পাহাড়, নদী, সমুদ্র পরিবেষ্টিত এবং প্রাচ্যের রানীখ্যাত বন্দরনগরী চট্টগ্রামের সেই জৌলুস এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করে চলা পাহাড়গুলো প্রতিনিয়ত কেটে ধ্বংস করা হচ্ছে। চট্টগ্রামের ইতিহাস সংস্কৃতি গবেষণা কেন্দ্র ও বাংলাদেশ পরিবেশ ফোরাম সম্প্রতি আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছে, গত চার দশকে চট্টগ্রাম মহানগরীতে ৮৮টি পাহাড় বিলুপ্ত এবং আংশিক কাটা হয়েছে ৯৫টি। ৪০ বছর আগেও নগরীতে ২০০টি পাহাড় ছিল, যার ৬০ শতাংশ এরই মধ্যে বিলুপ্ত। পাহাড় কাটার সঙ্গে জড়িত শ্রমিকদের মাঝেমধ্যে গ্রেফতার করা হচ্ছে। কিন্তু মূল দায়ীরা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। পাহাড় কাটার বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে বা পরিবেশ আদালতে মামলা করেই যেন পরিবেশ অধিদপ্তরের দায়িত্ব শেষ। এ কথা ভুলে গেলে চলবে না যে আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা এবং পাহাড় ধ্বংসকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ শাস্তি নিশ্চিত করার দায়িত্ব পরিবেশ অধিদপ্তরের। সাম্প্রতিক সময়ে যেসব আইন প্রণয়ন করা হচ্ছে, সেগুলোয় একই অপরাধ বারবার হলে শাস্তির মাত্রা কয়েক গুণ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। এক্ষেত্রে আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। শাস্তির মাত্রা বাড়িয়ে প্রয়োজনে পরিবেশ ধ্বংসকারী দুর্বৃত্তদের নিবৃত্ত করতে হবে।

পাহাড় কাটা বন্ধে উচ্চ আদালত এ যাবৎ অসংখ্যবার নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন। এর পরও আবাসন আর শিল্পায়নে পাহাড় নিশ্চিহ্ন হচ্ছে। আর অপরিণামদর্শী পাহাড় কাটায় ভূতাত্ত্বিক গঠন ক্রমে দুর্বল থেকে দুর্বলতর হচ্ছে। পাহাড়-পর্বত ইকোসিস্টেমের অংশ। মানুষ, প্রাণী, উদ্ভিদ ও জীববৈচিত্র্যের একে অন্যের ওপর চিরন্তন নির্ভরতাই প্রকৃতির পূর্ণতা। এ পাহাড়ই মানুষ ও জীববৈচিত্র্যের খাদ্য এবং খনিজ সম্পদের আধার। পাহাড়কে ক্ষত-বিক্ষত করলে পাহাড় কীভাবে সড়ক ও জনপদ ক্ষতিগ্রস্ত করে তার প্রমাণ একের পর এক পাহাড় ধস। পাহাড় কাটার সৃষ্ট দুর্যোগ যেমন ভয়াবহ, তেমন এর প্রাণ ও সম্পদহানি এবং অর্থনৈতিক ক্ষতিও অপরিমেয়। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত এক দশকে চট্টগ্রাম অঞ্চলে পাহাড় ধসে দুই শতাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। বাংলাদেশের মোট আয়তনের যে ১২ শতাংশ পাহাড়ি এলাকা, তার সব কি অক্ষত আছে? চট্টগ্রামের জাকির হোসেন রোডের উত্তরে, ঢাকা ট্রাংক রোডের পূর্বে এবং বায়েজিদ বোস্তামী রোডের পশ্চিম পাশের বিশাল এলাকাজুড়ে পাহাড়গুলো নিশ্চিহ্ন করে ফেলা হয়েছে। দেয়াং পাহাড়কেও ক্ষত-বিক্ষত করা হয়েছে। নতুন প্রজন্ম প্রকৃতির এ বিবর্তিত রূপ দেখে বুঝতেই পারবে না, অতীতে কী ছিল এখানে! পৃথিবীর অনেক বড় বড় শহরের অবস্থান পাহাড়ের শীর্ষে। উঁচু উঁচু পাহাড় অক্ষত রেখে ঢালু জায়গায় গড়ে তোলা হয়েছে অনিন্দ্যসুন্দর জনপদ। একখণ্ড পাহাড়ও কাটা পড়েনি, একটা গাছও হয়নি নিধন। এটিই টেকসই উন্নয়ন। অথচ দানবীয় প্রক্রিয়ায় আমরা পাহাড়-টিলা ধ্বংস করছি। অথচ পাহাড়ের ভৌগোলিক গঠনকে অক্ষত রেখে পাহাড়কেন্দ্রিক চা, মাল্টা, কমলা এবং ইকোপার্কের প্রকল্প নিলে তা দারিদ্র্য বিমোচন, পর্যটনের বিকাশ ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের মডেল হতে পারে।

চীন, নেপাল, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, জাপান, থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন নিখুঁতভাবে পাহাড় রক্ষা করছে। নেপাল পাহাড়, পর্বত ও হিমালয় নিয়ে অতুলনীয় সৌন্দর্যে ভরপুর। দেশটির সরকার ও জনগণ টিলারাশি পাহাড় পর্বত রক্ষায় এক অনন্য নজির স্থাপন করেছে। সরকার ও প্রতিটি নাগরিক পর্বত এবং পাহাড় রক্ষায় সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে থাকে। নিবিড় পরিকল্পনার মাধ্যমে তারা তাদের দেশকে গড়ে তুলছে। পরিকল্পিত উপায়ে বৃক্ষরোপণ করে সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে পর্যটকের জন্য আকর্ষণীয় করে তুলছে। ফলে সারা বছরই সেখানে পর্যটকের বিচরণ থাকে। আর এ খাত থেকে তারা প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন করে থাকে। তারা এমনভাবে বাড়িঘর নির্মাণ করে থাকে যে কোথাও ঝড়-বৃষ্টি বা বর্ষায় বাড়িঘর ধসে পড়ার কথা শোনা যায় না। অথচ বাংলাদেশ কয়েক বছর আগে ছোট ছোট অনেক পাহাড় ও টিলায় সমৃদ্ধ ছিল। পরিতাপের বিষয়, কিছু লোকের লোভ-লালসার শিকার হয়ে প্রকৃতির এ অসামান্য দান ও সম্পদ বিনষ্ট করে পরিবেশকে হুমকির মুখে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। পত্রপত্রিকার খবরে প্রকাশ, আন্তর্জাতিক পাহাড় বিশেষজ্ঞরা গভীর আগ্রহ নিয়ে বাংলাদেশে এসে বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকা পরিদর্শন করে পাহাড়-টিলা কাটার নমুনা দেখে হতবাক হয়ে যান। তারা গভীর দুঃখ ভরা মনে বলেন, এ দেশে যেভাবে পাহাড়-টিলা কেটে সমতল করা হচ্ছে তাতে ভবিষ্যতে যে প্রাকৃতিক বিপর্যয় দেখা দেবে তা নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন। তাদের অভিমত, এ ব্যাপারে সরকার তথা জনগণকে অবশ্যই দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে প্রকৃতির এ সম্পদ রক্ষা করতে হবে।

পরিবেশ সংরক্ষণ আইনে স্পষ্ট বলা আছে, সরকারি, আধাসরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন বা দখলাধীন বা ব্যক্তিমালিকানাধীন পাহাড় ও টিলা কোনোটাই কাটা যাবে না। জাতীয় প্রয়োজনে অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নিয়ে পাহাড় কাটার যে বিধান রয়েছে তারও অপব্যবহার হচ্ছে। দেখা যায়, এসব কাজে নিয়োজিত ঠিকাদাররা প্রয়োজন ছাড়াই অতিরিক্ত পাহাড় কেটে মাটি বিক্রি করেন। শুধু পাহাড় কাটা নয়, দেদার পাহাড়ের গাছও কাটা হচ্ছে। আর কাটা গাছের বেশির ভাগই চলে যাচ্ছে ইটভাটায়। অথচ আইনে পাহাড় বা টিলার মাটি ব্যবহার বা কাঠ পোড়ানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কিন্তু প্রায় কেউ-ই মানছে না এসব আইন। পাহাড় কাটার ফলে শুধু দুর্ঘটনাই ঘটে তা নয়, দেশের প্রাকৃতিক পরিবেশও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। আর শুধু যে পাহাড় কাটা হচ্ছে তা নয়। পাহাড়ের প্রকৃতিও বদলে দেয়া হচ্ছে। পাহাড়ের বহু প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। পাহাড়ের অনেক প্রাণীই সমতলে এসে টিকে থাকতে পারে না। আবার এটাও সত্য, কোনো কিছুই বিকল্পহীন নয়। কিন্তু তারও একটা নিয়ম থাকা দরকার। আমাদের দেশে নিয়ম মানতে অনেকেই নারাজ। কিন্তু এভাবে চলতে দেয়া যায় না। তাই আইনের কঠোর প্রয়োগ জরুরি হয়ে পড়েছে।

দুঃখের বিষয়, প্রশাসনের নাকের ডগায়ই পাহাড় নিধন চলছে। শোনা যায়, পাহাড় কাটার সুবিধার্থে নাকি টোকেন প্রথাও চালু রয়েছে। কোনো সময় পাহাড় বা টিলা কাটার দৃশ্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের চোখে পড়লে দু-একটি ট্রাক আটক করা হলেও তার পেছনে থাকে অন্য উদ্দেশ্য। আবার কেউ কেউ বলেন পাহাড়-টিলা কাটার ব্যাপারে যত কড়াকড়ি আরোপ করা হয়, তাতে নাকি ট্রাকপ্রতি বখরা দেয়ার অংকটাও বেড়ে যায়। ক’দিন আগে পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে টিলা ও পাহাড় কাটার ব্যাপারে নতুন যে আদেশ জারি করা হয়েছে, একজন পরিবেশকর্মী হিসেবে এটি পুনর্বিবেচনায় সরকারের প্রতি সবিনয়ে নিবেদন জানাচ্ছি। এটাতে আইনের ফাঁকফোকর রয়েছে। সত্য বলতে কি, ক্ষুদ্র ব্যক্তি বা গোষ্ঠী স্বার্থ যেখানে কাজ করে সেখানে শুধু ভালো কথা, নীতিবাক্য আর সদাচরণের মৌখিক আহ্বান কোনো কাজে আসে না। এর জন্য নীতি ও নিয়মের পাশাপাশি কঠোর আইনের প্রয়োজন। আর সে আইনের যথাযথ প্রয়োগে সংশ্লিষ্ট সব মহলের সততা, নিষ্ঠা, আন্তরিকতা ও দেশপ্রেম দরকার। যারা পাহাড় কাটছে, পাহাড় ন্যাড়া করছে এবং পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করছে, এসব ব্যর্থতার দায় শুধু তাদের নয়, এর দায় স্থানীয় প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোরই বেশি। নিয়ন্ত্রণমূলক কর্মকাণ্ড জোরদার করার ক্ষেত্রে কী ধরনের সমস্যা এবং কারা এসবের পেছনে সক্রিয় রয়েছে—এ বিষয়গুলো ভালোভাবে খতিয়ে দেখে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। জননিরাপত্তা, পাহাড়ের সৌন্দর্য ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করা অপরিহার্য। কাজটি যাতে সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা যায়, সেজন্য দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।