ফ্ল্যাশব্যাক/ জগন্নাথপুর, সুনামগঞ্জ

১৯৯৫ সালের সেপ্টেম্বর। জগন্নাথপুরের নলুয়ার হাওরের ভেতর দিয়ে স্পিডবোট চলছে। তিনজন যাত্রীর একজন ষষ্ঠ সংসদের বিরোধীদলীয় উপনেতা আব্দুস সামাদ আজাদ, অন্যজন তার দেহরক্ষী, বাকি জন আমি উপজেলা প্রকৌশলী। স্যার বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর, মুজিবনগর সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। ১৯৫৪ সালের পার্লামেন্টের মেম্বার। ব্রিটিশ আমল থেকে স্বাধিকার আন্দোলনের সক্রিয়কর্মী। নবীন প্রকৌশলী হিসেবে দ্রুত কিছু কাজ করে আমি স্যারের মন জয় করে ফেলেছি। জগন্নাথপুর এলে ভুরাখালী গ্রামে তার বাড়ি যাওয়ার সময় প্রায়ই আমি স্যারের সঙ্গে সেখানে যাই। স্যার তার স্মৃতিচারণ করতে করতে যান। কৃষিমন্ত্রী থাকাকালে হাওরের নদীগুলো খনন করেছিলেন। জ্যোতিবসুর সঙ্গে জীবনযাপন, স্বাস্থ্য নিয়ে আলাপচারিতা। পঁচাত্তরের নভেম্বরে জেল হত্যাকাণ্ডের সময় জাতীয় চারনেতার সঙ্গে একই জেলে থেকে ভাগ্যগুণে কীভাবে বেঁচে গেলেন, সে গল্প।

আমরা তার গ্রামের কাছাকাছি চলে এসেছি। হাওরে ভেসে থাকা দ্বীপের মতো ছোট্ট ভুরাখালী গ্রাম ক্রমে দৃষ্টির ফোকাসে আসছে। স্যার হঠাৎ স্মৃতিকাতর হয়ে গেলেন। বললেন, এ ধরনের গাঁও গেরাম থেকে আমরা উঠে এসেছি। বঙ্গবন্ধুর টুঙ্গিপাড়াও অনেকটা এ রকম। নৌকা ছাড়া কোনো যোগাযোগ ছিল না। শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ কামারুজ্জামান—আমরা সবাই অজপাড়াগাঁয়ের পোড় খাওয়া লোক। শুধু সোহ্রাওয়ার্দী সাহেব শহুরে এবং একটু আলাদা ছিলেন। শেরেবাংলা, মওলানা ভাসানী, সোহ্রাওয়ার্দী আমাদের অগ্রজ। বাকিরা সবাই সমসাময়িক। এদের মধ্যে আমরা কেউ বঙ্গবন্ধু হতে পারিনি। বঙ্গবন্ধু হয়েছেন একজনই। তুমি কি জানো বঙ্গবন্ধু কেন বঙ্গবন্ধু? এত গভীর প্রশ্নের উত্তর দেয়ার সাহস সেদিন আমার হয়নি। স্যারের উত্তর দেয়ার অপেক্ষায় থাকি। স্যার শুরু করেন কিন্তু বাড়ি চলে আসায় তার উত্তর সেদিন আর আমার শোনা হয়নি। তার উত্তর আমার আর শোনার সুযোগ হয়নি। এর কয়েক মাস পরই তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হয়ে গেলেন। এ রকম অখণ্ড অবসরে গল্প করা, গল্পের মুড কিংবা স্থান-কাল-পাত্র আমার আর পাওয়া হয়নি।

কিন্তু, আমি সারা জীবন এ উত্তর খুঁজেছি। বঙ্গবন্ধু কেন বঙ্গবন্ধু হতে পারলেন? তার আগে কিংবা তার সমসাময়িক সময়ে অন্য কেউ কেন বঙ্গবন্ধু হতে পারলেন না?

দুই.

বাঙালি মুসলমানের মন

‘বাঙালি মুসলমানের মন’ নামে আহমদ ছফার একটা বইয়ে বাঙালি মুসলমানের বহুমাত্রিক চরিত্রের বিশ্লেষণ আছে। তবে এতে ১৭৫৭ সালে নবাব সিরাজউদ্দৌলার

পতনের পর থেকে ব্রিটিশ ও বাঙালি হিন্দু জমিদারদের নিগ্রহে লাঞ্ছিত মুসলমানদের মনস্তত্ত্ব বোঝা যায় না। এ মনস্তত্ত্ব সৈয়দ মুজতবা আলী, মওলানা আকরম খাঁ—এদের সাহিত্যে পাওয়া যায়। শরত্চন্দ্রের লেখা ‘কলকাতার মাঠে বাঙালি ও মুসলমান ছাত্রদের মধ্যে ফুটবলখেলা’-এর অন্তর্হিত ভাব কিংবা বঙ্কিমচন্দ্রের ‘আনন্দমঠ উপন্যাস’ পড়ে তার কিছু আঁচ করা যায়। হিন্দু ব্রাহ্মণ শিশুদের সঙ্গে সামনের সারিতে স্কুলের বেঞ্চিতে বসতে না পারার বেদনা থেকে তা কিছুটা আঁচ করা যায়। স্টিমারে হিন্দুদের আলাদা কামরা, আলাদা আসনের গল্প শুনে তার একটা ছবি পাওয়া যায়।

কিন্তু বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনীসহ তার লেখা বইগুলো পড়লে ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ বোঝা যায়। বাঙালির আত্মপরিচয়ের দীর্ঘ সংগ্রামের যুদ্ধটা বোঝা যায়। বাঙালি মুসলমানের মন তিনধারী তলোয়ারে ক্রমে ক্ষত-বিক্ষত হয়েছে। তিনধারী তলোয়ারের প্রথমটা ছিল ব্রিটিশ; যারা তাদের নিগৃহীত, পরাধীন করে রেখেছে। দ্বিতীয়টা, নিজের প্রতিবেশী হিন্দুরা; যারা তাদের অচ্ছুত ভেবেছে। তিনধারী তলোয়ারের শেষ তলোয়ার হলো নিজ সম্প্রদায়ের অগ্রসর মুসলমানরা; যারা তাদের আপন হয়নি। এ ধারার জমিদার কিংবা উচ্চ শ্রেণীর মুসলমানরা উর্দু কিংবা ফার্সি ভাষায় কথা বলেছে। সাধারণ বাঙালি মুসলমানদের কাছে তাদেরকে কখনো কখনো উচ্চবর্ণ হিন্দুদের মতোই মনে হয়েছে।

বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ পড়তে পড়তে পাঠক যখন অগ্রসর হবেন, এ তিনধারী তলোয়ার তাকে স্পর্শ করে যাবে। তার পূর্বপুরুষ সরাসরি ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন। তার পূর্বপুরুষ কুদরত উল্লাহ শেখ ইংরেজ নীলকর রাইনের বিরুদ্ধে মামলায় জিতে তাকে আধাপয়সা জরিমানা করেছিলেন—এ গল্প দক্ষিণাঞ্চলের কিংবদন্তি। বঙ্গবন্ধু চল্লিশের দশকে তার বক্তৃতা শুরু করতেন ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে তিতুমীরের জেহাদ, হাজী শরীয়তউল্লাহর ফরায়েজী আন্দোলনের ইতিহাস দিয়ে।

বঙ্গবন্ধুর জীবনের প্রথম জেল হয়েছিল ১৯৩৮ সালে, হিন্দুদের সঙ্গে মারামারির মামলায়। তার বন্ধু আব্দুল মালেককে গোলাপগঞ্জের প্রভাবশালী হিন্দুরা ধরে নিয়ে বেঁধে রাখে। বঙ্গবন্ধু তার মুসলমান সঙ্গী-সাথী নিয়ে তাকে উদ্ধার করেন। এ ঘটনায় মামলা হয়। তিনি সাতদিন জেলে ছিলেন।

এ মহান নেতার জীবনের পঞ্চাশের দশক থেকে একাত্তর পর্যন্ত কেটেছে মুসলমান এলিটদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে। এরা কেউ মুসলিম লীগ, কেউ নেজামে ইসলাম করতেন। এ মুসলমান এলিটরা সাধারণ মানুষদের আপন হতে পারেননি। তাদের কোলাকুলির ভেতরও একটা আলগা পর্দার অস্তিত্ব মানুষ টের পেয়েছেন।

বঙ্গবন্ধু বাঙালি মুসলমানদের এ তিনধারী তলোয়ারের ক্ষত থেকে উদ্ধার করেছেন। তাদের শত শত বছরের বঞ্চনা, মানসিক ক্ষতে তিনি মলম লাগিয়েছেন। তার সঙ্গে বুক মিলিয়ে সাধারণ মানুষ তার অসাধারণ হূদয়ের হূদস্পন্দন শুনতে পেয়েছে। তারা বুঝতে পেরেছে—এ হূদয়ের সঙ্গে সাধারণ মানুষের হূদয় মিললে মাঝখানে আর কোনো পর্দা থাকে না।

তিন.

এক শতকের বাঙালি মুসলমান রাজনীতিবিদ (১৮৬১-১৯৬০)

১৭৫৭ থেকে ১৮৬১ সাল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিই ভারতীয় উপমহাদেশ শাসন করে। এর মধ্যে ১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহ ঘটে। এর পরে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি মহারানী ভিক্টোরিয়ার কাছে ভারত শাসনের দায়িত্ব অর্পণ করে। ১৮৬১ থেকে ১৯৪৭ সাল, আমরা ব্রিটিশ শাসনামলে বাঙালি মুসলমান রাজনীতিবিদদের সম্পর্কে কিছু ধারণা নিতে পারি।

১৮৬১ সাল থেকে ব্রিটিশ সরকার ‘ইম্পেরিয়াল লেজিসলেটিভ কাউন্সিল’ দিয়ে সরকারি কাজ পরিচালনা এবং আইন প্রণয়নে কিছু মনোনীত জনগণ রাখার চেষ্টা করেছে। এর কিছু ব্রিটিশ শাসকের প্রতিনিধি, কিছু অ্যাংলো ইন্ডিয়ান, কিছু হিন্দু। দিল্লির এখনকার ভারতীয় পার্লামেন্টের এটাই আদিরূপ। ১৮৬১-১৮৯২ সাল পর্যন্ত ৩০ বছরে বাংলা থেকে ঠাঁই পেলেন মাত্র দুজন। একজন নওয়াব আব্দুল গণি, আরেকজন খানবাহাদুর আহ্সানউল্লাহ। বাংলা থেকে ঠাঁই পেলেও তারা উর্দুভাষী। মুসলমান তবে ঠিক যেন বাঙালি নন। ১৮৯২ থেকে ১৯০৯ সালে সদস্য সংখ্যা বাড়ানো হলো। এ সময়েও বাংলা থেকে নওয়াব খাজা সলিমুল্লাহ ছাড়া আর কেউ ঠাঁই পেলেন না। বাঙালি হিন্দুদের মধ্যে স্যার আশুতোষ মুখার্জি। ১৯০৯ থেকে ১৯২০ সাল।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নওয়াব সৈয়দ শামসুল হুদা আর টাঙ্গাইলের ধনবাড়ীর সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী। তাদের মধ্যে নওয়াব আলী চৌধুরী ব্রিটিশ সরকারের শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন। তারাও জাতে বাঙালি। তবে আরবি, ফার্সি, উর্দু পড়া এলিট শ্রেণীর। ১৯১৯ সাল থেকে এ পার্লামেন্ট দ্বিকক্ষবিশিষ্ট পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ হয়ে গেল। কাউন্সিল অব স্টেট হয়ে গেল উচ্চকক্ষ। কাউন্সিল অব স্টেটে ২৬০ আসনের প্রতিনিধি সভা তৈরি হলো। ১৯১৯-৪৭ সময়ে মাহমুদ সোহ্রাওয়ার্দী আর মৌলভী আব্দুল করিম বাঙালি মুসলমানদের প্রতিনিধি ছিলেন।

এর মধ্যে ১৯৩৫ সালে গভর্মেন্ট অব ইন্ডিয়া অ্যাক্ট চালু হলো। পাক-ভারত উপমহাদেশকে ১১টি প্রদেশে ভাগ করে নির্বাচন দেয়া হলো। এর মধ্যে একটি হলো ‘বেঙ্গল’। সাধারণ মানুষ রাজনীতি করে ক্ষমতার কাছাকাছি আসার অধিকতর সুযোগ তৈরি হলো। ফলে ১৯৩৭ সালে, শেরেবাংলার কৃষক-প্রজা পার্টি সর্বভারত মুসলিম লীগের সঙ্গে কোয়ালিশন করে সরকার গঠন করল। শেরেবাংলা অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী হলেন। এর আগে ১৯১৩ সাল থেকে তিনি কয়েকবার বঙ্গীয় আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৩৫ সালে তিনি কলকাতার মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৩৭ সালের প্রাদেশিক কোয়ালিশন সরকারে ১৯৪১ সালে মুসলিম লীগের সঙ্গে শেরেবাংলার কোয়ালিশন ভেঙে গেল। শেরেবাংলা হিন্দু মহাসভার সঙ্গে কোয়ালিশন করে ১৯৪৩ পর্যন্ত টিকে থাকলেন। এরপর মুসলিম লীগের খাজা নাজিমুদ্দিন প্রধানমন্ত্রী হলেন। ১৯৪৬ সালে নির্বাচনে বেঙ্গল প্রাদেশিক মুসলিম লীগ নির্বাচনে জিতল। হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী প্রধানমন্ত্রী হলেন। এর আগে খাজা নাজিমুদ্দিনের মন্ত্রিসভায় তিনি ছিলেন সিভিল সাপ্লাই মন্ত্রী। ১৯৪৭ সালের আগস্টে পাক-ভারতবর্ষের স্বাধীনতার আগ পর্যন্ত তিনিই ছিলেন অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী।

ব্রিটিশ শাসনামল থেকে তিনজন বিশিষ্ট বাঙালি মুসলমান রাজনীতিবিদ হলেন শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, খাজা নাজিমুদ্দিন ও হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী। তাদের আমরা ‘জাতীয় তিন নেতার মাজার’ তৈরি করে ঠাঁই দিয়েছি। ১৯৪৭ থেকে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত তাদের মধ্যে খাজা নাজিমুদ্দিন ও সোহ্রাওয়ার্দী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী এবং শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক যুক্তফ্রন্ট সরকারের সময় পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। এ তিন জনের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন। কিন্তু স্থান-কাল-পাত্র, ইতিহাসের যুগসন্ধিক্ষণ বিবেচনায় বাঙালি মুসলমানদের মনমানসের মুখপাত্র তারা আর হতে পারেননি। আরেকজন মজলুম জননেতা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, যিনি সারা জীবন রাজনীতি করেছেন। কিন্তু ক্ষমতার রাজনীতি থেকে নিজেকে দূরে রেখেছেন। তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি ১৯৫৪ ও ১৯৭৩ সালে সংসদ সদস্য ছিলেন।

বঙ্গবন্ধুর বাড়ি আর শেরেবাংলার বাড়ি কাছাকাছি। বঙ্গবন্ধুর পিতা, আত্মীয়-স্বজন অনেকেই শেরেবাংলার ভক্ত। কিন্তু বঙ্গবন্ধু কেন শেরেবাংলার ভক্ত না হয়ে সোহ্রাওয়ার্দীর ভক্ত হলেন—গবেষকদের মনে প্রশ্ন রয়েছে। ১৯৩৮ সালে এ দুই নেতার সঙ্গে গোপালগঞ্জ মিশন স্কুলে বঙ্গবন্ধুর দেখা। বঙ্গবন্ধুর সহজাত নেতৃত্ব, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং সারল্য সোহ্রাওয়ার্দীকে মুগ্ধ করল। সোহ্রাওয়ার্দী এ নবীনকে নিজের কর্মী করে নিলেন। নিয়মিত পত্রযোগাযোগ করে আরো আপন করে নিলেন। তাই বঙ্গবন্ধু কলকাতায় গিয়ে সোহ্রাওয়ার্দীর রাজনৈতিক আশ্রয়েই চলে গেলেন। শেরেবাংলা হয়তো ইতিহাসের এ মাহেন্দ্রক্ষণটি ঠিক ধরতে পারেননি। [চলবে]

 

আবুল মনজুর মো. সাদেক: প্রকল্প পরিচালক, ‘আমার গ্রাম-আমার শহর’ কারিগরি সহায়তা প্রকল্প, এলজিইডি