পরিবেশ দূষিত হওয়ার মাত্রা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। বায়ু, পানি ও শব্দদূষণ যেন আজ স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর প্রভাব পড়ছে জনস্বাস্থ্যের ওপর। জলবায়ুর প্রতিকূলতাও রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়াচ্ছে। পরিবেশের ওপর দূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের জন্য ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া ও খাদ্যাভাবজনিতসহ নানা জটিল ও অপরিচিত রোগ দেখা দিচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীতে ডায়রিয়া বেড়ে ওঠার জন্যও পানিদূষণকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। শুধু তা-ই নয়, বায়ুদূষণের কারণে হাঁপানিসহ ফুসফুসের রোগ বেড়ে উঠছে। পরিবেশের বিপর্যয় মানে জীবনের বিপর্যয়। প্রাণীর স্বাস্থ্য, প্রাণী উৎপাদন ব্যবস্থাপনা ও জলবায়ু পরিবর্তন একটি আন্তঃসম্পর্কিত জটিল প্রক্রিয়া। এর ওপর অনেকাংশেই নির্ভর করে রোগের প্রাদুর্ভাব, উৎপাদন ব্যবস্থাসহ অনেক কিছু। এমনিতেই বৈরী জলবায়ুর করালগ্রাস থেকে রেহাই পাচ্ছে না বাংলাদেশও। পাশাপাশি যোগ হয়েছে পরিবেশ দূষণ। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় তাই দূষণ রোধ ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় সরকারকে আরো উদ্যোগী হতে হবে। দূষণ রোধে আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় কার্যকর অভিযোজন কৌশল দ্রুত গ্রহণ করা প্রয়োজন।

দেশে বায়ুদূষণ মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছেছে। বায়ুদূষণে আক্রান্ত সারা দেশ। প্রতিটি জেলাতেই বায়ুদূষণের হার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নীতিমালা অনুযায়ী গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে অন্তত তিন গুণ বেশি। গ্রামাঞ্চলের চেয়ে শহরাঞ্চলে বায়ুর মান তুলনামূলকভাবে খারাপ অবস্থায় রয়েছে। রাজধানী ঢাকার বায়ুর মান সবচেয়ে বেশি অস্বাস্থ্যকর। বিশ্বের খারাপ বায়ুর মানের তালিকায় মাঝে মাঝেই ঢাকা শীর্ষস্থানে চলে যায়। অন্য সময় দুই বা তিন নম্বরে থাকে। বায়ুদূষণের কারণে বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু কমে যাচ্ছে। বায়ুদূষণের ফলে ফুসফুসের রোগ, বক্ষব্যাধিসহ বিভিন্ন রোগ বাড়ছে। মৃত্যুও বাড়ছে। বিভিন্ন গবেষণায় বায়ুদূষণের প্রধান কারণ হিসেবে যেসব উৎস চিহ্নিত করা হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে ইটভাটা, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্প-কারখানা, যানবাহন থেকে নির্গত ধোঁয়া, বিভিন্ন নির্মাণকাজের ধুলা, সমন্বয়হীন সংস্কারকাজ ও রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি, শহরের বর্জ্য উন্মুক্ত জায়গায় পোড়ানো, নিম্নমানের কয়লা ও তরল জ্বালানি ব্যবহার ইত্যাদি। কারণগুলো যেহেতু চিহ্নিত, তাহলে তা দূর করা যাবে না কেন? এটা করতে পারে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এর জন্য প্রথমেই প্রয়োজন গুরুতর এ সমস্যার গুরুত্ব অনুধাবন করা এবং সমস্যা সমাধানে আন্তরিক উদ্যোগ নেয়া। পরিবেশ দূষণের ক্ষেত্রে বায়ুর পরেই রয়েছে পানিদূষণ। প্রতিটি নদীই দখল-দূষণের শিকার। কোনো নদীই মানুষকে দূষণমুক্ত পানি দিতে পারছে না। ঢাকা ওয়াসা বুড়িগঙ্গার দূষিত পানি পরিশোধন করে ঢাকাবাসীকে সরবরাহ করে। ওয়াসার দাবি পরিশোধিত এ পানি বিশুদ্ধ এবং পান করার যোগ্য। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি হলো, নগরবাসী ওয়াসার পানি পাইপলাইনে পান। তারপর সেটা গ্যাসের চুলায় ভালোভাবে ফুটিয়ে নেন যাতে জীবাণুমুক্ত হয়। এরপর ফুটানো পানি ঠাণ্ডা করে ফিল্টারে দেয়া হয় ময়লামুক্ত করার জন্য। তবেই ওয়াসার পানি পান করার উপযুক্ত হয়। ওয়াসাকে পানির জন্য দাম দিতে হয় এবং এ দাম নিয়মিত বাড়ানো হচ্ছে। চুলা ব্যবহারের জন্য গ্যাস কিনতে হয়। সেটার দামও দফায় দফায় বাড়ছে। বিশুদ্ধ ও নিরাপদ পানি পান করতে নগরবাসীকে অনেক টাকা খরচ করতে হয়। আর এ খরচ শুধু বাড়ছেই। গ্রামাঞ্চলের মানুষ খাওয়ার পানির জন্য জলাশয়ের ওপর নির্ভর করতে পারে না দূষণের কারণে। তারা নলকূপের পানি ব্যবহার করে, যেখানে সুযোগ আছে। নলকূপের পানিতেও আবার আর্সেনিক দূষণের আশঙ্কা। ফসল উৎপাদনে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারে জলাধারের পানিও নষ্ট হচ্ছে। ভূগর্ভস্থ পানি মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারে এর স্তর ক্রমে নিচে নামছে। এমন বিপর্যয়কর দূষণ থেকে মুক্তি পেতে আইনের প্রয়োগ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও প্রাকৃতিক সম্পদের সুরক্ষায় যথাযথ উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন।

বিশ্বের বহু দেশ দূষণ কমিয়ে আনতে সমর্থ হয়েছে যথাযথ পরিকল্পনা ও পদক্ষেপের মাধ্যমে। মানুষ যেন গাড়ি নিয়ে শহরের কেন্দ্রে আসা কমিয়ে দেয়, সেজন্য লন্ডনের কেন্দ্রে গাড়ি চালাতে গেলে দিনে ১০ পাউন্ড বা প্রায় ১৪ ডলার কিংবা ১১ ইউরো ‘ভিড়ের মাশুল’ গুনতে হয়। রাস্তায় লাগানো যন্ত্র স্বয়ংক্রিয়ভাবে গাড়ির নম্বর প্লেট চিনে নিতে পারে অর্থাৎ ধরতে পারে ‘ভিড়ের মাশুল’ দেয়া হয়েছে কিনা। ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেনে ৩০০ কিলোমিটারের বেশি রাস্তা শুধু সাইকেল আরোহীদের জন্য রাখা হয়েছে; শহরের অর্ধেক বাসিন্দা সাইকেলে চড়ে অফিসে যান। স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদের রয়্যাল থিয়েটারের সামনের চত্বরটিতে এরই মধ্যে গাড়ি চলাচল নিষিদ্ধ, অন্যান্য এলাকাও ‘পথচারী এলাকা’ ঘোষণা করার প্রচেষ্টা চলছে। লক্ষ্য হলো, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে মাদ্রিদের গোটা কেন্দ্রীয় অংশটি শুধু পথচারীদের জন্য খোলা রাখা। এর কারণ হলো, মাদ্রিদের চারপাশে পাহাড় থাকার ফলে দূষিত বায়ু শহরেই আটকা পড়ে ও ধোঁয়াশার সৃষ্টি হয়। দূষিত নদীকে পরিশুদ্ধ করে পর্যটনের স্থানে রূপ দিয়েছে ইতালির ভেনিস। এমন আরো উদাহরণ খুঁজে বের করা সম্ভব। চীনের বেইজিংকে দূষণমুক্ত করতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ ও শিল্প-কারখানার দূষণ কমিয়ে এনেছে মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই। বাংলাদেশের জন্যও বিষয়টি কঠিন নয়। পরিবেশ রক্ষা ও উন্নয়নের লক্ষ্যে একটি পৃথক মন্ত্রণালয় ছাড়াও অধিদপ্তর ও বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ রয়েছে, যারা সরকারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করে। এসব সংস্থার জনবলও কম নয়। তার পরও কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হয় না। সমস্যা হচ্ছে সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার অভাব।

পরিবেশ দূষণ রোধে সরকার আইন প্রণয়ন থেকে শুরু করে অনেক পদক্ষেপই নিয়েছে। কিন্তু এর অধিকাংশই কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ। মাঝে মধ্যে কিছু অভিযান পরিচালিত হলেও তার ফল প্রত্যাশিত নয়। পরিবেশের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সম্পর্কিত আইনের সংখ্যা প্রায় ২০০টি। দূষণ রোধে ১৯৯৫ সালে বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন এবং ১৯৯৭ সালে পরিবেশ দূষণ বিধিমালা প্রণয়ন করা হয়। পরিবেশ আদালত আইন প্রণয়নের মাধ্যমে বিচারিক আদালতে বিশেষায়িত পরিবেশ বিচার ব্যবস্থা চালু করা হয় ২০০০ সালে। দেশের প্রতিটি বিভাগে এক বা একাধিক পরিবেশ আদালত এবং সারা দেশের জন্য এক বা একাধিক পরিবেশ আপিল আদালত প্রতিষ্ঠার বিধান রাখা হয় আইনে। পরিবর্তনের হাওয়ায় আগের আইনটি রহিত করে ২০১০ সালের পরিবেশ আদালত আইন নামে সম্পূর্ণ নতুন একটি আইন প্রণয়ন করা হয়। দুঃখজনক ব্যাপার, পরিবেশ আদালত আইনে জনগণকে সরাসরি মামলা দায়েরের অধিকার দেয়া হয়নি। তবে কিছু আশাব্যঞ্জক নীতিমালা পরিলক্ষিত হয়। জাতীয় পরিবেশ নীতি (১৯৯২), জাতীয় পরিবেশ অ্যাকশন প্ল্যান (১৯৯২), বননীতি (১৯৯৪), বনায়ন মাস্টারপ্ল্যান (১৯৯৩-২০১২) ও পরিবেশ সংরক্ষণ আইন (১৯৯৫) উল্লেখযোগ্য। জাতীয় সংরক্ষণ কৌশল (ন্যাশনাল কনজারভেশন স্ট্র্যাটেজি) এবং বিশেষত জাতীয় পরিবেশ ব্যবস্থাপনা অ্যাকশন প্ল্যান সবার সহযোগিতায় প্রণীত হয়েছে। উপরন্তু ব্যবস্থাপনা কর্মসূচি ও অ্যাকশন প্ল্যান বাস্তবায়নে বিভিন্ন সামাজিক শক্তিসহ সরকারি বিধি ও নিয়ন্ত্রণের মতো বিভিন্ন নীতিগত পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে যদিও সবক্ষেত্রে সুফল মিলছে না।

ঢাকার বায়ুদূষণের অন্যতম কারণ ট্রাফিক জ্যাম। যানবাহন জ্যামে পড়লে যে তেল পুড়ে, তাতে পরিবেশ দূষণ বাড়ে। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় সুশৃঙ্খল আনা জরুরি। আরেকটা কারণ হচ্ছে, বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বা অবকাঠামো নির্মাণ। উন্নয়ন কর্মকাণ্ড চলবে, কিন্তু তার জন্য আলাদা একটা সময় নির্ধারণ করা উচিত। কোন সময় এসব কাজ করলে পরিবেশ দূষণ কম হয়, সেসব বিষয় বিবেচনা করা উচিত। উন্নয়নকাজ করলে ধুলা, বালি, বায়ুদূষণ হবেই, তবে বিশ্বের উন্নত দেশগুলোয় এসব কাজের ক্ষেত্রে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে কাজ করা হয়। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং বায়ুদূষণ রোধে আমাদের সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন, পাশাপাশি তা প্রয়োগ এবং বাস্তবায়নের দিকে নজর দেয়া প্রয়োজন। ইট ভাটাও বায়ু দূষণের জন্য দায়ী। সনাতনী ইট ভাটা বন্ধ এবং আধুনিক ইট ভাটা স্থাপনে যথাযথ উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। সুপেয় পানি নিয়ে সবার উদ্বেগ রয়েছে। ঢাকার মানুষ ফুটানো ছাড়া পানি পান করতে পারে না। ওয়াসার পানের উপযোগী পানি সরবরাহের মাধ্যমেও আমরা কিছুটা হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি কমাতে পারি। সবকিছু জনগণের ওপর চাপিয়ে দেয়ার কিছু নেই। এটা নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়নের বিষয়। যারা এসব বিষয় বাস্তবায়ন করবেন, তারা আরো বেশি মানবিক হবেন এবং সবাইকে সুস্থভাবে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করবেন—এটাই প্রত্যাশা।