বিশ্বে উল্লেখযোগ্য হারে শিশুমৃত্যুর হার কমে এলেও নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে এখনো প্রতি বছর ৫০ লাখ শিশু মারা যাচ্ছে। বাংলাদেশও এমন প্রবণতার বাইরে নয়। শিশুমৃত্যুর অন্যতম কারণ হিসেবে গবেষকরা অসুস্থ শিশু হাসপাতাল ছাড়ার মতো অবস্থায় পৌঁছনোর আগেই হাসপাতাল ছেড়ে যাওয়াকে দায়ী করছেন। চাইল্ডহুড অ্যাকিউট ইলনেস অ্যান্ড নিউট্রিশন (চেইন) পরিচালিত চাইল্ডহুড মরটালিটি ডিউরিং অ্যান্ড আফটার অ্যাকিউট ইলনেস ইন আফ্রিকা অ্যান্ড সাউথ এশিয়া শীর্ষক এক গবেষণায় এমন তথ্যই উঠে এসেছে। গতকাল বণিক বার্তায় প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অসুস্থ পুষ্টিহীনতার শিকার শিশুদের ক্ষেত্রে হাসপাতালে থাকা অবস্থায় বা ছাড়া পাওয়ার পর পুষ্টিহীন নয় এমন শিশুদের চেয়ে মৃত্যুর ঝুঁকি পাঁচগুণ বেশি। এক্ষেত্রে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর শিশুরা অসুস্থতা থেকে সেরে উঠছে বলে মনে হতে পারে। কিন্তু তারা দুর্বল থাকে এবং তাদের মধ্যে সংক্রমণের আশঙ্কা বেশি থাকে। দুঃখজনক বিষয় হলো, নিবন্ধিত মৃত্যুর অর্ধেকই হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর ঘটেছে। পরিস্থিতি উন্নয়নে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া শিশুদের নিবিড় পর্যবেক্ষণ জোরদার এবং যেসব শিশু সম্প্রতি হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছে ও যারা চিকিৎসকের পরামর্শ না মেনে হাসপাতাল ত্যাগ করেছে উভয় ক্ষেত্রেই জরুরি স্বাস্থ্যসেবা লাভের ব্যবস্থা করা। এক্ষেত্রে কমিউনিটি ক্লিনিক, পুষ্টি ক্লিনিক, পুষ্টি আপার মতো কার্যক্রমকে সম্পৃক্ত করে কর্মসূচি গ্রহণ করা প্রয়োজন।
গবেষণায় শিশুদের চিকিৎসা সম্পন্ন হওয়ার আগে হাসপাতাল ত্যাগের পেছনে কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। তার মধ্যে আর্থিক সামর্থ্যের ঘাটতি যেমন রয়েছে, তেমনি সচেতনতার অভাবও রয়েছে। শুধু তা-ই নয়, পরিবারের অন্য সদস্যদের দেখভাল, গৃহপালিত পশুর দেখাশোনা, রান্নাসহ অন্যান্য কারণেও শিশু পুরোপুরি সুস্থ হওয়ার আগেই পরিবার হাসপাতাল থেকে তাদের নিয়ে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকছে অপুষ্টির শিকার শিশুরা। তীব্র অপুষ্টিতে ভোগা শিশুর সর্বোচ্চ হারের দিক থেকে বিশ্বে বাংলাদেশ চতুর্থ। ২০১১ সালের খানা জরিপের তথ্যানুযায়ী দেশের ছয় লাখ শিশু তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে। পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, ২০২১ সালে দেশের হাসপাতালগুলোয় চিকিৎসা নিতে আসা মারাত্মক তীব্র অপুষ্টিতে ভোগা শিশুর সংখ্যা বেড়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৭২ শতাংশেরও বেশি। খবরটি চরম উদ্বেগজনক। এখনকার দিনে মারাত্মক তীব্র অপুষ্টি না হলে শিশুর মৃত্যু হয় না এটা ঠিকই, কিন্তু অপুষ্টি অনেক সময়ই শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশের ক্ষেত্রে একটা বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। রোগের বিরুদ্ধে (বিশেষ করে সংক্রামক রোগ) লড়াই করার শক্তি কমে যায়, বুদ্ধিবৃত্তির সম্পূর্ণ স্ফুরণ না হওয়ায় শিশুর ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাগুলোর বিকাশ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। গবেষণায় দেখা গেছে, হাসপাতালে ৩ থেকে ৬ সপ্তাহ অবস্থান করলে শিশুর পুষ্টি পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়। কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ের আগেই হাসপাতাল থেকে শিশুকে নিয়ে যাওয়ায় তাতে ছেদ পড়ে এবং ক্ষতির পরিমাণ বেশি হয়। এমন প্রবণতা বন্ধে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, প্রশিক্ষণ এবং বাড়িতে রেখে পর্যাপ্ত সেবা নিশ্চিতে বিকল্প প্রক্রিয়া অনুসন্ধান প্রয়োজন।
যেসব রাষ্ট্র দ্রুততার সঙ্গে অপুষ্টি কমিয়ে আনতে সমর্থ হয়েছে, সেসব দেশে এটি সম্ভব হয়েছে সরকারি পর্যায়ের নেতৃত্বে সৃষ্ট সহায়ক রাজনৈতিক পরিবেশের কারণে। এ বিষয়ে ভারতের মহারাষ্ট্রের উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। ২০০৬ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে অত্যন্ত দ্রুত হারে খর্বকায় শিশুর সংখ্যা কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে রাজ্যব্যাপী পরিচালিত পুষ্টি কার্যক্রম বড় ভূমিকা রেখেছে। পেরুতে সুশীল সমাজের নেতৃত্বে সংগঠিত প্রচেষ্টার ফলস্বরূপ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রার্থীরা জনসমক্ষে অপুষ্টি প্রতিরোধে তাদের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। ব্রাজিল সরকারের বলিষ্ঠ নেতৃত্ব ও নীতিমালার সুফল হিসেবে সেখানে খর্বকায়তার হার কমে এসেছে। এক্ষেত্রে শুধু অঙ্গীকারই যথেষ্ট নয়, প্রকৃত অর্থে সহায়ক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিবেশ তৈরি করতে হবে। অপুষ্টি প্রতিরোধে বিনিয়োগ বাড়ানো, বিভিন্ন খাতের অংশীদারদের সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন। জনসাধারণের পুষ্টিনিরাপত্তা নিশ্চিতে সাম্প্রতিক সময়ে কিছু দেশ ভালোও করেছে। যেমন পেরু, ব্রাজিল, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম। এ তালিকায় আরো আছে ইথিওপিয়া, গুয়াতেমালা, মালাউই, তানজানিয়া, নেপালের মতো দেশ। পুষ্টি উন্নয়নে দেশগুলোর সাফল্যের একটিই রেসিপি। সেটি হলো, নিজস্ব প্রেক্ষাপট উপযোগী যথাযথ ও লক্ষ্যাভিমুখী কৌশল গ্রহণ। প্রতিটি দেশই রাজনৈতিক দৃঢ় অঙ্গীকার, শক্তিশালী নেতৃত্ব, প্রমাণভিত্তিক নীতি হস্তক্ষেপ, নিবিড় তদারকি, পারস্পরিক সমন্বয়, পর্যাপ্ত অর্থায়ন ও যথাযথ জায়গায় সেটি ব্যবহার এবং জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে পুষ্টি কার্যক্রম বেগবান করেছে।
অপুষ্টিকে গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা বিবেচনা করে বাংলাদেশের সরকার পুষ্টি কার্যক্রম জোরদার করেছে। জাতীয় পুষ্টি নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। তীব্র অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের যথাযথ সেবা প্রদানের জন্য সরকারিভাবে গাইডলাইনও তৈরি করা হয়েছে। সব উপজেলা কমপ্লেক্স, জেলা সদর হাসপাতাল, মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রসহ সব মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সমন্বিত অসুস্থ শিশু ব্যবস্থাপনা ও পুষ্টি কর্নার স্থাপন করা হয়েছে। যেসব শিশু জটিলতাসহ তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে, তাদের হাসপাতালে ভর্তি করে নির্ধারিত কর্নারে রেখে জাতীয় অপুষ্টি ব্যবস্থাপনা নীতিমালা অনুযায়ী নিবিড় সেবা দেয়া হয়। একে কার্যকর করে তুলতে জেলা পর্যায়ে নিউট্রিশন সাপোর্ট অফিসারও রয়েছে। হাসপাতাল থেকে আগে ছাড়পত্র নিয়ে চলে যাওয়া অসুস্থ শিশুদের ক্ষেত্রে নিউট্রিশন সাপোর্ট অফিসারকে তাদের পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব দেয়া যেতে পারে। এতে পরিস্থিতির উন্নতি আশা করা যায়। তবে অপুষ্টি সমস্যার সমাধান করতে হলে জন্মের আগে থেকেই ব্যবস্থা নিতে হবে। আইসিডিডিআর,বি একটি ফর্মুলাও তৈরি করেছে, যা মাঠ পর্যায়ে সফল হয়েছে। শিশুজন্মের আগে থেকে তিন বছর পর্যন্ত তার বিভিন্ন পর্যায় অনুসরণ করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। এ কার্যক্রম বড় আকারে গ্রহণ করতে পারে সরকার। জাতীয় পুষ্টিনীতিকে আরো কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।
হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর দ্রুত কৃশকায় অবস্থা চিহ্নিত এবং জাতীয় নির্দেশনা অনুযায়ী মারাত্মক অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা করা। রোগীর শারীরিক পরীক্ষা ও চিকিৎসাপত্র নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা, বাড়িতে শিশুর প্রয়োজনীয় যত্নের জন্য পরিবারের সামর্থ্য যাচাই এবং পরিবারের সদস্যদের মারাত্মক লক্ষণগুলো শনাক্ত করতে প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা নেয়ার জন্য উৎসাহিত করার পদক্ষেপ নিতে হবে। পাশাপাশি হাসপাতালে ভর্তি হওয়া শিশুদের ফলোআপ জোরদার করা জরুরি। এক্ষেত্রে হাসপাতাল থেকে ছাড়ার সময় সংশ্লিষ্ট কমিউনিটি ক্লিনিক বা স্বাস্থ্যকর্মীকে জানিয়ে রাখার ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। উচ্চঝুঁকির শিশুদের ক্ষেত্রে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেয়ার কিছু দিন পর নিয়মিত ফলোআপের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। সর্বাগ্রে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সম্পন্ন না করে শিশুদের হাসপাতাল থেকে নিয়ে যাওয়ার প্রবণতার পেছনের কারণগুলো খুঁজে বের করতে হবে। অর্থ সংকট নাকি হাসপাতালের পরিবেশ তাদেরকে এ সিদ্ধান্ত নিতে প্রভাবিত করছে, তাও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। খাদ্যের অভাবে শিশুরা কৃশকায় হয় এমন ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। কৃশকায় হওয়ার অন্যতম কারণ পুষ্টিকর খাদ্য সম্পর্কে সচেতনতার অভাব। এক্ষেত্রে পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য বিবেচনাপূর্বক কার্যক্রম নেয়া দরকার। বাসায় ফিরে যাওয়ার পর শিশুর সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে খাদ্য ও চিকিৎসা সেবাসহ অন্যান্য বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে কর্মসূচি গ্রহণ করা জরুরি।










