ধান উৎপাদনে সার একটি অত্যাবশ্যকীয় পণ্য। সুলভ মূল্যে কৃষকের কাছে সার পৌঁছতে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিচ্ছে সরকার। তবুও সুফল মিলছে না। আমদানিকারক, পরিবহন ঠিকাদার ও ডিলারদের অসাধু সিন্ডিকেট, গুদামের সার আত্মসাৎ ইত্যাদি কারণে কৃষকরা সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি খরচে সার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কৃষকরা। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি এবং দেশে মূল্যবৃদ্ধির আভাসেই কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সারের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে বাড়তি মুনাফা করছে বলে গণমাধ্যমের খবরে উঠে এসেছে। অবিলম্বে এ সমস্যার সমাধান না করা গেলে আগামীতে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এক্ষেত্রে শুধু হুঁশিয়ারি নয়, অসাধু ব্যবসায়ীদের চিহ্নিতপূর্বক শাস্তি দেয়া প্রয়োজন।
সরকারের মূল্যবৃদ্ধির আগেই দেশের বিভিন্ন জায়গায় প্রয়োজনীয় সার দ্বিগুণ দামে কিনছেন কৃষকরা। পর্যাপ্ত মজুদ থাকার পরও ‘সরবরাহ সংকটের’ কথা বলে তিনটি সারেরই দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন ডিলার ও খুচরা বিক্রেতারা; কিছু জেলায় চড়া দামেও চাহিদামতো সার না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন কৃষকরা। দেশে শিল্প মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সার আমদানি করা হয় এবং কৃষি মন্ত্রণালয়ের নিয়োগকৃত ডিলারদের মাধ্যমে তা কৃষকদের কাছে বিতরণ করা হয়। ক্ষেত্রবিশেষে এ দুই মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়হীনতা ও জেলা পর্যায়ে নজরদারির অভাবে মাঠ পর্যায়ে সার বিতরণ ব্যবস্থায় অসাধু ব্যবসায়ীরা অবৈধভাবে লাভবান হচ্ছে। ফলে সারের বাজার অস্থির হচ্ছে নিয়মিত বিরতিতেই। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে সরকারি গুদাম ও কারখানা থেকে সার গায়েবের ঘটনা ঘটছে। বেলারুশ থেকে সবচেয়ে বেশি সার আমদানি করত বাংলাদেশ, এখন সেটা বন্ধ। এখন মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশ, রাশিয়া, ভারতসহ কয়েকটি দেশ থেকে সার আমদানি করতে হচ্ছে। এদিকে ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়া থেকেও সার আমদানি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে গত বছরের তুলনায় তিন গুণ দাম বেড়েছে। এছাড়া দেশের আটটি সার কারখানায় যান্ত্রিক ত্রুটি ও কাঁচামালের স্বল্পতার কারণে বছরের প্রায় চার থেকে সাত মাসই উৎপাদন বন্ধ থাকে। এতে দেশের সারের মোট চাহিদার দুই-তৃতীয়াংশই আমদানি করতে হয়। এতে সরকারকে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে, যা সার কারখানাগুলো সংস্কারপূর্বক পূর্ণমাত্রায় চালুর মাধ্যমে কমানো সম্ভব।
বর্তমানে উৎপাদন ও আমদানি মূল্যের তুলনায় খুচরা বাজারে সারের দামে অসংগতি পরিলক্ষিত হচ্ছে বলে গোয়েন্দা প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে। সরকার বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) ও বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) মাধ্যমে সার আমদানি করে। সার আমদানিতে সরকার উল্লেখযোগ্য পরিমাণে ভর্তুকি দিলেও আমদানিকারক, পরিবহন ব্যবসায়ী, সার পরিবহনে সিন্ডিকেটের কবলে পড়ে কৃষকরা সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে ডিলাররা সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রি করে অস্থিরতা সৃষ্টি করছেন, যা গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এক্ষেত্রে কারসাজির সঙ্গে সম্পৃক্তদের চিহ্নিতপূর্বক আইনি ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে ডিলার নিয়োগে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে। নন-ইউরিয়া সার পরিবহনের ক্ষেত্রে বেসরকারি সিন্ডিকেট ভাঙার জন্য শিল্প মন্ত্রণালয়ের শুধু বিআরটিএর মাধ্যমে পরিবহন ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগও কাজ করছে না। ট্রাকস্বল্পতার কারণে বিআরটিএ শিল্প মন্ত্রণালয়ের চাহিদাকৃত ট্রাক সরবরাহ করতে পারছে না। আবার বেসরকারি পরিবহন মালিকরা উচ্চ আদালতে রিটের মাধ্যমে সরকারের এ উদ্যোগও আটকে রেখেছেন। ফলে সরকারের উদ্যোগের সুফল পাওয়া যাচ্ছে না।
আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দাম বেড়ে ওঠায় ভারতেও এর দাম বেড়েছে। তবে সেখানে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে দাম বাড়ানোর ঘটনা অপেক্ষাকৃত কম বলেও খবর পাওয়া যাচ্ছে। ভারত সরকার সারে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত ভর্তুকি বাড়িয়েছে। দেশটিতে কৃষাণ কার্ডের মাধ্যমে সার সরবরাহ এবং পুরো প্রক্রিয়াটি ডিজিটালি মনিটর করায় অনিয়ম ও দুর্নীতির সুযোগ কমেছে। ফলে কোন কৃষক কতটুকু সার পেলেন তা এক ক্লিকেই জানা সম্ভব। এমনকি সারের ট্রাক কোথায় রয়েছে, কোন গুদামে কত সার রয়েছে, কোথায় সারের স্বল্পতা আছে—সবকিছুই ডিজিটালি মনিটর করায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া অনেক সহজ হয়েছে। দেশটির অধিকাংশ কৃষক সরকারের রেজিস্ট্রেশনের আওতাভুক্ত। ফলে ভর্তুকির অর্থ প্রদান বা সার-বীজ বণ্টন অনেক সহজ ও ব্যয় সাশ্রয়ী হয়েছে। তার পরও সেখানে দুর্নীতি ও অনিয়মের খবর মিলছে। সার সংকট এড়াতে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়ানোর দিকে নজর দিয়েছে ভারত। বাংলাদেশেও একই ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে প্রথমেই কৃষকদের চিহ্নিত করে তাদের একটি ইউনিক আইডি দিতে হবে। পাশাপাশি আমদানি থেকে বণ্টন প্রতিটি প্রক্রিয়া ডিজিটালি মনিটর করা প্রয়োজন। এতে সারস্বল্পতা দেখা দেয়ার আগেই আমদানি বা অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের মাধ্যমে সংকট মোকাবেলা করা যাবে সহজে।
কৃষিমন্ত্রী মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে কেউ সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রি করতে না পারেন। তিনি বলেছেন, কৃত্রিম ঘাটতি সৃষ্টি করে দাম বাড়ালে ডিলারদের লাইসেন্স বাতিলসহ আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে মাঠ পর্যায়ে সার্বক্ষণিক মনিটরিং ও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করারও সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। অতীতে সরকারের নির্দেশনা ও বাস্তবায়নের মধ্যে বিস্তর ফারাক দেখা গেছে। মন্ত্রণালয়ের অনেক নির্দেশনাই মাঠ পর্যায়ে কার্যকর হয় না। তাই এক্ষেত্রে কেবল হুঁশিয়ারি দিয়ে বসে থাকলে কাজ হবে না, তদারকি বাড়াতে হবে। কোথায় কী পরিমাণ সার মজুদ আছে, কী পরিমাণ সার বিক্রি হয়েছে, তার সঠিক হিসাব রাখতে হবে, যাতে ব্যবসায়ীরা কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে না পারেন। অসাধু ব্যবসায়ীদের অবশ্যই শাস্তির আওতায় আনতে হবে। তবে কাজটি একা কৃষি বিভাগ পারবে না; উপজেলা ও জেলা প্রশাসনের সক্রিয় সহযোগিতার প্রয়োজন হবে। তারা যেন সারের বিষয়টি কৃষি বিভাগের সমস্যা হিসেবে না দেখে। সারের দাম বাড়লে কৃষক কেবল আর্থিকভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না, তারা জমিতে প্রয়োজনের তুলনায় কম সার দেবেন এবং শস্য উৎপাদনও কম হবে। আর কৃষিমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, কোথাও সার সরবরাহে পরিবহন সমস্যা থাকলে সেটিও দ্রুত সমাধান করতে হবে।
প্রতিটি ইউনিয়নের ডিলার পয়েন্টে নির্ধারিত মূল্যে সার বিক্রি হচ্ছে কিনা তা কঠোরভাবে নজরদারি করতে হবে। পরিবহনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিছু মালিক বা প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর না করে অধিকসংখ্যক পরিবহন প্রতিষ্ঠানকে আহ্বান করে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে দায়িত্ব প্রদান এবং অবৈধ সিন্ডিকেট ও ব্যবসায়ীদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। দেশের সব সার কারখানা মেরামতসহ নতুন সার কারখানা স্থাপন করে সারা বছর নিরবচ্ছিন্নভাবে উৎপাদনের ব্যবস্থা গ্রহণ করাও জরুরি। সব ডিলার কর্তৃক প্রাত্যহিক বিক্রয় তালিকা প্রস্তুতসহ বিক্রয় রসিদ নিয়মিত জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে উপস্থাপনের উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। দেশের সব সরকারি গুদামে সার মজুদের হিসাব যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও এর সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। পাশের দেশ ভারতে টিএসপি, এমওপি ও ডিএপি সারের মূল্য বাংলাদেশ থেকে তুলনামূলকভাবে বেশি হওয়ায় ভারতে সার পাচার হচ্ছে কিনা, সে বিষয়ে কঠোর নজরদারির প্রয়োজন। সব গুদামে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা দরকার। সার পরিবহনে বিআরটিএকে নিয়োজিত করার সরকারি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে দায়েরকৃত রিটের দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হবে। ডিলারদের সরাসরি সার কারখানা থেকে সার সংগ্রহ করে নিজ এলাকায় বিক্রয়ের সুযোগ দেয়া যেতে পারে।
সেচ দেয়ার যন্ত্রের প্রধান জ্বালানি ডিজেলের দাম বাড়ানোর কারণে এবার বোরো মৌসুমে কৃষকের সেচ বাবদ বাড়তি খরচ হবে। পাশাপাশি অন্যান্য ব্যয় বৃদ্ধির কারণে ধান চাষে মুনাফা কমবে। এমন পরিস্থিতিতে কৃষকদের দুর্ভোগ কমাতে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়া না হলে অনেক কৃষক আগামীতে ধান আবাদে উৎসাহ হারিয়ে ফেলতে পারেন। কাজেই সার সংকটের সমাধানে মজুদ বাড়ানোর পাশাপাশি এর ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা কাটানোর জন্যও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। বলার অপেক্ষা রাখে না, এ সময়ে কৃষকের চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সারের জোগান নিশ্চিত করা না হলে কৃষিপণ্যের উৎপাদন খরচই কেবল বাড়বে না, একই সঙ্গে উৎপাদনও হ্রাস পাবে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন কৃষক। সারের দাম নির্ধারণ থেকে শুরু করে বাজার নিয়ন্ত্রণ—সবকিছু সরকারের হাতে থাকায় কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারীদের চিহ্নিত করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের দায়িত্ব সরকারের ওপরই বর্তায়।










