দেশের প্রান্তিক মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে সারা দেশে কমিউনিটি ক্লিনিক চালু করে সরকার। লক্ষ্য ছিল প্রতিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে ছয় হাজার মানুষের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা। কিন্তু দেখা যাচ্ছে অযত্ন, অবহেলা ও ভুল পরিকল্পনার কারণে এর মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে। গতকাল বণিক বার্তায় প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দশ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিকের আয়ু শেষের পথে অর্থাৎ সেবা প্রদানের পর্যায়ে নেই এসব ক্লিনিকের অবকাঠামো। ফলে স্থবির হয়ে পড়েছে কমিউনিটি ক্লিনিকের কার্যক্রম। শুধু তাই নয়, জনবলস্বল্পতা ও চিকিৎসা যন্ত্রপাতির সংকটের কারণে সেবা প্রদানও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বড় রকমের গলদ থাকায় ভালো একটি উদ্যোগের কার্যকারিতা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে, যা মোটেই কাম্য নয়। একদিকে জরাজীর্ণ স্থাপনা, বিকল যন্ত্রপাতি, অপর্যাপ্ত ওষুধ; অন্যদিকে অদক্ষ জনবলের হাতে গুরুত্বপূর্ণ সব ওষুধ তুলে দেয়ার ফলে মাঠপর্যায়ে বিনামূল্যের স্বাস্থ্যসেবা কতটা নিরাপদ তা নিয়ে সংশয় দিন দিন বাড়ছেই। দেশের সব কমিউনিটি ক্লিনিক যেন গ্রামের দরিদ্র মানুষকে মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা দিতে পারে, এজন্য সরকারকে বিশেষভাবে মনোযোগ দিতে হবে। কী কী কারণে কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোর কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে, তার কারণ খুঁজে বের করে তার সমাধান করতে হবে। পাশাপাশি ক্লিনিকগুলোর কার্যক্রমের ওপর নজরদারি বাড়াতে হবে।
কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো তৃণমূল পর্যায়ের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তির সুযোগ সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে স্বাস্থ্যসেবা কাঠামোর আওতার বাইরে থাকা দরিদ্র, দুস্থ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে স্বাস্থ্যসেবার অধিকারের অন্তর্ভুক্ত করতে সক্ষম হয়েছে, যা কমিউনিটি ক্লিনিকের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সাফল্য। তবে কিছু সংকট ও সমস্যাকে চিহ্নিত করা হয়েছে, যা কমিউনিটি ক্লিনিকের সেবার সুফল ও কার্যকারিতাকে বাধাগ্রস্ত করছে। প্রথমত, কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোয় বিদ্যুৎ, পানি, স্যানিটেশন ইত্যাদি সুবিধার কার্যকর অনুপস্থিতি ও স্থান সংকটের কারণে সেবা প্রদান কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে; দ্বিতীয়ত, কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোর সেবা প্রদানের সময় ছয় ঘণ্টা, কিন্তু চাহিদা ও জোগানের অসংগতি ও অন্যান্য পারিপার্শ্বিক অসুবিধার কারণে এই ছয় ঘণ্টার কার্যকর ব্যবহার সম্ভব হয় না, তৃতীয়ত, কোনো পর্যায়েই সার্বিক পর্যবেক্ষণ ও তত্ত্বাবধানে কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠান বা এলাকার কমিউনিটি ক্লিনিক ব্যবস্থাপনা কমিটির প্রতিনিধি দলের কোনো তত্পরতা নেই; চতুর্থত, সেবা প্রদানকারীদের শিক্ষাগত যোগ্যতা বিভিন্ন বিভাগ (মানবিক, বাণিজ্য ও বিজ্ঞান) থেকে হওয়ায় একটি মাত্র স্বল্পমেয়াদি ট্রেনিং সেবা প্রদান তাদের দক্ষ করে তোলার জন্য যথেষ্ট নয়। পঞ্চমত, কিছু কিছু এলাকায় ওষুধ সরবরাহ যেমন অত্যন্ত অপ্রতুল তেমনি চিকিৎসা সরঞ্জামেরও অভাব রয়েছে; রোগীদের যে সামান্য পরিমাণ ওষুধ দেয়া হয় তা রোগ নিরাময়ে যথেষ্ট নয় বলে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল পাওয়া যায় না।
কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্য সহায়তা ট্রাস্টি বোর্ড করা হয়েছে। ক্লিনিক নির্মাণ, পুনর্নির্মাণ, সংস্কার, সেবার মান ও পরিধি বাড়ানোর বিষয়ে সরকার কাজ করবে নাকি ট্রাস্ট কাজ করবে তা ঠিক করা উচিত। জনবল বৃদ্ধি, নতুন কমিউনিটি ক্লিনিক নির্মাণ ও জরাজীর্ণ ভবন মেরামত করা। জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণ, কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ, কমিউনিটি ক্লিনিকের টেকসই প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ ও উপজেলা স্বাস্থ্য ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।
এক্ষেত্রে সরকারের প্রথম লক্ষ্য হতে হবে শক্তিশালী পূর্ণাঙ্গ প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কাঠামো গড়ে তোলা। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা হচ্ছে একটি দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার বুনিয়াদ, যা সবচেয়ে সাশ্রয়ীভাবে স্বাস্থ্যসেবা দিতে সক্ষম। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যক্তি ও পরিবারকে আর্থিক বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করে। চিকিৎসাসেবা প্রাপ্তিতে সমতা বাড়ায়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দুই শাখা স্বাস্থ্য বিভাগ ও পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের জনশক্তি মাঠপর্যায়ে একই কাজের পুনরাবৃত্তি করে জনবল ও অর্থের অপচয় করছে। এতে বৈরিতা তৈরি হয়ে কাজের গতি নষ্ট হচ্ছে। সরকারি কয়েকটি উঁচু পদ হারানোর আশঙ্কা এ দুই বিভাগকে একীভূত করতে বাধা হয়ে আছে। এ বাধার অপসারণ হলে গ্রামীণ জনগণের স্বাস্থ্যসেবার উন্নতিতে দুই বিভাগের অর্থ ও জনশক্তির আরো কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হতে পারে।
বাংলাদেশ ২০১২ সালে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার বৈশ্বিক অঙ্গীকারে আবদ্ধ হয়েছে। কিন্তু ২০৩২ সালের মধ্যে এ অঙ্গীকার বাস্তবায়নের অন্যতম উপায় কমিউনিটি ক্লিনিকের ‘চিকিৎসা কার্যকারিতা’য় যেমন অনিশ্চয়তা ও ঝুঁকি রয়েছে, তেমনি দেশে মাথাপিছু চিকিৎসা ব্যয়ও এ অঙ্গীকার বাস্তবায়নের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। সার্ক দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশেই মাথাপিছু চিকিৎসা ব্যয় বেশি। আবার সরকারের স্বাস্থ্য খাতে মাথাপিছু বরাদ্দও খুব নগণ্য। আবার চিকিৎসায় রোগীকে নিজের পকেট থেকে ব্যয় করতে হয় মোট খরচের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি। এটি কমিয়ে আনতে সরকারকেই বড় ভূমিকা রাখতে হবে। স্বাস্থ্যসেবা প্রদান ব্যবস্থা একটি চ্যালেঞ্জিং প্রক্রিয়া এবং বাংলাদেশের মতো দেশে তা আরো কঠিন। বিশেষত স্বাস্থ্যসেবা ব্যাপক জনশক্তি ও বিভিন্ন দক্ষতার স্বতন্ত্র ব্যক্তির সংমিশ্রণে তৈরি টিমনির্ভর সেবা। বিপুল জনগোষ্ঠীর অগণিত প্রকারের রোগের চাপ, বিবিধ ধরনের সেবা ও তার জরুরি ধরন, চিকিৎসাসেবার অনিশ্চিত ফলাফল, চিকিৎসায় অভাবনীয় ব্যয়, দ্রুত সম্প্রসারমাণ জ্ঞান ও নতুন প্রযুক্তির সংযোগ, ভঙ্গুর অবকাঠামো ও যন্ত্রপাতি, দুর্বল নিয়ম-ব্যবস্থাপনা, অসংখ্য চিকিৎসাসামগ্রীর নিয়মিত সরবরাহ, সেবা প্রদানকারী ও সেবাগ্রহীতার সাংস্কৃতিক মানের পার্থক্য, আবেগের সংঘাত ইত্যাদির সঙ্গে অনিয়ম ও দুর্নীতির শৃঙ্খলে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা স্বাস্থ্য খাতে শুধু অর্থ ব্যয় বৃদ্ধি করে বা জনবল সংকটের সমাধান করে স্বাস্থ্যসেবাকে নিরাপদ ও উন্নত উচ্চতায় নেয়া সম্ভব হবে না। প্রতিনিয়ত দ্রুত তথ্য প্রাপ্তি, তদারকি ও মূল্যায়ন স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালু করতে পারলে জনগণের জন্য দ্রুততার সঙ্গে উন্নত স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তি নিশ্চিত করা সম্ভব।
গর্ভবতী মা, কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্য চাহিদা পর্যালোচনা করে তাদের জন্য স্বাস্থ্যসেবার পরিসর আরো বৃদ্ধি করা দরকার। এছাড়া কমিউনিটি ক্লিনিকের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার পরিসর বৃদ্ধি করে জরুরি ও গুরুতর রোগের চিকিৎসা প্রাপ্তির সুযোগ সৃষ্টি করলে কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোর কার্যকর ভূমিকা আরো ফলপ্রসূ হবে। প্রশ্ন হলো, কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোর বিদ্যমান এসব সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে কার্যকর সেবা প্রদান নিশ্চিত করতে কী করা যেতে পারে? এর উত্তরে বলা যায়, মানসম্পন্ন সেবা নিশ্চিত করা, সেবা প্রদানকারীদের আরো দক্ষ ও প্রশিক্ষিত করে তোলা, সাধারণ জনগণের অংশগ্রহণের মাধ্যমে কমিউনিটি ক্লিনিক ব্যবস্থাপনা কমিটিকে কার্যকরভাবে তত্পর করে তোলা, শক্তিশালী অবকাঠামো নির্মাণ, সর্বোপরি প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে স্বাস্থ্য সুশাসন নিশ্চিত করার মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে কমিউনিটি ক্লিনিকের প্রভাব ও কার্যকর ভূমিকাকে অধিকতর প্রাসঙ্গিক ও ইতিবাচক করা সম্ভব। এক্ষেত্রে কমিউনিটি ক্লিনিক ট্রাস্টি বোর্ড ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কার্যকর পদক্ষেপ নেবে বলে প্রত্যাশা।










