পরিবেশ দূষণ এড়াতে ঢাকার হাজারীবাগ থেকে চামড়া শিল্পনগরী সাভারে স্থানান্তরের উদ্যোগ নেয় সরকার। কিন্তু সেখানেও একই ধরনের পরিবেশ দূষণ ঘটতে দেখা যাচ্ছে। এর পেছনে রয়েছে দুর্বল বর্জ্য পরিশোধন ব্যবস্থা। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা যথাযথ না হওয়ায় সাভারের চামড়া শিল্পনগরী বন্ধ করে দেয়ার জন্য গত বছরের আগস্টে সুপারিশ করেছিল পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। কিন্তু শিল্প মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ না নেয়ায় বৃহস্পতিবারের বৈঠকে ক্ষোভ প্রকাশ করে কমিটি। বর্জ্য পরিশোধনের ব্যবস্থা না থাকলে সংশ্লিষ্ট ট্যানারি বন্ধ রাখার জন্য আবারো সুপারিশ করেছে তারা। সাভারে ট্যানারি শিল্প স্থানান্তর ও একে পরিবেশবান্ধব রূপ দিতে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করেছে শিল্প মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)। এটি তাদের উদাসীনতা ও অবহেলারই বহিঃপ্রকাশ। এজন্য তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন। সরকারই কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার (সিইটিপি) নির্মাণে নিয়োগ করে ঠিকাদার। যথাযথভাবে সিইটিপি নির্মাণের আগেই সাভারের চামড়া শিল্পনগরীতে ট্যানারি স্থানান্তরে মালিকদের বাধ্য করা হয়। তাই পরিবেশ দূষণের বিষয়ে মালিকদের দায় কম। তবে মালিকরা যে নির্দেশনা যথাযথভাবে পরিপালন করছেন, তাও নয়। এক্ষেত্রে উভয় পক্ষেরই দায় ও দায়িত্ব রয়েছে, যা এড়ানোর সুযোগ নেই। ট্যানারি বন্ধ করলে শ্রমিক বেকার হবেন, মালিকরাও ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়বেন। অন্যদিকে চামড়া রফতানিতেও ধস নামবে। বিদ্যমান বাস্তবতায় কারখানা বন্ধ কোনো সমাধান বয়ে আনবে না, বরং কারখানা চালু রেখেই কীভাবে পরিবেশ দূষণ দ্রুত বন্ধ করা যায়, তার পথ অনুসন্ধান করতে হবে। এক্ষেত্রে পারস্পরিক দোষারোপ বন্ধ করে চামড়া শিল্প বিকাশে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে।

সম্ভাবনাময় চামড়া শিল্পের রফতানি বাজারে অগ্রগতির বদলে ধস নামছে। অন্যদিকে বহুল আলোচিত নতুন চামড়া শিল্পনগরীতেও চলছে পরিবেশ ও নদীদূষণ। অথচ রাজধানীর বুড়িগঙ্গা নদীদূষণ ও হাজারীবাগ-কামরাঙ্গীরচর এলাকার পরিবেশ রক্ষার জন্যই ২০০৩ সালে সাভারের হেমায়েতপুরে ট্যানারি শিল্প সরিয়ে নেয়ার প্রকল্প হাতে নিয়েছিল সরকার। কিন্তু শুরু থেকেই ট্যানারি মালিকদের মধ্যে এ প্রকল্প নিয়ে গা-ছাড়া ভাব ছিল। অবশেষে ২০১৭ সালে উচ্চ আদালতের নির্দেশে হাজারীবাগে ট্যানারি কারখানার গ্যাস, পানি ও বিদ্যুৎ লাইন কেটে দিয়ে ট্যানারি মালিকদের হেমায়েতপুরে যেতে বাধ্য করা হয়। অন্যদিকে হেমায়েতপুরে ২০০ একর জায়গা নিয়ে চামড়া শিল্পনগরী প্রতিষ্ঠার প্রকল্প ১৯ বছরেও পূর্ণতা পায়নি। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এ ধরনের বিশেষায়িত শিল্পনগরী নির্মাণের কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকায় সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) এ ব্যর্থতার জন্য দায়ী। আর যে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ২০১২ সালে হেমায়েতপুরের কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার বা সিইটিপি নির্মাণের দায়িত্ব দেয়া হয়, তাদেরও এ বিষয়ে কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না। এসব কারণে দীর্ঘ সময়েও সিইটিপির সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা বলছেন, ২০১৭ সাল থেকে বিসিক বলে আসছে তাদের সিইটিপি প্রস্তুত, অথচ ২০২০ সালের শেষে এসে দেখা যাচ্ছে এটি কাজে আসছে না। তাদের অভিযোগ, বিসিকের অদক্ষতা দুর্নীতি, বুয়েটের সমীক্ষার ভুল, চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতা চামড়া শিল্পকে ডোবাচ্ছে। উল্লেখ্য, ৭০০ কোটি টাকা ব্যয়ে সিইটিপি নির্মাণের কার্যাদেশ দেয়া হয়েছিল ২০১২ সালে। হেমায়েতপুরে যে সিইটিপি তৈরি করা হচ্ছে, সেটির ধারণক্ষমতা ২৫ হাজার ঘনলিটার পানি। অথচ হেমায়েতপুরের কারখানাগুলো দৈনিক ৪০-৪৫ হাজার ঘনলিটার বর্জ্য পানি ছাড়ছে। ফলে ধারণক্ষমতা না থাকায় পানি ড্রেন উপচে সড়কে চলে যায়। আর অনেক কারখানা সরাসরি ধলেশ্বরী নদীতে বর্জ্য ফেলে দিচ্ছে। ফলে সেখানকার জনবসতি ও ধলেশ্বরী নদী দুটোই মারাত্মক দূষণের শিকার হচ্ছে। পরিবেশবান্ধব সিইটিপি করতে হলে সলিড ওয়েস্ট বা কঠিন বর্জ্য ও লিকুইড ওয়েস্ট বা তরল বর্জ্য দুটোরই ব্যবস্থাপনা থাকতে হয়। কিন্তু হেমায়েতপুরের সিইটিপিতে কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সুযোগ রাখা হয়নি আর তরল বর্জ্যের ধারণক্ষমতা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। এখন কঠিন বর্জ্য ফেলার জন্য দুটো ডাম্পিং স্টেশন নির্মাণ করা হচ্ছে। কিন্তু যথাযথ কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার না থাকায় পরিবেশ দূষণের প্রশ্নে দেশী প্রতিষ্ঠানগুলো বিদেশী ক্রেতাদের জোট লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ বা এলডব্লিউজির সনদ পাচ্ছে না এবং দেশের রফতানি বাজার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এর দায় কর্তৃপক্ষের ওপরই বর্তায়। পরিবেশ মন্ত্রণালয়সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটি যে নির্দেশনা দিচ্ছে, তা মানা হলে কারখানা বন্ধ হয়ে যাবে এবং বিপুলসংখ্যক মানুষ বেকার হয়ে পড়বে; যা কাম্য নয়। পরিবেশ দূষণের কথা বলে ট্যানারি শিল্পকে হাজারীবাগ থেকে সাভারে স্থানান্তর করা হলো কিন্তু তাদের প্রতিশ্রুত সুবিধা দেয়া হয়নি। এ অবস্থায় শিল্প মন্ত্রণালয়কে ট্যানারি বন্ধের পরামর্শ না দিয়ে কীভাবে চামড়া শিল্পকে পরিবেশবান্ধব করে তোলা যায়, তা নিয়ে ভাবতে হবে। এক্ষেত্রে উভয় মন্ত্রণালয় একসঙ্গে কাজ করতে পারে।

বিদ্যমান সিইটিপি যে ‘অকার্যকর’, তা উঠে আসে পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিদর্শনে। গত বছরের ২৯ আগস্ট ঢাকা ট্যানারি ইন্ডাস্ট্রিয়াল এস্টেট কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালককে একটি চিঠি দেয় পরিবেশ অধিদপ্তর। এতে বলা হয়, সিইটিপি অকার্যকরভাবে পরিচালিত হচ্ছে। অপরিশোধিত তরল বর্জ্য নালা দিয়ে ফেলা হচ্ছে নদীতে। এতে পরিবেশ ও প্রতিবেশ মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে। পরিবেশ দূষণ নিয়ে বিসিকের কর্মকর্তারা বলেন, মালিকরা বর্জ্য নির্গমনের নিয়ম মানেন না। অন্যদিকে ট্যানারি মালিকরা বলেন, সিইটিপি নির্মাণ ও পরিচালনা করছে বিসিক। ফলে দায়ও তাদের। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বল্প সময়ের মধ্যে সিইটিপির সক্ষমতা অনুযায়ী ট্যানারিগুলো থেকে বর্জ্য নির্গমন নিয়ন্ত্রণ করেও সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব। বড় কয়েকটি ট্যানারি স্বতন্ত্র ইটিপি করলে সিইটিপির ওপর চাপ কমবে। এদিকে দেশে যে পরিবেশসম্মত ট্যানারি তৈরি করা সম্ভব, তা দেখিয়েছে অ্যাপেক্স ফুটওয়্যার। গাজীপুরে তাদের জুতার কারখানার ট্যানারি ইউনিট এলডব্লিউজি সনদ পাওয়া। চামড়া শিল্পনগরীতেও অ্যাপেক্সের যৌথ বিনিয়োগের ট্যানারি আছে। ২০১৭ সালেই তারা এ কারখানায় আলাদা ইটিপি নির্মাণের অনুমতি চেয়েছিল। একইভাবে ইটিপি করার অনুমতি চায় বে। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় কোনো প্রতিষ্ঠানই তা পায়নি। এটি খুবই হতাশাজনক। দ্রুতই এর সমাধান প্রয়োজন। বাংলাদেশের চামড়া ও চামড়াজাত সামগ্রী রফতানিকারকরা সীমিত স্কেলে রফতানি চালিয়ে গেলেও এলডব্লিউজি সনদের অভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের ক্রেতারা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। বাংলাদেশে উন্নত মানের চামড়া থাকা সত্ত্বেও কমপ্লায়েন্সের শর্ত পূরণের জন্য কিছু বড় উদ্যোক্তা বিদেশ থেকে চামড়া আমদানি করে চামড়ার জুতা, ব্যাগ ও অন্যান্য পণ্য তৈরি করে রফতানি করেন। এটি চামড়া শিল্প বিকাশের অন্তরায়।

পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি চাইলে অদক্ষ ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে আর সময় বর্ধিত না করে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের এবং কোম্পানিটিকে কালো তালিকাভুক্ত করার পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে। বেসরকারি পরিচালনা কমিটির কাছে সিইটিপিসহ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা হস্তান্তরের আগে একটি পেশাদারি অভিজ্ঞ ও বিশেষজ্ঞ কোম্পানির মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ সমীক্ষা প্রয়োজন। এ কাজ ইউরোপীয় বিশেষায়িত কোম্পানির মাধ্যমে করা যেতে পারে। প্রয়োজনে উন্নত দেশের সহায়তা চাওয়া যেতে পারে। এরূপ সহায়তার অবর্তমানে সরকারি প্রণোদনা দিয়ে কাজটি সম্পন্ন করা যায়। প্রস্তাবিত সমীক্ষার পর যেখানে যা প্রয়োজন, তা-ই করে সিইটিপির সফল কমিশনিং ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সম্পন্ন করা যেতে পারে। এ কাজে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে। ইত্যবসরে উদ্যোক্তাদের ব্যাংক থেকে সহজ শর্তে বিশেষ ঋণের ব্যবস্থা করা যায়। সরকার চামড়া শিল্প পুনরুদ্ধারের জন্য করোনাকালীন বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করতে পারে। সেই সঙ্গে তৈরি পোশাক শিল্পের অনুরূপ চামড়া শিল্প খাতেও কর অব্যাহতি ও নগদ প্রণোদনা দেয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে চামড়া শিল্প উদ্যোক্তাদেরও সততা ও পেশাদারত্ব বজায় রেখে কাজ করতে হবে। গৃহীত ঋণের অর্থ অন্যত্র ব্যয় বা বিনিয়োগ না করে চামড়া খাতেই ব্যবহার করবেন এবং ব্যাংকঋণ সময়মতো পরিশোধ করতে সচেষ্ট হবেন। একটি সম্ভাবনাময় খাতকে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় শুধু বাঁচিয়ে রাখাই নয়, জাগিয়ে তুলতে হবে।

চামড়া শিল্পনগরীর পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে এত বড় বড় ভুলের দায় নীতিনির্ধারক ও ব্যবস্থাপকরা কোনোভাবেই এড়াতে পারেন না। চামড়া শিল্পের রফতানি বাজার সম্প্রসারণ ও অভ্যন্তরীণ বাজারের বিকাশ দুই লক্ষ্যেই হেমায়েতপুরের চামড়া শিল্পনগরীর সংকট নিরসনে যথাযথ উদ্যোগ নিতে হবে। ভুলে গেলে চলবে না, কাঁচা চামড়া সংগ্রহ থেকে ট্যানারিজাত হয়ে জুতা, জ্যাকেট, ব্যাগ ও অন্যান্য চামড়াপণ্য তৈরি পর্যন্ত কয়েক লাখ মানুষ এ খাতে জড়িত। এ খাতে যে অভিজ্ঞতা, দক্ষ শ্রমিক ও কর্মী তৈরি হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের শক্তির জায়গা। ফলে ট্যানারি শিল্পের শ্রমিক ও কর্মচারীদের জন্য ন্যূনতম মজুরি, নিরাপত্তা ও মানবিক কর্মপরিবেশ সৃষ্টির বিষয়েও উদ্যোগী হতে হবে। এখনই এসব উদ্যোগ না নিলে সম্ভাবনাময় চামড়া শিল্প রক্ষার আর কোনো পথ থাকবে না।