বিশ্বের চার ভাগের তিন ভাগ পানি হলেও মিঠা পানির পরিমাণ খুবই কম। তাই পানিসম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনা সারা বিশ্বে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশ্বে প্রাপ্ত মিষ্টি পানির প্রায় ৭০ শতাংশ ফসল উৎপাদনে কৃষকরা ব্যবহার করেন। শিল্প-কলকারখানা ব্যবহার করে ২০ শতাংশ এবং ১০ শতাংশ ব্যবহার করা হয় গৃহস্থালির কাজে। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত এক আলোচনা সভায় অংশগ্রহণকারী আলোচকরা দেশের শিল্প খাতে টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তারা শিল্পে বৃষ্টির পানি সংগ্রহ, সংরক্ষণ এবং তা ব্যবহারে জোর দিতে বলেছেন। এ কথা সত্য, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতার কারণে শিল্প খাতে অধিক পরিমাণ পানির ব্যবহার পরিবেশের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক বিষয় এবং ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধিতে প্রয়োজনীয় পানি সরবরাহের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই ব্যবস্থা নিশ্চিতে এখনই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। আশার কথা, এরই মধ্যে কিছু প্রতিষ্ঠান টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করেছে, যার মধ্যে পোশাক ও বস্ত্র শিল্প থেকে শুরু করে ইস্পাত শিল্পও রয়েছে। পানি সাশ্রয় ও বৃষ্টির পানি ব্যবহারে সব শিল্প-কারখানাকে উৎসাহিত করতে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়া আবশ্যক।
বাংলাদেশেও মিষ্টি পানি ও বিশুদ্ধ পানির সংকট দিন দিন তীব্র আকার ধারণ করছে। দেশে প্রধানত ভূগর্ভের সঞ্চিত পানি যন্ত্রের সাহায্যে উত্তোলনের মাধ্যমেই বিপুল পরিমাণ চাহিদা মেটানো হচ্ছে। কয়েক বছরের মধ্যেই এ সুযোগ বন্ধ হয়ে যাবে বলে বিশেষজ্ঞরা বলছেন। অর্থাৎ ভবিষ্যতে যে পরিমাণ ভূগর্ভস্থ পানির প্রয়োজন হবে, সেই পরিমাণ পানি ভূগর্ভ থেকে পাওয়া যাবে না। কাজেই ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন সীমিত করে বৃষ্টির পানি ও নদীর পানি ব্যবহার বাড়ানো প্রয়োজন। নদী ও শাখা নদী সংস্কার করে তাতে স্রোতধারা ফিরিয়ে এনে এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণ করে সেই পানি ব্যবহারে জোর দিতে হবে। দেশের সব নদীর মধ্যে স্থাপনা উচ্ছেদ করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোর প্রবাহ ঠিক রাখার জন্য চলমান উদ্যোগ আরো গতিশীল করার কৌশল নির্ধারণ করা প্রয়োজন। দেশ ক্রমে শিল্পায়নের দিকে এগোচ্ছে। দেশের সার্বিক উন্নয়নের জন্য এর বিকল্পও নেই, কারণ যে হারে জনসংখ্যা বাড়ছে, বেসরকারি খাত কর্মসংস্থান তৈরিতে অগ্রণী ভূমিকা না রাখলে বড় ধরনের সমস্যার মুখে পড়তে হবে। ভবিষ্যতে জনসংখ্যা আরো বাড়বে এবং সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়বে শিল্পায়নও। প্রতিটি শিল্পের জন্যই কিছু প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহার অপরিহার্য। এতে গ্যাস, পানিসহ নানা প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারের প্রয়োজন হয়। পানি প্রায় প্রতিটি শিল্পেই কম-বেশি দরকার। একটা সময় বাংলাদেশ বেপরোয়াভাবে প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহার করেছে, অপচয়ও করা হয়েছে সস্তা বলে। এখনো যে করা হচ্ছে না তা নয়। তবে গ্যাসের জোগান সীমিত—সবার মাথায় বিষয়টি এসেছে বলে এর অপচয় ও সিস্টেম লস কমানোর বিভিন্ন উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে, কিন্তু ভূগর্ভস্থ পানির ক্ষেত্রে এখনো তেমনটি দেখা যাচ্ছে না। ফলে ভবিষ্যতে ভূগর্ভস্থ পানির অভাবে বাংলাদেশকে বড় ধরনের সংকটে পড়তে হবে—এমন আশঙ্কা অমূলক নয়। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়া, বিভিন্ন অঞ্চলে প্রত্যাশামতো পানি না পাওয়া সে ইঙ্গিতই দিচ্ছে।
ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার পেছনে শিল্প-কারখানার পানি উত্তোলন ও প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত ব্যবহারও কোনো অংশে কম দায়ী নয়। পানি উত্তোলন-সংক্রান্ত কোনো ধরনের বাধ্যবাধকতা বা নজরদারি না থাকা এবং এজন্য বেশি অর্থ ব্যয় করতে হয় না বলেই পানির অপচয় হচ্ছে। দেশের কেবল গার্মেন্ট শিল্পই কী পরিমাণ পানির অপচয় করছে, বিশ্বব্যাংকের অন্যতম সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশন বা আইএফসির এক প্রতিবেদন থেকে তা জানা যায়। এতে বলা হয়, বৈশ্বিক মান অনুযায়ী প্রতিটি জিন্স ধোয়া ও রঙ করার কাজে পানির ব্যবহার হয় ৬০ থেকে ৭০ লিটার। অথচ দেশে এক্ষেত্রে গড়ে ২৫০ লিটার পানি ব্যবহার করা হয়। এর পুরোটাই মিঠা পানি। বাংলাদেশের আরএমজি খাতে প্রতিদিন ৪১১ কোটি লিটার পানির প্রয়োজন হয়। প্রতি বছর গার্মেন্ট শিল্পের সুতা ও পোশাকে ডায়িং ও ওয়াশের কাজে ব্যবহার হচ্ছে ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি লিটার পানি। বলার অপেক্ষা রাখে না, সহজলভ্য ও পয়সা খরচ ছাড়াই পাওয়ার কারণে কত বেশি পানি খরচ করা হলো, তা নিয়ে কেউই মাথা ঘামায় না। প্রতিবেদনটিতে আরো বলা হয়, ঢাকা ও এর আশপাশে প্রতি বছর ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দুই থেকে তিন মিটার নিচে নেমে যাচ্ছে। এতে একসময় আমাদের ভূগর্ভস্থ পানি অনেক নিচে নেমে যাবে, এমনকি পুরো শুকিয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। তা-ই যদি হয়, তবে তেল-গ্যাসের মতো পানি আমদানির ঝুঁকি তৈরি হবে বৈকি!
দক্ষিণ এশিয়ার দেশ শ্রীলংকার একটি বড় এলাকা শুষ্ক হিসেবে পরিচিত। দেশটির উত্তরাঞ্চলের অর্ধেক এবং পূর্বাঞ্চলের পুরো অংশেই পানির ঘাটতি রয়েছে। যদিও পৃথিবীর যে কয়েকটি দেশে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত হয়, তার মধ্যে শ্রীলংকা অন্যতম, কিন্তু
দেশটির সব এলাকায় সমান বৃষ্টিপাত হয় না। সেজন্য বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের মাধ্যমে গ্রামাঞ্চলে পানির চাহিদা পূরণ করা হয়। বৃষ্টির পানি ধরে রাখার জন্য শ্রীলংকার গ্রামাঞ্চলে নানা উপায় অবলম্বন করা হয়। এ সংরক্ষণের কাজ ২৬ বছর ধরে চলছে। ২০১৯ সালের তথ্যমতে, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য পুরো শ্রীলংকায় প্রায় ৪৫ হাজার ছোট-বড় ট্যাংক আছে। এছাড়া পুকুর, কুয়া ও জলাধার পরিষ্কার করা হয় এবং মানুষ এগুলো দূষিত করে না। বিভিন্ন হাসপাতাল, শিল্প-কারখানা ও মন্দিরে বৃষ্টির পানি ধরে রাখার জন্য ট্যাংক স্থাপন করা হয়েছে। কলম্বোর মতো বড় শহরগুলোয় পানির প্রধান সরবরাহ আসে ভূপৃষ্ঠের উপরিভাগ থেকে। এর মধ্যে বৃষ্টির পানি একটি বড় উৎস।
দেশে রফতানি খাত সংরক্ষণ ও পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে দক্ষভাবে পানি ব্যবহারের চেষ্টা করে বলে পোশাক কারখানায় ব্যবহূত পানির ছায়ামূল্য অন্যান্য শিল্প খাতের তুলনায় দৃশ্যত কম। পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তি গ্রহণের মাধ্যমে মাত্র দুই বছরে নারায়ণগঞ্জের একটি অ্যাপারেলস ৭০ শতাংশ এবং গাজীপুরের একটি ফ্যাব্রিকস কারখানা ২৭ শতাংশ পানি ব্যবহার কমিয়েছে বলে আইএফসির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আগে সংশ্লিষ্ট অ্যাপারেলসটিকে প্রতি মাসে ১ হাজার ২০০ টন কাপড় ওয়াশ ও ডাইয়ের জন্য ২৪ দশমিক ৯৬ কোটি লিটার পানি ব্যবহার করতে হতো। এখন পানি ব্যবহার করতে হচ্ছে মাত্র ৬ দশমিক ৯৬ কোটি লিটার। প্রতি কেজি কাপড়ে আগে ১২০ লিটার পানি ব্যবহার করতে হলেও এখন ফ্যাব্রিকস কারখানাটির প্রয়োজন পড়ছে ৮০ লিটার। সম্প্রতি বাংলাদেশ পানিসম্পদ পরিকল্পনা সংস্থার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তৈরি পোশাক শিল্পে সংরক্ষণ খরচসহ পানির ছায়ামূল্য প্রায় ৭৭ দশমিক ৮৫ টাকা। পোশাক শিল্পে গ্রিন কারখানা তৈরির প্রবণতা বেড়ে ওঠায় পানি ব্যবহারেও তারা সাশ্রয়ী হয়েছে। তবে বৃষ্টির পানি ব্যবহারে উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি হয়নি। সুযোগ রয়েছে এক্ষেত্রে বিনিয়োগ বাড়িয়ে পরিবেশ রক্ষা ও ব্যয় সাশ্রয়ের।
ভূগর্ভস্থ পানি কম ব্যবহারের ওপর জোর দিয়ে নীতিমালা তৈরিতে ভালো ফল পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এজন্য পোশাক কারখানা থেকে শুরু করে সব ধরনের শিল্পপ্রতিষ্ঠান যেন বৃষ্টির পানি ধরে রাখে এবং নদ-নদীর পানি পরিশোধন করে ব্যবহারের প্রতি মনোযোগী হয়, সেদিকে নজর দেয়া দরকার। এছাড়া বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে তা কাজে লাগানোর উপায় বের করতে হবে। বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনসহ নানা কারণে দেশে বৃষ্টিপাত বেড়েছে। এ বছর রেকর্ড বৃষ্টিপাত হয়েছে সারা দেশে। শিল্প-কারখানাগুলো তাদের ফ্যাক্টরি সাইড, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসনসহ সংশ্লিষ্ট এলাকায় বৃষ্টির পানি সংরক্ষণে উদ্যোগ নিতে পারে। মাত্রাতিরিক্ত পানি ব্যবহারের জন্য বাড়তি অর্থ আদায়ের পদক্ষেপ নিলে এক্ষেত্রে সাফল্য আসতে পারে। ঢাকায় এবং কিছু রয়তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে পোশাক প্রস্তুতকারকরা এখন সরকারকে পানির জন্য কিছু মূল্য পরিশোধ করে। আর নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরে নলকূপ স্থাপনের জন্য কিছু ফি দিতে হয়। এক্ষেত্রে পানির ব্যবহারিক মূল্য নির্ধারণ গুরুত্বপূর্ণ।
প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০২১-৪১-এর মতো দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন কৌশলগুলোয়ও পানির মূল্য অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। প্রধান ইনপুট হিসেবে পানি ব্যবহার করে এমন প্রকল্পগুলোর তুলনামূলক সুবিধা বিশ্লেষণে পুনর্মূল্যায়ন করার জন্য পরিকল্পনা কমিশন একটি পাইলট গবেষণা করতে পারে। পাইলট গবেষণা সম্পন্ন করার পর বর্তমানে সংশোধন করতে থাকা উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব অনুমোদনের নির্দেশিকায় পানির মূল্য বিবেচনায় নেয়া উচিত। এর সবচেয়ে ভালো উপায়গুলোর মধ্যে রয়েছে বৃষ্টির পানি সংগ্রহ, পানির চক্রাকার ব্যবহার, সেচের বিকল্প ভেজা ও শুকনো পদ্ধতি, ওয়াটার স্মার্ট নগর উন্নয়ন ও সমন্বিত পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা। ফ্যাশন শিল্পেই নিঃসন্দেহে সবচেয়ে বেশি পানি ব্যবহার হয়। এলেন ম্যাকআর্থার ফাউন্ডেশনের তথ্যানুসারে, টেক্সটাইল শিল্প বছরে ৯ হাজার ৩০০ কিউবিক মিটার পানি ব্যবহার করে; যা দিয়ে ৩ কোটি ৭০ লাখ অলিম্পিকের সুইমিং পুল ভরানো যাবে। এক্ষেত্রে পানিসাশ্রয়ী শিল্পকে কর রেয়াত, সরাসরি নগদ প্রণোদনা এবং সনদ প্রদানের মাধ্যমে পানি সংরক্ষণে বিনিয়োগ উৎসাহিত করে অমূল্য সম্পদটির সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব। বর্ষা মৌসুমের পানি মজুদ করা যেতে পারে। খাল, বিল, পুকুর থেকে শুরু করে সব ধরনের জলাশয় রক্ষা করতে হবে। সেই সঙ্গে বনভূমি, তৃণভূমি রক্ষা এবং নদীর সঙ্গে প্লাবনভূমির সংযোগ পুনরায় স্থাপন করা প্রয়োজন।










