[গতকালের পর]

ইটভাটা থেকে পরিবেশ দূষণ: সভ্যতাকে টিকিয়ে রাখতে আমরা স্থাপত্য শিল্পে মনোনিবেশ করছি আর স্থাপত্য শিল্পের অন্যতম একটি নির্মাণ উপাদান ইট। আমাদের দেশে সবচেয়ে বহুল ব্যবহূত মাটি থেকে প্রস্তুত পোড়ানো ইট। ইট তৈরির জন্য সারা দেশে প্রচুর পরিমাণে ইটভাটা রয়েছে। শুধু ঢাকার চারপাশে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ ইটভাটা রয়েছে। ফলে যেদিক থেকেই বায়ু প্রবাহিত হোক, দূষিত বায়ু প্রবেশ করছে ঢাকা শহরে। ঢাকার আশপাশে গেলেই দেখা যায় সারি সারি ইটভাটার চিমনি থেকে বের হওয়া কালো ধোঁয়া ছড়িয়ে যাচ্ছে বাতাসে। এ যেন দূষণের মেলা চলছে! পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ঢাকায় বায়ুদূষণের ক্ষেত্রে ৫৪ শতাংশ ইটভাটা থেকে হয়। বর্তমান আধুনিক বিশ্বে বহুতল ভবন নির্মাণে কংক্রিট, অ্যালুমিনিয়াম শিট, প্লাস্টিক, কাচ ফাইবার, স্টিল ও ধাতব বস্তুর ব্যাপক ব্যবহার হলেও বাংলাদেশের মতো স্বল্পোন্নত দেশে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ব্যবহার হচ্ছে ইট। আর এ ইট তৈরিতে ব্যবহার হয় প্রকৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান মাটি এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে যা নেয়া হয় কৃষিজমি থেকে। কৃষকদের লোভ দেখিয়ে ইটভাটার মালিকরা এককালীন অল্প কিছু টাকা দিয়ে চাষাবাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জমির উপরের অংশের উর্বর মাটি কেটে নিয়ে যান। বাংলাদেশে ইটভাটার মালিকরা সাধারণত বছরের অক্টোবর থেকে মার্চ মাসকে ইট তৈরির উপযুক্ত সময় হিসেবে বেছে নেন। যেকোনো দেশের জন্য ভূমিক্ষয় একটি মারাত্মক সমস্যা। সব দেশই চেষ্টা করে যেন ভূমিক্ষয় না হয়। বাংলাদেশে প্রায় ১২ হাজার ইট তৈরির প্রতিষ্ঠান আছে। আর বেশির ভাগ ইটভাটা শুষ্ক মৌসুমে চালু থাকে, যখন দূষণের পরিমাণ এমনিতেই বেশি থাকে। সাধারণত এক কোটি ইট তৈরি করতে কমপক্ষে আধা লাখ টন মাটির প্রয়োজন হয়, যার পুরোটাই আসে মাটির উর্বর অংশ বা টপ সয়েল থেকে। মাটির টপ সয়েলই ফসলের জন্য প্রয়োজনীয় সব উপাদান থাকে আর মাটির টপ সয়েল তৈরি হতে শত শত বছর সময় লাগে। যদিও ইটভাটায় লাকড়ি পোড়ানো আইনত নিষিদ্ধ। এসব ইটভাটায় ইট তৈরিতে পোড়ানো হয় কাঠ-কয়লা, কাঠের গুঁড়ো, ফার্নেস অয়েল, এমনকি বাতিল টায়ারও ইট পোড়ানোর কাজে ব্যবহার হয়। আবার এক লাখ ইট পোড়াতে প্রায় ২০ টন কয়লার দরকার হয়। লাকড়ি হলে এর পরিমাণ আরো বাড়বে। আমাদের দেশে গাছ লাগানো এক প্রকার সামাজিক আন্দোলনে পরিণত হলেও আমরা এর সুফল পাচ্ছি না। কারণ ব্যাপক হারে বন উজাড় করে লাকড়ি পোড়ানো হচ্ছে। অতিরিক্ত কাঠ ও কয়লা পোড়ানোর ফলে নির্গত হচ্ছে ধূলিকণা, পার্টিকুলেট কার্বন, কার্বন মনোক্সাইড, সালফার ও নাইট্রোজেন অক্সাইডগুলো, যা দূষিত করছে বায়ুমণ্ডল। দূষণের মাত্রা এতই বেশি থাকে যে আশপাশের গাছপালাও মারা যায়। বাতাসের স্বচ্ছতা কমে যায় ধূলিকণার কারণে। উর্বর মাটি না থাকায় ফসলের ফলন কমে যায়। ইটভাটাগুলোয় দূষণ কমানোর লক্ষ্যে বায়ু শোধন যন্ত্রপাতি ব্যবহার বাধ্যতামূলক করে আইন সংশোধন করে সেটা কঠোরভাবে প্রয়োগ করলে এ কারণে দূষণের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে। এর সঙ্গে পুরনো এবং অদক্ষ বুলস ট্রেঞ্চ পদ্ধতির ইটভাটাগুলো পর্যায়ক্রমে পরিবর্তন করে হফম্যান পদ্ধতিতে রূপান্তর করার জন্য নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দিতে হবে। এ লক্ষ্যে সরকারি অনুদানে হফম্যান পদ্ধতির নির্মাণ ও পরিচালনার ব্যাপারে প্রশিক্ষণ বা সাশ্রয়ী ম্যানুয়ালের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। নতুন করে ইটভাটা স্থাপনের ক্ষেত্রে পুরনো ও অদক্ষ বুলস ট্রেঞ্চ পদ্ধতি নিষিদ্ধ করাও উচিত। ইট যদি রফতানি করতেই হয়, তবে সেটা পরিবেশবান্ধব উপায়ে উৎপাদন করে এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদন পদ্ধতির জন্য যথোপযুক্ত মূল্য নির্ধারণ করে তবেই করা উচিত। এছাড়া প্রচলিত আগুনে পোড়ানো ইটের পরিবর্তে সেন্ড ব্রিক উৎপাদন ও প্রচলনের উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। পরিবেশবান্ধব উৎপাদন পদ্ধতির ফলে আন্তর্জাতিক কার্বন বাণিজ্য থেকে ভর্তুকি আদায়ের ব্যবস্থা করে তা দিয়ে ইটভাটাগুলোর উন্নয়নের খরচ পুরোটাই মেটানো সম্ভব হবে।

উন্নয়নের এ সময়ে সভ্যতাকে টিকিয়ে রাখতে শিল্প উৎপাদনের বিকল্প নেই। তাহলে কি আমরা উন্নয়নের নামে আমদের পরিবেশকে চিরতরে ধ্বংস করে দেব? না, উন্নয়নের পাশাপাশি আমাদের পরিবেশ দূষণের ব্যাপারেও নজর দিতে হবে। সনাতন পদ্ধতির পরিবর্তে শিল্পে আনতে হবে উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার। তরল বর্জ্য পরিশোধনের জন্য আমাদের ইটিপি বা সিইটিপি ব্যবহার করতে হবে। অপচয় রোধে ও পুনর্চক্রায়নের জন্য জিরো ডিসচার্জ পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। শিল্পের কঠিন বর্জ্যের জন্য ল্যান্ডফিলের পরিবর্তে ওয়েস্ট টু এনার্জি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। শিল্প-কারখানার বায়ুদূষণ প্রশমনে এটিপি ব্যবহার করতে হবে এবং উন্নত মানের চুল্লি ও জ্বালানি ব্যবহার করতে হবে। ইটভাটাগুলোয় উন্নত প্রযুক্তি ভাটা স্থাপন করতে হবে, পোড়ানো ইটের পরিবর্তে কমপ্রেসড ব্লক পদ্ধতিতে ইট তৈরি করতে হবে। সার্বিকভাবে শিল্প মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সঠিক ব্যবস্থাপনা, আইনের সঠিক প্রয়োগ করতে হবে এবং শিল্প মন্ত্রণালকে পরিবেশ অধিদপ্তর, নদী কমিশন, বিআইডব্লিউটিএসহ পরিবেশ সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানসহ পরিবেশ কর্মী ও গবেষকদের সমন্বয় করে কাজ করতে হবে। [শেষ]

 

ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার: অধ্যাপক ও ডিন, বিজ্ঞান অনুষদ; চেয়ারম্যান, পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগ, স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ