(১৯ মার্চ ছিল কবি, লোকবিজ্ঞানী ও শিশুসাহিত্যিক আশরাফ সিদ্দিকীর দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী। তাকে স্মরণ করে প্রকাশিত হলো ঢাকার ওপরে তার একটি লেখা)

 

আমার শৈশব কেটেছে টাঙ্গাইলে। প্রথম ঢাকায় পা রাখি ১৯৪৭-এ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমি ওই বছরই বাংলায় অনার্স পাস করি। কিন্তু আমার পাস করার কথা ছিল শান্তিনিকেতন থেকে। পড়ালেখার জন্য তখন আমরা সবাই কলকাতামুখী ছিলাম। তাই ঢাকার আগে আমি কলকাতা দেখেছি। শান্তিনিকেতনে আমি ইন্টারমিডিয়েট ও বাংলায় অনার্স সমাপ্ত করেছিলাম। দেশভাগের কারণে আমার সেখানে ফাইনাল পরীক্ষাটি দেয়া সম্ভব হয়নি। ঢাকায় এসে উঠলাম আমার মামাতো ভাই বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর (বাংলাদেশের প্রথম সাংবিধানিক রাষ্ট্রপতি) ময়মনসিংহ রোডের বাসা রোজেন ডেলে। ছয় বিঘা জায়গাজুড়ে কী অপরূপ সে বাড়ি! সেই বাসার চারদিক ছিল জঙ্গলে ঘেরা। বলা যায় সবই ফাঁকা জায়গা।

আমার ঢাকাজীবনের প্রথম দিককার বুড়িগঙ্গার দুই তীর ছিল দেখার মতো। দুই তীরে পর্তুগিজ, ইংরেজ, ফরাসি, আর্মেনীয়দের বিশাল বিশাল দালান আর ফ্রে রোড, বেগমবাজার, চায়না টাউন এসব। নদী তখন কমসে কম এক মাইল প্রশস্ত আর অনেক গভীর। বুড়িগঙ্গার দুই তীরের জেটিতে ভিড়ত কলকাতা ও বিশ্বের বিভিন্ন  স্থান থেকে আসা পণ্যবোঝাই জাহাজ। নদীর পূর্ব দিক থেকে সোয়ারীঘাট—তিন মাইলের বেশি জায়গাজুড়ে বিরাট বাকল্যান্ড বাঁধ। বাঁধ ডিঙিয়ে পানি কখনো ঢাকায় আসতে পারত না। নদী পারাপারের জন্য ছিল খেয়া নৌকা। নৌকায় জিঞ্জিরা থেকে মাওয়া ঘাট যাওয়া যেত। নৌকায় চড়ে আমি জিঞ্জিরা প্রাসাদ দেখতে গিয়েছিলাম। নবাবদের অনেক স্মৃতিবিজড়িত প্রাসাদ শিশমহল-অন্দরমহলসহ প্রায় আধা মাইল জায়গাজুড়ে থাকা অনেক ছোট বড় স্থাপনা। ফরাসগঞ্জে ছিল আমাদের বোন রেখার বাড়ি। বুড়িগঙ্গা নদীর গা ছুঁয়ে তোলা বাড়িটার বারান্দায় বসে দেখতাম লঞ্চ আর স্টিমারের ব্যস্ততা। বাড়িটাকে আমি বলতাম স্যানেটোরিয়াম। বাড়িটির নিচতলায় ছিল তাদের মডার্ন ফার্নিচার নামে সেসময়কার বিখ্যাত আসবাবের দোকান।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবন ছিল বর্তমানে মেডিকেল কলেজের ঠিক দক্ষিণ দিকে। সামনে ছিল একটা বিরাট পুকুর। বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢোকার জন্য একটা গেট ছিল। সেই জায়গার ঘটনাকে ঘিরেই আমি লিখেছিলাম ‘গলির ধারের ছেলেটি’, যাকে নিয়ে পরে সুভাষ দত্ত ডুমুরের ফুল সিনেমা তৈরি করে জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিলেন। পূর্ব-পশ্চিম দোতলায় বাংলা বিভাগ। একতলা ও দোতলা, প্রতিটিতে সাত-আটটা করে খুপরি ঘর। আমি থাকতাম সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে। ১৯৪৭ সালের শেষের দিকেও আমাদের বিভাগের অধিকাংশ ছিলেন হিন্দু শিক্ষক। আট-নয়জনের মতো শিক্ষক ছিলেন তখন। তাদের মধ্যে প্রফেসর প্রাণেশ চন্দ্র বসু ছিলেন রিডার, হরনাথ পাল ছিলেন লেকচারার। ১৯৫০ সালে আমি এমএ পাস করি, ততদিনে হিন্দু শিক্ষকরা চলে গেছেন। যোগ দিয়েছেন ভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, আব্দুল হাই (রাজশাহী কলেজ থেকে), ইদ্রিস মিয়া প্রমুখ। এরও কিছু পরে সৈয়দ আলী আহসান। ’৫০ সালে আমি সরকারি কলেজে যোগ দিই। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ আমাকে যোগদান করালেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। উদ্দেশ্য শিক্ষকতার পাশাপাশি তাকে লোকসাহিত্য গবেষণায় সহযোগিতা করব। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিখ্যাত ঐতিহাসিক স্থান ছিল আমতলা। আওয়ামী লীগ, মুসলিম লীগ, ভাসানীর সমাবেশসহ অনেক ইতিহাসের সাক্ষী আমতলা এখন নেই। গাছটি মারা গেছে।

তখন শাহবাগ ছিল না, টিএসসি ছিল না। পাবলিক লাইব্রেরি কেবল শুরু হচ্ছিল, আর আর্ট কলেজ ছিল টিনের। বর্তমানে টিএসসির পশ্চিম পাশের গম্বুজওয়ালা গুরুদুয়ারা নানক শাহীর চারপাশে ছিল বিস্তর খোলা জায়গা। আমাদের আজকের বাংলা একাডেমি তখন শুধুই বর্ধমান হাউজ, ছোট সুন্দর একটা দোতলা বাড়ি। ’৫২-তেও সেখানে থাকতেন প্রাদেশিক গভর্নর নুরুল আমিন। এর উত্তরে ছিল শত বছরের পুরনো এক ব্যবসায়ীর কবর এবং তাকে ঘিরে একটা মসজিদ। শুনেছি স্থানীয় ঢাকাইয়ারা এটিকে আস্তে আস্তে পীরের দরগা বিবেচনা করতে থাকে এবং কালক্রমে তাবিজ, ফুঁ, পানিপড়া ইত্যাদি নিতে আসতে থাকে। শেরেবাংলা এ. কে. ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীসহ তিন নেতার সমাধির পেছনে আজও সক্রিয় সেই মসজিদ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবন বর্তমান স্থানে চালু হয়েছে ’৫৫-র দিকে। ’৫২-এর দিকে ছোট ছোট কিছু ভবন নিয়ে নিউমার্কেট চালু হতে শুরু করে। তার আগে কোনো কিছু কেনার দরকার হলে ছুটতে হতো পাটুয়াটুলী বা ইসলামপুরে। নারীরা শাড়ি কিনতে ছুটতেন পাটুয়াটুলীর ঢাকেশ্বরী ও এমএ চৌধুরীদের দোকানে।

পঞ্চাশের দশকে ঢাকায় মোটরগাড়ির সংখ্যা ছিল হাতেগোনা। আট-দশটির মতো। স্পষ্ট মনে আছে, ইডেন বিল্ডিংয়ের সেক্রেটারি মোটরগাড়ি ব্যবহার করতেন। শহরজুড়ে চলত রিকশা আর ঘোড়ায় টানা টমটম। ভাড়াটে ঘোড়ার গাড়ির প্রচলন ছিল ব্যাপক। নেতারা, এমনকি মন্ত্রীরাও যাতায়াত করতেন ঘোড়ার গাড়িতে। অভিজাতদের অবশ্য নিজস্ব ঘোড়ার গাড়ি থাকত। বিয়ে-শাদি ও অন্যান্য অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে মূল বাহন ছিল ঘোড়ার গাড়ি। ঘোড়ার গাড়ির ঢাকাইয়া গাড়োয়ানরা ছিল খুব হাস্যরসিক। মুসলিম হল থেকে ইসলামপুর ভাড়া ছিল আট আনা। কিন্তু তারা চাইত এক টাকা। যদি বলতাম, ‘আট আনায় যাবেন না?’ তখন সে ঘোড়ার সঙ্গে কথা বলতে শুরু করত, ‘কিরে আট আনায় যাইবি?’ তারপর মাথা উঁচিয়ে বলত, ‘না হুজুর, ঘোড়ায় কইছে বারো আনার নিচে যাইব না।’ কিংবা গাড়ি জোরে চালাতে বললে বলত ‘পঙ্খীরাজ চল উইড়া চল।’ চাবুক খেয়ে ঘোড়া ছুটত টকবগিয়ে। ঘোড়ার গাড়িতে টঙ্গী পর্যন্ত যাওয়া যেত অনায়াসে।

ঢাকার অন্যতম আকর্ষণ ছিল ঢাকাইয়ারা। তারা উর্দু ও বাংলা মিশিয়ে এমন মজা করে কথা বলত, সবাই দাঁড়িয়ে যেত তাদের কথা উপভোগ করতে। এক ঢাকাইয়া রিকশাওয়ালা সময়ের পরিবর্তন বোঝাতে একবার বলেছিল, ‘বিটিশ আমলে আছিল শাসন, পাকিস্তান আমলে শোষণ, আর এখন শুনি খালি ভাষণ।’ তাদের রসবোধ বাংলা সাহিত্যের অন্যতম খোরাক। প্রায় সব কথাতেই ব্যবহার করত ‘আবে হালা’!। পুরান ঢাকার অনেকেই ছিল বিস্তর টাকার মালিক। এদের মধ্যে বিখ্যাত এক ধনী ছিল চুড়িওয়ালা। পুরান ঢাকায় একটা জায়গায় ছিল ‘চুড়িহাট্টা’। ঢাকাইয়া রাজমিস্ত্রিরা ছিল চৌকস নির্মাতা। এছাড়া ঘোড়ায় খুর লাগানো, ঘোড়ার গাড়ি মেরামতসহ অনেক ব্যবসাই ছিল তাদের একচেটিয়া। তারা খুব রঙচঙে কাপড় পরতে পছন্দ করত। আমরা যারা অন্যান্য শহর থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসেছি, তারা তাদের ছোট করতে চাইতাম ঢাকাইয়া কুট্টি বলে।

পঞ্চাশের ঢাকার বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম ছিল থিয়েটার আর সিনেমা। মুকুল (পাটুয়াটুলী), লায়ন এসব সিনেমা হলে বাংলা, উর্দু, হিন্দি, ইংরেজি সিনেমা খুব চলত। প্রমথেশ বড়ুয়া-কানন বালার দেবদাস ছিল সুপারহিট। তখনো মেয়েরা জোরেশোরে আসেনি থিয়েটারে। ছেলেরাই মেয়েদের মতো করে নাচত, চুল লাগিয়ে মহড়া করত। মুসলিম হলে একবার অভিনয়ের জন্য একজন পেশাজীবী নাচনেওয়ালি আনা হয়েছিল। নারী সংস্কৃতিচর্চাকারীদের তখনো সম্মান দিতে শিখিনি বলে হুলুস্থুল কাণ্ড বেধে গেল। লাঠি নিয়ে চড়াও হয়েছিল অনেকে। সহ-অভিনয়ের জন্য ঢাকার মঞ্চকে আরো অনেক দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছিল।

ঢাকা মর্মান্তিক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাও দেখেছে। বিহারের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার জের ধরে ঢাকায় শুরু হয়েছিল দাঙ্গা। তবে ছাত্রলীগ, আওয়ামী মুসলিম লীগ ও বামপন্থী নেতারাসহ শেরেবাংলা এ. কে ফজলুল হক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বিপক্ষে অবস্থান নেয়ার কারণে দাঙ্গা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারেনি। এ দাঙ্গার সময় আমি দেখেছি মুসলমান পরিবারগুলো ও ছাত্রনেতারা হিন্দু মেয়েদের নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দিচ্ছে। সে সময়ে ছাত্রদের মাঝে উদারতার শুভবোধ ছিল।

১৯৭১ সালে ঢাকা ছিল সব ঘটনার কেন্দ্রস্থল। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু দিলেন তার কালজয়ী বক্তৃতা, ছাত্রনেতারা ওড়াল বাংলাদেশের পতাকা। এর পরেই পাকিস্তানি মিলিটারি চালাল নির্বিচারে গণহত্যা। বাঙালিরা রুখে দাঁড়াল। শুরু হলো আমাদের মুক্তিযুদ্ধ। ঢাকার পরতে পরতে মিশে আছে পাকিস্তানিদের হত্যাযজ্ঞের কলঙ্ক। বিশ্ববিদ্যালয় হারাল জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা, মুনীর চৌধুরীসহ আরো কত জনকে। ঔপন্যাসিক শহীদুল্লাহ কায়সার আমাদের বর্তমান ধানমন্ডির বাসায় পালিয়ে থাকলেন কয়েকটা দিন। তারপর চলে যান অন্য কোনো নিরাপদ স্থানে। তবে নিস্তার পাননি রাজাকারদের হাত থেকে। তাকে খুঁজতে গিয়ে হারিয়ে যান জহির রায়হান। আজও তার কোনো খোঁজ মেলেনি। ডিসেম্বরে দেশ স্বাধীন হলো। কিন্তু শেষ হত্যাযজ্ঞ চলল ঠিক তার আগে আগে। মোহাম্মদপুর-মিরপুরে থাকা বিহারিদের এক অংশ দেশীয় রাজাকার ও মিলিটারিদের সঙ্গে মিলে হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে অনেক বাঙালিকে বীভৎস কায়দায় হত্যা করেছিল। রায়েরবাজারের বধ্যভূমিতে আমার চাচাশ্বশুর ড. আলীম চৌধুরীসহ অনেক বুদ্ধিজীবীর মরদেহ পাওয়া গেল। আমার স্ত্রী সাঈদা সিদ্দিকী সেই বধ্যভূমিতে শনাক্ত করেছিলেন তার চাচাকে।

স্বাধীন বাংলাদেশে আবার বিকশিত হতে থাকে এ ঢাকা নগরী। বড় বড় দালানকোঠা আর স্ট্রিট লাইটে সাজানো এ শহর। কিন্তু পৃষ্ঠপোষকতা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বিলীন হয়ে যাচ্ছে জিঞ্জিরার নওয়াবদের পুরনো বাড়িঘর বা ঘষেটি বেগমের নির্বাসনের কাটরা। এখনো যেসব প্রাচীন স্থাপত্য রয়েছে, যা ঢাকার ইতিহাস তুলে ধরে, সেগুলো রক্ষা করেই ঢাকাকে আধুনিকতার শরিক হতে হবে।