বছরের হিসাবের জন্য বিশ্বে এখন প্রায় ৮০টিরও বেশি দিনপঞ্জি বা ক্যালেন্ডার অনুসরণ করা হয়। এছাড়া হিজরি সন, ভারতীয় পঞ্জিকার ব্যবহারও রয়েছে। কিন্তু এর বাইরে বাজেট বর্ষ বা অর্থবছর নামে আরো একটি হিসাব চালু রয়েছে। সাধারণ বছর আর অর্থবছর এক নয়। দেশের হিসাব-নিকাশ, রাষ্ট্রীয় আয়-ব্যয় পরিকল্পনা অর্থবছর ধরেই হয়। কিন্তু ব্যাংক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো ইংরেজি বছর ধরেই তাদের হিসাব-নিকাশ করে। গত কয়েক দশকে বহু দেশ প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থবছরের পরিবর্তন করেছে। বাংলাদেশে কোনো পরিবর্তন হয়নি। এখনো ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমল থেকে পাওয়া অর্থবছরই অনুসরণ করা হচ্ছে। জুলাইয়ে অর্থবছর শুরু হয়, শেষ হয় জুনে। প্রতিটি দেশই অর্থবছরের সময়সীমা নির্ধারণ করে দেশী সংস্কৃতি, প্রাকৃতিক নিয়মাচার ও অর্থনৈতিক প্রয়োজনীয়তার নিরিখে। বাংলাদেশ ২০২৬ সালে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে আনুষ্ঠানিকভাবে নাম লেখাতে যাচ্ছে, সেখানে অর্থবছরের কারণে কোনো কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হওয়া কাম্য নয়। পরিকল্পনামন্ত্রীও অর্থবছর পরিবর্তনের পক্ষে বলেই মত ব্যক্ত করেছেন। প্রত্যাশা থাকবে অর্থনীতি গতিশীল করার স্বার্থে দ্রুতই বাংলাদেশের উপযোগী অর্থবছর নির্ধারণ করা হবে। এক্ষেত্রে কোনো আমলাতান্ত্রিক জটিলতা থাকলে তাও নিরসন করা জরুরি।
১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর ভারতীয় প্রজাতন্ত্র ১ এপ্রিল থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত অর্থবছর অনুসরণ অব্যাহত রাখে; কিন্তু পাকিস্তান সরকার জুলাই-জুনকে অর্থবছর নির্ধারণ করে। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় শাসনে পশ্চিম পাকিস্তানের প্রাধান্য থাকায় পূর্ববঙ্গ বা পূর্ব পাকিস্তান বা বর্তমানের বাংলাদেশ প্রাদেশিক বা আঞ্চলিকতায় পর্যবশিত হয়। বাংলার কৃষি ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মৌসুম অনুগামী বাংলা সন অর্থবছরের সাযুজ্যতায় মর্যাদার প্রশ্নে গুরুত্ব হারিয়ে ফেলে। সে সময় পশ্চিম পাকিস্তানের কৃষি বা উৎপাদন মৌসুম, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সবকিছুই ছিল পূর্ব পাকিস্তান থেকে ভিন্ন। সে কারণে এপ্রিল-মার্চের স্থলে জুলাই-জুনকে অর্থবছর সাব্যস্ত করার ক্ষেত্রে পাকিস্তানের সিদ্ধান্তই একচ্ছত্র হয়ে যায়। বাংলাদেশে মূলত মে মাস থেকে সেপ্টেম্বর অবধি বর্ষাকাল। বিদ্যমান অর্থবছর শুরু হয়েই প্রথম তিন-চার মাস বর্ষাজনিত কারণে উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড শুরু করা যায় না। আয়কর আইন অনুযায়ী আগের অর্থবছর শেষ হওয়ার তিন মাসের মাথায় ঠিক এ সময়টায় আয়কর প্রদানের বাধ্যবাধকতা চলে আসে, আগস্ট-সেপ্টেম্বরে প্রায়ই বড় বন্যা তথা প্রাকৃতিক দুর্যোগ অর্থনৈতিক জীবনযাত্রায় দুর্গতি বয়ে আনে এবং এ সময়টা ফসল বপন ও তোলার নয়; ফলে আয়কর হিসাবায়ন, পরিশোধ তথা রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতায় বিব্রত বোধ করেন রাজস্ব প্রদানকারীরা। নানা কারণে প্রায় প্রতি বছর আয়কর প্রদানের সময় বাড়ানোর দাবি উঠে আসে। সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে কার্য কিংবা সরবরাহের আদেশ দিতে দিতে এপ্রিল-মে। সরবরাহ সেবা কিংবা ভৌত কর্মকাণ্ড শুরু যখন হয় তখন বর্ষা শুরু হয়ে যায়। কাজের, সরবরাহের, সম্পাদনের গুণগত মান বজায় রাখা বর্ষাকালে বাংলাদেশে কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এ সময় মেরামত বা সংস্কারকাজে জনভোগান্তি যেমন বাড়ে, কাজের গুণগত মান পরিবীক্ষণেও ঘটে বিপত্তি। অর্থবছরের শেষে বরাদ্দ অনুযায়ী কাজ শেষ করার তাগিদে কিংবা প্রকল্প বাস্তবায়ন দেখানোর প্রয়োজনীয়তায় নানা অনিয়ম ও অনৈতিকতার আশ্রয় নেয়াটা নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। অনিচ্ছা সত্ত্বেও এ সময়টায় অপব্যয়-অপচয়ের অবকাশ হয় অবারিত। শুধু কৌশলগত অবস্থানের কারণে বাংলাদেশের অর্থবছরের পাঁচ-ছয়টি মাস অর্থনীতির জন্য অনুকূল না হয়ে প্রতিকূল হয়ে ওঠে।
অথচ অর্থবছরের এ ব্যাপ্তিটা জুলাই-জুনের পরিবর্তে যদি এপ্রিল-মার্চ হয় তাহলে প্রথম মাসেই কাজ শুরু করে পরবর্তী তিন-চার মাস বর্ষাকালে আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে অক্টোবর-মার্চ এ ছয় মাস পুরোটাই নিরবচ্ছিন্নভাবে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন কাজে পরিপূর্ণ ব্যবহার সম্ভব হতে পারে। বাংলাদেশের জন্য এ সময়টিই সব কাজের জন্য অনুকূল, সহনশীল ও উৎপাদনমুখী। ব্যক্তি ও ব্যবসা উভয় শ্রেণীর করদাতার জন্যও মে-জুনে করের হিসাবায়ন, কর প্রদান তথা রিটার্ন দাখিলে বিড়ম্বনা স্বাভাবিকভাবে হবে কম। কৃষিপ্রধান অর্থনীতির এ দেশে উৎপাদন মৌসুম, অর্থনৈতিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ও ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনার ক্ষেত্রে আবহাওয়া ও আবহমান সংস্কৃতির সুসময়কে শনাক্ত করেই অর্থবছরের ব্যাপ্তিকাল নির্ধারণ হওয়া উচিত।
দেশওয়ারি পর্যালোচনায় দেখা যায়, মার্কিন মুলুকের দেশগুলোয় (থাইল্যান্ডসহ) অক্টোবর-সেপ্টেম্বর, কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোয় জুলাই-জুনের (ভারত, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাজ্য, হংকং ব্যতিক্রম) মৌসুমি বলয় এবং এশীয় দেশগুলোয় (ভারত, জাপান, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাজ্য, হংকংসহ) এপ্রিল-মার্চের প্রাধান্য। সার্কভুক্ত সাতটি দেশের চারটিতে (বাংলাদেশ, পাকিস্তান, নেপাল ও ভুটান) জুলাই-জুন, দুটি দেশে (শ্রীলংকা ও মালদ্বীপ) পঞ্জিকাবর্ষ (জানুয়ারি-ডিসেম্বর) এবং একমাত্র ভারত এপ্রিল-মার্চকে অর্থবছর হিসেবে ব্যবহার করে। উদীয়মান বিশ্বশক্তি চীন ও মালয়েশিয়া উভয়ই পঞ্জিকাবর্ষকে অর্থবছর মানে। কোনো কোনো দেশ যেমন নেপাল (১৬ জুলাই-১৫ জুলাই), ইরান (২১ মার্চ-২০ মার্চ), ইথিওপিয়া (৮ জুলাই-৭ জুলাই) মাসের মধ্যবর্তী তারিখ থেকে অর্থবছর শুরু করে। এর পেছনে নিশ্চয়ই কোনো ঐতিহাসিক কারণ রয়েছে। বাংলা সনকে হুবহু সাযুজ্যকরণে বাংলাদেশের অর্থবছর ১৪ এপ্রিল থেকে ১৩ এপ্রিল সাব্যস্ত হতে পারে। এর সঙ্গে জানুয়ারি-ডিসেম্বর অর্থাৎ গ্রেগরিয়ান পঞ্জিকাবর্ষকে বাংলাদেশের অর্থবছর করার প্রস্তাবটি তুলনামূলক বিচার-বিশ্লেষণ করে দেখা যেতে পারে। বাংলাদেশের জলবায়ু, জীবনযাপনের সময়চক্র, আর্থ-প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের আবহমান সংস্কৃতিকে যথাবিবেচনায় আনলে অর্থবছর জানুয়ারি-ডিসেম্বর হওয়াটা অধিকতর যুক্তিযুক্ত প্রতীয়মান হয়।
বাংলাদেশের আর্থিক বাজারের আওতাধীন তফসিলি ব্যাংকসহ বীমা ও লিজিং কোম্পানির বাজেট ও চূড়ান্ত হিসাব ইংরেজি ক্যালেন্ডার বছর ধরে করা হয়। কেবল ষাণ্মাসিকভাবে জুন ক্লোজিং করা হয়। অথচ অর্থবছর ভিন্নতর হওয়ায় অযথা ঝামেলা ও ডুপ্লিকেট কাজ করতে হয়। যদি জাতীয়ভাবে ইংরেজি ক্যালেন্ডার বছর ভিত্তি করে বাজেট করা হতো তাহলে অর্থবাজারের আওতায় প্রায় সব আর্থিক প্রতিষ্ঠান কর্তৃক এ ব্যাপারে ইতিবাচক ভূমিকা রাখা সহজতর হতো এবং সর্বশেষ হালনাগাদ সরকারি ক্রয় নীতিমালা যথাযথ বাস্তবায়নের পথ সুগম হতো। আন্তর্জাতিক ব্যবসায় রফতানি ও আমদানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশে প্রচলিত জুলাই টু জুন হিসাবে আন্তর্জাতিক বাজারে কোনো প্রাধান্যই পায় না। তাই আয়ের প্রধান উৎস যে গার্মেন্ট ও শ্রম রফতানির রেমিট্যান্স, তা সাধারণত ইংরেজি বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী জানুয়ারি টু ডিসেম্বরভিত্তিক তারিখ ও সময়ের ওপর ভিত্তি করে হয়। প্রসঙ্গত, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর স্বাধীনতাপ্রাপ্ত প্রায় সব নতুন রাষ্ট্র অর্থবছর তথা বাজেট বছরের ক্ষেত্রে ইংরেজি ক্যালেন্ডার বছর অনুসরণ করে। মূলত আমাদের দেশে জুলাই টু জুন ভিত্তি করে হিসাব করতে গিয়ে দুটি ক্যালেন্ডার বছর ধরে এগোতে হয়। এতে হিসাব কার্যক্রমে জটিলতা সৃষ্টি হয়। সেখানে গতানুগতিক জুলাই টু জুনের অর্থবছর পদ্ধতি পরিবর্তন করাই বিধেয়। প্রশ্ন উঠতে পারে অর্থবছর এপ্রিল থেকে মার্চ নাকি জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর হবে। বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমেই যাচাই-বাছাইপূর্বক দেশের জন্য সুবিধাজনক সময় অর্থবছর নির্ধারণ করা যেতে পারে। বিষয়টি এমন নয় যে একবার অর্থবছর পরিবর্তন করা গেলে আর করা যাবে না। কাজে খুব বেশি অসুবিধার সৃষ্টি হলে অর্থবছর আবার পরিবর্তনও করা যেতে পারে।
সিদ্ধান্ত নিতে সরকারের এত অনীহা কেন বলা মুশকিল। তবে জানা যাচ্ছে, ২০০৬ সালে অর্থবছর পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়ে আমলাদের অসহযোগিতায় সেটি বাস্তবায়ন করা যায়নি। ধারণা করা হয়, জটিলতা এড়াতেই তারা এতে রাজি হননি। এখন তো ডিজিটাল সময়ের যুগ। অথচ অর্থবছরের পরিবর্তনে অর্থনীতির গতি-প্রকৃতির উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন হওয়ার কথা নয়, তবে এতে মানুষের ভোগান্তি কিছু কমবে; সঙ্গে অপচয় বা দুর্নীতির সুযোগও কিছুটা কমবে। পরিসংখ্যান ও হিসাবের সুবিধার জন্য কয়েক বছর পরপর ভিত্তি বছর পরিবর্তন করা হলেও অর্থবছর কেন পরিবর্তন করা যাচ্ছে না, তা বোধগম্য নয়। অর্থবছর পরিবর্তন করার বিরুদ্ধে এ যুক্তি একেবারেই টেকে না যে আন্তর্জাতিকভাবে সমন্বয়ের জন্য জুলাই-জুন অর্থবছর রাখতে হবে। বাংলাদেশের আবহাওয়া অনুযায়ী অর্থবছর জানুয়ারি-ডিসেম্বর বা এপ্রিল-মার্চ (বৈশাখ-চৈত্র মিলিয়েই করা যায়) হতে পারে। এতে বৃষ্টি শুরু হওয়ার আগেই আগের বছরের সব কাজ শেষ করা সম্ভব।










