সাম্প্রতিক মাসগুলোয় যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে বলে খবর মিলছে। শ্রমবাজারগুলোও অনেকটাই রুদ্ধ, দ্রুত খোলার সম্ভাবনা ক্ষীণ। সাম্প্রতিক এক জরিপে ৪৬ শতাংশ ক্ষুদ্র ব্যবসার মালিকরা বলেছেন, তারা নতুন উদ্যোগের জন্য কর্মী পাচ্ছেন না। ৩৯ শতাংশ উদ্যোক্তা জানিয়েছেন, কর্মীদের বেতন-ভাতাসহ সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে হয়েছে তাদের। তবু দেখা যাচ্ছে বন্ডের ইল্ড কম। অর্থাৎ বন্ডের  সুদ আয় কম। যেখানে মূল্যস্ফীতি ২ দশমিক ৪ শতাংশ, সেখানে দশ বছর মেয়াদি বন্ডের ইল্ড হার ১ দশমিক ২৪ শতাংশ মাত্র। কিন্তু শেয়ারবাজারের চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত। শেয়ারবাজার সর্বকালের উত্তুঙ্গ অবস্থায় বিরাজ করছে।

এক্ষেত্রে কিছু বিষয় বিবেচনায় আনা জরুরি। একটি বিষয় হতে পারে, যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতি আস্থা। সম্ভবত বন্ড বাজারগুলো যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভকে বিশ্বাস করে। ফেডারেল রিজার্ভ বলছে, বিদ্যমান মূল্যস্ফীতির চাপ সাময়িক এবং তারা নীতি সুদহার নিম্ন পর্যায়ে রাখবে। তেমনটি হলে প্রবৃদ্ধির (সঞ্চয় ও কংগ্রেসে আলোচিত হওয়া বাড়তি সরকারি ব্যয় দ্বারা যা চাঙ্গা হয়েছে) সাময়িক উল্লম্ফন ঘটবে এবং মূল্যস্ফীতিও ফেডের লক্ষ্যমাত্রার কাছাকাছি থাকবে। ব্রেকইভেন মূল্যস্ফীতির হারও একই চিত্রের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

তবে সেটি এ বিষয়টি ব্যাখ্যা করে না যে কেন ১০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের ইল্ড হার এত কম। বরং আগামী দশকজুড়ে বন্ডের প্রকৃত ইল্ড হার যে ঋণাত্মক হতে পারে, এটি তারই ইঙ্গিত দেয়। এটা যদি সত্য হয়, তাহলে অবস্থা কী দাঁড়াবে? সম্ভবত কভিড-১৯-এর ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের বিস্তার উন্নত দেশগুলোকে নতুন করে লকডাউনের দিকে চালিত করবে এবং উদীয়মান বাজারগুলোকে আরো বেশি মাত্রায় ভোগাবে। সম্ভবত আরো খারাপ কোনো করোনার ভ্যারিয়েন্টের আবির্ভাব ঘটবে। কংগ্রেসের আলোচনাও ব্যাহত হতে পারে, ব্যর্থ হতে পারে বাইপার্টিজান ইনফ্রাস্ট্রাকচার বিল। এ প্রেক্ষাপটে অবশ্য শেয়ারবাজারের চাঙ্গা ভাব এবং ব্রেকইভেন মূল্যস্ফীতি হারের ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করা আরো কঠিন হবে।

অতি সম্প্রসারণমূলক মুদ্রানীতির মাধ্যমে সৃষ্ট অবস্থার কারণে শেয়ার ও বন্ড মূল্য চাঙ্গা করার (বন্ড ইল্ড কমিয়ে) একটি সাধারণ ফ্যাক্টর হতে পারে অ্যাসেট ম্যানেজারদের ইল্ডের সন্ধান। এটা ব্যাখ্যা করবে কেন শেয়ার, বন্ড, ক্রিপ্টোকারেন্সি ও আবাসনের মূল্য একই সময়ে কম।

যারা স্থিতিশীল সম্পদমূল্যে যথেষ্ট গুরুত্ব দেন, তাদের জন্য কয়েক সপ্তাহ আগে দেয়া ফেড প্রধান জেরোমি পাওয়েলের ঘোষণা বেশ ইতিবাচক হতে পারে। তিনি বলেছেন, অর্থনীতি সেই বিন্দুতে এগিয়েছে, যেখানে ফেড ১২০ বিলিয়ন ডলারের বন্ড কেনার কর্মসূচি শেষ করতে পারে। এটা ছিল সুখবর। কোয়ান্টিটেটিভ ইজিং (কিউই) ধাপে ধাপে কমিয়ে আনাই হলো মুদ্রানীতি স্বাভাবিকীকরণের প্রথম পদক্ষেপ, যা বন্ডের নিম্ন ইল্ডের পরিবেশে অ্যাসেট ম্যানেজারদের অধিক রিটার্ন তৈরির চাপ থেকে মুক্তি দেয়ার জন্য আবশ্যক। [কোয়ান্টিটেটিভ ইজিং হলো এমন একটি বিশেষ মুদ্রানীতি, যা বিশেষ ব্যবস্থায় একটি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঘোষণা করতে পারে। একটি দেশের স্বাভাবিক মুদ্রানীতি কোনো কারণে অকার্যকর প্রমাণিত হলে এ ব্যবস্থা নেয়া হয়ে থাকে। এ নীতি ব্যবহার করে একটি দেশের সরকার বাজারে বাড়তি অর্থের জোগান দিয়ে দুর্বল বাণিজ্যিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহায়তা করে।]

এটিও ঠিক, কিইউ অবসানের সূচনা প্রত্যেককেই সন্তুষ্ট করতে পারবে না। কিছু অর্থনীতিবিদ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসার আগে আর্থিক সম্প্রসারণের ইতি টানাকে ভালোভাবে দেখছেন না। এরই মধ্যে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে অনেক দেরি হয়ে গেছে। এখন ব্যয়বহুল হস্তক্ষেপ ছাড়া এটাকে বশে আনা সহজ হবে না। ধারাবাহিকভাবে দুই দশকের নিম্ন মূল্যস্ফীতির পরিবেশ অনেক কেন্দ্রীয় ব্যাংকারের মধ্যে এ বোধের জন্ম দিয়েছে যে তারা কেবলই অপেক্ষা করতে পারে। এছাড়া তাদের হাতে অন্য কিছু করার সুযোগ নেই।

এদিকে উচ্চ সম্পদমূল্য কিংবা মূল্যস্ফীতি নিয়ে আর্থিক নীতিনির্ধারকরা অতিমাত্রায় উদ্বিগ্ন না হলেও আরেকটি ঝুঁকি সম্পর্কে তাদের অবশ্যই উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত। আর সেটি হলো, ভবিষ্যৎ সুদহারের উল্লম্ফনে সরকারের আর্থিক ঋণের এক্সপোজার বৃদ্ধি। 

কভিড পরিস্থিতিতে সরকারি ঋণ বাড়লেও সরকারের সুদ পরিশোধের হার নিম্ন রয়ে গেছে। আরো লক্ষণীয় হলো, গত দুই দশকের বেশি সময়ে কিছু দেশে ঋণ-জিডিপি অনুপাত লক্ষণীয় মাত্রায় বেড়েছে, সংকুচিত হয়েছে আর্থিক পরিসর। এ অবস্থায় উন্নত দেশগুলোয় যে সরকারি ঋণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সবচেয়ে উল্লম্ফনের দিকে যাচ্ছে, তা নিয়ে অনেক অর্থনীতিবিদই খুব একটা উদ্বিগ্ন নন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, মূল্যস্ফীতি যেভাবে বাড়ছে, তাতে সুদহার যদি বাড়ে, তাহলে অবস্থা কী দাঁড়াবে? যদি সরকারি ঋণ জিডিপির ১২৫ শতাংশের কাছাকাছি হয়, তাহলে সুদহারে প্রতি শতাংশীয় পয়েন্টের বৃদ্ধি জিডিপির অংশ হিসেবে বার্ষিক আর্থিক ঘাটতিতে ১ দশমিক ২৫ শতাংশীয় পয়েন্টে রূপান্তরিত হবে। এটি উপেক্ষার সুযোগ নেই। ব্যবসা চক্রের পরিক্রমায় কিছু শতাংশীয় পয়েন্টের মাধ্যমে সুদহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সরকারি ঋণও দ্রুত দুর্দশাগ্রস্ত হতে পারে।

এক্ষেত্রে চিন্তাশীল অর্থনীতিবিদরা হয়তো বলবেন, ‘দাঁড়ান, ১ মিনিট!’ সব ঋণই কিন্তু অতি দ্রুত বিবর্তিত (রলড) হয় না। কেবল যুক্তরাজ্যের দিকে তাকান। সেখানে সরকারি ঋণ পরিপক্বতার গড় মেয়াদ (ডেট ম্যাচিউরিটি) প্রায় ১৫ বছর।  সত্য হলো, দেশটিতে ঋণ পরিপক্বতার মেয়াদ সমানুপাতিকভাবে বাড়লেও যুক্তরাজ্যের মোট ঋণের কেবল এক-পঞ্চমাংশই প্রতি বছর পুনরায় অর্থায়ন করতে হবে। ফলে এটা বেড়ে চলা সুদহারের সমস্যা মোকাবেলায় কর্তৃপক্ষগুলোকে প্রচুর সময় দিবে।

এতে আত্মতৃপ্তির কোনো সুযোগ নেই। অন্য দেশ, অন্তত যুক্তরাষ্ট্রে সরকারি ঋণের পরিপক্বতার মেয়াদ বেশ কম। এটি ৫ দশমিক ৮ বছর মাত্র। এখানে সমস্যা ঋণের গড় মেয়াদ নয়,  বরং প্রকৃত সমস্যা হলো ঋণের মোট পরিমাণ; যা দ্রুত পরিপক্ব হবে এবং অবশ্যই চক্রবৃদ্ধি হারে আবর্তিত হবে। এক্ষেত্রে মধ্যবর্তী ঋণ মেয়াদ/ মিডিয়ান ডেট ম্যাচিউরিটি  (যে সময়ে বিদ্যমান ঋণের কেবল অর্ধেকই পরিপক্ব হবে) সুদহার বাহিত ঝুঁকির এক্সপোজার মোকাবেলার ভালো উপায় হতে পারে।   

আমাদের অবশ্যই ঋণের মেয়াদ কমানোর প্রধান উৎসও আমলে নিতে হবে। আর সেটি হলো কিউই। যখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক মাসিক বন্ড কেনা কর্মসূচির মাধ্যমে বাজার থেকে পাঁচ বছর মেয়াদি সরকারি ঋণ নিজের ঘাড়ে তুলে নেয়, তখন ওইসব ক্রয়কৃত বন্ড বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর রিজার্ভ থেকে ধার করে অর্থায়ন করতে হয়; যার ওপর কেন্দ্রীয় ব্যাংককে সুদ গুনতে হয় (যেটিকে বলা হয় অতিরিক্ত রিজার্ভের ওপর সুদ)। এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া খতিয়ে দেখা দরকার। সরকার এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের (ভাবুন, অনেক দেশই এটি সম্পূর্ণভাবে সরকারের নিজস্ব সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান) সার্বিক স্থিতিপত্রের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে দেখা যাবে সরকারকে আবশ্যিকভাবে পাঁচ বছর মেয়াদি ঋণকে আরো দ্রুত মেয়াদের ঋণে পরিণত করতে হয়েছে। সুতরাং কিউই এভাবে সরকারি ঋণের কার্যকর পরিপক্বতার মেয়াদ অব্যাহতভাবে কমানোর দিকে ধাবিত করে এবং বেড়ে চলা সুদহারে সমানুপাতিকভাবে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সামগ্রিক এক্সপোজার বাড়ায়।  

প্রশ্ন হলো, এটা সমস্যা কিনা। যুক্তরাজ্য সরকারের গড় ১৫ বছরের ঋণ পরিপক্বতার মেয়াদ বিবেচনা করা যাক। সেখানে মধ্যবর্তী পরিপক্বতার মেয়াদ (মিডিয়ান ম্যাচিউরিটি) আরেকটু কম, ১১ বছর। এ অবস্থায় সেখানে কিউই-চালিত ঋণের মেয়াদ কমানোর প্রভাব চিন্তা করলে দেখা যায় কেবল চার বছরই কমে। কাজেই সুদহারে এক শতাংশীয় পয়েন্ট বৃদ্ধি যুক্তরাজ্য সরকারের সুদ পরিশোধ ব্যয় বাড়ায় মাত্র জিডিপির শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ, যা তেমন একটা দুশ্চিন্তার নয়। তবে সুদহার ১ শতাংশীয় পয়েন্টের বেশিও বাড়তে পারে। সেটিকে সামলানো অবশ্য কঠিন নয়।  

যুক্তরাজ্যের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অনাদায়ী সরকারি ঋণের পরিপক্বতার মেয়াদের ব্যাপ্তি যে কম তা নয়, বরং এর এক-তৃতীয়াংশই পরিশোধের দায় পড়েছে  ফেডারেল রিজার্ভের ওপর। এ প্রেক্ষাপটে স্পষ্টতই কিউই যত প্রলম্বিত হবে, সরকারের ঝুঁকিও সমানুপাতিক হারে বাড়বে। তাই আর্থিক সম্প্রসারণের ইতি টানার সময় এখন অত্যাসন্ন।

 

রঘুরাম রাজন: সাবেক গভর্নর, রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া

ফাইন্যান্সের অধ্যাপক, ইউনিভার্সিটি অব শিকাগো বুথ স্কুল অব বিজনেস

ভাষান্তর: হুমায়ুন কবির