ফাটকাবাজি শব্দটি শুনতে কিছুটা শ্রুতিকটু হলেও এর ব্যবহার সর্বজনবিদিত। অর্থশাস্ত্রের সংজ্ঞানুযায়ী দ্রুত ক্রয়-বিক্রয়যোগ্য উপকরণ যেমন শেয়ার, বন্ড বা মুদ্রার বাজারমূল্যের ওঠানামার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে টাকা উপার্জনের ঝুঁকিপূর্ণ উদ্যোগকে বলে ফাটকাবাজি (স্পেকুলেশন)। সোজা কথায় কোনো বস্তুর অন্তর্নিহিত গুণাবলি যেমন কোনো কোম্পানির শেয়ার ক্রয়ের ক্ষেত্রে সেই কোম্পানির সম্পদের পরিমাণ, বার্ষিক আয় কিংবা ব্যয় ইত্যাদি বিবেচনা না করে, কেবল বাজারমূল্যের গতিপ্রকৃতি অনুমান করে টাকা নাড়াচাড়া করে লাভ করার প্রচেষ্টাকে বলে ফাটকাবাজি। স্পেকুলেশন বা ফাটকাবাজির সঙ্গে সত্যিকারের উৎপাদন বা বিনিয়োগের কোনো সম্পর্ক নেই। যারা ফাটকাবাজি বা স্পেকুলেশনের সঙ্গে জড়িত তাদের ফাটকাবাজ বা স্পেকুলেটর বলে।

আপনারা অনেকেই হয়তো বুঝে কিংবা না বুঝেই ফাটকাবাজি করে চলছেন। প্রকৃতপক্ষে আপনি একা নন, বড় বড় ব্যাংক ও বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান—সবাই কোনো না কোনোভাবে ফাটকাবাজিতে লিপ্ত। বর্তমান সময়ে একটি ব্যাংক কিংবা বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের হাতে প্রচুর পরিমাণ টাকা অলস পড়ে থাকে, এই টাকাগুলো বেকার ফেলে না রেখে স্বল্পমেয়াদি কিছু প্রজেক্টে খাটিয়ে অধিক লাভ করার সুযোগ খোঁজে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। তাই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মুদ্রার দাম কিংবা খনিজ সম্পদ যেমন জ্বালানি তেল, গ্যাস, স্বর্ণ ইত্যাদির বাজারমূল্যের ওঠানামাকে কেন্দ্র করে রাতদিন বাজি ধরতে থাকে প্রতিষ্ঠানগুলো। যদিও তাদের সবার লক্ষ্যই থাকে প্রতিটি বাজিতেই লাভ করা। স্পেকুলেশন একটি ‘জিরো সাম গেম’ অর্থাৎ, একজন হারলেই কেবল অন্য একজন জিতবে। শুধু বড় বড় প্রতিষ্ঠানই নয়, বরং ছোট-মাঝারি ধরনের অসংখ্য প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তি পর্যায়েও অনেকেই রাত-দিন বিশ্বের আনাচকানাচে স্পেকুলেটিভ লেনদেন করতে থাকে। অর্থনীতির প্রতিটি খাত, যেমন জ্বালানি তেল, খাদ্যশস্যসহ সব নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য, এমনকি ঘরবাড়ি নিয়েও ফাটকাবাজি বা স্পেকুলেশন প্রতিনিয়ত চলতে থাকে।

এ স্পেকুলেটররা প্রতিনিয়ত পণ্যমূল্যের গতিপ্রকৃতির ওপর চোখ রাখে এবং প্রতিটি মূল্য পরিবর্তন থেকে লাভ করার চেষ্টা করে। তাই কোনো পণ্যের দাম বৃদ্ধি বা হ্রাস পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তারা লেনদেনে আগ্রহী হয়ে ওঠে। স্পেকুলেটররা যদি মনে করে একটি পণ্যের দাম ভবিষ্যতে আরো বাড়বে, সুতরাং এখন কম দামে কিনে রাখলে ভবিষ্যতে আরো বেশি দামে বিক্রি করতে পারবে তখন তারা সেই পণ্যটি কিনতে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। বাকি সবকিছু অপরিবর্তিত থাকলে চাহিদা বাড়লে যেহেতু দাম বাড়ে, ফাটকাবাজরা যেই পণ্য নিয়ে মেতে ওঠে, তার দাম আকাশে রওনা দেয়।

ছোট থাকতে আপনারা হয়তো সাবানের গুঁড়ো পানিতে মিশিয়ে বুদবুদ বানিয়ে খেলেছেন। এ খেলায় সাবানের পানিতে ফুঁ দিলে বুদবুদের ফাটকা সৃষ্টি হয় এবং ফুঁ যতক্ষণ চলে ততক্ষণ ফাটকার আকৃতিও বাড়তে থাকে। তেমনিভাবে ক্রয়-বিক্রয়যোগ্য কোনো পণ্য নিয়ে যখন ফাটকাবাজদের আগ্রহ সৃষ্টি হয়, সেই পণ্যটির দামও বাড়তে থাকে। ফাটকার ভেতরে যেমন বাতাস ছাড়া কিছু থাকে না তেমনি এই মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে অন্তর্নিহিত গুণাবলি, যেমন পণ্যের উপযোগিতা, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ইত্যাদির কোনো সংযোগ থাকে না। মূল্যবৃদ্ধি হয় বাহ্যিক চাকচিক্যময় কিন্তু ভেতরটা থাকে অন্তঃসারশূন্য। ফাটকার ভেতরে বাতাসের পরিমাণ বাড়লে যেমন ফাটকার আকৃতি বড় হতে থাকে, একইভাবে নতুন নতুন ক্রেতার আগমনে পণ্যের মূল্য আরো বাড়তে থাকে। মূল্য বাড়তে থাকলে রাতারাতি ধনী হওয়ার আশায় যার যা আছে তাই নিয়ে কেনাকাটায় ঝাঁপিয়ে পড়ে।

এভাবে দাম বাড়তে বাড়তে একসময় পণ্যটি জনসাধারণের নাগালের বাইরে চলে যায়। এ পর্যায়ে সবাই বুঝতে পারে যে দাম অতিরিক্ত হয়ে গেছে এবং বর্তমানে খুব দ্রুত পণ্যটি বিক্রি করে দেয়া উচিত। এদিকে সবাই বিক্রির ধান্দায় প্রমাদ গুনতে থাকলে, পর্যাপ্ত পরিমাণ ক্রেতা খুঁজে পাওয়া যায় না। তাই সচেতন বিক্রেতারা দাম কিছুটা কমিয়ে হলেও হাতের পণ্য থেকে দায় মুক্ত হয়ে যায়। একবার দাম কমা শুরু হলে বাকি ক্রেতাদেরও টনক নড়ে ওঠে। সবাই ভাবতে থাকে এখন বিক্রি করতে না পারলে ভবিষ্যতে আরো বড় ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে। তাই তারাও হাতের মাল বিক্রি করতে হুমড়ি খেয়ে পড়ে, যাকে বলে মার্কেট প্যানিক। একে একে সবাই বিক্রির সিদ্ধান্ত নিলে দেখা যায় এতদিন যারা ক্রেতা ছিল, তারা সবাই এখন একসঙ্গে বিক্রেতা বনে গেছে। এ কারণে পণ্যের দাম ফাটা ফাটকার মতো এক মুহূর্তে চুপসে যায়। ইংরেজিতে যাকে বলে ‘বাবল বার্স্ট’।

স্পেকুলেশনের প্রভাব সবচেয়ে বেশি দেখা যায় মুদ্রাবাজার, শেয়ারবাজার ও সোনার বাজারে। ব্যাংক অব ইন্টারন্যাশনাল সেটেলমেন্টের ২০১৯ সালের গবেষণাপত্রে প্রকাশ করা হয়েছে যে মুদ্রাবাজার বা ফরেক্স মার্কেটের দৈনিক লেনদেনের পরিমাণ হচ্ছে ৬.৬ ট্রিলিয়ন ডলার। অথচ বিশ্বব্যাংকের সূত্রমতে একই সময়ে সমগ্র পৃথিবীর জিডিপি বা মোট উৎপাদন ছিল ৮৪ ট্রিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ, পৃথিবীর প্রতিটি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এক বছরে যে পরিমাণ আয় করে কেবল ফোরেক্স মার্কেটেই দুই সপ্তাহে তার সমান মুদ্রা লেনদেন হয়। এ লেনদেন যে বস্তুগত পণ্য ও সেবার বিনিময়ে করা হচ্ছে, ব্যাপারটা তা না। তথ্যসূত্র দেখলে আমরা এর প্রমাণ পাই। পৃথিবীর মোট আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পরিমাণ হচ্ছে বছরে ১৯ ট্রিলিয়ন ডলার, যা ফোরেক্স মার্কেটের মাত্র তিনদিনের আয়ের সমান। অর্থাৎ মুদ্রাবাজারের লেনদেনের সিংহভাগই ফাটকাবাজিনির্ভর।

যেকোনো পণ্য নিয়েই ফাটকাবাজি সম্ভব, যেমন আমাদের দেশে ঐতিহাসিকভাবেই জমি নিয়ে ফাটকাবাজি চলে আসছে। ফাটকাবাজির কারণে ঘন ঘন মূল্য পরিবর্তন হয়, ফলে ঝুঁকি বাড়ে। অনেক সময় আমরা ঝুঁকির পরিমাণ না বুঝেই বিনিয়োগ করে ফেলি এবং নিজের অজান্তেই ফাটকাবাজিতে জড়িয়ে পড়ি। এভাবে শেয়ার বা মুদ্রাবাজারে বিনিয়োগ করে সর্বস্ব হারিয়েছেন এমন ব্যক্তির সংখ্যা নেহাত কম নয়। তাই এ ব্যাপারে সতর্ক থাকা এবং ফাইন্যান্সিয়াল বিশেষজ্ঞের সঙ্গে পরামর্শ করে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি।

 

মোহাইমেন পাটোয়ারি: ডাবল মাস্টার্স, নরওয়ে স্কুল অব ইকোনমিকস এবং মানহাইম বিশ্ববিদ্যালয়, জার্মানি