ব্যবসা পরিচালনার জন্য লাইসেন্স গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এটি শুধু ব্যবসার বৈধতাই নিশ্চিত করে না, ব্যাংকঋণ ও সরকারের নানা সুবিধা প্রাপ্তির জন্যও এটি প্রয়োজন। কিন্তু এ লাইসেন্স পেতেই ব্যবসায়ীদের পদে পদে ভোগান্তি পোহাতে হয়, যা ব্যবসার ব্যয় বাড়িয়ে তোলে। বৃহস্পতিবার ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই ও বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) যৌথ আয়োজনে ব্যবসায়ীরা ব্যবসার সনদপ্রাপ্তি ও নবায়নে জটিলতা অবসানের আহ্বান জানিয়েছেন। বিভিন্ন গবেষণায়ও অবকাঠামোগত দুর্বলতা ও অদক্ষ প্রশাসনের কারণে ব্যবসার স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। বিশ্বব্যাংকের ইজ অব ডুয়িং বিজনেস সূচকেও এর প্রতিফলন রয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে ব্যবসার গতি বাড়াতে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিলেও এক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছে খুবই সামান্য, যার প্রভাব পড়ছে বিনিয়োগের ওপর। অথচ বিষয়টি অত্যন্ত সহজ বলেই সবাই মানছেন। ব্যবসার লাইসেন্সসংক্রান্ত ভোগান্তি কমাতে প্রয়োজন প্রশাসনের সদিচ্ছা। এক্ষেত্রে শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, ব্যবসার লাইসেন্স প্রদান ও নবায়নে কার্যকর ওয়ান স্টপ সার্ভিস (ওএসএস) বাস্তবায়ন করা হোক।

দেশে ব্যবসার পরিবেশ যে এখনো অনুকূল নয়, তা বিভিন্ন সময় বিশ্বব্যাংকের ডুয়িং বিজনেসের সূচকেও উঠে এসেছে। দেশীয় উদ্যোক্তাদের পদে পদে হয়রানির শিকার হতে হয়। ঘুষ না দিলে ফাইল আটকে রাখা হয়। আরোপ করা হয় নিয়মের অতিরিক্ত কর। রয়েছে আরো নানা জটিলতা, যা নতুন ব্যবসা শুরুর প্রক্রিয়াকে করে প্রলম্বিত। এসব কারণে নতুন শিল্পোদ্যোক্তারা বিনিয়োগে উৎসাহ বোধ করেন না। নানা ধরনের প্রক্রিয়াগত ও আইনি জটিলতার কারণে শিল্প-কারখানা গড়ে তোলার উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হয়। কখনোবা প্রলম্বিত হয় প্রক্রিয়া। অথচ এমনটি হওয়ার কথা নয়। দেশে ব্যবসা সহজীকরণে ডুয়িং বিজনেস-সংক্রান্ত জাতীয় সংস্কার কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ কমিটি বেশকিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এছাড়া একই উদ্দেশ্যে গঠন করা হয়েছে বিডা। কথা ছিল, ডুয়িং বিজনেস সংস্কার কমিটির কার্যক্রম সরাসরি মনিটর করবে বিডা। এতে আমরা আশা করেছিলাম, উদ্যোক্তারা শিল্প গড়ে তুলতে অতিদ্রুত তাদের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারবেন। একাধিক সংস্থার কাছ থেকে জটিল প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন সনদ সংগ্রহ পদ্ধতি ও বছর বছর নবায়ন প্রক্রিয়ার কারণে স্থানীয় তো বটেই, বিদেশী বিনিয়োগকারীরাও দেশে আসতে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। ৮-১০টি সংস্থার কাছ থেকে কারখানার নিরাপত্তাসংক্রান্ত সনদ নিতে হয়। পুরো ইপিজেড বন্ডেড হলেও সেখানে থাকা কারখানাগুলোকে নতুন করে বন্ড লাইসেন্স নিতে হচ্ছে। দুর্ভাগ্যের বিষয়, দেশীয় উদ্যোক্তাদের এখনো বিভিন্ন জায়গায় হয়রানির শিকার হতে হয়। এ অবস্থার অবসান জরুরি। সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়ার পরও দেশে ব্যবসার পরিবেশের উন্নতি হচ্ছে না কেন, তা খতিয়ে দেখা দরকার। এটা ঠিক, করোনা মহামারীর কারণে সারা বিশ্বের মতো দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যও স্থবির হয়ে পড়েছিল। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সামগ্রিক অর্থনীতি।

ব্যবসা খাতের কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি না হওয়ার পেছনে ব্যবসায়ীরা মোটাদাগে তিনটি সমস্যাকে দায়ী করে আসছেন—এক. দুর্নীতি, দুই. আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, তিন. পুঁজি জোগানের সীমাবদ্ধতা। এছাড়া ব্যবসায়ীরা যেসব সমস্যার কথা বলেছেন সেগুলো হলো, করের নীতিতে জটিলতা, অদক্ষ জনবল, পর্যাপ্ত উদ্ভাবনের অভাব, বিভিন্ন অপরাধ ও চুরি, সরকারের অস্থিতিশীলতা, নৈতিকতা, মূল্যস্ফীতি ও শ্রম আইনের সীমাবদ্ধতা। এসব কারণে ব্যবসায় ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। ফলে অনেক ব্যবসায়ীর পক্ষেই বাজারে টিকে থাকা কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ ব্যবসায় টিকে থাকতে হলে ব্যয় কমানোর কোনো বিকল্প নেই। চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানির মতো দেশেও ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প হচ্ছে তাদের মূল ভিত্তি। বাংলাদেশেও এটা করতে হবে। সেটি করতে হলে ব্যবসাটা সহজ করতে হবে। ব্যবসার পরিবেশ আরো উন্নত করতে হবে।

ভারত সরকার ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়নের লক্ষ্যে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ব্যাপকভাবে কমিয়ে এনেছে। ফলে বন্ধ হয়ে যাওয়া বিশ্বব্যাংকের ইজ অব ডুয়িং সূচকে অনেক অগ্রগতি লক্ষ করা গেছে। দেশটি বাস্তবিক অর্থেই ব্যবসায়ীদের সেবা প্রদানের জন্য ওএসএস চালু করেছে। ভিয়েতনামের অগ্রগতিও উল্লেখ করার মতো। প্রক্রিয়া সহজীকরণের ফল তারা পাচ্ছেও। বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণে দেশটি আজ সফল। সামসাংয়ের মতো প্রতিষ্ঠান সেখানে কারখানা স্থাপন করে পণ্য উৎপাদন করছে। শুধু তা-ই নয়, সেলফোন কোম্পানিগুলোও তাদের উইং ভিয়েতনামে স্থানান্তর করছে সরকারের নিয়মকানুন সহজীকরণের কারণে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে। অথচ আইন রয়েছে, আছে শক্তিশালী কর্তৃপক্ষ, এমনকি প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং তদারক করছেন। দুঃখজনক হলেও সত্য, এত কিছুর পরও পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি হয়নি। লাইসেন্স নবায়নে এখনো বিপুল পরিমাণ অর্থ ঘুষ দিতে হয়, যা হতাশাজনক। সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে ব্যবসায়ীদের ভোগান্তি ও হয়রানি কমানোর নির্দেশনার পরও কেন জটিলতা কমছে না, তা দ্রুত খতিয়ে দেখে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া এখন সময়ের দাবি।

কোনো সংস্থা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সেবা না দিলে ওয়ান স্টপ সার্ভিস আইন অনুযায়ী ব্যবস্থার বিধান রয়েছে। এছাড়া আইনটি বাস্তবায়নে অর্থমন্ত্রীকে প্রধান করে একটি কমিটিও রয়েছে। কমিটিতে অন্য মন্ত্রীরাও রয়েছেন। শুধু তা-ই নয়, বিডার ওএসএসে সেবা দিতে ৪১টি সংস্থার সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে এবং বর্তমানে ৫৮টি সেবা ওএসএসের মাধ্যমে দেয়া হচ্ছে। তার পরও ব্যবসায়ীদের হয়রানি বৃদ্ধি পাওয়ার অভিযোগটি অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে। বিষয়গুলো খতিয়ে দেখে দ্রুত যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন।

আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বা লাল ফিতার দৌরাত্ম্য দূর করে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে সরকার ২০১৫ সালে ওএসএস চালুর কথা চিন্তা করে। সেই লক্ষ্যে একটি আইন করা হয়, যা ওয়ান স্টপ সার্ভিস অ্যাক্ট, ২০১৮ নামে পরিচিত। সেবাটি তদারক করার দায়িত্ব পায় বাংলাদেশ ইকোনমিক জোন অথরিটি (বিইজেডএ)। এ সার্ভিসের উদ্দেশ্য ছিল: এক. লাইসেন্স-পারমিট নিবন্ধনের সময়সীমা উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমিয়ে আনা, দুই. লাইসেন্স-পারমিটের নিবন্ধন খরচ কমানো, তিন. দুর্নীতি কমিয়ে নিবন্ধনে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনা, চার. সেবার গুণগত মান বৃদ্ধি করা। বাংলাদেশ রফতানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ ওএস সার্ভিস দিয়ে আসছে। কিন্তু এ ব্যবস্থা আরো কার্যকর করে তোলা একান্ত প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও জোন পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর ওএসএস প্রদানের পদ্ধতিকে বিধিবদ্ধ করা, এ আইনকে প্রচলিত অপরাপর সংশ্লিষ্ট আইনের ওপর প্রাধান্য দেয়া, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সেবা দিতে ব্যর্থতার ক্ষেত্রে ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে সেবা প্রদান নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সমস্যার সমাধান একটি সিস্টেমিক দীর্ঘ প্রক্রিয়া। সমস্যার সমাধান বের করতে হলে প্রথমে সমস্যাকে চিহ্নিত করতে হবে। সমস্যা চিহ্নিত হয়ে গেলে তা আমলে নিতে হবে। তারপর সমাধানের পথ খুঁজতে হবে এবং যথাসময়ে সমাধান করেও ফেলা সম্ভব হতে পারে। কিন্তু আমাদের সমস্যার সমাধান হয় না। কেননা আমাদের সমস্যা চিহ্নিত হয় কিন্তু তা বিবেচনায় নেয়া হয় না; বরং সরকারের তরফ থেকে সমস্যা চিহ্নিতকারীকে তিরস্কার ও তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা হয়। এমন বাস্তবতায় সমাধান পাওয়া যাবে কীভাবে? আশার কথা হলো, সমস্যাটা চিহ্নিত হয়েছে। সরকারের উচিত ছিল সমস্যাটি আমলে নিয়ে কাজ করা।

পাসপোর্ট ইস্যু ও নবায়নেও নানা আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ছিল। পুলিশি ভেরিফিকেশনের নামে অযথা সময়ক্ষেপণ ও অযাচিত কাগজপত্র চাইতে দেখা গেছে একসময়। এ জটিলতা সম্প্রতি কমে এসেছে। পাসপোর্ট করতে এখন জাতীয় পরিচয়পত্র ছাড়া তেমন কোনো কাগজ লাগছে না, পুলিশ ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়াও সহজ করা হয়েছে। এমন নীতি ব্যবসায় লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে কেন অনুসরণ করা হচ্ছে না, তা বোধগম্য নয়। লাইন্সেস প্রদান সহজীকরণ এখন সময়ের দাবি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যেখানে উদ্যোক্তা হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন, সেখানে ব্যবসা শুরুর প্রথম দাপেই এত প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে রাখা কাম্য নয়।