প্রতি বছর খাদ্যশস্য সংগ্রহের কাজ করে খাদ্য মন্ত্রণালয়। শক্তিশালী খাদ্যনিরাপত্তা মজুদ গড়ে তোলা, কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য প্রদানে সহায়তা, খাদ্যশস্যের বাজারদর যৌক্তিক পর্যায়ে স্থিতিশীল রাখা এবং সরকারি খাদ্য বিতরণ ব্যবস্থায় সরবরাহ অব্যাহত রাখাই এর মূল উদ্দেশ্য। কিন্তু বিগত বছরগুলোর অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা অধিকাংশ সময়ই পূরণ হয়নি। এর কারণ অনুসন্ধানে জানা যায়, সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে খোলাবাজারে ধানের দাম বেশি থাকায় কৃষক সরকারি খাদ্যগুদামে ধান বিক্রি করেননি। কৃষকরা নয় সরকারের কাছে ধান বিক্রি করে থাকে মধ্যস্বত্বভোগীরা। গত বছর সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান কেনার উদ্যোগ নেয়া হলেও তা সফল হয়নি ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতায়। এবার আমন মৌসুমে খাদ্য মন্ত্রণালয় ধানের দাম কেজিপ্রতি ১ টাকা বাড়িয়ে ২৭ টাকা এবং চালের দাম ৩ টাকা বাড়িয়ে ৪০ টাকা নির্ধারণ করেছে। দাম কম নির্ধারণ ও কৃষকের ত্রুটিপূর্ণ তালিকার কারণে এবারো ধান সংগ্রহের লক্ষ্য অর্জিত না হওয়ার শঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে খাদ্য মন্ত্রণালয় আরো যাচাই-বাছাইপূর্বক ধান-চালের যৌক্তিক সংগ্রহ মূল্য নির্ধারণ ও কষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান কেনার পরিমাণ বাড়াবে বলে প্রত্যাশা।

বলা বাহুল্য, দেশের দরিদ্র কৃষক প্রাণান্ত পরিশ্রম করে যে ধান উৎপাদন করেন, বরাবরই তারা সেই ধানের যৌক্তিক দাম পান না। প্রতি বছর যে হারে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ধান সংগ্রহের মূল্য সরকার নির্ধারণ করে না বলে অভিযোগ রয়েছে। আবার উৎপাদন খরচের জন্য কৃষক যে ধার-দেনা করে, তা মেটাতে গিয়ে দ্রুত ধান বিক্রিরও কোনো বিকল্প থাকে না তাদের সামনে। ফলে ফড়িয়া, দালাল ও মধ্যস্বত্বভোগীরাই কৃষকের কাছ থেকে ধান কিনে থাকে। তারাই সরকারকে ধান দেয়। বাজারে বেশি দাম থাকলে তারা সরকারের কাছে ধান বিক্রি করে না। অথচ কৃষকদের দুরবস্থা থেকে রক্ষা করতেই সরকার উৎপাদন মৌসুমে ধান কেনার কর্মসূচি নেয়। কিন্তু তার সুফল কৃষকরা খুব একটা পান না। প্রায়ই দেখা যায়, সংগ্রহ অভিযান শুরু হয় দেরিতে, ততদিনে কৃষকরা ধান বিক্রি করে দিতে বাধ্য হন। আবার ধান ক্রয়ের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের অসততা এবং ব্যবসায়ী, ফড়িয়া ও প্রভাবশালীদের যোগসাজশে যে ধান কেনা হয়, তাতে কৃষকের অংশ খুব কমই থাকে। গত বছরও আমন মৌসুমে এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। সেবার ডিজিটাল পদ্ধতি অনুসরণ করা হলেও প্রকৃত কৃষকরা তার সুফল পাননি কেন, এ বিষয়টিও সংশ্লিষ্টদের বিবেচনায় নেয়া উচিত। সরকার মিল মালিকদের কাছ থেকে চালের বড় অংশ কিনছে। এতে মিলাররা লাভবান হচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, সরকার কৃষকদের কাছ থেকে উৎপাদিত ধানের মাত্র শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ সংগ্রহ করছে। সরকারের এত কম পরিমাণ ক্রয় কৃষকের উৎপাদিত ধানের দাম বাড়াতে তেমন ভূমিকা রাখতে পারে না। বলার অবকাশ রাখে না, কৃষককে প্রতিযোগিতামূলক দাম ও সরাসরি বিক্রির ব্যবস্থা করতে না পারলে খাদ্যপণ্য সংগ্রহের প্রশ্নে এমন ব্যর্থতার পুনরাবৃত্তি আগামীতেও ঘটবে।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ কৃষকদের নিবন্ধনের আওতায় এনে তাদের কাছ থেকে সরাসরি ধান কিনে থাকে। রাজ্যটি কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে ধানই সবচেয়ে বেশি কেনে। পশ্চিমবঙ্গের জনসংখ্যা ১০ কোটি। এ রাজ্য কৃষকদের প্রণোদনা ও বাজার স্থিতিশীল রাখতে একটি নীতিমালা করেছে। নিবন্ধিত কৃষকদের কাছ থেকে ৫২ লাখ টন ধান কিনে ৩৫ লাখ টন চাল মজুদ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা। এ চাল রেশন কার্ডের মাধ্যমে আবার কম মূল্যে জনসাধারণকে দেয়া হয়। রাজ্যের অধিকাংশ কৃষককে তারা নিবন্ধনের আওতায় এনেছে। শুধু ভারত নয়, নেপাল ও শ্রীলংকার চেয়ে চাল সংগ্রহ ও বিতরণ ব্যবস্থায় তুলনামূলক পিছিয়ে বাংলাদেশ। নেপালের জনসংখ্যা ৩ কোটি ৯৫ লাখ। দেশটিতে প্রতি বছর ৬০ লাখ টন চাহিদার বিপরীতে ৫৬ লাখ টন ধান উৎপাদন হয়। কৃষকদের থেকে সরাসরি প্রতি বছর ১৫ লাখ টন ধান কিনে মজুদ করছে নেপাল সরকার। শ্রীলংকার জনসংখ্যা ২ কোটি ১০ লাখ। দেশটির সরকারের বার্ষিক কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী চলতি অর্থবছরে ৪৪ লাখ টন ধান উৎপাদন হবে। এবার সরকারিভাবে ৫ লাখ ৫৩ হাজার টন চাল মজুদ করা হবে বলে জানা যাচ্ছে। জাপানও কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান-চাল কিনে থাকে। এক্ষেত্রে তারা প্রযুক্তি ও নিবন্ধনের সহায়তা নিয়েছে। বাংলাদেশকেও একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করে কৃষকের সঙ্গে সরকারের সংযোগ ঘটাতে হবে। এক্ষেত্রে প্রকৃত কৃষককে তালিকাভুক্ত ও রাজনৈতিক বিবেচনা পরিহারে তদারকি জোরদার করতে হবে। ক্ষুদ্র কৃষকরা যেন সরাসরি সরকারি গুদামে ধান ও চাল দিতে পারে তার পথ অনুসন্ধান জরুরি।

ধান-চাল সংগ্রহ ও মজুদ বাড়ানোর পরিকল্পনায় আরো গুদাম নির্মাণের প্রকল্প নিচ্ছে সরকার। প্রান্তিক কৃষকের কাছ থেকে লটারি ও কৃষক অ্যাপের মাধ্যমে ধান কেনা হচ্ছে। এছাড়া হতদরিদ্রদের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি আছে—কাবিখা, টিআর, ভিজিডি, ভিজিএফ, জিআরসহ অন্যান্য ব্যবস্থা চালু আছে। এখন এগুলো অ্যাপসের মাধ্যমে করার চেষ্টা চলছে। তাতে প্রক্রিয়া আরো সহজ হবে বলে সরকার দাবি করছে। কিন্তু আমরা দেখছি, নেপালের জনসংখ্যা বাংলাদেশের চার ভাগের এক ভাগ হলেও সেখানে ১৫ লাখ টন ধান কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি কেনা হয়। আর শ্রীলংকার জনসংখ্যা বাংলাদেশের আট ভাগের এক ভাগ হলেও ওই তুলনায় কৃষকদের কাছ থেকে অনেক বেশি ধান কেনে। বাংলাদেশের সরকারকেও কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হলে কৃষকের কাছ থেকেই ধান সংগ্রহ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে এর দামও উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নির্ধারণ করতে হবে।

সরকারি গুদামে বা সরকারের কাছে সরাসরি ধান বেচতে হলে কৃষককে তালিকাভুক্ত হতে হবে, ধানের আর্দ্রতা ১৪ মাত্রার বেশি হতে পারবে না, জাতীয় পরিচয়পত্র লাগবে ও ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থাকতে হবে। কৃষক তালিকাভুক্ত করার কাজ করে আবার থানা কৃষি অফিস। কিন্তু দুই বছর ধরে এই তালিকাভুক্তি বন্ধ রয়েছে। নিয়মে আছে তালিকাভুক্ত হতে হলে প্রকৃত কৃষক হতে হবে। তিনি জমির মালিক বা বর্গাচাষি হবেন। ধান উৎপাদনের সঙ্গে সরাসরি জড়িত থাকতে হবে। তবে এই তালিকাভুক্তির কাজেও আবার আছে দুর্নীতি। আসলে প্রত্যেক উপজেলায় সরকারি গুদামে ধান বিক্রির একটি চক্র আছে। কারণ সাধারণ কৃষক আর্দ্রতার বিষয়টি বোঝেন না। আর ধান বিক্রি করতে তালিকাভুক্তসহ যেসব শর্ত পূরণ করতে হয় সেসব শর্ত পূরণ করা অনেক কৃষকের পক্ষেই সম্ভব হয় না। অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, সব শর্ত পূরণ করলেও কৃষককে ধানের আর্দ্রতার মারপ্যাঁচে ফেলে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। আর ওই চক্রটি কৃষি অফিসের মাধ্যমে তালিকাভুক্ত হয় এবং উপজেলা খাদ্য অফিসের সাথে মিলে আর্দ্রতাসহ সব শর্ত পূরণ করে। ফলে বছরের পর বছর তারাই প্রকৃত কৃষকের নামে সরকারি গুদামে ধান বেচে।

প্রশ্ন হলো, কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি যদি ধান না কেনা হয়, তাহলে কৃষক কি ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন? কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য আসলে কত হওয়া উচিত? গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, সরকার ধানের যে দাম নির্ধারণ করেছিল গত বছর, বাইরে তার চেয়ে বেশি মূল্যে বিক্রি হয়েছে। বরং সরকার নির্ধারিত মূল্যে ধান বিক্রি করলে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হতেন বা কম লাভবান হতেন। কৃষককে যথাযথ মূল্য দিতে না পারাও সরকারের ধান-চাল সংগ্রহ অভিযানের লক্ষ্য পূরণ না হওয়ার একটা কারণ। এক্ষেত্রে তাই সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি ও ব্যবস্থাপনার সংস্কার প্রয়োজন। কৃষকের স্বার্থে সরকার ভর্তুকি দিয়ে বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি দামে অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে ধান-চাল সংগ্রহ করে। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, এক্ষেত্রে যে নীতিমালা অনুসরণ করা হয়, তাতে সরকারের এ ভর্তুকি কৃষকের উপকারে আসে না, ভর্তুকির পুরোটাই চলে যায় চালকল মালিক, মধ্যস্বত্বভোগী ও ফড়িয়াদের পকেটে। ফলে সরকারের অভ্যন্তরীণ সংগ্রহ অভিযানের মূল উদ্দেশ্যই বাস্তবায়ন হয় না। ধান-চালের অভ্যন্তরীণ সংগ্রহ নীতিমালায় অবশ্যই কৃষক ও ভোক্তা—উভয়ের স্বার্থই প্রতিফলিত হতে হবে। কৃষককে বাঁচাতে হলে তার উৎপাদন খরচ কমানোর ব্যবস্থা করতে হবে। উৎপাদন বাড়ানোর ব্যবস্থা নিতে হবে। সঠিক সময় বিক্রির জন্য সক্ষম করতে হবে।