দুই বছর আগে কভিড মহামারী গোটা বিশ্বকে গ্রাস করার সময় থেকে ‘নজিরবিহীন’ শব্দটি রীতিমতো বহুল ব্যবহূত উক্তিতে পরিণত হয়। ভাইরাসটি বৈশ্বিক আন্তঃসংযোগের ক্ষেত্রে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। যদিও তা মহামারীকালীন নতুন কিছু নয়। তবে আমরা কিন্তু বর্তমানে শুধু কভিড-১৯-এর মতো একটি পরিস্থিতির মধ্য দিয়েই যাচ্ছি না, বেশির ভাগ উন্নয়নশীল দেশে বৃদ্ধি পাচ্ছে কলেরার প্রাদুর্ভাবও।
সার্চ-কো ভি-২ ভাইরাসটি ‘নতুন’
কিন্তু কলেরা হচ্ছে পানিবাহিত ডায়রিয়ার অসুখ; যা ব্যাকটেরিয়া ভাইব্রিও কলেরার কারণে হয়। রোগটি পুরনো এবং এর রয়েছে ব্যাপক প্রাণহানির ইতিহাস। ঊনবিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে শুরু হওয়ার পর থেকে বর্তমান প্রাদুর্ভাব কলেরার সপ্তম মহামারী বলেই উল্লেখ্য। বিংশ শতাব্দীতে কলেরার সপ্তম এ প্রাদুর্ভাবের শুরু হয় ১৯৬১ সালে, ১৯৯১ সাল নাগাদ এটি বিশ্বের পাঁচটি দেশের জনগোষ্ঠীকে আক্রান্ত করে।
সুস্পষ্ট পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও কভিড-১৯ ও কলেরার মধ্যে অনেক মিল বিদ্যমান। উভয়ই টিকার মাধ্যমে অনেকটা নিয়ন্ত্রণযোগ্য এবং দুটোই জনাকীর্ণ ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খুব সহজে বিস্তার লাভ করে। তাই পর্যাপ্ত পরিমাণ নিরাপদ উত্স নিশ্চিত করা এবং পানি, স্যানিটেশন ও হাইজিন (ওয়াশ) অনুশীলন এবং অবকাঠামো শক্তিশালী করা সংক্রমণ সীমিত করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। স্বাস্থ্য সুরক্ষাবিষয়ক এ সাদৃশ্যগুলো ব্যাখ্যা করে কেন কভিড-১৯-এর সংক্রমণ হ্রাস করতে ভ্রমণের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ আর ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কিত সতর্কতা বৃদ্ধি কলেরার প্রকোপ হ্রাসের ক্ষেত্রে কাজ করেছে। কিন্তু বিশ্বের সরকারগুলো করোনার বিধিনিষেধ শিথিল করার সঙ্গে সঙ্গে কলেরার প্রকোপ ফিরে আসছে। ২০২১ সালের শেষে সারা বিশ্বে ১৬টি সক্রিয় কলেরা প্রাদুর্ভাব ছিল।
তবে কভিড-১৯-এর অভিজ্ঞতা কলেরার বিরুদ্ধে লড়াইকে শক্তিশালী করার জন্য মূল্যবান জ্ঞান সরবরাহ করে। শুরুটা যেমন কভিডের প্রাদুর্ভাব মোকাবেলায় গবেষণা কার্যক্রমের গুরুত্ব বৃদ্ধির মাধ্যমে। আমরা দেখেছি সার্চ-কো ভি-২ ভাইরাসের আবির্ভাব বিশাল ও ব্যাপক সমন্বিত বৈশ্বিক গবেষণা কার্যক্রমে গতি যোগ করেছে, যা রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের সব স্তরে প্রমাণভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণকে সক্ষম করে। কভিড-১৯ প্রতিরোধ করতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গ্লোবাল রিসার্চ রোডম্যাপের মতো উদ্যোগ ওই প্রচেষ্টাকে সঠিক দিকনির্দেশনা দিয়ে সহযোগিতার পাশাপাশি এটাও নিশ্চিত করেছে যে সাহায্যগুলো সেখানেই বা সে অঞ্চলগুলোতেই পাঠানো হয়েছে, যেখানে এর সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন বিদ্যমান।
কলেরার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ক্ষেত্রেও গবেষণা কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। এ কারণেই গত বছর শুরু হয়েছে কলেরা নিয়ন্ত্রণে গ্লোবাল টাস্কফোর্স কলেরা রোডম্যাপ গবেষণা কার্যক্রম। যেখানে কলেরাবিষয়ক ১৭৭ জন বৈশ্বিক বিশেষজ্ঞ ও অন্যান্য অংশীদার তাদের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন। উদ্যোগটি গবেষণার অগ্রাধিকারবিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোকে উত্থাপন করে। বৈশ্বিক কলেরা নিয়ন্ত্রণ টাস্কফোর্সের (জিটিএফসিসি) লক্ষ্যমাত্রা অনুসারে, ২০৩০ সালের মধ্যে কলেরা নির্মূলের লক্ষ্যে ওই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজাটা জরুরি।
কভিড-১৯ গবেষণা এজেন্ডার মধ্যে সহজেই অনেক প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, কম মূল্যে সীমিত কলেরা টিকা সরবরাহের সবচেয়ে দ্রুত ও সাশ্রয়ী উপায় কী? কীভাবে আমরা রোগটিকে মহামারী কিংবা মহামারী পর্যায়ে পৌঁছানো থেকে প্রতিরোধ করার জন্য টেকসই ও কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারি? কার্যক্রমগুলোর নকশা ও বাস্তবায়নে আমরা কীভাবে ঝুঁকিপূর্ণ সম্প্রদায়গুলোর সঙ্গে অর্থপূর্ণভাবে জড়িত হতে পারি? কোন ধরনের প্রতিরোধ ব্যবস্থা সবচেয়ে কার্যকর এবং কখন ও কোথায় তা প্রয়োগ করা উচিত?
প্রশ্নগুলো একই রকমের হতে পারে কিন্তু এর উত্তর অনুসন্ধানের প্রক্রিয়াটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। কভিড-১৯-এর ক্ষেত্রে প্রচণ্ড রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও ব্যাপক বিনিয়োগ গবেষকদের দ্রুত টিকা আবিষ্কারে সক্ষম করে। বিপরীতে কলেরা দীর্ঘদিন ধরে টিকে আছে কিন্তু সমাধানগুলোও অধরা রয়ে গেছে। এর অন্যতম কারণ কভিড-১৯ উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোকে একইভাবে আক্রান্ত করেছিল, কিন্তু ১৫০ বছর আগেই গ্লোবাল নর্থ থেকে কলেরা নির্মূল করা সম্ভব হয়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে প্রভাবিত করে এমন একটি রোগ মোকাবেলার জন্য বৈশ্বিকভাবে সম্পদ সংগ্রহ করাটা অনেকাংশেই কঠিন। কভিড-১৯-এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অঙ্গীকারের মধ্য থেকে সামান্য একটু অংশ দিয়ে কলেরার বিরুদ্ধে জীবন রক্ষাকারী গবেষণা কার্যক্রমের অগ্রগতি আনা যেতে পারে। মহামারীর ওপর পর্যবেক্ষণ ও নজরদারি বৃদ্ধি সংক্রমণের ধরন চিহ্নিত করতে সক্ষম করবে। নতুন ও উদ্ভাবনমূলক ডায়াগনস্টিক পরীক্ষাগুলো কেস শনাক্তকরণ ও চিহ্নিত করার গতি, কার্যকারিতা এবং গুণমান বৃদ্ধি করতে পারে। তাছাড়া নতুন ও উন্নত টিকা জরুরি সময়গুলোয় কাজে লাগার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধের মধ্যকার সংযোগকে শক্তিশালী করবে।
ভ্যাকসিনের সময় এবং ডোজগুলোকে কাজে লাগানোর বিষয়টিও অপরিহার্য, যেমন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে চিহ্নিতকরণ এবং তাদের চাহিদা পূরণের জন্য কীভাবে বিভিন্ন সম্প্রদায়কে সম্পৃক্ত করা যায়। ঝুঁকিপূর্ণ সম্প্রদায়গুলোর জন্য চিকিত্সা পদ্ধতি পরিবর্তনের লক্ষ্যে কলেরা সংক্রমণের বিপরীতে অ্যান্টিবায়োটিকের প্রভাব গবেষণা এবং কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মীদের দিয়ে কলেরা চিকিত্সার কেস ম্যানেজমেন্টের মাধ্যমে কোন পদ্ধতিটি সবচেয়ে কার্যকর ও কোনটি কার্যকর নয়, তা বোঝা প্রয়োজন।
এ অভিজ্ঞানের আলোকে দেশ ও স্বাস্থ্যবিষয়ক অংশীদাররা তাদের জাতীয় কলেরা পরিকল্পনা অনুসরণ করার সময়ে সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি ও পন্থা নির্বাচনের জন্য একটি ভালো অবস্থানে থাকবেন। এতে অতিরিক্ত তহবিল আকর্ষণ করা সহজ হবে, যা অগ্রগতির প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করবে।
কভিড-১৯ মহামারী আমাদের অনেক কিছু শিখিয়েছে। ভাইরাসটির সংক্রমণ প্রতিরোধে আমরা আমাদের জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের নির্দেশনাগুলো অনুসরণ করেছি—মুখে মাস্ক পরা, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা, কোয়ারেন্টিন পালন করা, টিকা গ্রহণ এবং বারবার হাত ধোয়া। আমাদের অবশ্যই বাড়তি সচেতনতা ও গতিশক্তি কাজে লাগিয়ে জনস্বাস্থ্যবিষয়ক অর্জনগুলোকে আরো বেশি অগ্রসর করতে হবে, শুধু আমাদের নিজস্ব সম্প্রদায়ের মধ্যে নয়, বিশ্বজুড়ে।
যার অর্থ নিজেদের পাশাপাশি অন্যের দিকেও লক্ষ রাখা। কলেরাকে পরাস্ত করার জন্য প্রয়োজনীয় সুরক্ষা সরঞ্জাম আমাদের রয়েছে কিন্তু কীভাবে, কখন এবং কোথায় তা প্রয়োগ করতে হবে তা শনাক্তের জন্য অবশ্যই গবেষণা চালাতে হবে। এভাবেই আমরা এই ‘নজিরবিহীন’ রোগটির হাত থেকে বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে রক্ষা করতে সক্ষম হব।
[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]
ফেরদৌসী কাদরী: জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী; ঢাকার আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্রের মিউকোসাল ইমিউনোলজি ও ভ্যাকসিনোলজি ইউনিটের প্রধান
মো. তৌফিকুল ইসলাম: আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্রের মিউকোসাল ইমিউনোলজি ও ভ্যাকসিনোলজি ইউনিটের উপপ্রকল্প সমন্বয়কারী
ভাষান্তর: রুহিনা ফেরদৌস










