গত মাসে আমি মা-বাবাকে দেখতে নিজ শহর বোগোতায় গিয়েছিলাম। সেখানে কীভাবে মানুষের পারস্পরিক প্রতিবেশিতার সম্পর্ক ছিন্ন হয়েছে তা প্রত্যক্ষ করেছি। নিজের প্রাণ বাঁচাতেই সবাই এখন ব্যস্ত। বেঁচে থাকতে তাদের অনেকেই রাস্তায় নেমে ভিক্ষা করছে। এপ্রিলের শেষ সময় থেকে সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে কলম্বিয়া সামাজিক অস্থিরতার অন্যতম বড় ঢেউয়ের মুখোমুখি হয়েছে। রাস্তায় মানুষ ক্ষোভ-বিক্ষোভ জানাচ্ছে, আন্দোলন করছে। এসব আন্দোলনের মূলে রয়েছে ক্ষুধা। গত জুলাইয়ে দক্ষিণ আফ্রিকাও এ ধরনের অস্থিরতা, রাজনৈতিক গোলযোগের মুখোমুখি হয়েছিল।

কভিড-১৯ মহামারীর বিপর্যয়কর সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব এবং জলবায়ু সংকটের সঙ্গে বেড়ে চলা ক্ষুধা অনেক দেশেই অস্থিরতা ও জন-অসন্তোষ সৃষ্টি করছে। জাতিসংঘের সাম্প্রতিক তথ্যানুসারে, মহামারী ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা আরো ১৬১ মিলিয়ন বাড়িয়েছে। এখন এ সংখ্যা মোট ৮১১ মিলিয়নের কাছাকাছি। তিনজনের মধ্যে প্রায় একজন (প্রায় ২ দশমিক ৪ বিলিয়ন মানুষ) পর্যাপ্ত পুষ্টির ঘাটতিতে ভুগছে।

২০৩০ সাল নাগাদ বৈশ্বিক ক্ষুধা ও পুষ্টিহীনতা অবসানের একটা লক্ষ্য নিয়েছে জাতিসংঘ। এক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি না ঘটায় সংস্থাটির মহাসচিব এন্তোনিও গুতেরেস নিউইয়র্কে গত ২৩ সেপ্টেম্বর একটি ফুড সিস্টেমস সামিটের আয়োজন করেছেন। এ সম্মেলনকে বৈশ্বিক খাদ্য উৎপাদন, পরিভোগ ও খাদ্য-সম্পর্কিত চিন্তাভাবনার উপায় রূপান্তরে সাহসী ও নতুন পদক্ষেপ সম্পর্কে আলোচনার সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

সম্মেলনটি শুরু থেকেই বিতর্কের জন্ম দিয়েছে, প্রধানত এজেন্ডা নির্ধারণে করপোরেট স্বার্থের প্রভাবের কারণে। যেজন্য সমালোচকরা এটিকে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে বেসরকারীকরণের চেষ্টা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। প্রধান করপোরেট মোড়লদের নেতৃস্থানীয় ভূমিকায় রেখে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের অংশীদারিত্বে জাতিসংঘ প্রাক-সামিট এজেন্ডা নির্ধারণ করেছে।

জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা ব্যাপকভাবে এ প্রক্রিয়ার সমালোচনা করেছেন, যা জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্যনিরাপত্তাবিষয়ক কমিটিকে (সিএফএস) কোণঠাসা করেছে। সিএফএসের আলোচনাগুলোয় ক্ষুদ্র চাষী, জেলে, আদিবাসী ও নাগরিক সমাজের কয়েকশ প্রতিনিধির অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়। জাতিসংঘের খাদ্য অধিকারবিষয়ক বিশেষ দূত মাইকেল ফখরির কথায়ও তৃণমূলের কৃষক জনগোষ্ঠীগুলোর অভিযোগ প্রতিধ্বনিত হয়েছে, যাদের পাঁচশরও বেশি আলোচ্য সামিট বয়কট করেছে। এ সম্মেলনে পছন্দের করপোরেশনগুলোর অত্যধিক প্রভাবকে তিনি ‘মুরগির ঘরে ইঁদুরকে আমন্ত্রণের’ মতো ব্যাপার বলেছেন। 

ক্ষুদ্র জোতদার, কৃষক, জেলে, গবাদি পশুপালক ও আদিবাসীরা করপোরেট সরবরাহ নিগড়ে প্রায় কোনো রকম প্রবেশ ছাড়াই বিশ্বের বেশির ভাগ জনসংখ্যার খাদ্যের জোগান দেয়। বিশ্বের প্রায় ৮০ শতাংশ কৃষকই দুই হেক্টরের চেয়ে ছোট, অথচ তাদের জমির পরিমাণ বিশ্বের মোট কৃষিজমির মাত্র ১২ শতাংশ। অন্যদিকে বৃহৎ ১ শতাংশ এগ্রিবিজনেস ফার্মগুলো নিয়ন্ত্রণ করে মোট কৃষিজমির ৭০ শতাংশেরও বেশি।

বহুজাতিক করপোরেশনগুলোর স্পষ্টতই একটি স্বার্থের সংঘাত থাকে, যখন ভূমি দখল, পুষ্টিহীনতা, কর ফাঁকি ও কীটনাশকের অতিব্যবহার ঠেকানোর প্রসঙ্গ আসে। একই কথা সত্য কেন্দ্রীভূত/নিবিড় আবাদ প্রক্রিয়া থেকে আরো সামাজিকভাবে ন্যায্য, স্থায়িত্বশীল ও টেকসই কৃষিচর্চা-কৃষিবিদ্যার দিকে যাওয়ার দাবিগুলো তুলে ধরার ক্ষেত্রেও। কেননা এসব প্রতিষ্ঠান তাদের শেয়ারহোল্ডারের কাছে দায়বদ্ধ, যেখানে জনকল্যাণ সুরক্ষার চেয়ে মুনাফা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু খাদ্য একটি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয় এবং এর অভিগম্যতা একটি মৌলিক মানবাধিকার। ঠিক এ জায়গা থেকেই আলোচনা শুরু হওয়া উচিত।

খাদ্যে ক্রমাগতভাবে করপোরেট আধিপত্য বৃদ্ধিতে আমাদের সবারই চিন্তিত হওয়া উচিত। এটা নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে কিংবা নজরদারির বাইরে থেকে গেলে আমরা একটি বিবর্ণ ভবিষ্যতের মুখোমুখি হব, যেখানে বড় খামারের একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠী আমরা যা খাই এবং কীভাবে সেটি প্রস্তুত হয়, তার পুরো প্রক্রিয়াটি নিয়ন্ত্রণ করবে। অতি প্রক্রিয়াজাত ভোগ্যপণ্যের বর্ধিত ভোগ (স্থূলতা, টাইপ ২ ডায়াবেটিস এবং সম্পর্কিত রোগগুলোর প্রধান অনুঘটক) স্বাস্থ্যঝুঁকির বিপদ আমাদের প্রতিনিয়তই জানান দিচ্ছে।

এই করপোরেট আধিপত্য এ বিশ্বাসেরই প্রতিফলন ঘটায় যে বৃহৎ অ্যাগ্রিবিজনেসগুলো খাদ্য জোগানোর আবশ্যক, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে তাদের স্বার্থ যুক্ত এবং আমাদের খাদ্য ব্যবস্থা বিন্যস্ত করতে গৃহীত বিধি ও নীতি প্রণয়নে তারা সরকার ও নাগরিক সমাজের চেয়ে অধিক সুসজ্জিত। এটি করপোরেশনগুলোকে ভূমি, পানি, মত্স্য সম্পদ, আধা একচেটিয়া বাণিজ্যিক বীজ এবং ব্যাপকভাবে কীটনাশক ও রাসায়নিক সার ব্যবহারে নিজেদের কর্তৃত্ব বৃদ্ধির সুযোগ দেয়। আর এটি করে অনেকটা দৃষ্টির বাইরে থাকা আনুষঙ্গিক ক্ষতিগুলো স্বীকার না করেই। ইউএন ফুড সিস্টেমস সামিটের মতো প্রধান আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোয় করপোরেট আধিপত্যের এ দৃষ্টিভঙ্গিকে অনুমোদন দেয়ার বিষয়টি গণতন্ত্র ও আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারকে আরো অবমূল্যায়িত করবে। 

কীটনাশকের কথা ভাবুন। ক্ষতি সত্ত্বেও কৃষি শ্রমিক ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিষক্রিয়া, দূষণ, মাটির জীববৈচিত্র্য কমানোসহ সাম্প্রতিক দশকগুলোয় কীটনাশকের ব্যবহার বেড়েছে। উৎপাদকরা এসব পণ্য আগ্রাসীভাবে বিপণন করেন এবং সেগুলো যে ক্ষতি করে তার ব্যাপ্তি অস্বীকার করেন। জোরগলায় তারা বলেন, যদি যথাযথভাবে ব্যবহার করা হয় তাহলে সেটি নিরাপদ। আলোচ্য কীটনাশক কোম্পানিগুলো আরো দাবি করে, বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে একটি বর্ধিষ্ণু জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা মেটাতে কীটনাশক/বালাইনাশক জরুরি।

এক্ষেত্রে ব্রাজিলের ঘটনা উল্লেখ করা যায়। ২০২০ সালের মার্চ থেকে ২০২১ সালের মে—এ সময়ের মধ্যে সরকার বাণিজ্যিক কীটনাশকে কর দাড় দিয়েছে এবং নতুন ৬১৩টি নতুন পণ্য অনুমোদন দিয়েছে, যদিও দেশটি এরই মধ্যে কীটনাশক ব্যবহারে বিশ্বের শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। প্রতিবেশ ব্যবস্থা ও মানুষের ওপর এর প্রাণঘাতী পরিণাম সত্ত্বেও দেশটির প্রেসিডেন্ট জাইর বোলসোনারো রফতানির জন্য কৃষিপণ্যের উৎপাদন বাড়াতে চান।

একইভাবে বহুজাতিক করপোরেশনগুলো কলম্বিয়ানদের ক্ষুধা কিংবা অপুষ্টি নিয়ে প্রতিবাদ করা থেকে থামাবে না। এসব মানুষের এমন এক সরকার প্রয়োজন, যেটি জোরালো সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর জন্য অর্থ সংগ্রহে বৃহৎ কোম্পানিগুলোর ওপর করারোপে সমর্থ। উপরন্তু, তাদের এমন এক সরকার দরকার, যারা সুবিধাবঞ্চিত ও প্রান্তিক কৃষক এবং আদিবাসীদের ভূমি অধিকারে বিরাজমান চরম অসমতা বদলাতে বদ্ধপরিকর।

বেড়ে চলা ক্ষুধা ও অপুষ্টির মতো সংকট সমাধানে বৈশ্বিক করপোরেশনগুলোর দিকে তাকানোর পরিবর্তে জাতিসংঘ ও জাতীয় সরকারগুলোকে অবশ্যই খাদ্যে করপোরেট কর্তৃত্বের অবসান ঘটাতে হবে এবং পরিবেশবান্ধব একটি কৃষি প্রতিবেশ ব্যবস্থার দিকে উত্তরণ ঘটাতে হবে। সরকারগুলোর এটা করা উচিত বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর ন্যায্যভাবে করারোপ করে এবং তাদের কর্মকাণ্ডের পরিবেশগত ও মানবাধিকার পরিণামের বিষয়ে জবাবদিহিতা নিশ্চিতের মাধ্যমে।

১৯৪৮ সালে জাতিসংঘ স্বীকার করেছে যে খাদ্য একটি মৌলিক মানবাধিকার। দুঃখজনকভাবে, জাতিসংঘের কিছুদিন আগে শেষ হওয়া খাদ্য সম্মেলন কয়েকশ মিলিয়ন ক্ষুধার্ত, ভুখা-নাঙ্গা মানুষের মধ্যে আশা সঞ্চারের পরিবর্তে করপোরেট মুনাফাকে অধিক সহায়তা করেছে।

[স্বত্ব:
প্রজেক্টসিন্ডিকেট
]

 

সোফিয়া মনসালভে: ফিয়ান ইন্টারন্যাশনালের মহাসচিব, ইন্টারন্যাশনাল প্যানেল অব এক্সপার্টস অন সাসটেইনেবল ফুড সিস্টেমসের সদস্য

ভাষান্তর: হুমায়ুন কবির