দুই মাস ধরে দেশে করোনা সংক্রমণ ও মৃত্যু দুটোই অনেক কমে এসেছে। গতি ফিরেছে জনজীবনে, যা স্বস্তির। তবে প্রতিবেশী দেশ হওয়ায় আমাদের জন্য খানিকটা চিন্তার কারণ হয়ে দেখা দিয়েছে ভারতে নতুন করে ভাইরাসটির সংক্রমণ বৃদ্ধির বিষয়টি। পরিস্থিতির গুরুত্ব উপলব্ধি করে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এরই মধ্যে সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে, যার যথাযথ বাস্তবায়ন জরুরি। গতবার আমরা দেখি যে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ বাংলাদেশে প্রবেশের আগে ভারতে তীব্রভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল। এবার তাই ভারত থেকে সংক্রমণ যেন বাংলাদেশে ছড়াতে না পারে সেজন্য সীমান্ত, স্থলবন্দরসহ প্রবেশপথগুলোয় সর্বোচ্চ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। এ অবস্থায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে আরো বেশি সক্রিয় হতে হবে। নইলে দেশে বর্তমানে বিরাজমান স্বাভাবিক অবস্থা বিঘ্নিত হয়ে জনস্বাস্থ্য ও অর্থনীতি আবারো ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
ভারত ছাড়াও করোনার সংক্রমণ বেড়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, মধ্য এশিয়া, পূর্ব ইউরোপসহ বিভিন্ন অঞ্চলে। আকাশপথে বিভিন্ন দেশ থেকে আমাদের এখানে যাত্রীরা আসা-যাওয়া করছে। অনেক স্থানে পর্যটন স্পটগুলো খুলে দেয়া হয়েছে। ১৫ নভেম্বর থেকে আকাশপথে ভারতের পর্যটন ভিসা চালু হচ্ছে। পর্যটকরা একবারে ৩০ দিন সেখানে অবস্থান করতে পারবেন। আমাদের দেশ থেকে অনেকেই চিকিৎসাসহ বিভিন্ন কাজে ভারতে যান। পর্যটন ভিসা চালু হলে অনেকেই সেখানে যাবেন। এ অবস্থায় আমাদের সার্বিক সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। যাত্রীদের করোনা পরীক্ষাসহ যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি পরিপালন, কোয়ারেন্টিন, আইসোলেশনের মতো বিষয়গুলো নিশ্চিত করা চাই। এর আগে ভারতের ভয়াবহ পরিস্থিতি অবলোকন করে প্রয়োজনীয় সতর্কতামূলক কার্যক্রম গ্রহণের সময় পেলেও আমরা কার্যকর প্রস্তুতি নিতে সক্ষম হইনি, যার জন্য আমাদের অনেক চড়া মূল্যও দিতে হয়েছে। এবারো তাই এক ধরনের ঝুঁকিতে রয়েছি আমরা।
চীন সম্প্রতি বেইজিং ম্যারাথন স্থগিত করাসহ সংক্রমণ ঠেকাতে শতাধিক ফ্লাইট বাতিল করেছে। নতুন করে অনেক স্কুল বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে সেখানে। পাশাপাশি বাড়ানো হয়েছে কভিড-১৯ শনাক্তকরণ পরীক্ষার গতি। চীনের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে সীমান্তবর্তী দেশগুলো কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করতে শুরু করেছে। বিভিন্ন দেশের সরকারের পক্ষ থেকে নতুন করে দিকনির্দেশনা দেয়া হয়েছে। তাতে স্বাস্থ্যবিধি যথাযথভাবে মেনে চলার ওপর জোরারোপ করা হয়েছে। এছাড়া সংক্রমণের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত কোনো এলাকায় যেন জনসমাগমের আয়োজন না করা হয়, সেদিকে সতর্ক থাকতে স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
করোনা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে আমাদের ইচ্ছা বা আকাঙ্ক্ষার ঘাটতি না থাকলেও বাস্তব অভিজ্ঞতা ভিন্ন কথা বলে। ভারতে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের সংক্রমণের সময় আমরা তেমন কোনো কিছুই করতে পারিনি। কাগজে-কলমে অনেক সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। সীমান্তও বন্ধ করা হয়েছিল। কিন্তু সংক্রমণ এড়াতে আমরা সফল হইনি। বর্তমানে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক, কেরালাসহ বিভিন্ন স্থানে করোনা বাড়ছে। আমাদের দেশের বিমান ও স্থলবন্দরগুলোয় তাই পরীক্ষার ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। সার্বিক প্রস্তুতি হিসেবে সীমান্ত এলাকায় পরীক্ষার সংখ্যা ও কোয়ারেন্টিন সুবিধা বাড়ানো এবং ট্রাকচালকদের টিকা দেয়ার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে হবে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পিসিআর পরীক্ষাগার স্থাপন করা হয়েছে, তবে প্রয়োজনের তুলনায় সক্ষমতা কম। এর সক্ষমতা আরো বাড়াতে হবে। করোনা শনাক্তকরণ ল্যাব স্থাপন ও পরীক্ষা জোরদার করতে হবে অন্য বিমানবন্দরগুলোয়। বিমান ও স্থলবন্দরগুলোয় সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নভেল করোনাভাইরাস সংক্রমণ পরীক্ষার ব্যবস্থা, সবাইকে মাস্ক পরতে ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে উদ্বুদ্ধ করার কার্যক্রম জোরদার করলে আগের বিপর্যয় এড়াতে সক্ষম হব আমরা।
আমাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো স্বাস্থ্য খাতের অবকাঠামোগত দুর্বলতা। করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের সময় আমরা দেখেছি সংক্রমণ বৃদ্ধির ফলে রোগীর চাপ সামাল দিতে হিমশিম অবস্থা দেশের হাসপাতালগুলোয়। তীব্র আইসিইউ সংকট। প্রয়োজনের তুলনায় চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর অভাব। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ নতুন চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেয়ার কথা বলছে, তবে সংকটকালীন পরিস্থিতি সামলানোর জন্য তা যথেষ্ট কিনা এটি বিবেচ্য। এদিকে মাত্র ১২ দশমিক ৩৩ শতাংশ মানুষের দুই ডোজ টিকা সম্পন্ন হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় ও স্কুল পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের টিকাদান কর্মসূচি চলছে। এ অবস্থায় চলমান টিকাদান কর্মসূচিকে আরো জোরদার করতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে দেশে নতুন সংক্রমণের বিস্তার ঘটলে পরিস্থিতি সামলে ওঠা কঠিন হয়ে পড়বে। যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ ও টিকাদান কর্মসূচি জোরদারের মাধ্যমে বিশ্বের অনেক দেশ সংক্রমণ রোধ করতে সক্ষম হয়েছে। এ দৃষ্টান্ত আমাদের সামনে আছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদপ্তরের মধ্যে আরো সমন্বয় নিশ্চিত ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ অপরিহার্য।
গত বছর শীতের আবহাওয়ায় সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কার কথা বলা হলেও বাস্তবে তা হয়নি। শীত শেষে উষ্ণ আবহাওয়া শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সংক্রমণ আবার বেড়েছে। তবে এবার একই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি না-ও হতে পারে। কারণ করোনার ধরন বদলাচ্ছে বারবার। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ল্যাবরেটরির গবেষণায় দেখা গেছে ভাইরাসটি ঠাণ্ডা, শুকনো এবং যেখানে আলট্রাভায়োলেট রেডিয়েশন নিম্নপর্যায়ে, সেখানে বেশি সময় টিকে থাকতে পারে। এ অবস্থায় স্বাস্থ্যবিধি পালন ও ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার মতো পদক্ষেপের দিকে জোর দিতে হবে। গণপরিসর, রেস্তোরাঁ, গণপরিবহনসহ সবখানে স্বাস্থ্যবিধি মানার প্রবণতা ঢিলেঢালাভাবে চলছে। পরিস্থিতির গুরুত্ব উপলব্ধিপূর্বক নতুন সংক্রমণ এড়াতে স্বাস্থ্যবিধির যথাযথ পরিপালন নিশ্চিতের বিকল্প নেই।










