ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য ‘ভিশন-২০২১’ শিরোনামে নির্বাচনী ইশতেহারে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ একটি উন্নত দেশ, সমৃদ্ধ ডিজিটাল সমাজ, একটি ডিজিটাল যুগের জনগোষ্ঠীর রূপান্তরিত উৎপাদন ব্যবস্থার কথা ঘোষণা দেয়। দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে ডিজিটালাইজেশনের লক্ষ্যে নানা পদক্ষেপও নেয়া হয়। ইন্টারনেটের ব্যবহার বৃদ্ধি থেকে শুরু করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যাংক ও আর্থিক খাত, অফিস-আদালত, বিনোদনসহ বিভিন্ন খাতে ডিজিটালাইজেশনের ছোঁয়া লেগেছে। একই সঙ্গে নিরাপত্তা নিয়ে নানা শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের ডিজিটালে রূপান্তর শক্তিশালীকরণে বাংলাদেশের জন্য কৌশলপত্র ২০২২-২৫ প্রণয়ন করছে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি)। যার একটি খসড়া তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপনও করা হয়েছে। আলোচ্য উদ্যোগ নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের ডিজিটালাইজেশনকে আরো এগিয়ে নেবে। তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে তথ্যের সহজলভ্যতা, সরকারি পরিষেবা, বাণিজ্য, ই-কমার্স, টেলিমেডিসিন, অনলাইনে সব পরিষেবা নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে এ সুফল এখন সবাই ভোগ করছেন। বিশেষত গত বছরের প্রথম দিকে শুরু হওয়া নভেল করোনাভাইরাস মহামারী ও লকডাউনের বাস্তবতায় সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও মানুষ অনলাইনভিত্তিক ডিজিটাল পরিষেবার ওপর নির্ভরশীল হতে বাধ্য হয়েছে। আর এ বাস্তবতা আমাদের ডিজিটাল বাংলাদেশের রূপরেখা বাস্তবায়নে কয়েক ধাপ এগিয়ে দিয়েছে। তবে ডিজিটালাইজেশনের সামাজিক-অর্থনৈতিক সুফল ও সম্ভাবনাগুলোর পাশাপাশি এর কিছু অনিবার্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, কুফল ও নিরাপত্তাহীনতার দিকও এরই মধ্যে উন্মোচিত হয়েছে। বাংলাদেশকে এখন সেসব বিষয়ে অধিক নজর দিতে হবে।

ডিজিটাল শব্দটি ব্যাপক অর্থে বিস্তৃত। একটি দেশ তখনই ডিজিটাল দেশে পরিণত হয় যখন তা ই-স্টেটে রূপান্তরিত হয়। অর্থাৎ সরকার ব্যবস্থা, শাসন ব্যবস্থা, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা, কৃষিসহ সব কার্যক্রম কম্পিউটার ও আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে পরিচালিত হবে। বাংলাদেশ এরই মধ্যে রাষ্ট্রের প্রায় প্রতিটি কাঠামোতেই ডিজিটালাইজের ছোঁয়া লাগাতে সক্ষম হয়েছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ উন্নয়নের একটি চলমান প্রক্রিয়া। একটি নির্দিষ্ট সময়ে ও একটি নির্দিষ্ট বাজেটে কাজটি করা সম্ভব নয়। পরিপূর্ণ ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে বেশকিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে উচ্চগতির ইন্টারনেট ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া ইন্টারনেট ব্যবহারে পরিপূর্ণ দক্ষ হয়ে গড়ে উঠতে ইংরেজি জানা আবশ্যক। আবার সরকারি কর্মচারীরা তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারে প্রত্যাশা অনুযায়ী পারদর্শী নন। আজও সরকারি ব্যাংকগুলো ও উল্লেখযোগ্য বৃহৎ সংখ্যক সরকারি প্রতিষ্ঠানে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির ছোঁয়া লাগেনি। পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল বাংলাদেশ তৈরি করতে হলে আমাদের উন্নয়নের একটি বিজ্ঞানসম্মত নকশা তৈরি করতে হবে। ইন্টারনেট কাঠামোর উন্নয়ন ও ইন্টারনেটের ব্যয় সাধারণের সীমার মধ্যে এনে সব মানুষের জন্য তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং সর্বোপরি সরকারি, আধা সরকারি ও বেসরকারি কাজে ইন্টারনেট ব্যবহার করে স্বচ্ছতা আনা ইত্যাদি বাংলাদেশকে ডিজিটালাইজেশনে সহযোগিতা করবে। কৌশলপত্রের উদ্দেশ্য হতে হবে সৃজনশীল-জ্ঞানভিত্তিক ডিজিটাল অর্থনীতির বিকাশ ঘটানো। পাশাপাশি শিক্ষিত জনগোষ্ঠীকে ডিজিটাল যুগের উপযোগী মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেয়া ও দেশ-বিদেশে কর্মসংস্থান এবং প্রতিটি বাড়ি ও প্রতিটি মানুষকে সংযুক্তির আওতায় আনা। ডিজিটাল ক্ষেত্রে বিদ্যমান বৈষম্য হ্রাসেও পদক্ষেপ নিতে হবে।

সরকার এরই মধ্যে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি নামে একটি বিভাগ গঠন করেছে। ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে একীভূত করে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় হিসেবে একটি স্বতন্ত্র ও পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রণালয়ে পরিণত হয়েছে। এ সরকার ক্ষমতায় আসার ১০০ দিনের মধ্যেই প্রণয়ন করে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি নীতিমালা ২০০৯। এমনকি এ নীতিমালা সংশোধন ও নবায়নের কাজটিও সম্পন্ন করা হয়েছে ২০১১ সালে। অনলাইন ব্যাংকিং, ইলেকট্রনিক মানি ট্রান্সফার, এটিএম কার্ড ব্যবহার শুধু যে ক্যাশলেস সোসাইটি গড়াসহ ই-গভর্নমেন্ট প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখছে তা নয়, ই-কমার্সেরও ব্যাপক প্রসার ঘটাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে ই-কমার্স কোম্পানিগুলোর লাখো মানুষের কাছ থেকে প্রতারণামূলকভাবে হাজার হাজার কোটি টাকা নিয়ে বিদেশে পাচার করে দেয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে। এ থেকেই বোঝা যায়, দেশের মানুষ ডিজিটালাইজেশন সুবিধাগুলোর পাশাপাশি এর অসুবিধা ও নিরাপত্তাহীনতার নিগড়ে নিক্ষিপ্ত হচ্ছে। প্রযুক্তি একটি সর্বজনীন বিষয় হলেও এর সর্বোত্তম সদ্ব্যবহার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই হচ্ছে সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর জন্য

বড় চ্যালেঞ্জ।

বাংলাদেশের ডিজিটালে রূপান্তরে কয়েকটি বড় কৌশল নিয়ে কাজ করতে হবে। চ্যালেঞ্জগুলো হলো ১) শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতকে ডিজিটালে রূপান্তর ও ডিজিটাল দক্ষতাসম্পন্ন মানবসম্পদ উন্নয়ন, ২) সরকারের ডিজিটালে রূপান্তর ও জনগণের সব সেবা ডিজিটালকরণ ৩) শিল্প-বাণিজ্য তথা অর্থনীতির ডিজিটালে রূপান্তর ৪) ডিজিটাল সংযুক্তি প্রথম, সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ও গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জটি হচ্ছে ডিজিটাল শিল্প বিপ্লব বা জ্ঞানভিত্তিক সমাজের উপযোগী মানবসম্পদ সৃষ্টি নিয়ে। এজন্য শিক্ষার ডিজিটালে রূপান্তরের বিষয়টিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে। শিক্ষার বিষয়টি এখনো ঔপনিবেশিক স্তরেই রয়ে গেছে। এর পাঠদান পদ্ধতি, পাঠক্রম, শিক্ষক প্রশিক্ষণ সব ক্ষেত্রেই যুগান্তকারী রূপান্তর দরকার। ডিজিটাল বাংলাদেশ—এ ভাবনাই খাতটিতে যথাযথ প্রতিফলন হয়নি। যদিও ২০২২ সাল থেকে শিক্ষার পরিবর্তনের কথা বলা হচ্ছে, তবুও বিশেষ করে যে খাতটির বিশেষজ্ঞরাই ডিজিটালে রূপান্তরের বিষয়টি অনুধাবন করতে পারেন না, তারা কতটা সামনে দেখতে পাবেন সেই শঙ্কা তো রয়েই গেছে। পরের চ্যালেঞ্জটি হলো সরকারের ডিজিটালে রূপান্তর বা একটি ডিজিটাল সরকার প্রতিষ্ঠাবিষয়ক। এর আওতায় সরকার পরিচালনা পদ্ধতি ডিজিটাল করা ছাড়াও জনগণের কাছে সব সংস্থার সব সেবাকে ডিজিটাল উপায়ে উপস্থাপন করার বিষয়টিও রয়েছে। তৃতীয় চ্যালেঞ্জটি মূলত শিল্প-বাণিজ্য ও অর্থনীতির ডিজিটালে রূপান্তর। শিল্প-কল-কারখানা-ব্যবসা-বাণিজ্যসহ অর্থনীতির সব ধারার ডিজিটালে রূপান্তর এর প্রধান উদ্দেশ্য। সামগ্রিকভাবে এর উদ্দেশ্য একটি ডিজিটাল, সৃজনশীল বা জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিও গড়ে তোলা। চতুর্থ চ্যালেঞ্জটি হলো জনগণকে ডিজিটাল পদ্ধতিতে সংযুক্ত করা।

ডিজিটাল ডিভাইস ভবিষ্যতে দেশের জন্য সবচেয়ে বড় সম্ভাবনাময় রফতানি পণ্যের তালিকায় স্থান করে নেবে বলে প্রধানমন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। আরো দুই দশক আগেই দেশে সফটওয়্যার ও ডিজিটাল পণ্যের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছিল। প্রতিবেশী দেশ ভারত এক্ষেত্রে অনেক দূর এগিয়ে গেলেও আমরা আমাদের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারিনি। সেই সঙ্গে ই-গভর্ন্যান্স, ই-কমার্স এবং ডিজিটাল গণমাধ্যমের পরিষেবার ক্ষেত্রেও নানা বিড়ম্বনা, প্রতারণা ও নিরাপত্তাহীনতার আশঙ্কা ভর করেছে। ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডিজিটালাইজেশন ও আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স পরিষেবা যেন দেশের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনাকে সংকুচিত করে না দেয়, সেদিকেও লক্ষ রাখতে হবে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, ই-কমার্স ও ব্যাংকিং পরিষেবা থেকে শুরু করে সেলফোন অপারেটর কোম্পানির ইন্টারনেটের গতি, সেবার মান ও নিরাপত্তার গ্যারান্টি নিশ্চিত করতে পারে—এমন একটি আইনগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এখন জরুরি হয়ে পড়েছে। গত ১২ বছরে প্রত্যাশিত ই-গভর্ন্যান্স, তথ্য পরিষেবা, ভূমি ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়গুলোকে স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তাসহ ডিজিটালাইজেশনের যেটুকু বাস্তবায়ন হয়েছে, তা এখনো যথেষ্ট নয়। এক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং সংশ্লিষ্ট সবার মধ্যে এক ধরনের অনীহা দেখা যাচ্ছে। সরকারের প্রতিটি মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী থেকে শুরু করে বিচার বিভাগ, আইন বিভাগ ও আইন-শৃঙ্খলা বিভাগের সংশ্লিষ্ট সবাইকে তথ্যপ্রযুক্তি ও ডিজিটালাইজেশন সম্পর্কে বাস্তব ধারণা ও দক্ষতা নিশ্চিত করার কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। তথ্যপ্রযুক্তি আইনের অস্বচ্ছতা এবং যেকোনো অপপ্রয়োগ দূর করে তার সময়োপযোগী ও সফল প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।