বাংলাদেশের ভূমি শাসন ব্যবস্থা খুবই দুর্বল। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্কোর ৩৭, বৈশ্বিক গড় ৫১। দেশের ‘ভূমি শাসন ব্যবস্থা’র ওপর সুনির্দিষ্ট নির্দেশক-সূচকের বিশ্লেষণপূর্বক হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ সেন্টার (এইচডিআরসি) ও অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (এএলআরডি) প্রকাশিত প্রতিবেদনে এ তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। ব্যক্তিগতভাবে ভূমি মালিকানা লাভের সাংবিধানিক অধিকার সব বাংলাদেশী নাগরিকের থাকলেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের ভূমিতে ব্যক্তিগত স্বত্ব বা মালিকানা বা প্রবেশাধিকার নেই। নারী, ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠিসহ প্রান্তিক, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ভূমি স্বত্ব অরক্ষিত, কমিউনিটি ভূমির স্বীকৃতি, সংরক্ষণ ও নিবন্ধনের সুনির্দিষ্ট আইন নেই। সম্পত্তির উত্তরাধিকারে নারীর সমানাধিকার নেই, আবার বিদ্যমান উত্তরাধিকার আইনে তার যতটুকু প্রাপ্য নারী তা থেকেও বঞ্চিত। এর মধ্যেই নদী-জলা ও ভূমির অবৈধ দখল বাড়ছে। সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো শিল্পায়নের নামে কৃষিজমিও ব্যবহার করছে। এমন প্রেক্ষাপটে প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে বিশেষজ্ঞরা টেকসই ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা প্রণয়ন ও স্থানীয় ভূমি ব্যবহারকারীদের সুরক্ষার দাবি জানিয়েছেন। ভূমি মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট বিষয় আমলে নিয়ে ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা আধুনিকায়ন এবং ভূমি-সংক্রান্ত জটিলতা নিরসনে কার্যকর ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার পদক্ষেপ নেবে বলে প্রত্যাশা।
স্থানীয় পর্যায়ে কোনো ‘টেকসই’ ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা নেই। বড় বিষয় হলো ভূমি ব্যবহার নিয়ে কোনো পরিকল্পনা হলে সেখানে স্থানীয় ভূমি ব্যবহারকারী ও মালিকদের অধিকার বিবেচনায় নেয়া হয় না বলে অভিযোগ রয়েছে। জমি-জলা-জঙ্গল থেকে ছলে-বলে-কৌশলে উচ্ছেদ করে যাদের ভূমি গ্রাস করা হচ্ছে তাদের সঙ্গে অর্থবহ এবং অংশগ্রহণমূলক আলোচনার সুযোগ আইনে সীমিত। সরকারি সংস্থা ও বেসরকারি করপোরেট প্রতিষ্ঠান অধিগ্রহণে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ঘাটতি রয়েছে। ভূমিহীনতা থেকে শুরু করে অন্যান্য কৃষি উপকরণ প্রাপ্তিতে সমস্যা ক্ষুদে পারিবারিক কৃষকের উৎপাদনে সংকট তৈরি করছে। অনানুষ্ঠানিক, আইনি কাঠামোর বাইরে বিদ্যমান, বর্ধমান চুক্তিবদ্ধ চাষ ক্ষুদে পারিবারিক কৃষকের জন্য নতুন দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিল্পকারখানা ও অবকাঠামো উন্নয়নে অনেক ভূমির চাহিদা তৈরি হচ্ছে। এক্ষেত্রে কৃষি জমি সুরক্ষার বিকল্প নেই। কিন্তু নীতিমালা ও আইন না থাকায় দুই বা তিনফসলি জমি অবকাঠামো নির্মাণে ব্যবহার হচ্ছে। এতে কৃষি উৎপাদন ঝুঁকিতে পড়ছে।
বাংলাদেশের ভূমিকে কেন্দ্র করে একটি বিরাট সমস্যা হচ্ছে জবরদখল। প্রকৃতিগতভাবেই বাংলাদেশে বিশাল জনসংখ্যার অনুপাতে ভূমির পরিমাণ কম হওয়ায় এ সমস্যার উদ্ভব। এ সমস্যা জনগণের শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তাকে হুমকির সম্মুখীন করে তোলে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে যারা বেআইনি দখলদার তারা কিছু অর্থ খরচ করে কিছু জাল কাগজপত্র বের করে এবং এর ভিত্তিতে তারা অবৈধভাবে ভূমি দখল করে। অনেকে আবার জাল কাগজ তৈরি করারও প্রয়োজন মনে করে না। দখলচ্যুত ব্যক্তির দখল ফিরে পাওয়ার উপায় কী? তাকে দখল উদ্ধারের জন্য দেওয়ানি আদালতে যেতে হবে। রয়েছে উকিলের ফি এবং প্রতি স্তরে ঘুষ প্রদান। তিন-চার বছরের মাথায় মামলার রায় হবে। সময় বেশি লাগে কারণ মামলার তুলনায় বিচারকের স্বল্পতা। এরপর ওই রায় কার্যকর করার জন্য পুনরায় ডিক্রি জারির জন্য মামলা করতে হয়। এটা আইনের বিধান। এছাড়া ডিক্রির বিরুদ্ধে পরাজিত পক্ষের আপিল, আপিলের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল, রিভিশন, রিভিউ প্রভৃতি করে শেষ পর্যন্ত আসতে আসতে ২০ বছর পর্যন্ত লেগে যায়। আর অর্থ খরচ হয় তার চেয়েও বেশি। বাস্তবতা হলো অধিকাংশ ভূমি অফিস এখনো পুরনো ধাঁচেই চলছে। জমি ক্রয়-বিক্রয়, নামজারিসহ অনেক বিষয়ে মানুষ নানাভাবে ভোগান্তির শিকার হচ্ছে। ভূমিসংক্রান্ত কত মামলা চলছে, তার সঠিক হিসাবও কারো কাছে আছে বলে মনে হয় না। দীর্ঘদিন ধরে চলমান ভূমির রেকর্ডপত্র সংরক্ষণ, রেজিস্ট্রেশন, নকশা প্রণয়ন প্রভৃতি ক্ষেত্রে জাল-জালিয়াতির কারণে ভূমি নিয়ে নানা ধরনের বিরোধ রয়েছে। তা বাড়ছেও বটে। আর এসব বিরোধের জের ধরেই চলে এ খাতে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি।
ভূমি ব্যবস্থাপনা একেক জায়গায় একেক রকম। কিছু জায়গায় জমি বিক্রি হয় না, বরং দীর্ঘমেয়াদে ইজারা দেয়া হয়। নাইজেরিয়া ও বেলারুশে জমির মালিকানার প্রমাণপত্রে লেখা থাকে সেই জমি কতদিন পর্যন্ত ভোগদখল করা যাবে। ভিয়েতনামে ব্যক্তিগত মালিকানা থাকে না। সেখানে দলিল মানে ভূমি ব্যবহারের অধিকার পত্র। আর জাপানে ভূমি ও স্থাপনাকে আলাদাভাবে দেখা হয়। ব্রাজিলের কেন্দ্রীয় ভূমি রেজিস্ট্রি এবং ক্যাডেস্টারে কেবল গ্রামীণ এলাকার জমিসংক্রান্ত তথ্য পাওয়া যায়। শহরের জমির তথ্য তত্ত্বাবধান করে অঙ্গরাজ্য ও পৌরসভা কর্তৃপক্ষ। বিশ্বব্যাপী সম্পত্তি আইন ও ব্যবস্থাপনায় অনেক তারতম্য থাকার কারণে স্থানীয় বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেয়া জরুরি। সম্পত্তির রেকর্ড সাধারণত জাতীয়ভাবেই রাখা হয়। যুক্তরাষ্ট্রে ভূমি মালিকানা রেকর্ড থাকে স্থানীয় পর্যায়ে, সাধারণত কাউন্টি নথিরক্ষক বা কর নির্ধারকের কার্যালয়ে। অনেক জায়গায়, বিশেষত সাব-সাহারান আফ্রিকায় অল্প কিছু জমির নিবন্ধন বা মালিকানা নির্দিষ্ট করা আছে। সাধারণত গ্রামীণ এলাকায় বেশির ভাগ জমির মালিকানা নির্ধারিত হয় প্রথা-নিয়ম মেনে, কাগজে-কলমে নয়। তাই মালিকানার দাবি নিয়ে প্রায়ই সংঘাত দেখা দেয়। তাদের ওপর নিয়ন্ত্রণ আনতে গিয়ে সরকারও অহরহ বিতর্কের জন্ম দেয়। এর সমাধানে ডিজিটালাইজেশন ও ভূমি অফিসের স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি।
ভূমিসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারী নিজেরাই দুর্নীতিতে সম্পৃক্ত বলে টিআইবি দাবি করেছে। এ বাস্তবতায় মানুষকে জমিসংক্রান্ত দুর্ভোগ, হয়রানি ও ক্ষতি থেকে রক্ষার জন্য ভূমি খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা জরুরি। বস্তুত এ লক্ষ্যে সরকার উদ্যোগও নিয়েছিল। সরকার ভূমি ব্যবস্থাপনা ডিজিটালাইজেশনের উদ্যোগ নিলে জনগণ তাকে স্বাগত জানিয়েছিল। এ উদ্যোগের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হলে ভূমি খাতে দুর্নীতি অনেকাংশে কমে যেত। বিশেষত সারা দেশে জমির মৌজা-ম্যাপ, খতিয়ান ও নামজারির খতিয়ান ডিজিটালাইজেশনের আওতায় এলে এসব ক্ষেত্রে ঘুষের সুযোগ তিরোহিত হতো। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, এ-সংক্রান্ত কার্যক্রমের গতি অত্যন্ত মন্থর। কৃষিজমি সুরক্ষা আইনও বছরের পর বছর ঝুলে রয়েছে। সরকারকে এদিকে দৃষ্টি দিতে হবে। দেশের উত্তরাধিকার আইন ও ভূমিসংক্রান্ত অন্যান্য আইন কার্যত ব্রিটিশ আমলের। ভূমির সঙ্গে যুক্ত সরকারের অনেক বিভাগ ও শাখা-প্রশাখা। ভূমিসংক্রান্ত একেক কাজ একেক বিভাগ করে। তাদের অবস্থা অনেকটা বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো। ফলে সাধারণ মানুষের বিড়ম্বনা আরো বেড়ে যায় এতে। সরকারের ডিজিটালাইজেশন কর্মসূচিতে অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়েছে বটে। তবে এখনো অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। ডিজিটাল বাংলাদেশের একটি বড় লক্ষ্য হতে হবে ভূমি এবং এর ব্যবস্থাপনার আমূল সংস্কার। আশা করি, সরকার ভূমি অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত ও কার্যক্রমে স্বচ্ছতা আনার মাধ্যমে ভূমি ব্যবস্থাপনার আমূল পরিবর্তনের সূত্রপাত ঘটাবে।
বণ্টনকৃত ও বণ্টনযোগ্য সব খাসজমি অবৈধ দখলদারদের কাছ থেকে যত দ্রুত সম্ভব উদ্ধার এবং খাসজমি উদ্ধার ও বণ্টন আইন প্রণয়ন করা জরুরি। সামাজিক শ্রেণী-জাতিগত পরিচিতি-লিঙ্গ নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিকের ভূমি অধিকার রক্ষায় রাষ্ট্রকে সুস্পষ্ট ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ, কমিউনিটি ভূমি যেন ব্যক্তিমালিকানাধীন ভূমির মতোই সমান সুরক্ষা পায় সেই জন্য আইনি কাঠামো তৈরি ও উত্তরাধিকার প্রশ্নে জমি-সম্পত্তিতে নারী-পুরুষের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একক আইন প্রণয়ন করা প্রয়োজন। সর্বোপরি টেকসই ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা করা এবং সেখানে স্থানীয় ভূমি ব্যবহারকারীদের অধিকারের সুরক্ষা দিতে হবে। রাষ্ট্র ও ব্যক্তির ভূমি ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত একটি বহুপক্ষীয় প্লাটফর্ম জরুরি ভিত্তিতে তৈরি করা উচিত।










