বাংলাদেশে রেমিট্যান্সপ্রবাহ হ্রাস পাচ্ছে এই মর্মে বণিক বার্তা সম্প্রতি (গত ২১ এপ্রিল) একটি হেডলাইন খবর পরিবেশন করে, যেখানে বলা হয়, বর্তমান অর্থবছরের প্রথম আট মাসে গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় দেশে সার্বিক রেমিট্যান্সপ্রবাহ এবং প্রধান রেমিট্যান্স আহরণকারী ব্যাংকগুলোর রেমিট্যান্স আহরণ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমে গিয়েছে।
উল্লেখ্য, নভেল করোনাভাইরাসের কারণে বৈদেশিক রেমিট্যান্সপ্রবাহ কমে যাওয়া শ্রীলংকার বর্তমান বৈদেশিক মুদ্রা সংকটের পেছনে একটি প্রধান কারণ। আবার শ্রীলংকার মতো অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের শঙ্কা বাংলাদেশে রয়েছে, এমন একটি ভ্রান্ত ধারণা পত্রপত্রিকায় ইদানীং আলোচিতও হয়েছে। এ অবস্থায় বণিক বার্তার এ খবর সেই অমূলক আতঙ্ককে কিছুটা হলেও উসকে দিতে পারে। তাছাড়া খবরটি পড়ে এমন ধারণা হয় যে অগ্রণী ব্যাংক সাম্প্রতিককালে রেমিট্যান্স আহরণে বড় ধরনের ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। কিন্তু আসলেই কি রেমিট্যান্সপ্রবাহে এ ধরনের কোনো অশনিসংকেত দৃশ্যমান হচ্ছে এবং অগ্রণী ব্যাংকের রেমিট্যান্স আহরণ কার্যক্রম কি সত্যিই বিপর্যয়ের সম্মুখীন? সার্বিক তথ্য নির্মোহভাবে বিশ্লেষণ করলে ভিন্ন চিত্র ধরা পড়ে। আর তা তুলে ধরার জন্যই আজকের এই নিবন্ধ।
বাংলাদেশে গত দশ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে যে পরিমাণ রেমিট্যান্স প্রবাসীরা প্রেরণ করেছে এবং যে পরিমাণ রেমিট্যান্স অগ্রণী ব্যাংক একই সময়ে আহরণ করেছে, তার তথ্য সারণি-১ এবং রেখাচিত্র-১ ও ২-এর মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে।
উল্লিখিত তথ্য থেকে যে বিষয়টি স্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয় তা হচ্ছে, ২০২০-২১ অর্থবছর রেমিট্যান্সপ্রবাহের দিক থেকে সামগ্রিক বাংলাদেশ এবং অগ্রণী ব্যাংকের জন্য একটি বড় ধরনের ব্যতিক্রমী বছর ছিল। রেমিট্যান্সপ্রবাহ ২০২০-২১-এর প্রথম আট মাসে পূর্ববর্তী বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩৩ দশমিক ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পায় (১২.৫০ বিলিয়ন ডলার থেকে ১৬.৬৯ বিলিয়ন ডলারে বৃদ্ধি), যা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় ছিল অনেক বেশি। অগ্রণী ব্যাংকের ক্ষেত্রে একই সময়ে এ বৃদ্ধির হার ছিল ৬১ দশমিক ৯ শতাংশ (১.২৪ বিলিয়ন ডলার থেকে ২ বিলিয়নে বৃদ্ধি), যা সার্বিক রেমিট্যান্সপ্রবাহ বৃদ্ধির হারের তুলনায় প্রায় ১ দশমিক ৮৯ গুণ। ফলে রেমিট্যান্স আহরণে অগ্রণী ব্যাংকের অংশ প্রায় ১০ থেকে ১২ শতাংশে উন্নীত হয়। ২০২০-২১ অর্থবছরে রেমিট্যান্সপ্রবাহের এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধির পেছনে বিভিন্ন কারণের মধ্যে নিম্নের বিষয়গুলো ছিল প্রধান—
(১) নভেল করোনাভাইরাসের কারণে বর্ধিত হারে প্রবাসীদের দেশে প্রত্যাবর্তনের সময় অনেকে তাদের সমুদয় সঞ্চয় রেমিট্যান্সের মাধ্যমে পাঠান।
(২) যারা দেশে ফেরেননি, তারাও অন্য সময়ের তুলনায় করোনাকালে বেশি রেমিট্যান্স পাঠান, যাতে আত্মীয়স্বজন করোনাভাইরাস-সৃষ্ট অর্থনৈতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করতে পারে।
(৩) নভেল করোনাভাইরাসের কারণে বাংলাদেশ থেকে বিদেশ ভ্রমণ এবং সার্বিক যাতায়াত পরিস্থিতি প্রায় স্থবির হয়ে পড়ায় হুন্ডির চাহিদা ব্যাপকভাবে হ্রাস পায় এবং এর ফলে বৈধ পথে রেমিট্যান্সপ্রবাহ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পায়।
(৪) সরকার ঘোষিত ২ শতাংশ প্রণোদনা এবং অগ্রণী ও অন্য কয়েকটি ব্যাংকের অতিরিক্ত প্রণোদনাও এ প্রবাহ বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখে।
২০২১-২২ অর্থবছরের প্রথম থেকেই বাংলাদেশে ও বিশ্বের অনেক জায়গায় করোনাভাইরাস পরিস্থিতির ক্রমোন্নতির ধারা পরিলক্ষিত হয়, যা রেমিট্যান্স বৃদ্ধির তীব্রতাকে কিছুটা কমিয়ে আনে। সারণি-১-এর তথ্য থেকে দেখা যায়, সার্বিক রেমিট্যান্সপ্রবাহ ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে পূর্ববর্তী বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৯ দশমিক ৫ শতাংশ হ্রাস পায় (১৬.৬৯ বিলিয়ন ডলার
থেকে ১৩.৪৪ বিলিয়নে হ্রাস)। তবে এ সময়ের
রেমিট্যান্সপ্রবাহকে যদি আমরা ২০১৬-১৭ অর্থবছরের একই সময়ের রেমিট্যান্সের (৮.১২ বিলিয়ন ডলার) সঙ্গে তুলনা করি তাহলে এ পাঁচ বছরে গড় বার্ষিক রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়ায় ১৩ দশমিক ২ শতাংশে। একইভাবে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের একই সময়ের রেমিট্যান্সের (৯.৪৬ বিলিয়ন ডলার) সঙ্গে তুলনা করলে এ চার বছরে গড় বার্ষিক প্রবৃদ্ধি হার হয় ১১ দশমিক ৯ শতাংশ এবং ২০১৮-১৯ অর্থবছরের একই সময়ের রেমিট্যান্সের (১০.৪১ বিলিয়ন ডলার) তুলনায় বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার ১২ দশমিক ২ শতাংশ। অর্থাত্, ২০২০-২১ অর্থবছরের অস্বাভাবিক রেমিট্যান্সের তুলনায় ২০২১-২২ অর্থবছরে রেমিট্যান্সপ্রবাহ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে হ্রাস পেলেও করোনা-পূর্ববর্তী তিন অর্থবছরের প্রথম আট মাসের স্বাভাবিক রেমিট্যান্সপ্রবাহের তুলনায় ২০২১-২২ অর্থবছরের একই সময়ে রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধির হার বার্ষিক প্রায় ১২ শতাংশ। রেখাচিত্র-১ থেকে এটা বোধগম্য যে ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রথম আট মাসের রেমিট্যান্সপ্রবাহ করোনা-পূর্ববর্তী বছরগুলোর একই সময়ের প্রবৃদ্ধির ধারার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
রেখাচিত্র-২ থেকে অগ্রণী ব্যাংকের রেমিট্যান্স আহরণের ব্যাপারে একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা যায়। বস্তুত, অগ্রণী ব্যাংকের অবস্থা (রেখাচিত্র-২) সার্বিক দেশের রেমিট্যান্সপ্রবাহ পরিস্থিতির (রেখাচিত্র-১) প্রায় মিরর ইমেজ বলা যায়।
করোনা-পূর্ববর্তী বছরগুলোয় সার্বিক রেমিট্যান্সপ্রবাহে অগ্রণীর অংশ প্রায় ১০ শতাংশে ওঠানামা করে। ২০২০-২১ অর্থবছরে ১ শতাংশ হারে বাড়তি প্রণোদনা দেয়ার কারণে অগ্রণী ব্যাংকের রেমিট্যান্স আহরণে বড় ধরনের উল্লম্ফন ঘটে (৬২% প্রবৃদ্ধি)। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সেই বাড়তি প্রণোদনা বন্ধ করে দেয়ায় এবং একই সময় কিছু বেসরকারি ব্যাংক নিয়মবহির্ভূতভাবে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি মূল্যে বৈদেশিক মুদ্রা ক্রয় করায় অগ্রণীর রেমিট্যান্স আহরণ কিছুটা কমে আসে।
তবে আমরা যদি ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে অগ্রণী ব্যাংক আহরিত রেমিট্যান্সের সঙ্গে করোনা-পূর্ববর্তী ২০১৬-১৭, ২০১৭-১৮ এবং ২০১৮-১৯ অর্থবছরের একই সময় আহরিত রেমিট্যান্সের সঙ্গে তুলনা করি তাহলে বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়ায় যথাক্রমে ৫ দশমিক ১, ৬ দশমিক ৭ ও ৪ দশমিক ৯ শতাংশ; যা আগের প্রবৃদ্ধির সঙ্গে ধারাবাহিক প্রতীয়মান হয়।
উপস্থাপিত তথ্য-উপাত্ত থেকে এটা বোধগম্য যে একটি বছরে কোনো সূচকের অস্বাভাবিক বৃদ্ধির কারণে ভিত্তি বড় হয়ে যাওয়ায় পরবর্তী বছরে সেই অস্বাভাবিক বছরের তুলনায় প্রবৃদ্ধির হিসাব সেই সূচকের প্রবৃদ্ধির প্রকৃত অবস্থা বোঝার জন্য যথেষ্ট নয়। এক্ষেত্রে পূর্ববর্তী বছরগুলোর ধারাবাহিকতায় বর্তমান বছরের গড় বার্ষিক প্রবৃদ্ধি হিসাব করলে আলোচ্য বছরে সূচকে কতটুকু উন্নতি বা অবনতি হয়েছে সেটি সম্পর্কে সম্যক ধারণা পাওয়া যায়।
উপসংহারে বলা যায়, বর্তমান অর্থবছরের প্রথম আট মাসে সার্বিক রেমিট্যান্সপ্রবাহ এবং অগ্রণী ব্যাংক কর্তৃক আহরিত রেমিট্যান্স ২০২০-২১ অর্থবছরের অস্বাভাবিক রেমিট্যান্স বৃদ্ধির বিপরীতে বড় ধরনের হ্রাস প্রতীয়মান হলেও করোনা-পূর্ববর্তী স্ব্বাভাবিক সময়ের ইতিবাচক প্রবৃদ্ধির ধারার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং এ ব্যাপারে আতঙ্কিত হওয়ার মতো কোনো কারণ এখনো ঘটেনি।
জায়েদ বখত: চেয়ারম্যান, অগ্রণী ব্যাংক লিমিটেড










