বয়লার বিস্ফোরণের ফলে সৃষ্ট দুর্ঘটনা শিল্প খাতের বড় দুশ্চিন্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিয়মিত বিরতিতে ঘটছে এ ধরনের দুর্ঘটনা। সাম্প্রতিক সময়ে দুর্ঘটনার হার বরং আরো বেড়েছে। আগে যেখানে বছরে পাঁচ-ছয়টি দুর্ঘটনা ঘটত, সেখানে এখন প্রতি বছর গড়ে ১০-১২টি দুর্ঘটনা ঘটছে। কিন্তু বিদ্যমান আইন দিয়ে এতে রাশ টানা যাচ্ছে না। বর্তমানে বয়লারের নিবন্ধন থেকে শুরু করে পরিদর্শন—সবকিছু চলছে ১৯২৩ সালের আইন দিয়ে। দ্রুত পাল্টে যাওয়া দৃশ্যপটে ঔপনিবেশিক আমলের এ আইন অনেকটাই কার্যকারিতা হারিয়েছে। এ অবস্থায় শিল্প-কারখানার বয়লারসংক্রান্ত পুরনো আইন বাতিল করে নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এরই মধ্যে এর খসড়া সংসদে উত্থাপন করেছেন শিল্পমন্ত্রী। সার্বিক প্রক্রিয়া সম্পন্নপূর্বক নতুন আইনটি দ্রুত পাস ও বাস্তবায়ন কাম্য।

দেশে বয়লার বিস্ফোরণজনিত দুর্ঘটনায় বারবারই প্রাণহানি ঘটছে। গত কয়েক বছরে বেশ কয়েকটি বড় দুর্ঘটনা ঘটেছে। সংবাদমাধ্যমের তথ্য বলছে, ২০১৬ সালে টঙ্গীতে একটি প্যাকেজিং কারখানায় বয়লার বিস্ফোরণে প্রাণ হারান ২৫ জন। ২০১৭ সালে গাজীপুরের পোশাক কারখানা মাল্টি ফ্যাবস লিমিটেডে বয়লার বিস্ফোরণে মারা যান ১৩ জন। উল্লিখিত বড় দুর্ঘটনার পাশাপাশি ছোটখাটো বয়লার বিস্ফোরণ তো একটা নৈমিত্তিক ব্যাপার এখন। এসব ঘটনার কোনো সঠিক পরিসংখ্যানও নেই। আবার তা সংবাদমাধ্যমেও খুব একটা আসে না। অব্যাহতভাবে ঘটা বয়লার বিস্ফোরণের পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ দায়ী। নিবন্ধন বাধ্যতামূলক হলেও অনেক বয়লার চলছে কোনো রকম সরকারি নিবন্ধন ছাড়াই। ফলে সেগুলো নজরদারির বাইরে থেকে যাচ্ছে। এটা একটা কাঠামোগত দুর্বলতা। আবার নিবন্ধন করলেও অনেক বয়লারের মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে গেছে। প্রয়োজনীয় কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করে সেগুলো নবায়ন করা হচ্ছে না নিয়মিতভাবে। রয়ে যাচ্ছে নানা ত্রুটি। শুধু স্থাপন করলে হয় না, বয়লার সুষ্ঠুভাবে রক্ষণাবেক্ষণও একটা বড় ইস্যু। অভিযোগ মিলছে, অনেক সময় সেগুলো যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় না। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয় না। গাফিলতি রয়েছে বয়লার পরিদর্শন কার্যালয়েরও। এ কার্যালয়ের কাজ নিবন্ধন দেয়ার পাশাপাশি ঠিকমতো বয়লার বসানো হয়েছে কিনা, কী অবস্থায় আছে সেটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ছাড়পত্র দেয়া। অথচ দুঃখজনকভাবে পরিদর্শনের কাজটি যথাযথভাবে করা হচ্ছে না। বয়লার ব্যবহারকারী কারখানার সংখ্যা অনেক বেশি হলেও পরিদর্শকের সংখ্যা খুব অপ্রতুল। ফলে বেশির ভাগ কারখানার বয়লার চলছে পরিদর্শন ছাড়াই। তার মধ্যে আবার যুগোপযোগী আইন নেই। এখতিয়ার সীমিত হওয়ায় দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থাও নেয়া সম্ভব হচ্ছে না অনেক ক্ষেত্রে। সব মিলিয়ে বয়লার বিস্ফোরণের ঝুঁকি থেকে যাচ্ছে শিল্প খাতে।

শিল্প-কারখানায় তাপ সৃষ্টির জন্য বয়লারের ব্যবহার একটি বৈশ্বিক রীতি। সব দেশেই এটা ব্যবহার করা হচ্ছে।  তবে বিস্ফোরণের ঝুঁকি থাকায় বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, স্কটল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, জাপান প্রভৃতি দেশে বয়লার ব্যবহারে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিতে জোর দেয়া হয়। নিবন্ধন থেকে পরিচালনা সব ক্ষেত্রেই নিশ্চিত করা হয় রাষ্ট্রীয় নজরদারি। কোনো বয়লার নিবন্ধনের বাইরে রয়ে গেছে কিনা, মান ঠিক আছে কিনা, মেয়াদ আছে কিনা, যান্ত্রিক ও ভৌত ত্রুটি আছে কিনা, কীভাবে চালানো হচ্ছে, ঠিকমতো রক্ষণাবেক্ষণ করা হচ্ছে কিনা, নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে কিনা—সবকিছু পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখা হয়। নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ এটি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে করে থাকে। কমপ্লায়েন্স নিশ্চিতে এতটুকুও ছাড় দেয়া হয় না। ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের দুর্বলতা যেন না থাকে, সেজন্য বিদ্যমান আইনগুলো পর্যালোচনা করা হয় নির্দিষ্ট সময় অন্তর। সময়োপযোগী করতে আইনে আনা হয় প্রয়োজনীয় সংস্কার। বলতে গেলে যুগোপযোগী আইন, নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের নজরদারি এবং কর্তৃপক্ষের দায়িত্বশীলতায় ওইসব দেশে বয়লার বিস্ফোরণ প্রায় শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। আমাদের জন্য তাদের নীতি ও কর্মপ্রক্রিয়া অনুসরণীয়।

দেশে বয়লার আইন সংস্কারের দাবি দীর্ঘদিনের। বেড়ে চলা দুর্ঘটনা কমাতে অবশেষে আইন যুগোপযোগী করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বলা হচ্ছে, প্রস্তাবিত আইনে দণ্ডের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ের এখতিয়ার বাড়ানো হয়েছে। খসড়া আইনে সনদ ছাড়া বয়লার পরিচালনা করলে সর্বোচ্চ দুই বছরের জেল বা ২ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত  হবে। বিদ্যমান আইনে যা শুধু ১০ হাজার টাকা। একইভাবে নিয়মের বাইরে কেউ বয়লার তৈরি বা আমদানি করলে দুই বছরের জেল বা ২ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। নিয়মের বাইরে গিয়ে বয়লার ব্যবহার করলে বা কাউকে ব্যবহারের অনুমতি দিলেও সর্বোচ্চ দুই বছরের জেল বা ২ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। এছাড়া বিদ্যমান নিবন্ধন না নিয়ে বয়লার ব্যবহার করা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার এখতিয়ার সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ের নেই। প্রস্তাবিত আইনে নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের এখতিয়ার বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। এসব নিশ্চয়ই ইতিবাচক উন্নয়ন। সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়ন হলে দুর্ঘটনা হ্রাসে এ আইন সহায়ক ভূমিকা রাখবে বৈকি।

আমাদের দেশে আইনের কমতি নেই। প্রতিটি খাতেই ভালো অনেক আইন আছে। কিন্তু সেগুলোর যথাযথ প্রয়োগ হয় না। ফলে যে উদ্দেশ্যে আইন প্রণয়ন, শেষ পর্যন্ত সেই উদ্দেশ্যটি ব্যাহত হয়। কাজেই অতীতের ব্যত্যয় দেখতে চাইব নতুন বয়লার আইনের ক্ষেত্রে। আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা এড়িয়ে আইনটি দ্রুত পাস করতে হবে।  পাশাপাশি এর কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। বয়লার বিস্ফোরণের ঝুঁকি কমাতে বিশেষজ্ঞরা পানিকে ধাতু ও বালি বা পলিমুক্ত রাখা, ভূগর্ভস্থ পানি সরাসরি পাম্প করে বয়লারে না দিয়ে পানিকে অ্যারেশন ও ফ্লোকুলেশনের পর ফিল্টার করে বয়লারে ব্যবহার করা, বয়লার তলায় আস্তরণ জমা দূরীকরণে ফসফরিক অ্যাসিড ব্যবহার করা, বিস্ফোরণের বিস্তৃতি ঠেকাতে বয়লারকে কংক্রিটের ঘেরাটোপের মধ্যে বসানোর ব্যবস্থা করা এবং বাষ্প তৈরি ও ব্যবহারের মধ্যে সমন্বয় করার কথা বলছেন। এসব পরামর্শ আমলে নেয়া যেতে পারে। 

বয়লার বিস্ফোরণ ঘটা কোনো দৈব বা প্রাকৃতিক ঘটনা নয়। এটি সম্পূর্ণ কারখানার ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার অবহেলা, অব্যবস্থাপনা ও অদক্ষতার ফল। সঠিক সময়ে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করলেই বয়লার বিস্ফোরণ ঘটা রোধ অনেকাংশে সম্ভব। সবচেয়ে জরুরি হচ্ছে, বয়লার নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে কিনা, তা নিশ্চিত করা। তাছাড়া পরিষ্কার করা, সেফটি ভালভ পরীক্ষা করা দরকার। সঠিক পরিবেশবান্ধব ও সবার জন্য নিরাপদ কারখানা ব্যবস্থাপনা বয়লার বিস্ফোরণ রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। এক্ষেত্রে কারখানার মালিকের যেমন, তেমনি কর্তৃপক্ষের সতর্কতা ও সক্রিয়তার বিকল্প নেই।