বলধা গার্ডেনে পানি সংকট চলছে কয়েক বছর ধরে, গরমের সময় এটি তীব্র সংকটে রূপ নেয়। প্রয়োজনের এক-তৃতীয়াংশ পানিও পাচ্ছে না বলধা গার্ডেন কর্তৃপক্ষ। বাগানের ছোট-বড় চৌবাচ্চাগুলোর পানির স্তর নেমে গেছে। বিশাল পুকুরটিও প্রায় পানিশূন্য। গতকাল বণিক বার্তায় প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চাহিদামতো পানি সরবরাহ করছে না ঢাকা ওয়াসা। পানির অভাবে এরই মধ্যে অনেক গাছ মারা গিয়েছে। অন্য গাছগুলোও মরে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। বলধা গার্ডেন কর্তৃপক্ষ এ সমস্যার কথা জানিয়ে ঢাকা ওয়াসা কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার চিঠি দিয়েছে। কিন্তু ওয়াসা কর্তৃপক্ষ পানি সংকট নিরসনে কোনো উদ্যোগ নেয়নি। অন্যদিকে ওয়াসা কর্তৃপক্ষ বলছে, পুরনো পাম্পটি সরিয়ে নতুন পাম্প বসাতে পারলে এ সংকট সমাধান করা সম্ভব। নতুন পাম্প বসাতে হলে যন্ত্রপাতি ও পাম্প স্থাপনের জন্য জায়গা প্রয়োজন। কিন্তু বলধা গার্ডেন কর্তৃপক্ষ সেটি দিচ্ছে না। এটি সরকারের আন্তঃঅধিদপ্তরের সমন্বয়ের একটি মন্দ দৃষ্টান্ত। দুই বিভাগের টানাটানিতে বলধা গার্ডেনকে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষায় সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নেবে বলে প্রত্যাশা।
বর্তমানে এ উদ্যানে অনেক দুর্লভ প্রজাতির গাছ রয়েছে। এগুলোর মধ্যে তিন শতাধিক গাছ খুবই বিরল। কিন্তু বণিক বার্তায় প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, পানির অভাবে জীববৈচিত্র্য চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। অনেক গাছ মারা গেছে, ঠিকমতো বাড়ছে না। ফুল-ফল ধরছে না। কয়েক বছর ধরে ওয়াসা ঠিকমতো পানি না দেয়ায় গাছগুলোর এ পরিণতি ঘটছে। ১৯৮১ সালে উদ্যান কর্তৃপক্ষ ও ওয়াসার মধ্যে সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী গাছগুলোর জন্য ওয়াসার প্রতিদিন ১০ হাজার গ্যালন পানি দেয়ার কথা। কিন্তু আগে ঠিকমতো পানি দিলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ পানি দেয়ায় অনিয়ম দেখা গেছে। আবার ওয়াসা কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে উদ্যান কর্তৃপক্ষের উদাসীনতাকে দায়ী করছে। দুঃখজনক বিষয় হলো, চার বছরের অধিক সময় ধরে এমন বিরোধ চললেও কোনো সমাধান আসেনি। বিষয়টিতে জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সরকারের উদাসীনতাও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রতি বছরই গরমের সময় পানি সংকট চরম আকার ধারণ করে। এতে একের পর এক বৃক্ষ মারা যাচ্ছে, সৌন্দর্য হারাচ্ছে বলধা গার্ডেন। এমন অবস্থা চলতে থাকলে একসময় বাগানের সব গাছ পানিশূন্যতায় মারা যাবে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এখন পারস্পরিক দোষারোপের এ বৃত্ত থেকে বেরিয়ে এসে গাছগুলো যেন পর্যাপ্ত পানি এবং উদ্যানের গাছগুলো রক্ষা পায় সেই দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট মহলগুলোর। বলধা গার্ডেন কর্তৃপক্ষকেও ওয়াসার ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে পানির বিকল্প উৎস অনুসন্ধান করতে হবে।
বলধা গার্ডেন ব্যবস্থাপনায় নানা দুর্বলতা পরিলক্ষিত হয়েছে বিভিন্ন সময়ে। বর্ষায় গাছগুলো সবুজাভ হয়ে উঠলেও অযত্ন-অবহেলার ছাপ ও পরিচর্যার অভাব সুস্পষ্ট। চারপাশের উঁচু দালানে প্রায় ঢাকা পড়েছে বাগানটি। দিনের আলোয়ও পেছনের দিকটা বেশ অন্ধকার। সূর্যের আলোর পরশ থেকে বঞ্চিত বৃক্ষ, উদ্ভিদরাজি উঠে আর দাঁড়াতেই পারছে না। পরিবেশের দূষণ থেকেও নিজেদের রক্ষা করার শক্তি হারিয়ে ফেলছে। চারপাশে উঁচু ভবন ও রাস্তা নির্মাণ হওয়ার কারণে বাগানের জমি নিচু হয়ে গেছে। একটু বৃষ্টি হলেই সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতার। আশপাশের বর্ষার জলের সঙ্গে বর্জ্যও ঢোকে বাগানে। পরবর্তী সময় পানি শুকিয়ে গেলেও বর্জ্যগুলো রয়ে যায় বাগানেই। এসব কারণে বলধা গার্ডেনের উদ্ভিদবৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে। সূর্যঘড়িটি বিকল।
বর্তমান যুগে একটি দেশ কতটা আধুনিক তা চাকচিক্যময় স্থাপনার ওপরই নির্ভর করে না, সে দেশ কতটা ঐতিহ্য সংরক্ষণে উদ্যোগী, প্রাকৃতিক সম্পদে কতটা ঐশ্বর্যশালী তার ওপরও নির্ভর করে। ঐতিহ্য সংরক্ষণের মধ্য দিয়ে ওই দেশটির জনগণের রুচিবোধ ও মূল্যবোধের প্রতিফলন ঘটে। এটি সংস্কৃতিবোধেরও পরিচায়ক। তাই তো বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশ তাদের পুরনো ঐতিহ্য সংরক্ষণে খুবই মনোযোগী। গ্রিসে আধুনিক নগর সম্প্রসারণ করলেও প্রাচীন আমলের পুরনো স্থাপনাগুলো খুবই যত্নসহকারে সংরক্ষণ করা হয়েছে। প্রাচীন গ্রিসের যেসব থিয়েটারে নাটক মঞ্চস্থ করা হতো সেগুলো এখনো অবিকল অবস্থায় রাখার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। তার পাশে অন্য কোনো উচ্চ স্থাপনা তৈরি করতে দেয় না, যাতে ওই প্রাচীন স্থাপনাগুলোর বিন্দুমাত্র ক্ষতি না হয়। রোমে তাদের দাস যুগের নিকৃষ্ট নিদর্শন ‘এম্ফিথিয়েটার’গুলো একইভাবে রেখে দেয়া হয়েছে। ইউরোপ-আমেরিকার দেশগুলোয় ঐতিহ্য সংরক্ষণে বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা সর্বজনবিদিত। সুষ্ঠু সংরক্ষণের মাধ্যমে ঐতিহ্য সম্পর্কে যেমন নাগরিকদের সম্যক ধারণা হয়, পর্যটন থেকে একটা ভালো আয় হয়। যেকোনো সুষম ও বিকশিত নগরের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর উদ্যান। নাগরিকদের অবসর বিনোদন ও নগরের বাতাস সুস্থ ও স্বাভাবিক রাখতে উদ্যানের বিকল্প নেই। এ কারণে পুরনো উদ্যান শুধু সংরক্ষণই যথেষ্ট নয়, নতুন উদ্যান সৃষ্টি করাও কর্তৃপক্ষের জরুরি দায়িত্ব।
এরই মধ্যে বলধা গার্ডেন থেকে অনেক দুষ্প্রাপ্য প্রজাতি হারিয়ে গেছে। গোলাপের বাগানে ছিল প্রায় ২০০ জাতের গোলাপ। এর বেশির ভাগই এখন বিলুপ্ত। ছিল দুষ্প্রাপ্য বাওবাবগাছ, যা মিসরের মমিতে ব্যবহূত হতো। এখন সেটি নেই। এমনকি বিরল সংগ্রহের একমাত্র প্যাপিরাস গাছটিও আর নেই। দুর্লভ এই গাছ দীর্ঘদিন ধরে বলধা গার্ডেনের সাইকী অংশে সংরক্ষিত ছিল। বাগানের ভেতর জলাবদ্ধতার কারণে বৃষ্টির পানির সঙ্গে আসা পয়োনিষ্কাশন নালার ময়লা গাছের গোড়ায় জমে গাছটির মৃত্যু হয়েছে বলে জানা যায়। একসময় দুষ্প্রাপ্য সুপারপাইন ছিল দর্শনার্থীদের বিশেষ আকর্ষণ। সেটিও এখন নেই। তিন-চার বছর আগে ঝড়ে একমাত্র রুদ্র পলাশগাছটি মারা গেছে। এ ছাড়া জীবনচক্র পূর্ণ করায় দুর্লভ ও দুষ্প্রাপ্য শতবর্ষী বৃক্ষ শুগার পামের জীবনাবসান ঘটেছে। এভাবে হারিয়ে যেতে থাকলে তখন তাদের দেখা মিলবে শুধু বইয়ের পাতায়। বাগানে এমন অনেক গাছ রয়েছে, যার দ্বিতীয়টি কোথাও সংরক্ষিত নেই। জরুরি ভিত্তিতে এই দুষ্প্রাপ্য গাছগুলোর রিপ্লেসমেন্ট করা প্রয়োজন। বর্ষায় নিয়মিত জলাবদ্ধতার কারণে প্রতিবছর অনেক গাছের মৃত্যু হচ্ছে। বিজ্ঞানসম্মতভাবে বিশেষজ্ঞ পরামর্শ মোতাবেক মাটি ভরাট করে সুষ্ঠু বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নতুন নতুন চারা রোপণ, সযত্ন রক্ষণাবেক্ষণ ও নজরদারির মাধ্যমে এই ঐতিহাসিক নিদর্শনটি স্বমহিমায় উদ্ভাসিত হতে পারে। সবার আগে সুষ্ঠু পানি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।
ঢাকা শহরে পানির সংকট ক্রমে তীব্র হয়ে উঠছে। শুধু ঢাকা নয়, দেশব্যাপী বিশুদ্ধ পানির স্বল্পতা দেখা যাচ্ছে। এমন বাস্তবতা বলধা গার্ডেন কর্তৃপক্ষকেও অনুধাবন করতে হবে। ওয়াসার আগে বসানো পাম্পে পানি ওঠানোর পরিমাণ কমে আসার কারণ হিসেবে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়াকে দায়ী করা হচ্ছে। নতুন পাম্প বসিয়ে কতদিন বিপুল পরিমাণ পানি সরবরাহ করা যাবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এক্ষেত্রে বলধা গার্ডেন কর্তৃপক্ষকে পানির বিকল্প উৎসের সন্ধান করতে হবে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এত পুরনো একটি বাগানে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য কোনো রিজার্ভার তৈরি করা হয়নি। এছাড়া পানি অপচয়ের অভিযোগও রয়েছে। গাছে অতিরিক্ত পানি প্রদান থেকে শুরু করে স্থানীয় অধিবাসীরাও এখান থেকে পানি নিত বলে জানা যাচ্ছে। এসব সমস্যার সমাধান করা প্রয়োজন। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়ায় বলধা গার্ডেনের গাছের পানির প্রয়োজনীয়তাও বেড়ে উঠছে। পানি তুলে এ সমস্যার সাময়িক সমাধান হলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি কার্যকর নাও হতে পারে। এক্ষেত্রে ভূউপরিস্থ পানি সংরক্ষণ ও ব্যবহারে পদক্ষেপ নিতে হবে।
ঢাকা নগরী অপরিকল্পিতভাবে বেড়ে উঠেছে। বর্তমানে তীব্র যানজট, দূষণসহ নানা সমস্যার কারণে পৃথিবীর অন্যতম আবাসযোগ্য নগরে পরিণত হয়েছে। তার মধ্যে ঐতিহ্যবাহী বলধা গার্ডেন শুধু এ নগরের একটি অঞ্চলের শোভাবর্ধনই করে না, উপরন্তু তা ওই অঞ্চলের পরিবেশের জন্যও বড় ভূমিকা রাখে। তাছাড়া এটি রাজধানীর যে অল্প কয়েকটি দর্শনীয় ও বিনোদনমূলক স্থান রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম। তা নাগরিকদের অবকাশযাপনের স্থানের পাশাপাশি শিক্ষামূলক স্থানও বটে। তাই এ উদ্যানের সংকট উদ্বেগের। বলধা গার্ডেনসহ অন্য উদ্যানগুলোর ব্যাপারে যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব বন বিভাগের। তাই বলধা গার্ডেনের এ সংকটকে আমলে নিয়ে ওই বিভাগ জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করবে এটাই কাম্য।










