আজ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১০২তম জন্মবার্ষিকী। গোটা জাতির জন্য এ এক অবিমিশ্র আনন্দের দিন। বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও বঙ্গবন্ধু সমার্থক। তিনি আমাদের স্বাধীনতার মহান স্থপতি। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন শেষে নতুন এক কালপর্বে ঢুকেছে রাষ্ট্র। উন্নয়নের পরবর্তী সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে এখন দেশ। চলছে মুজিববর্ষের উদযাপন। নানা কারণে তাই আজকের দিনটি তাৎপর্যপূর্ণ। সমস্যা-সংকট উত্তরণে সবসময়ই আমাদের অনুপ্রেরণা হয়েছে বঙ্গবন্ধু। আগামীর পথচলায়ও অহর্নিশ আলোকবর্তিকা হয়ে থাকুক তার নীতি ও জীবনাদর্শ। জন্মদিনে তার প্রতি জানাই গভীর প্রণতি ও অশেষ ভালোবাসা।
শতবর্ষ আগে বাংলার নিভৃত পল্লীতে বঙ্গবন্ধুর জন্ম। অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে ছেলেবেলা থেকে প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে ধাপে ধাপে তার রাজনৈতিক উত্থান। ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ প্রতিটি গণতান্ত্রিক ও স্বাধিকার আন্দোলনে তার অবদান অবিস্মরণীয়। সত্তরের নির্বাচনে অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে অভিষিক্ত হয়ে গোটা জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেন। শুরু হয় অসহযোগ আন্দোলন। সময়ের পরিক্রমায় আসে একাত্তরের ৭ মার্চ। সেদিন ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে তার ঐতিহাসিক ভাষণ আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের অনন্য মাইলফলক। এরই পথ বেয়ে সূচিত হয় মুক্তিযুদ্ধ। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে আসে বহুল কাঙ্ক্ষিত বিজয়। বিশ্বমানচিত্রে আত্মপ্রকাশ ঘটে স্বাধীন বাংলাদেশের। বলিষ্ঠ নেতৃত্বে শেখ মুজিবুর রহমান যেভাবে উপমহাদেশের মানচিত্র বদলে দিয়েছিলেন, সেটি ছিল বিশ্ববাসীর জন্য বিস্ময়জাগানিয়া। শুধু উপমহাদেশে নয়, বিশ্বের শোষিত মানুষের পক্ষে তার অবস্থান ছিল দৃঢ়। বাংলাদেশের বাইরেও এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকার কোটি কোটি মুক্তিকামী মানুষের অনুপ্রেরণার উৎস ছিলেন তিনি।
স্বাধীনতার পর মাত্র সাড়ে তিন বছর বঙ্গবন্ধু দেশ শাসনের সুযোগ পেয়েছিলেন। এ স্বল্প সময়ে তিনি দেশ পুনর্গঠন করেছেন। রাজকোষ শূন্য। অর্থনীতির করুণ অবস্থা। অবকাঠামো ধ্বংসপ্রায়। আইন-শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, মুক্তিযোদ্ধাদের পুনর্বাসন, যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনর্নির্মাণ, লাখ লাখ ক্ষুধার্ত মানুষের জন্য খাদ্য সংগ্রহ করা, রাষ্ট্র ও জাতি গঠন কার্যক্রমসহ বিপুল চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছিল তার সরকারকে। সর্বোপরি, চুয়াত্তরে পড়তে হয়েছিল দুর্ভিক্ষ অবস্থায়। তিনি কঠোর পরিশ্রম, সততার সঙ্গে সবাইকে নিয়ে চ্যালেঞ্জগুলো অতিক্রম করেছিলেন। শুধু অভ্যন্তরীণ এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা নয়, আন্তর্জাতিক পর্যায়েও অবদান রেখেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ বিশ্ব পরিমণ্ডলে মর্যাদা ও সম্মান অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিল। তখন আয়তনে ছোট রাষ্ট্র বাংলাদেশ বৈশ্বিক পরিসরে বড় পক্ষ হয়ে উঠেছিল। এমনকি জাতিসংঘ, ওআইসি, কমনওয়েলথ, ন্যাম প্রভৃতি বিশ্ব সংস্থায় বঙ্গবন্ধু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। এটা আমাদের জন্য গর্বের ও আনন্দের।
বঙ্গবন্ধু ছিলেন অসাম্প্রদায়িক চেতনার মানুষ। তিনি চেয়েছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশ হবে ধর্ম নির্বিশেষে সব জনগোষ্ঠীর রাষ্ট্র। এটা তার রাজনৈতিক অঙ্গীকার। তাই তো তিনি বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র—এ চার নীতিকে সংবিধানের মূলনীতি হিসেবে অঙ্গীভূত করেন। বঙ্গবন্ধুর কাছে জাতীয়তাবাদ কোনো সংকীর্ণ বোধ নয়, বরং সব ধরনের শোষণের বিরুদ্ধে জাতিসত্তার লড়াই। তার কাছে ধর্মনিরপেক্ষতা মানে কোনো ধর্মকে বড় করে দেখা নয়, সবার ধর্মচর্চা নিশ্চিত করা। সমাজতন্ত্র মানে প্রচলিত মার্ক্সীয় চিন্তার বাস্তবায়ন নয়, কল্যাণকর রাষ্ট্র গঠনে বৈষম্য ও শোষণের বিরুদ্ধে অবস্থান। আর গণতন্ত্র মানে সবার রাজনৈতিক ও বাক্স্বাধীনতার নিশ্চয়তা বিধান। তিনি চেয়েছিলেন সবার অর্থনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত ও একটা ন্যায়নিষ্ঠ, সমতামূলক, সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলা। পাঁচ দশকের এ দীর্ঘ যাত্রায় বঙ্গবন্ধুর দর্শনগত বিবেচনায় দেশ কতটা এগিয়েছে, সেটি এখন বেশ প্রশ্নসাপেক্ষ।
সন্দেহ নেই, বাংলাদেশ রাষ্ট্র আগের চেয়ে এখন অনেক বেশি আত্মপ্রত্যয়ী। অর্থনীতি, উন্নয়ন ও সামাজিক নানা সূচক অর্জনে দেশ বিশ্বে তৈরি করেছে এক সমীহজাগানিয়া অবস্থান। পাঁচ দশকে দারিদ্র্যের হার কমা, গড় আয়ু বৃদ্ধি, শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার কমাসহ বাংলাদেশের অগ্রগতি প্রশংসনীয়। সময়ান্তরে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রসার ঘটেছে। নারীর ক্ষমতায়ন বেড়েছে। যোগাযোগ ব্যবস্থায় প্রভূত উন্নতি এসেছে। নিজস্ব সম্পদ সঞ্চালন বেড়েছে। এমনকি পদ্মা সেতুর মতো বড় প্রকল্প নিজস্ব অর্থায়নে হচ্ছে। ধারাবাহিকভাবে চমকপ্রদ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, উন্নয়ন হচ্ছে। বৈশ্বিক উন্নয়ন সংলাপে বারবারই উদাহরণ হিসেবে উদ্ধৃত হচ্ছে বাংলাদেশ। খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদ থেকে শুরু করে ডেভেলপমেন্ট প্র্যাকটিশনার—সবাই বাংলাদেশের ‘উন্নয়ন বিস্ময়ে’ অভিভূত। কিন্তু বৈষম্যের অবসান হয়নি। আজ দেশের বেশির ভাগ সম্পদ মুষ্টিমেয় কিছু লোকের মুঠোবন্দি। সম্পদ ও আয়ে ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান ক্রমেই বাড়ছে। বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন দেশের উত্তরোত্তর অগ্রগতির সঙ্গে সর্বস্তরের মানুষের জীবনমানের যুগপৎ উন্নতি হবে। কিন্তু বর্তমান উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় সেটি হচ্ছে না। ধনী আরো ধনী হচ্ছে, দরিদ্র আরো নিঃস্ব হচ্ছে। এটা বঙ্গবন্ধুর আকাঙ্ক্ষা, নীতি ও স্বপ্নের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।
দেশ ও মানুষের সমন্বিত অর্থনৈতিক উন্নয়নে বঙ্গবন্ধু প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন। এজন্য সাধারণ জনগণ, পিছিয়ে পড়া বর্তমান উন্নয়ন পরিক্রমায় এর উল্টোযাত্রা দৃশ্যমান। অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি-পরিকল্পনার ঘাটতিতে বৈষম্য বাড়ছে। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আমাদের আবারো বঙ্গবন্ধুর নীতি ও আদর্শ বাস্তবায়নে ফিরে যেতে হবে। প্রতি বছর এ মহান নেতার জন্মবার্ষিকী নতুন প্রজন্মের জন্য ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা, দেশ গড়ার অনুপ্রেরণা নিয়ে আসে। আমাদের রাষ্ট্র পরিচালনায়, উন্নয়ন প্রক্রিয়ায়, ব্যক্তিগত জীবনযাপনে, কর্মে, চর্চায় বঙ্গবন্ধুর জীবনাদর্শ প্রতিফলিত হবে; সবার সম্মিলিত প্রয়াসে তার স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে উঠবে, এটিই প্রত্যাশা।










