সারা বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তনে অভিবাসন ও নগরায়ণ একটি পরস্পর সংযুক্ত ভাবনা। বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনে বিভিন্ন পর্যবেক্ষণযোগ্য ঝুঁকি হিসেবে বন্যা, ভারি বৃষ্টিপাত, ঝড় ও খরা যেমন রয়েছে, তেমনি এ ধরনের ঝুঁকির কারণে গ্রামীণ দরিদ্র মানুষের জীবিকার সঙ্গে জড়িত সীমিত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ রয়েছে। এটিকে বিশেষভাবে গ্রামীণ দরিদ্র মানুষের বড় সমস্যার কারণ বলা যেতে পারে, যেখানে একটি দেশের জলবায়ু আক্রান্ত উপকূলীয় অঞ্চলে মানুষের কাজ করার সুযোগ সীমিত। ফলে জলবায়ু ঝুঁকিগুলো গ্রামীণ জনগণকে শহরে বস্তি এলাকায় অনানুষ্ঠানিক বসতিতে স্থানান্তর করতে প্রভাবিত করছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব শহর এলাকায় অনানুষ্ঠানিক বসতি স্থাপনের জন্য অভিযোজন কৌশল হিসেবে গুরুত্ব অনেক বেশি। অনুন্নত ও উন্নয়নশীল বিশ্বের শহরাঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তন ঝুঁকির কারণে অনানুষ্ঠানিক বসতি গড়ে উঠছে, যেখানে দারিদ্র্য, অসমতা ও বঞ্চনা সাধারণ ঘটনা। যদিও নগরায়ণ একটি ক্রমবর্ধমান প্রবণতা এবং ধারণা করা হচ্ছে, জলবায়ু আক্রান্ত মানুষ জীবিকার তাগিদে আগামী দশকগুলোয় সব অঞ্চলের শহরগুলোয় ক্রমবর্ধমানভাবে স্থানান্তর করবে। উন্নয়নশীল বিশ্বের বেশির ভাগ নগর জনসংখ্যার সম্প্রসারণের হার অন্য কোনো কারণ নয়, বরং জলবায়ু পরিবর্তনে ঝুঁকির কারণে নগর অভিবাসনের বর্ধিত হারের বিকশিত ফল। ইউএন-হ্যাবিট্যাটের (২০১৮) তথ্যমতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকির কারণে বর্তমান বিশ্বের অর্ধেকেরও বেশি জনসংখ্যা শহরাঞ্চলগুলোয় অনানুষ্ঠানিক বসতি স্থাপন করেছে। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বের জনসংখ্যার ৬৬ শতাংশ শহর এলাকায় বসতি গড়ে তুলবে।
দ্রুত
নগরায়ণকে বলা যেতে পারে প্রকৃত অর্থে
গ্রামীণ দরিদ্র
জনগণের অর্থনৈতিক
পরিস্থিতি ও পরিবেশগত বিপর্যয়ের
ফল; যা তাদের অনানুষ্ঠানিক বসতি গড়তে বস্তি
এলাকায় বাধ্য
করছে। তবে এটি কেবল জলবায়ু পরিবর্তনের
কারণেই নয়, দ্রুত শিল্পায়নের
কারণেও নগরায়ণ
হচ্ছে। ফলে উৎপাদনশীলতা ও কর্মসংস্থান নগর সম্প্রসারণের সঙ্গে
সম্পর্কিত। দ্রুত
নগরায়ণে জীবনযাত্রার প্রক্রিয়া এরই মধ্যে
দারিদ্র্য, বেকারত্ব,
পরিবেশগত বির্পযয়
ও অবকাঠামোর
অভাবের মতো বিভিন্ন সমস্যার
সম্মুখীন হয়েছে।
ইউএন-হ্যাবিট্যাট (২০১৮) অনুসারে, শহরে দ্রুত জনসংখ্যা
বৃদ্ধির ফলে বস্তি এলাকায়
অনানুষ্ঠানিক বসতি গড়ে উঠছে।
প্রায় এক বিলিয়ন দরিদ্র
মানুষ রয়েছে,
যারা বস্তিতে
বসবাস করছে।
মৌলিক চাহিদা
পূরণ ও কার্যকর নীতি ছাড়াই দেশে লক্ষাধিক শহুরে
বস্তিবাসীর জীবন চলছে। এতে ঝুঁকিপূর্ণ দরিদ্র
জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মান নিরাপদ করা সম্ভব হচ্ছে
না। সাম্প্রতিক
দশকগুলোয়, বিশেষ
করে বাংলাদেশের
মতো উন্নয়নশীল
দেশে দ্রুত
নগরায়ণ একটি প্রধান উদ্বেগের
বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বব্যাংকের (২০১৯) তথ্যমতে, বাংলাদেশে
দ্রুত নগরায়ণ
দেশটিকে বিশ্বের
পাঁচটি দ্রুততম
সম্প্রসারণশীল অর্থনীতির
একটিতে পরিণত
করেছে। দক্ষিণ
এশিয়ার দেশ হিসেবে বাংলাদেশে
জলবায়ু পরিবর্তনের
জন্য শহুরে
দরিদ্র জনগোষ্ঠী
অনানুষ্ঠানিক বসতিতে
বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ
অবস্থানে রয়েছে,
যেখানে দেশটিতে
দরিদ্র জনগোষ্ঠীর
জীবিকা নির্বাহের
মতো কম অভিযোজন ক্ষমতা
রয়েছে। ফলে বস্তিতে অনানুষ্ঠানিক বসতি দ্রুত সম্প্রসারণ
ঘটছে। এতে বাংলাদেশ নগরায়ণে
অবকাঠামোগত উন্নয়নে
পিছিয়ে যাচ্ছে।
দেখা যায়, জলবায়ু আক্রান্ত
জনগোষ্ঠী অনানুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের দুটি বৃহত্তম
শহর ঢাকা ও চট্টগ্রামে
বসতি স্থাপন
করছে। এছাড়া
অনেক জলবায়ু
প্রভাবিত মানুষ
দারিদ্র্য এবং ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগের
কারণে অনানুষ্ঠানিক বসতিতে আশ্রয় খুঁজছে।
প্রমাণস্বরূপ, খুলনা
শহরে নিম্ন
আয়ের জনগোষ্ঠীর
পরিষেবার বিধানের
ক্ষেত্রে শহুরে
দরিদ্র জনগোষ্ঠীর
অনানুষ্ঠানিক নেটওয়ার্কের অভিজ্ঞতার কথা বলা যেতে পারে।
শহুরে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অনানুষ্ঠানিক বসতিতে মৌলিক চাহিদা পূরণ ও কার্যকর নীতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে মৌলিক স্তরের জীবনযাত্রার মান নিশ্চিত করা অত্যাবশকীয়। দেখা যায়, অনানুষ্ঠানিক বসতিগুলোয় জনসাধারণের পরিষেবার অভাব রয়েছে, বিশেষ করে অপর্যাপ্ত পানীয় জল, পয়োনিষ্কাশনের অভাব, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের অভাবকে দায়ী করা হচ্ছে। মোটের ওপর, নগর এলাকার অদক্ষ সম্প্রসারণ এবং শহুরে জনসংখ্যা বৃদ্ধি মৌলিক উপযোগিতা ও পরিবেশগত পরিষেবার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। বলা যেতে পারে, এটি শহরজুড়ে জীববৈচিত্র্যের ওপরও প্রভাব ফেলছে। শহরগুলোয় খুব ঝুঁকিপূর্ণ অনানুষ্ঠানিক বসতির ফলে জনসংখ্যার দ্রুত বৃদ্ধি এবং তাদের কার্যক্রমে কার্বন নির্গমনে গ্রিনহাউজ গ্যাস বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে টেকসই উন্নয়নে শহর এলাকায় অনানুষ্ঠানিক বসতিগুলো নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। শহরে অনানুষ্ঠানিক বসতি হ্রাস করা এবং জলবায়ু পরিবর্তন অভিযোজনের জন্য উদ্ভাবনী পরিকল্পনা দরকার। সম্প্রতি এক গবেষণাপত্রে দেখা যায়, শহরে বস্তি জনগোষ্ঠির কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট কমিটির (সিডিসি) কর্মসূচির ওপর ভিত্তি করে জীবনযাত্রার পরিস্থিতি উন্নতির লক্ষ্যে কাজ করছে। উদাহরণস্বরূপ, ইউএনডিপি ও খুলনা সিটি করপোরেশন যৌথভাবে সিডিসি কর্মসূচি গ্রহণ করেছে, যা জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি কমাতে এবং বস্তির দারিদ্র্য স্তরের উন্নতির লক্ষ্যে কাজ করছে। রাজশাহী শহরে বস্তি জনগোষ্ঠী চালিত উন্নয়ন কর্মসূচির দারিদ্র্য বিমোচনের জোরালো কর্মসূচি রয়েছে। একইভাবে ঢাকার কড়াইলে বস্তি উন্নয়ন ও আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নতির জন্য দারিদ্র্য বিমোচন প্রকল্পের জন্য নগর অংশীদারিত্ব গ্রহণ করা হয়েছে। অধিকন্তু, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে আক্রান্ত এবং সীমিত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ রয়েছে এমন দুর্বল দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী কর্মসূচিগুলো সহযোগী কর্মসূচি হতে পারে। বাংলাদেশ সরকার সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে এবং এ কর্মসূচিগুলো দারিদ্র্য হ্রাস ত্বরান্বিত করছে।
তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে এতে জোর দাবি করা যায়, জলবায়ু প্রভাবিত অভিবাসন এবং শহরে অনানুষ্ঠানিক বসতিগুলোর মধ্যে একটি আন্তঃসম্পর্ক রয়েছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর টেকসই নগর উন্নয়ন সম্পর্কে বস্তিবাসীর জীবিকা যথেষ্ট উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশে উপকূলীয় অঞ্চলে গ্রামীণ জীবিকা প্রাকৃতিক ও পরিবেশগত অবনতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং এতে বাংলাদেশে শহরাঞ্চলে অনানুষ্ঠানিকভাবে বসতি স্থাপন করছে। এক সমীক্ষায় দেখা যায়, শহুরে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অনানুষ্ঠানিক বসতিতে বস্তিবাসীর ব্যবহূত নির্ধারকগুলোর পরিবর্তে জলবায়ু পরিবর্তনে অভিযোজন ক্ষমতা, টেকসই আনুষ্ঠানিক বসতি, দারিদ্র্য বিমোচনের মাধ্যমে জনসেবা নিশ্চিত করার জন্য কার্যকর নীতি বাস্তবায়ন ও প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। পদক্ষেপ হিসেবে বস্তিবাসীদের জন্য শহরে অনানুষ্ঠানিক আশ্রয় অবকাঠামোকে আনুষ্ঠানিক আশ্রয় কেন্দ্রে রূপান্তরের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা জরুরি। সর্বোপরি, বাংলাদেশে নগর পরিকল্পনাসহ ও বস্তিবাসীদের জমির অনানুষ্ঠানিক মালিকানাকে আনুষ্ঠানিক ও আইনি উপায়ে বুঝিয়ে দেয়া উচিত। অধিকন্তু, বাংলাদেশে টেকসই নগর উন্নয়নের জন্য দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে বসতির আনুষ্ঠানিক বন্দোবস্ত করতে হবে এবং মানসম্পন্ন মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা ও জনসেবা প্রদানের মাধ্যমে সরকারকে টেকসই নগর উন্নয়নের সফল উদ্যোগ নিতে হবে।
নবীন কুন্ডু: সহযোগী অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়
রিসার্চ ফেলো, রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্ট










