গত বছরজুড়ে তাইওয়ান নিয়ে
উত্তেজনা আরো তীব্র হয়েছে। এই উত্তেজনার নেপথ্যে রয়েছে দুই পরাক্রমশালী চীন ও
যুক্তরাষ্ট্র। তাদের চাপে তাইওয়ানে শান্তি
ক্রমে বিলীন হচ্ছে। এমনকি দেশটিতে যুদ্ধাবস্থা দেখা দিয়েছে। এ পরিস্থিতি তৈরির
জন্য চীন-যুক্তরাষ্ট্র একে অপরকে দায়ী করছে।
সবশেষ গত ২৬ ডিসেম্বর তাইওয়ান
সরকার দাবি করে, ২৪ ঘণ্টায় যুদ্ধবিমান ও
ড্রোনসহ ৭১টি বিমান তাদের আকাশসীমায় প্রবেশ করেছে। এমনকি সাতটি জাহাজও তাইওয়ান
প্রণালীতে প্রবেশ করে। তাইওয়ানের সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, সেগুলো চীনের এবং এটিই এখন পর্যন্ত চীনের সবচেয়ে বড়
অনুপ্রবেশের ঘটনা।
এরপর ২৭ ডিসেম্বর এক সংবাদ
সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট সাই ইং ওয়েন বলেন, ‘আগস্টে সামরিক মহড়ার পর থেকে চীনের হুমকি আরো তীব্র
হয়েছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘কেউ যুদ্ধ চাইবে না... কিন্তু শান্তি তো আর আকাশ থেকে পড়বে
না।’
কী ঘটেছিল আগস্টে
গত আগস্টে চীনের আপত্তি থাকা
সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি তাইওয়ান সফর
করেছিলেন। এতে চোটে যায় চীন। চীন সেসময় শুধু প্রতিবাদ বা ক্ষোভ জানিয়েই ক্ষান্ত
হয়নি,
বরং পেলোসির সফরের সময়েই তাইওয়ানের পণ্য আমদানি ও প্রতিবেশী
দেশটিতে সিলিকন রফতানিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করে। আর তার সফর শেষ হওয়ার পরপরই
তাইওয়ানের চারপাশে বিশাল সামরিক মহড়া শুরু করে। মোতায়েন করা হয় যুদ্ধজাহাজ, যুদ্ধবিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র। এমনকি পেলোসি ও তার পরিবারের
ওপর নিষেধাজ্ঞাও দিয়েছে চীন। পাঁচ মাসেও চীনের ক্ষোভ যে এখনো কাটেনি, তা স্পষ্ট।
যুক্তরাষ্ট্র কী বলে
তাইওয়ানের পাশে থাকার
প্রতিশ্রুতি আছে যুক্তরাষ্ট্রের। তাইওয়ানে সর্বদাই সচেষ্ট হতে দেখা যায়
যুক্তরাষ্ট্রকে। তাইওয়ানকে সামরিক সহায়তাও দিয়ে থাকে তারা। গত আগস্টে ওয়াশিংটন
পোস্টে লেখা এক নিবন্ধে ন্যান্সি পেলোসি বলেছিলেন, চীন যখন তাইওয়ানকে ও এর গণতন্ত্রকে হুমকি দিচ্ছে, তখন আমরা চুপ করে বসে থাকতে পারি না।
বাইডেন নির্বাচিত হওয়ার পর
থেকে তাইওয়ানের আকাশ প্রতিরক্ষা অঞ্চলে চীনা জঙ্গিবিমানের অনুপ্রবেশের ঘটনাও
বেড়েছে। এদিকে তাইপেকে ওয়াশিংটনের যে কোনো সহযোগিতার নিন্দা জানায় বেইজিং। চীনের অভিযোগ, ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলকে সামনে রেখে যুক্তরাষ্ট্র ‘তাইওয়ান নিয়ে খেলছে’। এ অঞ্চলে
অস্ত্র বিক্রি বাড়িয়েছে। তাইওয়ানের স্বাধীনতার জন্য বিচ্ছিন্নতাবাদী কার্যকলাপকে
সমর্থন করছে।
তাইওয়ান কী চায়
চীনের প্রেসিডেন্ট শি
জিনপিংয়ের শাসনামলে তাইওয়ানে বেইজিংয়ে সবচেয়ে বেশি তৎপরতা বাড়তে দেখা গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, গত কয়েক
দশকের মধ্যে বর্তমানে তাইওয়ানে চীনের হুমকি সবচেয়ে বেশি। তাইওয়ানকে নিজেদের একটি
প্রদেশ মনে করে চীন। অন্যদিকে
তাইওয়ানের দাবি, তারা স্বাধীন
ও সার্বভৌম রাষ্ট্র। তাইওয়ানের এই দাবির সঙ্গে সংহতি রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের।
ফলশ্রুতিতে চীনের শাসন মেনে নেয়ার জন্য তাইওয়ানের ওপর কূটনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ বাড়িয়েছে বেইজিং। তাইওয়ান সরকার
বলেছে,
তারা শান্তি চায়, তবে হামলা হলে নিজেদের সুরক্ষায় ব্যবস্থা নেবে।
এদিকে গত ২৭ ডিসেম্বর
তাইওয়ানের সকল পুরুষ নাগরিককে চার মাসের পরিবর্তে বাধ্যতামূলকভাবে এক বছরের জন্য
সামরিক সেবায় অংশ নেয়ার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। ২০২৪ সাল থেকে এই বিধান বাস্তবায়ন করা
হবে। এর আগে প্রেসিডেন্ট সাই ইং ওয়েন বলেন, ‘আমরা যত বেশি প্রস্তুতি নেব, ততই আগ্রাসনের ধাক্কা সামলাতে পারব। আমরা যতই ঐক্যবদ্ধ থাকব, তাইওয়ান ততটাই নিরাপদ থাকবে।’
তাইওয়ান গুরুত্বপূর্ণ কেন?
বিশ্ব অর্থনীতিতে তাইওয়ানের
গুরুত্ব ব্যাপক। বৈদ্যুতিক গাড়ি থেকে মোবাইল, ল্যাপটপ, ঘড়ি ও গেম
কনসলোরের মতো ইলেকট্রনিক ডিভাইসগুলোতে যে কম্পিউটার চিপ ব্যবহার করা হয়, তার বড় যোগানদাতা তাইওয়ান। তাইওয়ানের সেমিকন্ডাকটর
ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি (টিএসএমসি) বিশ্বে কম্পিউটার চিপের বাজার অর্ধেকের বেশি
দখল করে রেখেছে। ২০২১ সালে এই
প্রতিষ্ঠানটির অর্থমূল্য ছিল প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলার।
যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ, চীন যদি তাইওয়ানের দখলে যায়, তাহলে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ এই শিল্পের নিয়ন্ত্রণ পাবে
বেইজিং। কারণ, তাইওয়ানের চিপের ওপর
অনেকটা নির্ভরশীল যুক্তরাষ্ট্র। ইউএন কমট্রেড ডেটা অনুযায়ী, ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ১০ হাজার ৫৭০ কোটি মার্কিন ডলারের
পণ্য রফতানি করে তাইওয়ান। যার বেশিরভাগই ছিল তথ্যপ্রযুক্তি ও ইলেকট্রনিক্স
পণ্যনির্ভর। এদিকে চিপ উৎপাদনে চীনের ওপর অনেকাংশে নির্ভর করে তাইওয়ান। চিপ উৎপাদনে যে সিলিকন ব্যবহার
তার যোগানদাতা চীন। যুক্তরাষ্ট্রকে বিপাকে ফেলতে এই সিলিকন রফতানি বন্ধে
নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে বেইজিং। যা যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অ্যাপল, কোয়ালকম ও এনভিডিয়ার মতো প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর জন্য
ক্ষতিকর।
তাইওয়ান কি পেরে উঠবে?
ইউক্রেনে রুশ অভিযানের মতো
অনেকে তাইওয়ানে চীনের সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা করছেন। যদি তাইওয়ানে সামরিক সংঘাত
শুরু হয়,
তাহলে তাইওয়ান কি কুলিয়ে উঠবে? তাইওয়ানের সামরিক শক্তির সক্ষমতাই বা কতটুকু?
বিশ্বে সামরিকখাতে সবচেয়ে বেশি
খরচ করে যুক্তরাষ্ট্র। নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি, এমনকি সাইবার হামলার দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পরের অবস্থানে
রয়েছে চীন। চীন যদি পুরোদমে সামরিক হামলা করে তাহলে তাইওয়ান সংকটে পড়বে।
লন্ডনভিত্তিক গবেষণা
প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজি স্টাডিজের তথ্য অনুযায়ী, চীনের মোট সৈন্য সংখ্যা ২০ লাখ ৩৫ হাজার। অপরদিকে তাইওয়ানের
১ লাখ ৬৯ হাজার। সমরাস্ত্রের হিসাব করলে চীনের হাতে রয়েছে ৫ হাজার ৪০০টি ট্যাংক।
আর তাইওয়ানের ট্যাংকের সংখ্যা মাত্র ৬৫০। চীনের ৩ হাজার ২২৭টির বেশি যুদ্ধবিমান
রয়েছে,
অপরদিকে তাইওয়ানের যুদ্ধবিমান ৫০৪টির কিছু বেশি।
চীনের সাবমেরিনের বিশাল বহর রয়েছে। দেশটির মোট সাবমেরিনের সংখ্যা ৫৯। অপর দিকে তাইওয়ানের হাতে মাত্র চারটি সাবমেরিন রয়েছে। চীনের নৌবাহিনীর জাহাজের সংখ্যা ৮৬, তাইওয়ানের ২৬। চীনের কামানের সংখ্যা ৯ হাজার ৮৩৪টির বেশি, বিপরীতে তাইওয়ানের ২ হাজার ৯৩টি।
চীন কি থামবে?
চীন সাধারণত যুদ্ধ পছন্দ করে
না। প্রতিষ্ঠার পর থেকে দেশটি কখনো সক্রিয়ভাবে কোনো যুদ্ধ করেনি। কূটনৈতিকভাবে
তারা আঞ্চলিক শান্তি, স্থিতিশীলতা, আন্তর্জাতিক আইন ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মৌলিক আদর্শকে
লালন করে।
চীনের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যবাদী আচরণের কারণে তারা সক্রিয় হচ্ছে। আর পেলোসি যদি তাইওয়ান সফর না করতেন, তাহলে এত উত্তেজনা তৈরি হতো না। চীনের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্রই এই অঞ্চলে স্থিতাবস্থা পরিবর্তনের জন্য দায়ী। পশ্চিমা বিশ্লেষকদের মতে, চীন যদি তাইওয়ান দখল করে নেয়, তাহলে চীনের শক্তি আরো বেড়ে যাবে। যা যুক্তরাষ্ট্র কিছুতেই
চাইবে না। অন্যদিকে চীনও চায় না, যুক্তরাষ্ট্র
বাড়াবাড়ি করুক।
চীনের সঙ্গে তাইওয়ানের
রাজনৈতিক দূরত্ব থাকলেও বাণিজ্যিক দিক থেকে তারা নৈকট্যে। এ কারণে তাইওয়ানের
বেশিরভাগ জনগণও চায় না, চীনের সঙ্গে
সামরিক পদক্ষেপে যেতে। অনেকে মনে করেন, দু’দেশের
বাণিজ্যিক সম্পর্ক যত ত্বরান্বিত হবে, সামরিক পদক্ষেপের শঙ্কা তত কমবে।
ইতিহাস কী বলে
ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, ১৬২৪-১৬৬১ সাল পর্যন্ত দ্বীপটি ডাচ উপনিবেশ ছিল, এরপর ১৬৮৩-১৮৯৫ সাল পর্যন্ত এটি চীনের কিং রাজবংশের
শাসনাধীনে ছিল। সপ্তদশ শতকে চীনারা তাইওয়ানে পাড়ি জমাতে শুরু করে। বেশিরভাগই ছিল
ফুজিয়ান প্রদেশ ও গুয়াংডংয়ের অধিবাসী। পরে জাপান যুদ্ধে হেরে ১৮৯৫ সালে দ্বীপটি
জাপানের কাছে ছেড়ে দেয় চীন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপান পরাজয় স্বীকারের পর তাইপের
নিয়ন্ত্রণ পায় বেইজিং। কিন্তু কয়েক বছর পর চীনে গৃহযুদ্ধ বেঁধে যায়। কুওমিনতাং দলের নেতা চিয়াং কাই–শেক নেতৃত্বাধীন জাতীয়তাবাদী সরকার ও মাও সে তুংয়ের কমিউনিস্ট পার্টির ওই যুদ্ধে ১৯৪৯ কমিউনিস্টদের জয় হয়।
তখন চীনের শাসনভার নেয় মাও সেতুং। এরপর চিয়াং প্রায় ১৫ লাখ নেতাকর্মী নিয়ে
তাইওয়ানে চলে যান। কয়েক দশক সেখানেই তারা শাসন করেছিলেন এবং দ্বীপটির সবচেয়ে
প্রভাবশালী রাজনৈতিক দল হয়ে ওঠে কুওমিনতাং।
তাইওয়ান তখন থেকে এক ধরনের
স্বাধীনতা উপভোগ করছে। ১৯৮০ এর দশকে সেখানে সামরিক আইনের অবসান হওয়ার পর তাইওয়ানে
গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পায়। তবে তাদের গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারকেও ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মূলত, চীন পুরনো ইতিহাসের দিকে তাকিয়ে তাইওয়ানকে নিজেদের ভাবে।
আবার এই ইতিহাসের কারণেই তাইওয়ান ভাবে, তারা চীনের অংশ নয়। এমনকি মাও সে তুংয়ের গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের অধীনেও ছিল না তারা।
লেখক: সাংবাদিক










