বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস করপোরেশনের (বিটিএমসি) বন্ধ থাকা ১৬টি মিল পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের (পিপিপি) আওতায় পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেয় বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়। ২০১৪ সালে সিদ্ধান্ত নেয়া হলেও ২০১৭ সালে এসে একটি এবং ২০১৯ সালে আরেকটি মিল পিপিপির আওতায় চালুর জন্য চুক্তি হয়। হতাশাজনক বিষয় হলো, ২০২২ সালে এসেও দুটি মিলের কোনোটিই চালুর প্রক্রিয়া শুরু করা যায়নি। বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি চাপ প্রয়োগ করে বিক্রি হওয়া মিল চালু এবং অন্যান্য মিলও দ্রুত পিপিপিতে দেয়ার সুপারিশ করেছে। এক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে পিপিপিতে রাষ্ট্রায়ত্ত টেক্সটাইল মিল চালু করতে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় এবং বিটিএমসিকে আরো সক্রিয় হতে হবে।
স্বাধীনতার
পর সরকারের
ঘোষিত অর্থনৈতিক
পরিকল্পনা অনুযায়ী
এবং কিছুটা
বাধ্য হয়ে উল্লিখিত শিল্প-কারখানা রাষ্ট্রায়ত্ত করা হয়েছিল। কেননা
এসব শিল্প-কারখানার অধিকাংশেরই
মালিক ছিলেন
পাকিস্তানি। সরকারের
ভুল নীতি, দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনার কারণে অধিকাংশ কারখানা
কখনই লাভজনক
হয়নি। তাই ৫০ বছরের
নির্মম বাস্তবতা
হলো, লোকসানের
দায়ে আদমজীসহ
বহু কারখানা
বন্ধ করে দেয়া হয়েছে,
বহু কারখানা
বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। অনেকে
ভুয়া উদ্যোক্তা
সেজে কারখানা
কেনার নামে ব্যাংক থেকে কোটি কোটি টাকা ঋণ নিয়েছেন কিন্তু
কারখানা চালু করেননি। অনেকে
কারখানার জমি ও সম্পদ
ভোগ করেছেন
কিন্তু কারখানা
চালু করেননি।
তবে এর মধ্যেও বেসরকারি
অনেক উদ্যোক্তা
শিল্প-কারখানাকে
লাভজনক করতে পেরেছেন, যার মূল শক্তি
হলো সততা ও দক্ষতা।
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন
ওঠে, বেসরকারি
খাতের এসব শিল্প-কারখানা
লাভ করতে পারলে রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের কারখানাগুলো কেন ক্রমাগত লোকসান
দিয়ে যাবে? প্রায়ই রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানার শ্রমিকরা আন্দোলনে
নামেন বকেয়া
বেতন-ভাতা ও নতুন মজুরি কাঠামোর
দাবিতে। সরকার
কোটি কোটি টাকার জোগান
দিয়ে আন্দোলন
স্থগিত করছে।
কিন্তু এভাবে
তো রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের কারখানা চিরকাল
চলতে পারে না। বস্ত্র
ও পাট কারখানাগুলোর বহু পুরনো মেশিন
এ যুগে প্রায় অচল হয়ে পড়েছে,
এগুলোর উৎপাদন
ক্ষমতা খুবই কম।
পিপিপি
চালুর পর থেকে ৭৭টি প্রকল্প নেয়া হলেও দু-তিনটি দৃশ্যমান।
পিপিপির বেশির
ভাগ প্রকল্প
নেয়া হয়েছে
অবকাঠামো খাতে।
পিপিপি চালুর
পর থেকে বাজেটের পর বাজেট আসছে।
বাজেটে আলাদা
থোক বরাদ্দ
রাখা হলেও পিপিপির অর্থ খরচ হয় না। প্রয়োজন
না থাকায়
টাকাও ছাড় করা হয় না। এখানে
সমস্যাটা কেবল পিপিপি কিংবা
নির্দিষ্ট কোনো প্রকল্পের নয়; সমস্যা অর্থনৈতিক
সুশাসনের। এজন্য
রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত
প্রয়োজন। লাভজনক
প্রকল্পগুলো সরকার
নিজে বাস্তবায়ন
করছে। যেগুলো
অর্থনৈতিক দিক থেকে আকর্ষণীয়
নয়, সেগুলো
পিপিপিতে দিচ্ছে।
এক্ষেত্রে বেসরকারি
খাত আগ্রহী
না হওয়াটাই
স্বাভাবিক। বেসরকারি
খাতকে আগ্রহী
করতে হলে লাভের বিষয়টি
যেমন দেখতে
হবে, তেমনি
পদ্ধতিগত সংস্কারও
জরুরি। বিশ্বের
অনেক দেশে কারখানা তৈরি হচ্ছে পিপিপির
আওতায়। যেসব নতুন ব্যবসা-বাণিজ্য হচ্ছে,
সেখান থেকে আসা করের অংশ পাচ্ছে
পিপিপির বেসরকারি
অংশীদার। অন্য দেশ এসব করতে পারছে,
কারণ তারা একদিকে আস্থার
জায়গা তৈরি করেছে। অন্যদিকে
বিষয়টিকে দক্ষতা
ও গুরুত্বের
সঙ্গে নিয়েছে।
সেখানে বেসরকারি
মানে প্রতিযোগিতা। অংশীদারিত্বের সঙ্গে কাজ করার ক্ষেত্রে
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতাও সরকার যাচাই
করবে। সেখানে
কাজ পেতে স্বজনপ্রীতি নেই। যোগ্যরাই কাজ করতে পারছেন।
তার ওপর দুর্নীতিমুক্ত হয়ে স্বচ্ছতার সঙ্গে
কাজ করা সম্ভব হচ্ছে।
যে দেশগুলো
পিপিপিতে সফল হয়েছে, তারা যুগোপযোগী মডেল গ্রহণের মাধ্যমে
তা করেছে।
সেই সঙ্গে
লাভজনক হওয়া, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার বিষয়ও
রয়েছে।
বিটিএমসির কাছ থেকে মিল ভাড়া নিয়ে ব্যবসায়ীদের চালানোর অভিজ্ঞতাও সুখকর নয়। যেমন কয়েক বছর আগে রাজশাহী টেক্সটাইল মিলের ভাড়া ছেড়ে দেয় নারায়ণগঞ্জের মোবারক ট্রেডার্স নামের একটি প্রতিষ্ঠান। কারণ হিসেবে জানানো হয়, কারখানাটিতে বিদ্যুতের যে সংযোগ ছিল তা অত্যন্ত বেশি ক্ষমতার। এতে বিল অনেক বেশি আসত। বিটিএমসিকে বারবার চিঠি দিয়ে বিদ্যুতের কম ক্ষমতার সংযোগ পাইয়ে দেয়ার অনুরোধ করা হয়েছে। কিন্তু তারা সেটা করেনি। এখন সেটি অলস পড়ে আছে। বিটিএমসির নিয়ন্ত্রণে থাকা মিলগুলোর মধ্যে দুটি এখন ভাড়ায় চলছে। এর মধ্যে যশোরের অভয়নগর উপজেলার নওয়াপাড়ার বেঙ্গল টেক্সটাইল মিল চালাচ্ছে নারায়ণগঞ্জের আর কে ইয়ার্ন ট্রেডিং। যশোরে শ্রমিক সংকটের কারণে এখন আর লাভ হচ্ছে না বলে অভিযোগ করছেন উদ্যোক্তা। বিটিএমসির নয়টি মিল শ্রমিক-কর্মচারীদের কাছে হস্তান্তর করেছে সরকার। এর কিছু আংশিক চালু, কিছু পুরো বন্ধ হয়ে গেছে। এসব উদাহরণ মোটেও উৎসাহজনক নয়। এক্ষেত্রে আদমজী পাটকলের মতো বিটিএমসির কারখানাগুলোর জমিতে ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য প্লট বরাদ্দ দেয়া এবং সম্পদ ও যন্ত্রপাতি অন্য কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে।
পিপিপি
অর্থ সরকারি-বেসরকারি যৌথ অংশীদারিত্বে প্রকল্প
গ্রহণ, অর্থায়ন
ও বাস্তবায়ন।
এটি সফল করতে হলে প্রথমেই দেখতে
হবে প্রকল্প
নির্বাচন কতটা সঠিক। তারপর
দেখার বিষয় উভয়ের মধ্যে
কতটা আস্থা
রয়েছে। পাশাপাশি
প্রকল্প কতটা লাভজনক এবং উন্নয়ন সহায়ক
কিনা, তাও বিবেচনায় রাখা জরুরি। প্রকল্পের
বাণিজ্যিক দিকের
পাশাপাশি পদ্ধতিগত
জটিলতা নিরসন,
পিপিপি কর্তৃপক্ষের কার্যক্রমে লক্ষ্য নির্ধারণও
প্রয়োজন। এসব সম্পাদনের ক্ষেত্রে
কর্তৃপক্ষ কতটা আন্তরিক, তাও খাতিয়ে দেখা প্রয়োজন। দুঃখজনক
হলেও সত্য, সমস্যা আমলাতান্ত্রিক মানসিকতায়। পৃথিবীর প্রায়
প্রতিটি দেশেই
আমলাতন্ত্র রয়েছে।
আমলাতন্ত্র কিংবা
প্রশাসনযন্ত্র দিয়ে অনেক দেশই ভালো করছে।
আমলাতন্ত্র আর আমলাতান্ত্রিক মানসিকতা
এক বিষয় নয়। এখানে
জবাবদিহি অনুপস্থিত।
আমলাতান্ত্রিক মানসিকতার
কারণে সিদ্ধান্ত
গ্রহণে বিলম্ব
ঘটছে। আর এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে রাষ্ট্র।
রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প-কারখানা নিয়ে বিশেষজ্ঞরা গবেষণা করে সংকট উত্তরণে নানা সুপারিশ করেছেন। সরকারের উচিত সেসব সুপারিশ আমলে নিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা। প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে কমিটি গঠন করে তাদের কাছ থেকে সহযোগিতা নেয়া। তবে কমিটি গঠনের নামে সময়ক্ষেপণ করা যাবে না। লোকসান দিয়ে কোনো রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানা চালানো হলে তার দায় সংশ্লিষ্টদেরই নিতে হবে। রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প-কারখানা বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়ার ক্ষেত্রেও দেখতে হবে তাদের সেটি চালানোর অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা আছে কিনা। যাদের এ শিল্পের অভিজ্ঞতা নেই, কারখানা কেনার নামে তারা ব্যাংকঋণ কিংবা কারখানার সম্পদ যেন হাতিয়ে না নেন, সে বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে। অতীতে ভুল উদ্যোক্তাদের কাছে কারখানা বিক্রি করে সরকার দুভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভবিষ্যতে এর পুনরাবৃত্তি কাম্য নয়।
বিটিএমসির বন্ধ মিলগুলো পিপিপির মাধ্যমে পরিচালনা করার সিদ্ধান্ত ছিল যুগোপযোগী। এ মিলগুলো এভাবে চালু না করার কোনো বিকল্প ছিল না। তবে বেসরকারি খাতের সহযোগিতা বা তাদের পারফরম্যান্সের জন্য এগুলো প্রসারিত হচ্ছে। স্থানীয় বিনিয়োগকারী ও বিদেশী বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে যৌথভাবে বিটিএমসির কারখানাগুলো পরিচালনা করা যায় কিনা, তা খতিয়ে দেখা যেতে পারে। এক্ষেত্রে বিদ্যমান আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও লাল ফিতার দৌরাত্ম্য কমাতে হবে। কারখানাগুলোর অধিকাংশই পুরনো হয়ে যাওয়ায় বিপুল বিনিয়োগের প্রয়োজন পড়বে, সেক্ষেত্রে স্বল্প সুদে কীভাবে মূলধন জোগানো যায়, তারও পথনির্দেশনা থাকা আবশ্যক। কারখানা পিপিপিতে দিলে তা তদারকির জন্য একটি প্রতিষ্ঠান থাকা দরকার। সরকার তাই বিটিএমসিকে পুনর্গঠন করতে পারে।










