আজ স্বাধীনতা দিবস। বাঙালি জাতির ইতিহাসে অন্যতম গৌরবের দিন। এদিন মুক্তিযুদ্ধের সব শহীদকে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি। আন্তরিক শ্রদ্ধা নিবেদন করছি স্বাধীনতা সংগ্রামের অবিসংবাদিত নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি। শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি জাতীয় চার নেতাকে, যারা নিবেদিতভাবে আজীবন কাজ করে গেছেন স্বাধীনতার জন্য। শ্রদ্ধা জানাচ্ছি বীর নারীদের, যারা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্মম নিষ্পেষণের শিকার হয়েছিলেন।

সময়টা ৫০ বছর আগে। ১৯৭১ সালের এদিন আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের সূচনা ঘটে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অতর্কিত আক্রমণের পটভূমিতে। ২৫ মার্চ দিবাগত রাতে হত্যাযজ্ঞ চালায় দখলদার বাহিনী। নৃশংস গণহত্যার শিকার পূর্ব বাংলার জনগণ গড়ে তোলে সশস্ত্র প্রতিরোধ। পরবর্তী নয় মাস ধরে প্রাণপণে যুদ্ধ চালিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের বিজয় সম্পন্ন করে। আমাদের স্বাধীনতার লড়াই ছিল প্রকৃত সর্বাত্মক জনযুদ্ধ। কেননা এতে পুরো জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল এবং প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে অবদান রেখেছেন। অনেকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সম্মুখযুদ্ধে লড়াই করেছেন। তাদের কেউ কেউ শহীদ হয়েছেন। ফলে তাদের পরিবার-পরিজন দীর্ঘ দুঃখ-বেদনার মুখোমুখি হয়েছে। অনেক পরিবার আর্থিক ও বৈষয়িকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আবার অনেকে নিজে অস্ত্র হাতে নেননি কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের সাধ্যমতো সহযোগিতা করেছেন। বাংলার মাটিকে দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীর জন্য বিপজ্জনক ও বৈরী করে তুলেছিলেন, এমন মানুষের সংখ্যাও কম নয়। বলতে গেলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী মানুষের পাশে ছিল সমগ্র জাতি। উদ্দেশ্য একটাই, পরাধীনতার শিকল ভাঙা ও নিজের দেশকে দখলদারমুক্ত করা।

স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মূলে ছিল আপেক্ষিক অর্থনৈতিক বঞ্চনার অনুভূতি, অন্যায়-অবিচার ও স্বাধিকার চেতনা। পাকিস্তান রাষ্ট্রে প্রতিটি ক্ষেত্রেই বঞ্চনার শিকার হয়েছিল বাঙালিরা। পশ্চিম পাকিস্তানের অর্থনীতির অধিকতর দ্রুত উন্নতি ও বহুমুখীকরণ অনিবার্যভাবেই তত্কালীন পূর্ববাংলার জীবনমানে প্রতিফলিত হয়েছিল। গুটিকয়েক পরিবারের হাতে কুক্ষিগত ছিল অধিকাংশ সম্পদ। সম্পদের বৈষম্যের সঙ্গে বজায় ছিল রাষ্ট্রীয় সেবা-সুযোগ-সুবিধা ভোগের বঞ্চনাও। পূর্ব বাংলার বেসরকারি খাতে অবাঙালিদের প্রাধান্য, অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণে পক্ষপাতিত্ব আর ক্রমে কোণঠাসা অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে চেয়েছিল বাঙালি জাতি। চেয়েছিল এক স্বাধীন সার্বভৌম গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে। পাকিস্তানের অমানবিক ও অন্যায্য রাষ্ট্রের বিপরীতে আমরা এমন এক স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেছিলাম, যার শাসন ব্যবস্থার মূলনীতি হবে গণতান্ত্রিক; যে রাষ্ট্রে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে নিশ্চিত হবে সবার সমান অধিকার। অবসান ঘটবে অন্যায়, অবিচার, শোষণ, নিপীড়ন, সাম্প্রদায়িক বিভেদ, বৈষম্যের। প্রতিষ্ঠা পাবে প্রতিটি মানুষের মানবিক মর্যাদা। আমরা এমন এক ন্যায্য সমাজ গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছিলাম, যেখানে সবার অর্থনৈতিক মুক্তি ঘটবে, অশিক্ষা দূর হবে, নিরসন হবে সব ধরনের বঞ্চনা।

পঞ্চাশ পেরিয়ে এখন বাংলাদেশ। গত পাঁচ দশকে অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে আমাদের অনেক অগ্রগতি হয়েছে। দারিদ্র্য কমেছে উল্লেখযোগ্য মাত্রায়; কমেছে শিশুমৃত্যু-মাতৃমৃত্যুর হার। গড় আয়ু বেড়েছে, পুষ্টি পরিস্থিতির তুলনামূলক উন্নতি হয়েছে, স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নতি হয়েছে, শিক্ষার ব্যাপকতর বিস্তার ঘটেছে। অর্থনৈতিক সক্ষমতা বেড়েছে। পদ্মা সেতুর মতো বৃহৎ প্রকল্প হচ্ছে নিজস্ব অর্থায়নে। মেট্রোরেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মাতারবাড়ী কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্র, এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের মেগা প্রকল্পসহ ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার মতো কর্মযজ্ঞ চলছে। প্রবৃদ্ধির সঙ্গে মাথাপিছু আয় বাড়ছে। খাদ্য উৎপাদনে সাফল্য, যাতায়াত ও পরিবহন খাতে উন্নয়নের পাশাপাশি  জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের অগ্রগতি হয়েছে। সম্প্রতি বিদ্যুতে শতভাগ বাড়ি আলোকিত হওয়ার খবর মিলেছে। দেশের প্রায় সব জায়গা ইন্টারনেটের আওতায় এসেছে। তথ্যপ্রযুক্তির প্রসার মানুষের কাজকর্মে যোগ করেছে নতুন গতি। ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার পথে আজ ধাবমান বাংলাদেশ। নিঃসন্দেহে এসব অগ্রগতি প্রশংসনীয়।

তবে ৫১ বছর পরও আত্মজিজ্ঞাসা করলে দেখা যাবে স্বাধীনতার অনেক লক্ষ্যই এখনো অপূর্ণ রয়ে গেছে। যেমন বৈষম্য। আজও মুষ্টিমেয় লোকের হাতে পুঞ্জীভূত সম্পদ আয়ের বিপুলাংশ। এক হিসাব বলছে, বর্তমানে ১ শতাংশ ধনীর হাতে জাতীয় আয়ের ১৬ শতাংশ কেন্দ্রীভূত। কভিডের কারণে নতুন করে প্রায় ছয় কোটি লোক দরিদ্র হয়েছে। পুষ্টিহীনতায় ভুগছে অনেকে। কর্মহীন অবস্থায় রয়েছে অনেকে। কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত। শিক্ষিত তরুণদের অনেকেই বেকার। ব্যাংক খাত খেলাপি ঋণের ভারে ন্যুব্জ। প্রতিযোগিতা সক্ষমতা, রফতানি বহুমুখীকরণ, কর্মপরিবেশের উন্নয়ন, পরিবেশগত সূচকে অগ্রগতি এখনো যৎসামান্য। পুঁজিবাজার ভুগছে অস্থিতিশীলতা ও আস্থাহীনতার সংকটে। শুধু অর্থনৈতিক ফ্রন্টে নয়, রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও উদ্বেগের ছায়া। রাজনৈতিক সংস্কৃতির অবনতি ঘটেছে, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী হওয়ার পরিবর্তে দুর্বল হয়েছে। স্বাধীন মতপ্রকাশ ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা বহুলাংশে খর্ব হয়েছে। জনপ্রশাসনের সর্বস্তরে অনিয়ম, জবাবদিহির অভাব ক্রমেই প্রকটতর হয়েছে। অপরাধ দমনে আইনের যথাযথ প্রয়োগ সুদূরপরাহত। ফলে খুন, ধর্ষণসহ নানা ধরনের গুরুতর অপরাধের শিকার হওয়া মানুষগুলো বিচারপ্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এক ধরনের বিচারহীনতার পরিবেশ অপরাধবৃত্তি বৃদ্ধিতে সহায়ক হচ্ছে। নারীর প্রতি সহিংসতা ক্রমে বাড়ছে। এসব বিষয় স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।

স্বাধীনতার প্রথম লক্ষ্য ছিল ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান। একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে সেটি অর্জিত হয়েছে। দ্বিতীয় লক্ষ্য ছিল একটি গণতান্ত্রিক, ন্যায়ভিত্তিক ও অসাম্প্রদায়িক দেশ গঠন; যেখানে দেশের প্রতিটি মানুষের মৌলিক চাহিদা ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত হবে। অর্থনৈতিক মুক্তি ঘটবে। এ লক্ষ্য পূরণ এখনো দূর অস্ত। 

এবারের স্বাধীনতা দিবসটি নানা দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। দুই বছরের বিপর্যয় শেষে কভিড অতিমারী নিয়ন্ত্রণে এসেছে। এরই মধ্যে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করেছে দেশ। উন্নয়নের একটা নতুন রূপান্তর পর্বে প্রবেশ করেছে। উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের জাতিসংঘের চূড়ান্ত সুপারিশ পেয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে ২০২৬ সালে পদার্পণ করবে উন্নয়নশীল দেশে। স্বভাবত উন্নয়নশীল দেশের কাতারে শামিল হওয়ার পর আমরা আন্তর্জাতিক বাজারে প্রাধিকারমূলক সুবিধাগুলো আর পাব না। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আমাদের সক্ষমতা বাড়িয়ে তুলতে হবে। এখন থেকে প্রস্তুতি নিতে হবে। প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সংগতিমূলক হারে দেশে বাড়ছে না কর্মসংস্থান। সরকারি প্রচেষ্টা সত্ত্বেও ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ এখনো স্থবির। এসব চ্যালেঞ্জ উত্তরণে নিতে হবে জোরালো উদ্যোগ। সর্বোপরি অবসান ঘটাতে হবে সব ধরনের অন্যায়, অর্থনৈতিক বঞ্চনা। এবারের স্বাধীনতা দিবসে বাংলাদেশকে প্রকৃত অর্থে একটি ন্যায়ভিত্তিক, সমতামূলক ও মানবিক মর্যাদার রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।