চালের বাজার অস্থির। ক্রমেই বাড়ছে প্রধান খাদ্যপণ্যটির দাম। সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, কম দামি মোটা চাল এখন ৫৩-৫৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মাঝারি মানের চাল বিক্রি হচ্ছে ৬৮-৭০ টাকায়। সরু মিনিকেট ৭২-৭৪ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া নাজিরশাইল বিক্রি হচ্ছে ৮০-৮২ টাকায়। অন্যসব নিত্যপণের সঙ্গে চালের মূল্যবৃদ্ধি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর দুর্ভোগ বাড়িয়ে তুলছে। ভরা মৌসুমে চালের দামের ঊর্ধ্বগতি রোধে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিয়েছে মন্ত্রিসভা। বিশেষ অভিযানের কথাও বলা হয়েছে। শুধু অভিযান নয়, মজুদবিরোধী আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি।
অনেক দিন চালের দামে ঊর্ধ্বগতি বিরাজ করছে। কমার লক্ষণ নেই। এর মধ্যে কিছু প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব যোগ হয়েছে। এবার বোরো মৌসুমের শুরুতে হাওরে আগাম পানি এসে কিছু ধান নষ্ট হয়েছে। এছাড়া ঘূর্ণিঝড় অশনির কারণে সারা দেশে ব্যাপক বৃষ্টিপাত পাকা ধানের ক্ষতি করেছে। ওইদিকে রাশিয়া-ইউক্রেনের যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারেও চালের দাম কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী। স্বভাবত এর একটা উত্তাপ দেশের চালের বাজারে রয়েছে। তবে এরই মধ্যে বোরো ধানের বেশির ভাগই উঠে গেছে। এ ভরা মৌসুমের মধ্যেও দুই দফা বেড়েছে খাদ্যপণ্যটির দাম। এ অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির পেছনে বেশকিছু কারণ দায়ী। গত কয়েক বছর শুধু মিলারদের কারসাজিতে বাজারে চালের দামে অস্থিরতা দেখা দিত। এবার মিলারদের সঙ্গে বড় কিছু কোম্পানি সুযোগ নিচ্ছে। তারা মাঠে ধান পাকার আগেই কৃষকের কাছ থেকে ধান কিনে রেখেছেন। সেই ধান পাকার পরও তাদের গুদামে মজুদ করছেন। ধান ও চাল কিনে রেখে ভবিষ্যতে ভালো মুনাফা করার সুযোগ খুঁজছেন একশ্রেণীর মৌসুমি ব্যবসায়ী। উচ্চহারে শুল্ক আরোপের কারণে বিদেশ থেকে চাল আমদানির সুযোগ কম, প্রতিযোগিতা কম। এমন পরিস্থিতিতে কিছু ব্যবসায়ী, চালকলের মালিক ও বড় কৃষক ধান কিনে রাখতে বিনিয়োগ করছেন; যা সরবরাহে টান সৃষ্টি করে বাজারে দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে সরকারি গুদামে পর্যাপ্ত পরিমাণে চাল মজুদ আছে। বেসরকারি খাতেও চালের সংকট নেই। এর মধ্যে বোরো ধান থেকে রূপান্তর হওয়া চালও বাজারে আসছে। তথ্য বলছে, হাওরে বন্যায় ৮০ হাজার টন চাল নষ্ট হওয়ার পরও এবার বোরো মৌসুমে ২ কোটি ৭ লাখ টনের ওপরে চাল উৎপাদন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ইউএসডিএর বৈশ্বিক দানাদার খাদ্যশস্য উৎপাদনবিষয়ক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশে গত বছরের তুলনায় এ বছর দেড় লাখ টন চাল বেশি উৎপাদন হবে। সব মিলিয়ে চলতি অর্থবছরে ৩ কোটি ৬০ লাখ টন হওয়ার কথা। এমন চিত্রের পরও বাজারে চালের দাম বাড়ছে, যা উদ্বেগজনক।
বাজারে এখন ডাল, তেল, চিনিসহ প্রায় সব নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য ও সাবান, টুথপেস্টসহ নিত্যব্যবহার্য পণ্যের দাম চড়া। এ অবস্থায় চালের মূল্যবৃদ্ধি বিপাকে ফেলছে মানুষকে। চাল দৈনন্দিন খাদ্যসামগ্রীর মধ্যে প্রধান উপাদান। তাই নিম্ন আয় ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ওপর এর মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব অসমানুপাতিকভাবে পড়ে। চাহিদা ও সরবরাহের তত্ত্বের সঙ্গে বর্তমান অবস্থার মিল নেই। কাজেই এখানে যে বাজার বিকৃতি ঘটেছে, সেটি স্পষ্ট।
দেশে মজুদবিরোধী আইন আছে। কেউ ইচ্ছা করলেই চালের মতো অতিপ্রয়োজনীয় পণ্য মজুদ করে রাখতে পারেন না। এ আইনের আওতায় পাইকারি ব্যবসায়ীরা ধান ও চাল সর্বোচ্চ ৩০০ টন পর্যন্ত মজুদ রাখতে পারবেন ৩০ দিনের জন্য। আর খুচরা পর্যায়ের ব্যবসায়ীরা ১৫ টন ধরে রাখতে পারবেন ১৫ দিন। অটো রাইস মিলগুলো ১৫ দিনে যে পরিমাণ ধান ভানতে পারে, এর পাঁচগুণ ধান মজুদ রাখতে পারবে। আর ১৫ দিনে যে পরিমাণ চাল উৎপাদন করতে পারবে, তার দ্বিগুণ চাল জমা রাখতে পারবে তাদের গুদামে। এ আইনে বিভিন্ন ধরনের শাস্তির কথাও বলা হয়েছে। অতিরিক্ত পণ্য মজুদ ও কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বিভিন্ন পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির একটি প্রবণতা তৈরি হয়েছে। আইনটির প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলে আজকের এ পরিস্থিতি তৈরি হতো না। তাই ভবিষ্যতে এ ধরনের সংকট এড়াতে আইনটির কঠোর প্রয়োগ জরুরি।
ঊর্ধ্বমুখী বাজার পরিস্থিতিতে অভিযান পরিচালনা করে যে খুব একটা লাভ হয় না, তার প্রমাণ ভোজ্যতেলের বাজার। দাম স্থিতিশীল রাখতে মজুদবিরোধী অভিযান চালাচ্ছে সরকার। দায়ীদের জরিমানা ও অন্য দণ্ড দেয়া হচ্ছে। তবু ভোজ্যতেলের দাম কমে আসছে না। গত বছরও সরকারের পক্ষ থেকে দাম স্থিতিশীল রাখতে চালের অভিযান চালানো হয়েছিল। সেটি তেমন কাজে আসেনি। পরে অবশ্য স্বীকার করা হয়েছিল যে, প্রকৃত অর্থেই চালের সংকট রয়েছে। এবারো তেমনটা হচ্ছে কিনা, সেটি প্রথমে খুঁজে বের করতে হবে। বিশেষজ্ঞদের কারো কারো মত হলো, অভিযানে বরং হিতে বিপরীত হয়। সরবরাহ আরো কমে যায়। কাজেই শুধু অভিযান নয়, সরকারি উদ্যোগে বাজারে সরবরাহ বাড়াতে হবে। সেক্ষেত্রে কমমূল্যে খোলাবাজারে (ওএমএস) চাল বিক্রির তত্পরতা বাড়াতে হবে।
দেশে বোরো মৌসুমে বছরের চাহিদার অর্ধেকের বেশি চাল সংগ্রহ হয়। বাজারে চাল উঠতে শুরু করলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যটির দাম কমে আসে। এবার এর উল্টো প্রবণতা দেখে অনেকেই বিস্ময় প্রকাশ করছেন। এমন প্রেক্ষাপটে সরকারি মহল থেকেও বাজার কারসাজির বিষয়টি সন্দেহ করা হচ্ছে। উন্নত দেশসহ বিশ্বের বেশির ভাগ দেশে মেমোরেন্ডাম অব অ্যাসোসিয়েশন ও আর্টিকেল অব অ্যাসোসিয়েশন খুব সুনির্দিষ্ট। সুনির্দিষ্ট পণ্যের বাইরে কেউ পণ্যের উৎপাদন বা ব্যবসা করতে পারে না। আমাদের দেশে একটি মেমোরেন্ডাম অব অ্যাসোসিয়েশনের মধ্যে অনেক বিষয় সংযোজন করার একটা প্রবণতা রয়েছে। ফলে সুযোগ বুঝে এবং অতিমুনাফার আশায় নিজস্ব এখতিয়ারের বাইরের কোনো পণ্যের ব্যবসায় যুক্ত হয়ে পড়ে। বর্তমানে চালের ব্যবসায়ও এমনটা হচ্ছে কিনা, নজরদারি করা জরুরি।
বোরোর ভরা মৌসুমে বাজারে চালের মূল্যবৃদ্ধি সুলক্ষণ নয়। চালের দাম নিয়ন্ত্রণে ব্যবসায়ীরা কারসাজি করছেন কিনা তা খতিয়ে দেখতে কড়া নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। বিশেষ করে করপোরেট ব্যবসায়ীদের মধ্যে যারা চালের কারবারে নেমেছেন, তাদের সম্পর্কে খোঁজ নিতে, এ-সংক্রান্ত ব্যবসার অনুমোদন আছে কিনা, খতিয়ে দেখতে বলা হয়েছে। মূল্য স্বাভাবিক রাখতে অতিদ্রুত তেলের মতো চালের বাজারেও বিশেষ অভিযান চালানোর জন্য খাদ্য মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছে মন্ত্রিসভা, এটা সময়োপযোগী। বাজার জরিপ করে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্টদের সক্রিয় হতে হবে। পাশাপাশি টিসিবির কার্যক্রম আরো বাড়াতে হবে। বাণিজ্য ও খাদ্য মন্ত্রণালয়ের যুগপৎ প্রয়াসে চালের দাম কমে আসবে বলে প্রত্যাশা।










