বিশ্বের অধিকাংশ শহর যেখানে স্থাপনা অপসারণ করে উন্মুক্ত স্থানের পরিমাণ বাড়াচ্ছে, ঠিক তার বিপরীতে ঢাকাকে ক্রমেই কংক্রিটের জঞ্জালে পরিণত করা হচ্ছে। নগর পরিকল্পনাবিদদের মতামত উপেক্ষা করে, একের পর এক মাঠ বা খোলা স্থান দখল করে ভবন নির্মাণ করছে বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ। সাম্প্রতিক সময়ে কলাবাগানে অবস্থিত ছোট এক টুকরা ফাঁকা জায়গা, শিশুরা যেটিকে খেলার মাঠ হিসেবে ব্যবহার করে আসছিল বহু বছর ধরে, সেটিও এখন দখলের কবলে। নগর সভ্যতার দাপটে হারিয়ে যাচ্ছে খেলার মাঠ। আর মাঠ হারিয়ে যাওয়ার ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। জনসংখ্যার চাপের সঙ্গে সঙ্গে দালানকোঠা বৃদ্ধি, অপরিকল্পিত নগরায়ণে বাংলাদেশের প্রধান প্রধান শহর পরিণত হচ্ছে কংক্রিটের শহরে। গত কয়েক দশকের অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে সংকুচিত হয়ে পড়েছে নগরীর উন্মুক্ত স্থানগুলো। খেলাধুলার পর্যাপ্ত জায়গার অভাবে ছেলেমেয়েরা হয়ে পড়ছে ঘরমুখী। এমন প্রবণতা বন্ধে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের মেয়র, স্থানীয় সরকার মন্ত্রী, এমনকি প্রধানমন্ত্রী একাধিকবার শিশুদের মাঠ, পার্ক ও নগরের উন্মুক্ত জায়গা সংরক্ষণের কথা বলেছেন, নিদের্শনা দিয়েছেন। নগরবাসী এর কার্যকর বাস্তবায়ন প্রত্যাশা করে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বসবাসের জন্য আদর্শ একটি শহরের প্রতিটি বাসিন্দার জন্য কমপক্ষে নয় বর্গমিটার খোলা জায়গা থাকা দরকার। প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৫০ হাজার মানুষ বাস করা ঢাকা শহরে সেই সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কম, মাত্র এক বর্গমিটার। এ থেকেই অনুমান করা যায় ঢাকা শহরে খেলার মাঠের কেমন অবস্থা। জনসংখ্যার হিসাবে যে শহরে থাকার কথা দেড় হাজার খেলার মাঠ, কাগজে-কলমে সে শহরের দুই সিটি করপোরেশনের কাছে আছে কমবেশি ২৫০টির মতো খেলার মাঠ! অর্থাৎ সব শ্রেণী-পেশা, লিঙ্গ ও বয়সের মানুষ যে খেলাধুলা, হাঁটাহাঁটি করবে এমন জায়গার রয়েছে তীব্র সংকট। এ শহরে অপরিকল্পিত ও নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে গড়ে উঠেছে একাধিক ওয়ার্ড, যেখানে একটিও মাঠ নেই। ঢাকায় যেসব মাঠ রয়েছে, সেগুলোর সিংহভাগেই প্রবেশের অনুমতি নেই জনসাধারণের। বেশির ভাগই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক বা সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান বা কলোনির তত্ত্বাবধানে থাকায় সেগুলো ব্যবহারের অনুমতি পায় হাতেগোনা কিছু নাগরিক। বাস্তবিকভাবে জনসাধারণের প্রবেশ ও খেলাধুলার অনুমতি আছে, সিটি করপোরেশনের হাতে ঢাকায় এমন উন্মুক্ত মাঠের সংখ্যা মাত্র ৫০টির মতো। এর বাইরে আছে মাঠ দখলের ব্যাপারটি। ঢাকার সবচেয়ে অভিজাত এলাকা গুলশানে একসময় প্রতিটি রোডে আলাদা আলাদা মাঠ ছিল, যার অস্তিত্ব এখন আর নেই। বিভিন্ন সময় এ মাঠগুলো দখল হয়েছে, বরাদ্দ দেয়া হয়েছে আবাসিক ভবনের জন্য। নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, আদর্শ একটি শহরের ১০-১৫ শতাংশ এলাকা জলাশয় এবং ১৫-২০ শতাংশ এলাকা সবুজে আচ্ছাদিত থাকা প্রয়োজন। যদিও রাজধানী ঢাকায় সবুজ এলাকা ও জলাশয়গুলো ক্রমেই কংক্রিটের আগ্রাসনে হারিয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে কমছে রাজধানীর খোলা জায়গা। গত দুই দশকে রাজধানীর খোলা জায়গার পরিমাণ তিন ভাগের এক ভাগে নেমে এসেছে। ভূমি ব্যবহার নিয়ে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) এক গবেষণায় উঠে এসেছে, রাজধানীর মোট ভূমির মাত্র ৪ দশমিক ৬১ শতাংশ এখন খোলা জায়গা হিসেবে টিকে রয়েছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক।

খেলার মাঠ, উন্মুক্ত স্থান ও প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন, ২০০০-এর ধারা অনুযায়ী খেলার মাঠ অন্য কোনোভাবে ব্যবহার বা অনুরূপ ব্যবহারের জন্য ভাড়া, ইজারা বা অন্য কোনোভাবে হস্তান্তর করা যাবে না। আর এ আইন লঙ্ঘনে অনধিক পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় সাজার বিধান রয়েছে। ঢাকা সিটি করপোরেশনের সিটিজেন চার্টার অনুযায়ী, শিশু-কিশোরদের বিনোদনের জন্য প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি করে খেলার মাঠ থাকার কথা। আর রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নীতিমালা অনুযায়ী, আবাসিক এলাকার প্রতিটি সেক্টরে একটি করে খেলার মাঠ রাখার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু কোনো ক্ষেত্রেই এ নিয়ম মানা হচ্ছে না। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন। রাজধানীতে একসময় প্রতিটি ওয়ার্ডে একাধিক খেলার মাঠ থাকলেও এখন অবস্থা একেবারেই বেহাল। ডিসিসির খেলার মাঠ ছাড়া পাড়া-মহল্লার মাঠগুলোয় ঘাসের অভাব, বাউন্ডারি না থাকা, তদারকির অভাব, মেলার জন্য স্টল বরাদ্দের কারণে শিশু-কিশোররা সেখানে খেলার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। ফলে মাঠে খেলা ছাড়াই বড় হচ্ছে ঢাকার শিশুরা। শিশুদের বাড়ির ছাদ, গ্যারেজ কিংবা বারান্দাতেই খেলতে হচ্ছে। এতে সুষ্ঠু মানসিক বিকাশ হচ্ছে না। অভিভাবকরা এসব বিষয় নিয়ে উদ্বিগ্ন, কী হতে পারে সমাধান তা ভেবে ভেবে হয়রান। অথচ পর্যাপ্ত খেলার মাঠ থাকলে এসব সমস্যার উদ্ভবই হতো না বলে ধারণা অনেক মনোরোগ বিশেষজ্ঞের। খেলার মাঠ যে শুধু শারীরিক কসরতের জায়গা তা নয়, বরং মানসিক বিকাশের একটি বড় ক্ষেত্রও বটে! অন্যদের সঙ্গে ভাব বিনিময় এবং জীবনমুখী অনেক কিছু শেখা যায় খেলার মাঠ থেকে, যা মোবাইলের স্ক্রিন কিংবা চার দেয়ালে আবদ্ধ থেকে শেখা সম্ভব নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রতিটি শিশুকে দিনে অন্তত ১ ঘণ্টা বাইরে খেলাধুলা করার পরামর্শ দিচ্ছে। কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে, ঢাকা শহরের মাত্র ২ শতাংশ শিশু মাঠে গিয়ে খেলার সুযোগ পায়। ২০ শতাংশ কিশোর ও ২৯ শতাংশ কিশোরীর মধ্যে হতাশার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। শিশুরা খেলার সুযোগ পাচ্ছে না, বিশেষ করে মেয়েশিশুরা এক্ষেত্রে আরো বেশি বঞ্চিত হচ্ছে। শিশু-কিশোররা মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়ছে। হতাশা, বিষণ্নতা, অবসাদ ও খিটখিটে মেজাজ তাদের সঙ্গী হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তাদের মধ্যে তৈরি হচ্ছে অসহিষ্ণু মনোভাব। পারস্পরিক সমঝোতা ও সহানুভূতিশীল আচরণ সাংঘাতিকভাবে কমে যাচ্ছে। বাড়ছে আক্রোশ ও স্বার্থপরতা। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে নগরীতে পর্যাপ্ত খেলার মাঠ তৈরি ও সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।

নানা নাগরিক সমস্যায় জর্জরিত ঢাকা শহর। এ শহরকে বাসযোগ্য ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আদর্শ হিসেবে গড়ে তুলতে প্রয়োজন সম্মিলিত প্রচেষ্টা। প্রয়োজন এরই মধ্যে দখল হয়ে যাওয়া সব মাঠ পুনরুদ্ধার এবং আসছে নতুন প্রকল্পগুলোয় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে মাঠের বরাদ্দ করা। পরবর্তী প্রজন্মের জন্য মনে রাখার মতো একটি শৈশব উপহার দিতে চাইলে এর বিকল্প নেই। জাতিসংঘের শিশু সনদে বলা হয়েছে, শিশুদের শারীরিক, মানসিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশের উপযোগী পরিবেশ রক্ষা ও সৃষ্টি করা রাষ্ট্রের কর্তব্য। জাতীয় শিশুনীতি ও শিক্ষানীতিতেও শিশুর বিকাশ নিশ্চিত করার জন্য অনেক কথা বলা হয়েছে। অথচ বাস্তবে হচ্ছে উল্টোটা। সুযোগ সৃষ্টি তো হচ্ছেই না, যেটুকু সুযোগ আছে, তাও রক্ষা করা যাচ্ছে না। আমরা রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারকদের কথা ও কাজের মধ্যে সংগতি দেখতে চাই। শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত ও উন্মুক্ত খেলার মাঠ চাই।

রাজধানীতে খেলার মাঠ ও খোলা জায়গা দেখলেই একটি শ্রেণীর মধ্যে তা অবৈধ দখলের চিন্তা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। নানা অছিলায় কিংবা দোকানপাট বসিয়ে মাঠ-পার্ক দখল করতে শুরু করে। শুধু ব্যক্তি নয়, সরকারি প্রতিষ্ঠানও উন্মুক্ত স্থান দখলে নামে বিভিন্ন সময়ে। একবার দখল করলে তা উচ্ছেদ করা দুরূহ হয়ে পড়ে। অনেক সময় সিটি করপোরেশনও এ কাজে সহায়তা করে বলে অভিযোগ রয়েছে। পত্রপত্রিকার মাধ্যমে দৃষ্টি আকর্ষণ করলেই কেবল নড়েচড়ে বসে। নিজ দায়িত্ব থেকে তাদের নিজস্ব মাঠ ও পার্কের সংরক্ষণ, উন্নয়ন এবং পরিচর্যার মাধ্যমে খেলাধুলা ও ভ্রমণের উপযোগী করে তোলার তাগিদ অনুভব করে না। শুধু সিটি করপোরেশনের মাঠই নয়, বিভিন্ন সরকারি কলোনির অনেক মাঠ ও পুকুরও বিলুপ্ত হয়ে গেছে। মাঠ ও পুকুর ভরাট করে বড় বড় ভবন গড়ে তোলা হয়েছে। এসব মাঠ ও পুকুরে শিশু-কিশোর থেকে সব বয়সীরা খেলাধুলা ও সাঁতার কাটত। আমরা মনে করি, আগামী প্রজন্মের সুষ্ঠুভাবে বেড়ে ওঠার জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ ও পার্ক সৃষ্টি করতে হবে। এজন্য নতুন করে জায়গা অধিগ্রহণ করার দরকার নেই। উভয় সিটি করপোরেশনের অধীনে থাকা মাঠ-পার্ক দখলমুক্তকরণ এবং সেগুলোর যথাযথ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করে খেলাধুলার সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি করা সম্ভব। এক্ষেত্রে সিটি করপোরেশন, রাজউক, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়কেও দায়িত্বশীল হতে হবে। তাদের অধীনে থাকা খেলার মাঠ ও পার্ক সংরক্ষণ করতে হবে।