মহামন্দা ও কভিড মহামারীর মধ্যেও বাংলাদেশের অর্থনীতি উচ্চ জিডিপি প্রবৃদ্ধির ধারা বজায় রাখতে সক্ষম হয়। সমস্যাসংকুল পথ অতিক্রম করে মূলত একটি কৃষিনির্ভর অর্থনীতি থেকে বর্তমান সরকারের গতিশীল নেতৃত্বে দেশ আজ সেবা ও শিল্প খাতনির্ভর উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উপনীত হওয়ার দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু অতি সাম্প্রতিককালে অব্যাহতভাবে উচ্চ মূল্যস্ফীতি আমাদের সামষ্টিক অর্থনৈতিক ভারসাম্যের ক্ষেত্রে কিছুটা চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। তাই বিষয়টি নিয়ে দেশের অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকরাসহ বিভিন্ন মহল নানা মত ও পথের সন্ধান দিচ্ছেন। গত ৭ মার্চ বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট কর্তৃক আয়োজিত একেএন আহমেদ স্মারক বক্তৃতায় আমাদের পরম শ্রদ্ধেয় বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন ‘মুদ্রানীতির সাথে রাজস্বনীতির সমন্বয়’ এবং তার বক্তব্যের সূত্র ধরে আমার একজন শিক্ষাগুরু জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আব্দুল বায়েস ‘বাংলাদেশের অর্থনীতির অসুখ এবং উপসমের উপায়’ শীর্ষক নিবন্ধে সামষ্টিক অর্থনীতির নানা বিষয়ে ক্ষুরধার পর্যবেক্ষণ, পর্যালোচনা ও সুপারিশের মধ্যে বহুধা বিনিময় হার অবলুপ্ত করে একটি একক ও কার্যকর বিনিময় হার নীতিমালা অনুসরণের তাগিদ দিয়েছেন। এই প্রেক্ষাপটে আমার এ নিবন্ধে আমি দেশের সাম্প্রতিক মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির কারণ এবং বিনিময় হার ব্যবস্থাপনার প্রায়োগিক কিছু অসম্পূর্ণতা দূরীভূত করে একটি একক ও কার্যকর বিনিময় হার ব্যবস্থা প্রবর্তনের গুরুত্ব ও উপায় তুলে ধরার চেষ্টা করেছি মাত্র।
এটা অনস্বীকার্য যে, ২০২২ সালে বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতির যে উল্লম্ফন দেখা দেয় তা শুধু অর্থ সরবরাহ বাড়ার কারণেই সংঘটিত হয়নি। করোনা মহামারীর কারণে বৈশ্বিক উৎপাদন হ্রাসের পাশাপাশি করোনা-পরবর্তীকালে বৈশ্বিকভাবে হঠাৎ চাহিদা বৃদ্ধি, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বাণিজ্য বিরোধ এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে সরবরাহ ব্যবস্থা পর্যুদস্ত হওয়ায় বিশ্বব্যাপীই উচ্চ মূল্যস্ফীতি দেখা দেয়। তবে পৃথিবীর অধিকাংশ দেশ বিশেষত বর্তমানে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত ও শ্রীলংকায় মূল্যস্ফীতির হার উল্লেখযোগ্যভাবে নেমে এলেও আমাদের দেশে তা এখনো প্রত্যাশিত মাত্রায় নামেনি, যদিও আশার কথা এই যে সম্প্রতি মূল্যস্ফীতি নিম্নগামী হওয়ার প্রবণতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। উল্লেখ্য শ্রীলংকায় ২০২২ সালের অক্টোবরে সর্বোচ্চ রেকর্ড প্রায় ৭৩ শতাংশ মূল্যস্ফীতি কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নামিয়ে আনতে সে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃক নীতি সুদহার বৃদ্ধি, অর্থনীতির বৈদেশিক খাত বিশেষ করে পর্যটন খাতের পুনরুজ্জীবন এবং অন্তর্মুখী রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধির পাশাপাশি অভ্যন্তরীণভাবে পণ্য ও সেবাদির উৎপাদন ও সরবরাহ বৃদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ভারত তার ২০২২ সালের জুলাইয়ে সর্বোচ্চ ৭ দশমিক ৪৪ শতাংশ মূল্যস্ফীতির চাপ নিরসনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃক নীতি সুদহার বৃদ্ধির পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ বাজারে সরবরাহ পর্যাপ্ত রাখতে বেশকিছু পণ্যসামগ্রীর রফতানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, যা এখনো অনেকটাই বলবৎ রয়েছে। একদিকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে বিশ্বব্যাপী সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হওয়া এবং অন্যদিকে আমাদের নিকটবর্তী আমদানির উৎস দেশে কিছু পণ্য রফতানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ বাংলাদেশের বাজারে গম, চিনি, পেঁয়াজসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় অনেক পণ্যের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিতের অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। এছাড়া নিকট অতীতে আমাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য ও কৃষিজাত পণ্যের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ পার্শ্ববর্তী দেশ মিয়ানমার থেকেও এসেছে। কিন্তু সাম্প্রতিককালে সেখানকার সামরিক জান্তা সরকারের সঙ্গে সে দেশের বিদ্রোহী সংগঠনগুলোর রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ আমাদের সীমান্ত এলাকা পর্যন্ত বিস্তৃত হওয়ার পাশাপাশি চীন ও মিয়ানমারের ওপর মার্কিন বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা আরোপের ফলে বাংলাদেশের আমদানি বাণিজ্য চরমভাবে বিঘ্নিত হয়, যা দেশে অনেক পণ্যের সরবরাহের পর্যাপ্ততা নিশ্চিতেরও অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। উপরন্তু মিয়ানমার থেকে আগত ১০-১২ লাখ রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু দেশের সামগ্রিক চাহিদা বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে। কাজেই চাহিদা বাড়ার তুলনায় অপর্যাপ্ত সরবরাহই সাম্প্রতিক মাসগুলোয় দেশে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়, যদিও নোবেলজয়ী মার্কিন অর্থনীতিবিদ মিল্টন ফ্রিডম্যানের দৃষ্টিতে, ‘অবিরাম মূল্যস্ফীতি সবসময় এবং সর্বত্রই একটি আর্থিক প্রপঞ্চ’ হিসেবেই বিবেচ্য হয়ে থাকে।
এটাও অনস্বীকার্য যে, আমাদের দেশে সরবরাহ ঘাটতির পেছনে বিগত মাসগুলোয় ডলারের বিপরীতে টাকার অস্বাভাবিক অবচিতিও বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে। বস্তুত সাম্প্রতিককালে প্রকাশিত বিভিন্ন গবেষণা থেকে দেখা গেছে যে, বিগত মাসগুলোয় যে মূল্যস্ফীতি ঘটেছে তার সিংহভাগই ঘটেছে প্রধানত ডলারের বিপরীতে টাকার অবচিতি বা অবমূল্যায়ন থেকে। এমনকি ২০২২ সালের শেষ দিকে বাংলাদেশ সফরকারী আইএমএফের প্রতিনিধি দলও তাদের মূল্যায়নে আমাদের দেশের মোট মূল্যস্ফীতির শতকরা ৫০ ভাগই বিনিময় হার অবমূল্যায়নের ফলে সংঘটিত হয়েছে বলে উল্লেখ করেছিল।
২০২১ সালের আগস্টে দেশের ইতিহাসে বৈদেশিক মুদ্রার মোট রিজার্ভ সর্বোচ্চ ৪৮ দশমিক শূন্য ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছানোর পর থেকে বৈশ্বিক কারণে টাকার অবমূল্যায়ন চাপ তীব্রতর হতে শুরু করে। এ চাপ সামলাতে এখন পর্যন্ত প্রায় ২২ থেকে ২৩ বিলিয়ন ডলার রিজার্ভ হ্রাস ও ডলারের বিপরীতে টাকার মূল্যমান মোটামুটিভাবে ৩৩ শতাংশের অধিক অবচিতি ঘটেছে, যা সরাসরি আমদানীকৃত পণ্যের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ উৎপাদনে ব্যবহৃত আমদানিনির্ভর জ্বালানি ও অন্যান্য কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধির মাধ্যমে মূল্যস্ফীতিকে উসকে দিয়েছে। তবে দেশে পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ না থাকলে কিংবা বাংলাদেশ ব্যাংকের বিচক্ষণ নীতির মাধ্যমে ঝঞ্ঝাপূর্ণ সময়ে রিজার্ভ থেকে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে ডলার ছাড়া না হলে দেশে টাকার মূল্যমানের অবচিতি এবং মূল্যস্ফীতির পরিমাণ শ্রীলংকা ও পাকিস্তানের ন্যায় আরো বেশি হতে পারত। আরো উল্লেখ্য যে, ২০২১ সালের আগস্ট পর্যন্ত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দ্রুত বাড়ার পেছনে দেশের বৈদেশিক লেনদেন ভারসাম্যের আর্থিক হিসাবে উদ্বৃত্ত যেমন মুখ্য ভূমিকা রেখেছিল, পরবর্তী সময়ে ওই আর্থিক হিসাবের ঘাটতিই রিজার্ভ হ্রাসের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মূলত উন্নত বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো, বিশেষত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ, কর্তৃক করোনা-পরবর্তীকালে মূল্যস্ফীতির চাপ নিরসনে গৃহীত সংকোচনমুখী মুদ্রানীতির আওতায় অস্বাভাবিক মাত্রায় নীতি সুদহার বাড়ার ফলে সেখানে বিভিন্ন ধরনের সভরেন বন্ড ও বিলের ইল্ড সাম্প্রতিক বছরগুলোয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এতে উন্নত অর্থনীতির দেশগুলো থেকে বাংলাদেশের মতো স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোয় বিভিন্ন মেয়াদি ঋণ ও বিনিয়োগের প্রবাহ হ্রাসের পাশাপাশি পূর্বের ঋণ ও বিনিয়োগের দায় শোধ এবং মূলধন প্রত্যাবাসন বাড়ার দরুন আমাদের মতো অর্থনীতির দেশগুলোয় লেনদেন ভারসাম্যের মূলধন হিসেবে এখনো ব্যাপক ঘাটতির সৃষ্টি হচ্ছে। মূলত এ কারণেই আমাদের দেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ হ্রাসের পাশাপাশি ব্যাপক মুদ্রা সরবরাহের মধ্যে বৈদেশিক সম্পদের অনুপাত হ্রাস ও বিনিময় হারে অবচিতির চাপ সৃষ্টি হয়েছে, যদিও অতি সাম্প্রতিক মাসগুলোয় এ চাপ অনেকটাই স্তিমিত হয়ে এসেছে।
বিনিময় হারের চাপ হ্রাস ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের হ্রাসমান ধারা রোধকল্পে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক যথাক্রমে রাজস্ব এবং মুদ্রানীতির আওতায় এরই মধ্যে নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। গৃহীত এসব পদক্ষেপের মধ্যে ঋণের সুদহারের ঊর্ধ্বসীমা এবং আমানতের সুদহারের নিম্নসীমা প্রত্যাহার, নীতি সুদহার বৃদ্ধি, ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রেরণ উৎসাহিতকরণের লক্ষ্যে প্রবাসী বাংলাদেশীদের সরকার ঘোষিত ২ দশমিক ৫ শতাংশ হারে নগদ প্রণোদনা প্রদান ইত্যাদি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এছাড়া ২০২৩ সালের ২২ অক্টোবর হতে ব্যাংকগুলোও বৈদেশিক মুদ্রার জরুরি চাহিদা মেটাতে প্রয়োজনে নিজস্ব উৎস হতে রেমিট্যান্সের ওপর ২ দশমিক ৫ প্রণোদনা প্রদানের বিধান চালু করে। সে সময়ে ঝঞ্ঝাপূর্ণ অবস্থা সাময়িকভাবে মোকাবেলায় রেমিট্যান্সের ওপর সরকার ও ব্যাংকগুলো কর্তৃক প্রণোদনা প্রদান উপযোগী হিসেবে বিবেচনা করা হলেও বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে তা একাধিক বিনিময় হারের উদ্ভব বলেই বিবেচনা করা হয়। এছাড়া তথ্য-উপাত্ত দিয়ে পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে যে, রেমিট্যান্সের ওপর নগদ প্রণোদনা বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে বিদ্যমান টাকা-ডলার বিনিময়ের আনুষ্ঠানিক বাজার এবং অনানুষ্ঠানিক বাজারে বিনিময় হারের পার্থক্যকেও অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে। উল্লেখ্য, বর্তমানে এ পার্থক্য অনেকটাই কমে এলেও এখনো আনুষ্ঠানিক বাজারের তুলনায় অনানুষ্ঠানিক বাজারে ডলারের মূল্য ৭-৮ টাকা বেশি রয়েছে বলে জানা যায়, যা রেমিট্যান্সের ওপর প্রণোদনা চালুর পূর্বে মাত্র ৩-৪ টাকার মধ্যেই সীমিত ছিল। অবশ্য এটাও উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক বাজারে বিনিময় হারের পার্থক্য থাকাটা পুরোপুরিই স্বাভাবিক ব্যাপার। এমনকি পৃথিবীর অনেক দেশেই এ পার্থক্য আমাদের দেশের তুলনায় বেশিও রয়েছে। কিন্তু যেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ তা হলো অনানুষ্ঠানিক বাজারে বিনিময় হার যত বেশি বা আকর্ষণীয় হবে, আনুষ্ঠানিক বাজারে বিনিময় হার তত বেশি চাপের সম্মুখীন এবং বিনিময় হারের প্রায়োগিক ব্যবস্থাপনাও কঠিন হয়ে পড়ে। রেমিট্যান্সের ওপর নগদ প্রণোদনা ও এজন্য ব্যাংকগুলোর প্রচ্ছন্ন খরচ বাড়ার ফলে আমদানির জন্য এলসি খোলায় যে বিনিময় হার ব্যবহার করা হয় এলসি সেটেলমেন্টে তার চেয়ে অনেক বেশি হারে টাকা খরচ করতে হয় মর্মে ব্যবসায়ী মহল থেকে বরাবরই দাবি করছে এবং এটিকেও বাজারে আমদানীকৃত পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণ হিসেবে তারা চিহ্নিত করে আসছে। এছাড়া তথ্য-উপাত্ত নিয়ে পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে যে, বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক বাজারে বিনিময় হারের পার্থক্য অব্যাহতভাবে বাড়লে তা সামনে আরো বাড়ার প্রত্যাশা সৃষ্টি করে বিধায় রফতানি আয় প্রত্যাবাসনের ধীরগতিরও কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
অনেক সময় বৈদেশিক মুদ্রার অনানুষ্ঠানিক বাজার অত্যন্ত নগণ্য এবং সেখানে বিনিময় হার বেশি হওয়া স্বাভাবিক ও এতে তেমন কিছু আসে-যায় না বলে মনে করা হয়। কিন্তু ইয়েল ইউনিভার্সিটির এক গবেষণা থেকে দেখা যায় যে, বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোয় অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলে যে পরিমাণ রেমিট্যান্স এসে থাকে তার পরিমাণ আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে আসা রেমিট্যান্সের ৩৫ থেকে ৭৫ শতাংশের সমান এবং বলা বাহুল্য, বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এর কোনো ব্যতিক্রম হবে না। বিশেষ করে বর্তমানে বিভিন্ন মোবাইল অ্যাপসনির্ভর আর্থিক লেনদেন ব্যবস্থা চালুর ফলে বিশ্বব্যাপীই হুন্ডি ব্যবসার বিস্তার ঘটায় রেমিট্যান্সের ওপর নগদ প্রণোদনা লেনদেনের আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক বাজারের মধ্যে বিনিময় হারের পার্থক্য বাড়িয়ে তা অনানুষ্ঠানিক বাজারকে আরো আকর্ষণীয় করে বলেই বিবেচনা করা হয়ে থাকে। তাছাড়া রেমিট্যান্সের আনুষ্ঠানিক বাজারের তুলনায় অনানুষ্ঠানিক বাজারে বিনিময় হার বেশি হলে তা স্থানীয় মুদ্রার মূল্যমানে অবমূল্যায়নের টান সৃষ্টিকারী উপাদান হিসেবে কাজ করে।
বস্তুত প্রবাসীদের আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রেরণে উৎসাহিতকরণে বিমিময় হার আকর্ষণীয় করা যতটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ, অত্যন্ত নিরাপদ ও দ্রুততম সময়ে নির্বিঘ্নে তা যথাযথ প্রাপকের কাছে পৌঁছানোর বিষয়টা তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বলা বাহুল্য, বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক দেশীয় ব্যাংকগুলোকে বিদেশে রেমিট্যান্সের ড্রইং ব্যবস্থা স্থাপনের অনুমোদন এবং সংগৃহীত রেমিট্যান্স দেশের অভ্যন্তরে দ্রুততম সময়ে পৌঁছতে এজেন্ট ব্যাংকিং, মোবাইল অ্যাপসভিত্তিক ডিজিটাল প্লাটফর্ম ও এনজিও লিংকেজ ব্যবহারের অনুমোদনসহ নানা নীতিগত সহায়তা প্রদান করে চলেছে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, দেশের তফসিলি ব্যাংকগুলো এখনো দেশের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে মুহূর্তেই বেনিফিশিয়ারির কাছে রেমিট্যান্সের টাকা পৌঁছানোর ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি সাধন করতে পারেনি। এক্ষেত্রে যথাযথ অগ্রগতি সাধন করতে হলে দেশের তফসিলি ব্যাংকগুলো এবং সরকারি ও বেসরকারি সব পর্যায় থেকে সমন্বিতভাবে ব্যাপকভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ ও তা বাস্তবায়নের এখনো অনেক অবকাশ রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, সরকারি পর্যায় থেকে প্রবাসী ও তাদের রেমিট্যান্সের সম্ভাব্য বেনিফিশিয়ারিদের গ্রাম, ইউনিয়ন/ওয়ার্ড থেকে শুরু করে থানা/উপজেলা ও জেলাভিত্তিক তথ্যভাণ্ডার তৈরি, সব প্রবাসী ও তাদের রেমিট্যান্সের সম্ভাব্য বেনিফিশিয়ারিদের তফসিলি ব্যাংকগুলো কর্তৃক মোবাইল অ্যাপসভিত্তিক হিসাব খোলা ও প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে প্রয়োজনীয় সংখ্যক ব্যাংক বুথ স্থাপন এবং দ্রুততম সময়ে রেমিট্যান্সের টাকা যথাযথ প্রাপকের কাছে পৌঁছানোর জন্য ব্যাংকের নিজস্ব উপযুক্ত কর্মী বাহিনী নিয়োগের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এসব ব্যবস্থা আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে রেমিট্যান্স আহরণে সহায়তার পাশাপাশি সামগ্রিকভাবে ব্যাংকগুলোর আমানত ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং দেশে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির সহায়ক হতে পারে। এছাড়া প্রবাসী ও তাদের রেমিট্যান্সের মূল বেনিফিশিয়ারিদের থানা/উপজেলাভিত্তিক তথ্যভাণ্ডার পাওয়া গেলে, সেখান থেকে যারা নিয়মিতভাবে আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠিয়ে থাকেন তাদের এবং তাদের রেমিট্যান্সের মূল প্রাপকদের সরকারের প্রশাসন কর্তৃক প্রতি বছর বিজয় দিবসে বিশেষ সংবর্ধনা প্রদান এবং তফসিলি ব্যাংকগুলো কর্তৃক আর্থিক সেবায় অন্তর্ভুক্তি ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সৃষ্টির লক্ষ্যে পূর্ব পরিকল্পিতভাবে ছুটির দিনে এলাকাভিত্তিক আর্থিক মেলা আয়োজনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
মোট কথা, সরকার ও ব্যাংকগুলো কর্তৃক নগদ প্রণোদনা দিয়ে অনানুষ্ঠানিকভাবে রেমিট্যান্স সংগ্রহকারীদের তুলনায় বিনিময় হার আকর্ষণীয় করার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত না হয়ে রেমিট্যান্সের সেবা সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছানো ও বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠানোর বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়াই শ্রেয়তর হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এ লক্ষ্যে সরকার আগামী অর্থবছর থেকে রেমিট্যান্সের ওপর ২ দশমিক ৫ শতাংশ হারে নগদ প্রণোদনা প্রদানের বর্তমান বিধান রহিত করার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে। একই সঙ্গে তফসিলি ব্যাংকগুলো কর্তৃক নগদ প্রণোদনা প্রদানের বিধান থাকলে বাংলাদেশ ব্যাংক সার্কুলার ইস্যু করে তাও নিষিদ্ধ করতে পারে। তবে এটাও বিবেচনায় রাখতে হবে যে, রেমিট্যান্সের ওপর নগদ প্রণোদনা প্রদানের বিধান প্রত্যাহার করা হলে প্রবাসীরা অখুশি এবং রেমিট্যান্সের প্রবাহেও সাময়িকভাবে কিছুটা নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি হতে পারে। এ ধরনের বিরূপ প্রতিক্রিয়া সামলানোর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক নমিনাল ও ইফেক্টিভ এক্সচেঞ্জ রেটের সূচকনির্ভর হিসাব-নিকাশ বিবেচনায় নিয়ে নমনীয় একটি করিডোরভিত্তিক একক বিনিময় হার ব্যবস্থাপনা চালু রাখার বর্তমান প্রয়াস সুসংহত করার পাশাপাশি সরকার কর্তৃক সম্প্রতি সর্বজনীন পেনশন স্কিমের আওতায় সৃষ্ট ‘প্রবাস স্কিম’ এবং ওয়েজ আনার্স ডেভেলপমেন্ট, ইউএস ডলার প্রিমিয়াম এবং ইউএস ডলার বন্ডগুলোকে আকর্ষণীয় করার জন্য ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালানো এবং এগুলোর মুনাফা/সুদের হার বাড়ানোর বিষয়টিও খতিয়ে দেখা যেতে পারে। এছাড়া হুন্ডি প্রতিরোধে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইউনিট ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর তৎপরতা বৃদ্ধি এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের গবেষণা বিভাগ ও বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত বিভাগগুলোর সমন্বয়ে একটি বিশেষ টিম গঠন করে রেমিট্যান্স চ্যানেলিংয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত নেটওয়ার্ক বিশেষ করে মোবাইল নেটওয়ার্কগুলোর রেমিট্যান্স প্রাপ্তি, রিপোর্টিং এবং তা বেনিফিশিয়ারিদের প্রদান সম্পর্কিত বিশাল তথ্য (বিগ ডাটা) পর্যালোচনা করে এতে কোনো গরমিল আছে কিনা এবং মধ্যপ্রাচ্যসহ বিদেশে রেমিট্যান্সের মূল উৎসদেশগুলোয় বাংলাদেশে রেমিট্যান্স প্রেরণে দৃশ্যমান কোনো প্রতিবন্ধকতা আছে কিনা ইত্যাদি সমীক্ষা করে দেখে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়ার বিষয়গুলোও বিবেচনায় রাখা যেতে পারে।
মো. জুলহাস উদ্দিন: অবসর-উত্তর ছুটিতে (পিআরএল) অবস্থানরত বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক (গবেষণা) এবং আর্থিক ও মুদ্রানীতি বিশ্লেষক
[নিবন্ধে প্রকাশিত মতামতগুলো একান্তভাবেই তার নিজস্ব এবং কোনোক্রমেই তা বাংলাদেশ ব্যাংকের মতামত বলে গণ্য করা সমীচীন হবে না]










