মাতৃভূমি বাংলাদেশ গৌরবোজ্জ্বল বিজয়ের ৪৯তম ‘বিজয় দিবস’ পালন করছে। আর মাত্র ১০০ দিন এবং এক বছর পরে আমরা পালন করতে যাচ্ছি যথাক্রমে আমাদের ‘স্বাধীনতা দিবস’ এবং ‘বিজয় দিবস’-এর বহুল প্রতীক্ষিত ‘সুবর্ণ জয়ন্তী’। মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা-পরবর্তী প্রজন্মের একজন বাঙালি ও বাংলাদেশী হিসেবে দ্ব্যর্থহীনভাবে বিষয়টি গর্বের। ১৯৭১ সালের মহান ১৬ ডিসেম্বরে পৃথিবীর বুকে জন্ম হয়েছিল আরেকটি জাতিসত্তার। আমরা অর্জন করেছিলাম একটি স্বাধীন, সার্বভৌম ভূখণ্ড এবং একটি লাল-সবুজ পতাকা। পৃথিবীর ইতিহাসে যে দুটি জাতি ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির’—এই অকুতোভয় দৃঢ় প্রত্যয় এবং স্বাধীনতা ঘোষণার মধ্য দিয়ে মুক্তির সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল এবং পরবর্তী সময়ে সেই ধারাবাহিকতায় সশ্রদ্ধ মুক্তিযুদ্ধ করেছিল— তার একটি হলো বাংলাদেশ এবং আরেকটি খুব সম্ভবত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। পার্থক্য শুধু ছিল সাম্রাজ্যের। আমরা পাকিস্তানি সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে, যুক্তরাষ্ট্র ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে। বলা বাহুল্য, পৃথিবীর ইতিহাসে আমরা সবচেয়ে স্বল্প সময়ে স্বাধীনতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিলাম, মাত্র নয় মাসে। দ্ব্যর্থহীনভাবে এটি গৌরবের ও জাতি হিসেবে আমাদের একটি অনন্য উচ্চতায় আসীন করেছে। একটি দেশের আপামর জনসাধারণ যখন মুক্তি ও স্বাধীনতার লক্ষ্যে একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে অবলীলায় নিজের প্রাণের তোয়াক্কা না করে অবতীর্ণ হয়, মূলত সেটা শুধু বঞ্চনা ও অধিকার হরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। প্রধানত ও সার্বিকভাবে যখন একটি জাতির শাণিত জাতীয়তাবাদকে ভূলুণ্ঠিত করার মানবতাবিরোধী অপকৌশল ও অপচেষ্টা করা হয়, ঠিক তখনই মুক্তির সংগ্রাম সংগঠিত হয়। অর্থাত্, মোটাদাগে আমরা বলতে পারি, নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার যে অকুতোভয় সংগ্রাম। আমরা নয় মাসে সশস্ত্র সংগ্রামের দ্বারা স্বাধীনতা পেয়েছি, অর্জিত হয়েছে পৃথিবীর বুকে এক ফালি সুজলা-সুফলা-শস্য-শ্যামলা সার্বভৌম মানচিত্র। নির্ভয়ে, নিঃসংকোচে ওড়াতে পেরেছি একটি লাল-সবুজ কেতন। মূলত নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধটি ছিল পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ ২৩ বছরের অনাচার ও শোষণের একটি দুর্বার আস্ফাালন। স্বাধীনতা-পরবর্তী প্রজন্মের একজন হয়ে ভাবতে অবাক লাগে কীভাবে বাঙালি মাত্র ২৩ বছরে স্বপ্ন দেখতে এবং পরবর্তী সময়ে বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের তথা প্রগতিশীল বাঙালি জাতীয়তাবাদের। কী ছিল সেই জাতীয়তাবাদ? কী ছিল তার মূল্যবোধ? যার সুদীর্ঘ যোগসূত্রে আমরা পেয়েছিলাম ১৬ ডিসেম্বর।

বাংলাদেশ যে জাতীয়তাবাদের নিমিত্তে জন্ম নিয়েছিল, তার মূল ভিত্তি ছিল ধর্মনিরপেক্ষতা ও প্রগতিশীল সমাজ ব্যবস্থা। অনেকেই এর নামকরণ করেন ‘মুজিববাদ’ হিসেবে। এখানে একটি বিশ্লেষণ উল্লেখ করতে চাই। জাতীয়তাবাদ উগ্রতা ও সংকীর্ণতায় পর্যবসিত হলে সেটা একটি দক্ষিণপন্থী ও প্রতিক্রিয়াশীল সমাজের জন্ম দেয়। আমরা বর্তমান প্রেক্ষাপটে পৃথিবীর অনেক দেশেই তার উদ্বেগজনক অবস্থা দেখতে পাই। পৃথিবীর বুকে যে জাতিগুলো ধর্মনিরপেক্ষতা ও প্রগতিশীল সমাজ ব্যবস্থা কায়েম করতে পেরেছে, আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে তারাই আজকে উন্নত ও উদীয়মান। তাদের সমাজ ব্যবস্থায় খুব একটা নৈতিক স্খলন চোখে পড়ে না। জার্মানি ও হিটলারের ইতিহাস আমাদের কমবেশি সবারই জানা আছে। সে ছিল দক্ষিণপন্থী একজন ভয়াবহ স্বৈরাচার। বর্তমানে নতুন প্রজন্ম জার্মানিকে জানে একটি প্রগতিশীল ও নৈতিক জাতি হিসেবে। ঠিক একইভাবে তা জাপানের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এ জাতিগুলো উপলব্ধি করতে পেরেছিল যে প্রগতিশীল সমাজ কায়েম করতে ব্যর্থ হলে উন্নত ও নৈতিক মূল্যবোধে আলোকিত রাষ্ট্র ব্যবস্থা কায়েম স্বপ্নই থেকে যাবে। আমাদের এই প্রগতিশীল আয়ত্তকরণের একটি হেতু রয়েছে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতার ইতি ঘটে ধর্মীয় সংখ্যাগুরু ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে কেন্দ্র করে। সেখানে অন্য আর কিছুই আমলে নেয়া হয়নি। ঔপনিবেশিকতার শোষণ ও বঞ্চনা কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই বাঙালি জাতি পাকিস্তানিদের রোষানলে ও এক অন্তহীন অমানবিক শোষণে পর্যুদস্ত হলো।আবারো বাঙালির জীবনে নেমে এল বৈষম্যের আক্রোশ। সুতরাং মুক্তির একমাত্র উপায় ছিল একটি প্রগতিশীল ধর্মনিরপেক্ষ মূল্যবোধ দীপ্ত অকৃত্রিম সমাজ ব্যবস্থা, যার মূলে অবস্থান করেছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদ। কোনো ধর্মীয় ব্যুত্পত্তির আগ্রাসন থেকে নয়। এটি সন্দেহাতীতভাবে একটি দুরূহ ব্যাপার। নির্যাতিত, নিরীহ, নিষ্প্রভ, বঞ্চিত, শোষিত বাঙালি জাতি একটি অকৃত্রিম ও অভিন্ন প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে প্রধানত জাতীয়তাবাদের আলোকে নির্ভীক, আত্মমর্যাদাসম্পন্ন মননে ও সংকল্পে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর অর্জন করতে পেরেছিল। জাতির ওই ক্রান্তিকালে এক অকুতোভয়, কালজয়ী, ক্ষণজন্মা, সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালির আবির্ভাব হয়েছিল—জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। অধিকন্তু, এ অংশে স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সব শহীদ, বীর মুক্তিযোদ্ধাসহ, জাতীয় চার নেতাকে তাদের ২৬ মার্চ, ১৯৭১-পরবর্তী মুজিব নগর সরকার এবং দেশে-বিদেশে অসাধারণ ও সুকৌশলী কূটনৈতিক অবদানের কথা বিনম্র চিত্তে স্মরণ করছি।

বাংলাদেশে পঁচাত্তর-পরবর্তী যে সরকারগুলো ক্ষমতায় আসীন হয়েছিল, তারা প্রায় প্রত্যেকেই আমাদের কাঙ্ক্ষিত প্রগতিশীল জাতীয়তাবাদকে ভূলুণ্ঠিত করার লক্ষ্যে এ দেশের সহজ সরল ধর্মভীরু মানুষের আবেগকে তথাকথিত ধর্মের দোহাই দিয়ে সামগ্রিকভাবে সাম্প্রদায়িকতামূলক ধারায় বিবর্তন করে। তদুপরি রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল ইসলামের শঠকারী দোহাই ও ব্যাখ্যা দিয়ে। তারই অংশ হিসেবে আমরা দেখি শাসনতন্ত্রে স্থান পেয়েছিল রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম। যে ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে আমরা লড়াই করলাম, তাদেরই মদদপুষ্ট কিছু সুবিধাবাদী দালালের খপ্পরে গোটা জাতি আবার ভয়ংকরভাবে বিপদগ্রস্ত হলো। জাতি হিসেবে বাঙালির একটি লক্ষণীয় ব্যাপার হলো, বাঙালি জাতিকে একবার যদি বুদ্ধিদীপ্ত ও প্রগতিশীল ভাবধারায় জাতীয়তাবাদকে জাগিয়ে তোলা যায়, তাহলে ইতিহাস সাক্ষী আছে বাঙালি তা-ই করে দেখিয়েছে। তার সর্বোত্কৃষ্ট উদাহরণ আমাদের মুক্তিযুদ্ধ। আমরা মাতৃভূমি বাংলাদেশ পেয়েছি। কিন্তু কিছু স্বাধীনতাবিরোধী কুচক্রী অমানুষ স্বাধীন দেশে স্বাধীনতার মর্যাদা ও চেতনাকে ধূলিসাত্ করবার লক্ষ্যে আবার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছিল। গোটা জাতিকে আবারো একটি অন্ধকার কূপে নিক্ষেপ করেছিল। যে বীরের জাতি একদা বঙ্গবন্ধুর অবিসংবাদিত ৭ মার্চের আহ্বানে মুক্তির জন্য অস্ত্র ধরতে পেরেছিল, শুধু তাই নয়, বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল বাঙালি স্বাধীনতা অর্জন করতে পারে, কিন্তু পরবর্তী সময়ে সেই বাঙালিকে স্তব্ধ করে দেয়া হয়েছিল। এখানেই শেষ নয়। উপরন্তু, আমাদের আত্মমর্যাদা ও আত্মবিশ্বাসকে কুঠারাঘাত করে গোটা জাতিকে মোটাদাগে দুটি ভাগে ভাগ করে দেয়া হয়েছে। বলা যেতে পারে হুবহু সেই ঔপনিবেশিকতার কুিসত রাজনৈতিক অবয়ব। বাঙালি যেন চিরদিন অসাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদের আলোকে আরেকবার জ্বলে উঠতে না পারে সেই লক্ষ্যে এ দেশের বেশির ভাগ হতদরিদ্র ও নিরীহ ধর্মপ্রাণ, কোমল হূদয় মানুষগুলোর ওপর ধর্মান্ধের আগ্রাসন লেলিয়ে দেয়া হয়। তারই অংশ হিসেবে পরবর্তী সময়ে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি আবার সক্রিয় রূপ নেয়। আমাদের বিশ্বাসকে বিষিয়ে দেয়া হলো এই বলে যে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম ছিল একটি অনভিপ্রেত ও দূরভিসন্ধি-জর্জরিত এক হঠকারী সিদ্ধান্ত। তারই রেশ ধরে উপসংহারটি ছিল আরো ভয়াবহ—বাঙালি চিরকালই পরাধীন ছিল এবং এ জাতি কোনো দিন স্বাধীনতা অর্জন করার যোগ্য নয়! কী অপরিসীম অনাচার!

আগেই উল্লেখ করেছিলাম একটি স্বতন্ত্র জাতিসত্তা হিসেবে ইতিহাসে বাঙালি বরাবরই পরিচিত। অসাম্প্রদায়িক মূল্যবোধ অর্থাত্ ধর্মনিরপেক্ষতা, প্রগাঢ় জাতীয়তাবাদ, বিচিত্র সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল। এখানে একটি নিখুঁত স্বাতন্ত্র্য বাঙালি জাতীয়তাবাদের উপমা উল্লেখ করতে চাই। আর সেটা হলো ‘জয় বাংলা’ স্লোগানটি। স্বাধীনতাপূর্ব, বিশেষ করে পূর্ব পাকিস্তান সময়ে যারা ছিলেন, তারা প্রত্যেকেই এ দুটি শব্দের সঙ্গে শুধু পরিচিতই নন, রীতিমতো এটিকে আত্মস্থ করেছিলেন বাঙালি জাতীয়তাবাদের একটি মূর্ত প্রতীক হিসেবে। আমি এর আঙ্গিকে কিছু কথা বলতে চাই।

‘অ্যালঅ না-ফাঁ দ’লা পাতৃ’—এ ধ্বনিটি ফরাসিদের জাতীয় সংগীতের প্রথম কলি। সাধারণত ফরাসিদের কেউ যখন বলে ‘অ্যালঅ না-ফাঁ’, ঠিক তখন অন্য কেউ একজন যিনি শুনেছেন বলে ওঠেন—‘দ’লা পাতৃ।’ এই জয় ধ্বনিটি দেয়ার সময় কেউ চিন্তা করে না, সে কি সোস্যালিস্ট, কমিউনিস্ট, প্রপ্রেসিভ নাকি কনজারভেটিভ। ফরাসিদের এই জাতীয় সংগীতটি ‘La Marseillaise’ ‘মারসেইয়েজ’ ১৭৯২ সালে অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার প্রাক্কালে রচিত হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ১৭৯৫ সালে এটি রাষ্ট্রীয়ভাবে জাতীয় সংগীত হিসেবে অলংকৃত হয়। ফরাসিরা যদি তাদের ফরাসি জাতীয়তাবাদের আলোকে আলোকিত হয়ে দল-মত নির্বিশেষে এটিকে তাদের জয়ধ্বনি হিসেবে বিবেচনা করতে পারে, তাহলে এক দেশ, এক জাতি, এক ভাষা এবং অভিন্ন ভূখণ্ডে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের জয়ধ্বনি ‘জয় বাংলা’ নাদটি বাঙালি জাতীয়তাবাদের অলংকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে না কেন? আমার কাছে মনে হয়েছে আমাদের নিপীড়িত ও নিরীহ মানুষগুলোকে বোঝানো হয়েছিল যে ‘জয়’ শব্দটি হিন্দুদের শব্দ এবং ‘জিন্দাবাদ’ হচ্ছে ইসলামী শব্দ। আগেই উল্লেখ করেছি ধর্মপ্রাণকে কূট কৌশলে ধমান্ধতায় রূপান্তর করা হয়েছে। এটি আজকে প্রতীয়মান যে স্বাধীনতাবিরোধীহীন, কাপুরুষ, পরাজিত, সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে অসাম্প্রদায়িক প্রগতিশীল বাঙালি জাতীয়তাবাদের ওপর এ রকম একটি ধাপ্পামূলক অপপ্রচার চালিয়েছে।

ঠিক এ পর্যায়ে একটি চিন্তার খোরাক আছে। কেন এ দেশের আপামর জনসাধারণ এই স্লোগানটিকে নির্বিঘ্ন চিত্তে ধারণ করতে পেরেছিল? তার কারণ হলো, প্রথমত স্বাধীনতার সংগ্রাম ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদকে কেন্দ্র করে একটি মৌলিক ও বাস্তবিক সত্য। পরবর্তী সময়ে তারই ধারাবাহিকতায় স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র। দ্বিতীয় কারণটি হলো, জাতিগতভাবে আমরা এক ও অভিন্ন, যেটা ইংরেজিতে ‘নেশন’ নামে পরিচিত। এখানে বাংলায় ‘নেশন’ শব্দের প্রতিশব্দ অনুপস্থিত। ইংরেজিতে জাতি বলতে ‘রেস’ (Race)-ও বুঝে থাকি। রেসে দৈহিক ও বংশগত সাদৃশ্য থাকতে পারে আবার ভাষাগত অসাদৃশ্যও থাকতে পারে। যেমন ভারতবর্ষে বিবিধ ভাষা ও ধর্ম থাকা সত্ত্বেও তারা একটি নেশন। আবার ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড আগে এক ছিল না (এখন তারা ‘ইউনাইটেড কিংডম’), যদিও বাহ্যিক দৃষ্টিতে সাদৃশ্য রয়েছে এবং তাদের ভাষাও অভিন্ন। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে বেশি বিবিধ জাতি (Race) ও বর্ণের মিশ্রণ হয়েছে ঠিকই কিন্তু পরিশেষে একটি নেশনে রূপান্তরিত হয়েছে—‘ইউনাইটেড স্টেটস অব আমেরিকা’। ভাষার ঐক্য ন্যাশনাল (জাতীয়) ঐক্যের সহায়তা করে সন্দেহ নেই, কিন্তু সেটা সর্বাঙ্গীণ নয়। তাছাড়া ভাষায় যে একটি জাতির সার্বিক অর্থে পরিচয় পাওয়া যায়, সেটাও নয়। স্পেনে স্প্যানিশ ভাষায় কথা বলে আবার লাতিন আমেরিকার শুধু ব্রাজিল ছাড়া ওই মহাদেশের সব দেশেই স্প্যানিশ মূল ভাষা হিসেবে প্রচলিত। কিন্তু তারা এক নেশন নয়!

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ নেশনকে যথার্থই আখ্যায়িত করেছেন, “নেশন একটি সজীব সত্তা, একটি মানস পদার্থ। দুটি জিনিস এই পদার্থের অন্তঃপ্রকৃতি গঠিত করেছে। সেই দুটি জিনিস বস্তুত একই। তার মধ্যে একটি অতীতে অবস্থিত, আর একটি বর্তমানে। একটি হচ্ছে সর্বসাধারণের প্রাচীন স্মৃতিসম্পদ, আর একটি পরস্পর সম্মতি, একত্রে বাস করবার ইচ্ছা। নেশনও সেরূপ সুদীর্ঘ অতীতকালের প্রয়াস, ত্যাগস্বীকার এবং নিষ্ঠা হতে অভিব্যক্ত হতে থাকে।অতীতে সকলে মিলে ত্যাগ, দুঃখ-স্বীকার এবং পুনর্বার সেজন্য সকলে মিলে প্রস্তুত থাকার ভাব হতে জনসাধারণকে যে একটি একীভূত নিবিড় অভিব্যক্তি দান করে তাই ‘নেশন’। এর পশ্চাতে একটি অতীত আছে বটে, কিন্তু তার প্রত্যক্ষগম্য লক্ষণটি বর্তমানে পাওয়া যায়। তা আর কিছু নয়; সাধারণ সম্মতি, সকলে মিলে একত্রে জীবন বহন করবার সুস্পষ্ট পরিব্যক্ত ইচ্ছা।” এই অভিব্যক্তির আলোকে হয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের শাসনতন্ত্রের চার মূলনীতি—জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা।

মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার সংগ্রামে এ দেশের মুক্তিকামী জনসাধারণ ঠিক এই মর্মেই একটি নেশনের জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে এক মূল্যবোধে, এক চেতনায়, বঙ্গবন্ধুর এক সুদৃঢ় আহ্বানে, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়াতে পেরেছিল। ঠিক এ কারণেই এক কণ্ঠে এ দেশের সর্বসাধারণ মানুষ বলে উঠতে পেরেছিল—জয় বাংলা। জয় বাংলা ছিল সাধারণ সম্মতি, সবাই মিলে একত্রে জীবন বহন করার সুস্পষ্ট পরিব্যক্ত ইচ্ছা। দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, কিছু ধাপ্পাবাজ,স্বার্থান্বেষী, স্বাধীনতাবিরোধী গোষ্ঠী ডানপন্থী রাজনীতির রেশ ধরে বলা শুরু করল, ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’। আরো বলা হলো, জিন্দাবাদ’ ইসলামী শব্দ! কস্মিনকালেও কোনো আরব রাষ্ট্রের অথবা অন্য কোনো ইসলামী প্রজাতন্ত্রে এরূপ কোনো স্লোগান নেই, কেবল পাকিস্তান ছাড়া। সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে অন্তর্নিহিত ব্যাপারটি কী হতে পারে! জয় বাংলা ধ্বনিটি আওয়ামী লীগের প্লাটফর্ম থেকে উদ্ভূত হলেও সেটা আর শুধু সেই দলের জয়ধ্বনি হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি। এটি রূপ নিয়েছিল আমাদের রণহুঙ্কারে এবং আমাদের বাঙালি জাতীয়তাবাদের চেতনায়। মুক্তিযোদ্ধারা কোনো দলের ছিলেন না, এমনকি শহীদ হওয়ার আগের মুহূর্তে জয় বাংলা চিত্কার করে তারা জীবনের শেষ প্রত্যয়, শেষ অভিব্যক্তি নির্দ্বিধায় ব্যক্ত করে গিয়েছেন। আমাদের বিজয় আমাদের অহংকার, বিজয় দিবস আমাদের অহংকার। প্রতি বছর ১৬ ডিসেম্বর মনে করিয়ে দেয় আমাদের সেই বীরত্বগাথা ইতিহাস। একটি জাতি সার্বিক পরিপূর্ণতা লাভ করে জাতীয়তাবাদের বিভিন্ন মৌলিক উপকরণের সমন্বয়ে।

জয় বাংলা সে রকম একটি বিষয়। পৃথিবীতে অনেক দেশ নানানভাবে আপষ করে নেশন হতে পেরেছে। আমাদের অতীতের গৌরবময় স্মৃতি ও সেই স্মৃতির অনুরূপ ভবিষ্যতের আদর্শ একত্রে দুঃখ পাওয়া, আনন্দ করা—এগুলোই অকৃত্রিম ব্যাপার। বাঙালি এত নিষ্পেষিত ও শোষিত হয়েছে যে আনন্দের চেয়ে দুঃখের বন্ধন দৃঢ়তর। সেদিক থেকে আমরা ঐতিহাসিকভাবে নেশনই ছিলাম, যার ধারাবাহিকতায় অর্জন করেছি একটি স্বাধীন, সার্বভৌম মানচিত্র এবং একটি লাল-সবুজ কেতন। আমাদের চেতনায়, মননে সর্বোপরি ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে যেন আমরা এই গর্বিত বিজয়কে ধারণ করতে পারি, শুধু একটি দিবস পালন করে নয়, তাই হোক আগামীর ব্রত। ‘জয় বাংলা, বাঙালির জয়।’

 রেজওয়ান উর রহমান: গবেষক, আটলান্টা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র