এশিয়ার বৃহত্তম ও বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় হাওর হাকালুকি। কিন্তু এটি ক্রমেই তার ঐতিহ্য হারিয়ে ফেলছে। উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে তলদেশে পলি জমে ভরাট হয়ে যাচ্ছে হাকালুকি হাওর। এরই মধ্যে ভরাট হয়ে অস্তিত্ব হারিয়েছে অনেক খাল-বিল। গতকাল বণিক বার্তায় প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পানি নিষ্কাশনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় হাকালুকি হাওরের খাল-বিলের পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে পানি আশপাশের জমিতে ছড়িয়ে পড়ছে। এক পর্যায়ে সেই পানি শুষ্ক মৌসুমে শুকিয়ে হাওরের বিশাল অংশের তলদেশে পলি জমে খাল-বিল ভরাট হচ্ছে ক্রমে। হাকালুকি হাওরকে রক্ষা করতে হলে পানির স্বাভাবিক চলাচল নিশ্চিত করতে হবে সর্বাগ্রে। নইলে এর জীববৈচিত্র্য রক্ষা কঠিন হয়ে পড়বে। আমাদের প্রত্যাশা থাকবে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সমন্বয়ের মাধ্যমে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবে। 

জলাভূমিকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্থায়িত্বশীল জীবিকার আধার হিসেবে গণ্য করা হয়। জলাভূমির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট লাখো মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত করতে হবে এর প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষা করেই। বর্তমানে কৃষি ও মত্স্য চাষের পাশাপাশি বাণিজ্যিকভাবেও শুরু হয়েছে হাঁস পালন, শামুক চাষ, জলাশয়ে ভাসমান কচুরিপানার ওপর সবজি চাষ ইত্যাদি। এছাড়া প্রাকৃতিকভাবে জন্ম নেয়া শাপলা, হোগলা, মাকনা প্রভৃতি আহরণের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে বহু মানুষ। বর্ষা মৌসুমে দেশের বহু এলাকায় যাতায়াতের একমাত্র বাহন নৌকা। ফলে অসংখ্য মানুষ নৌকাকেন্দ্রিক জীবিকার সঙ্গে জড়িত। জলাভূমি রক্ষার মাধ্যমে প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার পাশাপাশি জলাভূমিসংশ্লিষ্ট জীবিকাগুলোকে টেকসই করা গেলে তা দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। জলাভূমি রক্ষা ও সমৃদ্ধ করতে একটি টেকসই উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে হবে।

প্রতি বছর হাওর তলিয়ে গেলেও রাষ্ট্রীয় কোনো প্রতিষ্ঠান এর পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও গবেষণা করে না। কেউ দায়িত্ব নেয় না; দায় স্বীকার করে না। অথচ হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তর নামে একটি সংস্থা আছে। কিন্তু হাওর উন্নয়ন বা রক্ষায় তাদের কার্যকর ভূমিকা দৃশ্যমান হয় না। ২০১২ সালে প্রকাশিত তিন খণ্ডের হাওর উন্নয়ন মহাপরিকল্পনাটি ছয়টি ধাপে প্রস্তুত করা হলেও এটির কোনো কার্যকারিতা নেই বলে মনে হয়। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিকভাবে গৃহীত ‘রামসার কনভেনশন ১৯৭১’ ও ‘রিও কনভেনশন ১৯৯২’ স্বাক্ষর করায় ভূমি ও জলজ পরিবেশ রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ কনভেনশন দুটির প্রথমটি জলজ পাখির আবাস সংরক্ষণসংক্রান্ত, যা নদী ও জলাভূমির প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষার লক্ষ্যে অতি প্রয়োজনীয়। দ্বিতীয়টি ভূমি ও জলের সব প্রজাতির উদ্ভিদ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণসংক্রান্ত, যা একই লক্ষ্য অর্জনে জরুরি। বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের টাঙ্গুয়ার হাওর ও সুন্দরবন এলাকা ‘রামসার সাইট’ হিসেবে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। হাকালুকি হাওর ও সুন্দরবনকে পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে ‘পরিবেশগত স্পর্শকাতর এলাকা’ ঘোষণা করায় ওই দুই এলাকার নদী ও জলাভূমিগুলো সংরক্ষণে সরকারি দায়বদ্ধতা রয়েছে। এক্ষেত্রে কারো উদাসীনতা দেখানোর সুযোগ নেই। 

অভয়াশ্রম তৈরির জন্য বিল খননের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। ঢিমেতালে মাটি খননের ফলে খনন প্রক্রিয়া বিঘ্নিত হয়েছে বারবার। যতটুকু বিল খননের কথা ছিল ততটুকু সম্ভব হয়নি। হাওরের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় যে সাফল্য অর্জিত হয়েছে, প্রকল্প অব্যাহত থাকলে তা আরো উপকৃত হবে বলে অনেকে মনে করছেন। এক্ষেত্রে হাওরের প্রাকৃতিক পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। কৃত্রিম উপায়ের চেয়ে প্রাকৃতিক পথে কীভাবে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ এবং একই সঙ্গে জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা যায়, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। পরিবেশ অধিদপ্তর, হাওর উন্নয়ন বোর্ড, ভূমি মন্ত্রণালয়, মত্স্য অধিদপ্তর—এসব দপ্তর বিচ্ছিন্নভাবে জলাভূমি উন্নয়ন ও সংরক্ষণে সহায়তা করলেও জলাশয় রক্ষায় একটি সামগ্রিক প্রচেষ্টায় ঘাটতি রয়েছে। আইনি কাঠামোয় জলাভূমির মালিকানা, ব্যবস্থাপনা, পরিচালনার বিষয়গুলো সুনির্দিষ্টভাবে বণ্টন না থাকায় এবং কিছু ক্ষেত্রে একাধিক কর্তৃপক্ষের ভূমিকা থাকায় কার্যক্রমে একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অন্য প্রতিষ্ঠানের অধিক্রমণ (ওভারল্যাপিং) ঘটে। এ সমন্বয়হীনতা দূর করা প্রয়োজন। জলাভূমির পরিবেশ আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও কাজ করতে পারে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন প্রকল্প ও কর্মসূচির সহায়তায় দ্বীপ ও উপকূলীয় জলাভূমির জীববৈচিত্র্য রক্ষার কাজে স্থানীয় বাসিন্দাদেরও সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন।

দেশের বিভিন্ন স্থানের জলাধারগুলো বিভিন্ন সময় লিজ বা ইজারা দেয়া হয়েছে। ফলে লাভের চেয়ে জলাধারগুলোর বৈশিষ্ট্য নষ্ট হয়েছে বেশি। ফলে উদ্ভিদ ও জলজ প্রাণীর বংশবৃদ্ধি এবং বেঁচে থাকার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বাঁধ দিয়ে পানি সেচে মাছ ধরা বা ফসল আবাদের মতো উদ্যোগ বন্ধ করা প্রয়োজন। এতে পানি ও পলির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে হাওরের খাল-বিল আরো দ্রুত ভরাট হচ্ছে। এমনিতেই দেশী মাছের বিচরণ ও প্রজননক্ষেত্র ধ্বংস হয়েছে, বেড়েছে বিদেশী মাছ উৎপাদন। দেশের জলাভূমি রক্ষায় বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তর কাজ করলেও যতই দিন যাচ্ছে ততই জলাভূমির সংখ্যা কমে যাচ্ছে। অনেক জলাভূমি বদ্ধ জলাশয়ে রূপ নিচ্ছে, কোনোটা আবার কৃষিজমিতে রূপান্তর করা হচ্ছে। অথচ বাংলাদেশের সংবিধানের ১৮(ক) অনুচ্ছেদে জলাভূমি সংরক্ষণ ও দেখাশোনার প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। ‘জলাভূমির দেশ’ হিসেবে খ্যাত বাংলাদেশ থেকে একের পর এক জলাভূমি হারিয়ে যাওয়া মানে জেনে-বুঝে দেশের ক্ষতি ডেকে আনা। তাই জলাভূমি রক্ষায় প্রচলিত আইনের প্রয়োগ ঘটাতে হবে। এগুলো হারিয়ে যাওয়ার ফলে জলাভূমিনির্ভর প্রান্তিক মানুষের জীবন-জীবিকার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। জলাভূমিগুলো আমাদের সম্পদ, জীববৈচিত্র্যের আধার। জলবায়ু পরিবর্তনশীলের বাস্তবতায় জলাধারগুলো রক্ষা করা এখন গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয়, আঞ্চলিক ও জাতীয় পর্যায়ে জলাভূমিগুলো সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনার কথা গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে।

জনসংখ্যার বিপুল বৃদ্ধির ফলে খাদ্যের চাহিদা বাড়ছে। বিপরীতক্রমে বিপুল জনসংখ্যার বিবিধ প্রয়োজনে ফসলি জমির পরিমাণ কমছে। এর প্রতিক্রিয়ায় বাড়তি খাদ্যের চাহিদা মেটাতে জলাভূমির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। জলাভূমি রক্ষায় পরিবেশগত দিক থেকে এর ইজারার মৌল নীতি পুনরুদ্ধার, সুরক্ষা, সংরক্ষণ এবং জলাভূমির উৎপাদনশীলতা ও জীববৈচিত্র্য টিকিয়ে রাখা, সামগ্রিকভাবে জলমহালসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য জলমহাল পরিচালনা কমিটিতে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ/দপ্তর, নারী প্রতিনিধি, সংগঠন এমনকি পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মধ্য থেকে প্রতিনিধি সম্পৃক্ত ও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। জলাভূমি রক্ষার্থে দেশের নাগরিক সমাজ ও স্থানীয় নাগরিকদের অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। তাহলেই কেবল সবার জলাভূমির প্রাকৃতিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা চিন্তা করে এর টেকসই উন্নয়ন সম্ভব।