারি নজরদারি, কার্যকর পদক্ষেপ ও কর্তৃপক্ষের আন্তরিক প্রয়াসে বেসরকারি উদ্যোগে চালিত চিকিৎসা শিক্ষার মানোন্নয়ন ঘটবে বলে প্রত্যাশা।










