সম্প্রতি জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের জনশক্তি রফতানি-সংক্রান্ত চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে। এবার অভিবাসন নীতিতে পরিবর্তন আনল জাপান। এর মাধ্যমে দেশটিতে জনশক্তি রফতানির সুযোগ আরো বাড়ল। কভিড প্রভাবান্বিত বাংলাদেশের জনশক্তি রফতানিতে এটি ইতিবাচক খবর বটে। তবে এজন্য চাই দক্ষ জনশক্তি। কারণ জাপান দক্ষ জনশক্তিই নেবে। বাজারটিতে প্রবেশের জন্য বাংলাদেশকে চীন, কোরিয়া, ভিয়েতনামের মতো দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হবে, যারা দক্ষ জনশক্তি রফতানিতে এগিয়ে। বাংলাদেশের জনশক্তি রফতানি বাজারটি মূলত অদক্ষ কর্মীনির্ভর। কিন্তু জাপানে জনশক্তি রফতানি বাড়াতে হলে দক্ষতা প্রয়োজন। প্রত্যাশা থাকবে, উন্মোচিত হওয়া নতুন জনশক্তির বাজার সঠিকভাবে কাজে লাগাতে যথাযথ পরিকল্পনা নেয়া হবে।
সারা বিশ্বে বাংলাদেশের প্রায় এক কোটি মানুষ বিভিন্ন কর্মে নিয়োজিত। আবার প্রতি বছর গড়ে ছয়-সাত লাখ মানুষ কাজের সন্ধানে বিদেশে গেলেও মাত্র এক-তৃতীয়াংশ প্রশিক্ষিত। বাকিরা আধা দক্ষ ও অদক্ষ হিসেবে বিদেশে যায়। বিশেষ করে জনশক্তি প্রেরণ খাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত উদ্যোক্তাদের নিজস্ব উদ্যোগে সৃষ্ট কিছু কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে ও সরকারের টিটিসি থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে যতটা সম্ভব দক্ষ কর্মীরা বিভিন্ন দেশে যাচ্ছেন। অভিবাসন খাতের সঙ্গে সংশ্নিষ্ট কেউই দক্ষ কর্মী গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো সুবিধা, ট্রেনিং সেন্টার স্থাপনের জন্য বিশেষ অঞ্চল বা জমি বরাদ্দ, ব্যাংকঋণ সুবিধা ইত্যাদি কোনো ধরনের সরকারি-বেসরকারি সুবিধা পান না। অভিবাসন একটি সম্ভাবনাময় খাত হওয়ায় এর প্রতি সরকারের নজর বা পৃষ্ঠপোষকতা আরো বাড়াতে হবে। দুই দশক আগেও বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি রফতানির মূল গন্তব্য ছিল উপসাগরীয় সহযোগিতা সংস্থাভুক্ত (জিসিসি) ছয়টি দেশ। এরপর নতুন গন্তব্য হিসেবে যুক্ত হয় মালয়েশিয়া। তবে অর্থনৈতিক মন্দা, বৈশ্বিক রাজনীতি, মধ্যস্বত্বভোগীদের অধিক মুনাফার লোভ, কূটনৈতিকসহ নানা কারণে ক্রমেই আস্থা হারাচ্ছে বিদ্যমান বৈদেশিক শ্রমবাজারগুলো। এমন অবস্থায় জাপানের জনশক্তি রফতানির অগ্রগতি নিঃসন্দেহে আশাজাগানিয়া।
জাপান দক্ষ ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শ্রমিক নেবে। তাই মধ্যপ্রাচ্য বা মালয়েশিয়ায় যে জনশক্তি রফতানি হয়, জাপান তার থেকে ভিন্ন হবে। অন্য দেশের তুলনায় জাপানে আয়ের সুযোগও বেশি। আগামী পাঁচ বছরে সাড়ে তিন লাখ বিদেশী কর্মী নেবে দেশটি। স্বাভাবিকভাবে যে দেশ বেশিসংখ্যক প্রশিক্ষিত ও দক্ষ জনশক্তির জোগান দিতে পারবে, সে দেশ থেকে বেশিসংখ্যক শ্রমিক তারা নেবে। জাপানের মানুষের গড় আয়ু ৮৪ বছর এবং ১০০ বছর বা তার অধিক বয়সী মানুষের সংখ্যা প্রায় ৭০ হাজার। বয়স্ক এসব মানুষের সেবার জন্যও দক্ষ জনবল দরকার। নির্মাণ শিল্প, প্রযুক্তি, নার্সিং, কৃষি, হোটেল ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ট্যুরিজম খাতেও কাজের সুযোগ আছে। সুতরাং জাপানে জনশক্তির নতুন বাজার খুলেছে—এ খবরে আমাদের সে দেশে পাঠানোর উপযোগী দক্ষ জনবল তৈরির দিকে মনোযোগ দিতে হবে। তাদের যে ধরনের বিশেষায়িত ও দক্ষ শ্রমিক প্রয়োজন, সে রকম শ্রমিক পরিকল্পিতভাবে তৈরি করতে হবে। আর এটাও বাস্তব যে অদক্ষ ও অপ্রশিক্ষিত জনশক্তি রফতানির সুযোগ ভবিষ্যতে আরো কমে যাবে। জাপানে জনশক্তি রফতানির জন্য বিশেষভাবে জোর দিতে হবে জাপানি ভাষা শিক্ষার ওপর। প্রশিক্ষণের আওতা বাড়াতে গত ফেব্রুয়ারিতে বেসরকারি জনশক্তি রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। তাদের এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাতে হবে। আগে থেকেই আটটি দেশ যথাক্রমে চীন, ইন্দোনেশিয়া, নেপাল, মিয়ানমার, ফিলিপাইন, মঙ্গোলিয়া, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম দেশটিতে জনশক্তি পাঠাচ্ছে। সে হিসাবে দেশটিতে বাংলাদেশ নবম জনশক্তি রফতানিকারক দেশ। বিষয়গুলো বিবেচনায় রেখে বাংলাদেশকে পরিকল্পনা সাজাতে হবে।
সম্প্রতি করোনা মহামারীর কারণে অনেক প্রবাসী দেশে ফেরত এসেছেন। নতুন শ্রমিক পাঠানো সম্পূর্ণভাবে বন্ধ আছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে করোনা-পরবর্তী সময়ে বৈদেশিক শ্রমবাজারে দক্ষ শ্রমিকের প্রচুর চাহিদা সৃষ্টি হবে। সেদিক বিবেচনা করে দক্ষ ও অভিজ্ঞ জনশক্তি তৈরির লক্ষ্যে ‘কর্মসংস্থান অধিদপ্তর’ গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। এদিকে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের তথ্যসূত্রে জানা যায়, বর্তমানে দেশে দক্ষ শ্রমিক তৈরিতে ৪৭টি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র রয়েছে, যেগুলোয় বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন নতুন নতুন প্রশিক্ষণ মডিউল চালুর পরিকল্পনা করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়া দেশের সব জেলায় প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে এবং এরই মধ্যে এ বিষয় নিয়ে কাজ শুরু করেছে মন্ত্রণালয়। এছাড়া আরো জানা যায়, প্রথম পর্যায়ে আট বিভাগের ৭১টি উপজেলায় প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নির্মাণ করতে যাচ্ছে সরকার। এগুলো নিঃসন্দেহে ভালো উদ্যোগ। তবে খেয়াল রাখতে হবে শুধু যেন অবকাঠামো নির্মাণ আর কাগজ-কলমে এ উদ্যোগ সীমাবদ্ধ না থাকে। এখান থেকে যেন দক্ষ জনশক্তি তৈরি হয়, সেদিকে সবসময় দৃষ্টি রাখতে হবে। ক্ষেত্রবিশেষে প্রয়োজনে বিদেশ থেকে প্রশিক্ষক এনে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। নিয়মিত তদারক করতে হবে। ভালো হয় সরকারি কার্যক্রমের পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগকে এ খাতে উৎসাহিত করলে। তাহলে এ খাতে প্রতিযোগিতার সৃষ্টি হবে। আমাদের প্রতিযোগী দেশগুলো যেমন ভারত, শ্রীলংকা, ভিয়েতনাম এরই মধ্যে এ খাতে তাদের বিনিয়োগ বাড়িয়েছে এবং তাদের বেসরকারি খাতগুলোও সমানতালে দক্ষ জনশক্তি তৈরি করছে। সবচেয়ে ভালো হয় চাহিদাসম্পন্ন কোনো নির্দিষ্ট খাতে ফোকাস করে ওই খাতে দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা। যেমন ভিয়েতনাম দক্ষ নার্স তৈরি করে এবং ইউরোপের অনেক দেশেই তাদের নার্স রয়েছে। ভারত আইটি সেক্টরের দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে বিখ্যাত। এ রকমভাবে কোনো চাহিদাসম্পন্ন নির্দিষ্ট খাতে দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে পারলে বাংলাদেশকে বিশ্ব ওই নির্দিষ্ট জনশক্তির ব্র্যান্ড হিসেবে জানবে।
জাপানের মানুষের গড় আয়ু ৮৪ বছর হলেও ১০০ বা তার অধিক বয়সী মানুষের সংখ্যা প্রায় ৭০ হাজার। বয়স্ক এসব মানুষের সেবার জন্য দক্ষ জনবল দরকার। নির্মাণ শিল্প, প্রযুক্তি, নার্সিং, কৃষি, হোটেল ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ট্যুরিজম খাতেও কাজের সুযোগ আছে সেখানে। থাকা-খাওয়া বাদে প্রতি মাসে প্রায় ৮০ হাজার টাকা উপার্জনের সুযোগ পাবেন একজন দক্ষ শ্রমিক। জাপান যেতে অভিবাসন ব্যয় নেই বললেই চলে। তবে বিদেশী শ্রমিক নেয়ার ব্যাপারে জাপান বরাবরই রক্ষণশীল। তাই কোনো অঘটনের কারণে যেন বাজারটি বন্ধ হয়ে না যায়, সেদিকে মনোযোগ দিয়েই এগোতে হবে। জাপানি ভাষা প্রশিক্ষণ না নিয়ে কেউ জাপানে যাওয়ার সুযোগ পাবেন না। তাই প্রশিক্ষণের আওতা বাড়াতে গত ফেব্রুয়ারিতে বেসরকারি জনশক্তি রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। সরকার প্রণীত নীতিমালার আওতায় এরই মধ্যে বেশকিছু আগ্রহী প্রতিষ্ঠান বিএমইটিতে আবেদন করেছে। এসব আবেদন তদন্ত করে যাচাই-বাছাইয়ের পর মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দিচ্ছে বিএমইটি। মন্ত্রণালয় থেকে চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়া হবে। বেসরকারি খাতের প্রতিষ্ঠান কাজ শুরু করলে প্রশিক্ষিত শ্রমিকের সংখ্যা আরো বাড়বে। চুক্তি অনুযায়ী যারা জাপানে চাকরি পাবেন তারা বিনা খরচে সেখানে যেতে পারবেন। কোনো অসাধু জনশক্তি রফতানিকারকের দ্বারা যাতে কেউ প্রতারিত না হন, সে বিষয়ে সরকারের কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে মালয়েশিয়া একাধিকবার বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি আমদানি স্থগিত করেছে। জনশক্তি রফতানির নতুন বাজার জাপানের ক্ষেত্রে যেন এ রকম না হয়, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারেরই।
বাংলাদেশকে দক্ষ শ্রমিক তৈরির দিকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। তাছাড়া আমাদের প্রধান বৈদেশিক শ্রমবাজার ‘মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার’ বিভিন্ন কারণে সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। এর উল্লেখযোগ্য কারণগুলো হলো, বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমে যাওয়া, রাজনৈতিক অস্থিরতা, অভ্যন্তরীণ বেকারত্ব বেড়ে যাওয়া, বিভিন্ন খাতে আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার বেড়ে যাওয়া ইত্যাদি। তাই সহজেই অনুমেয় ভবিষ্যতে কঠিন সময় অপেক্ষা করছে। তাই আমাদের দক্ষ শ্রমিক তৈরির পাশাপাশি বিকল্প শ্রমবাজারের অনুসন্ধান করতে হবে। জাপানের জনশক্তির বাজারে প্রবেশের সুযোগ কাজে লাগাতে সরকারকে অবশ্যই বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে। প্রতিযোগিতামূলক এ বাজারে বাংলাদেশের সুযোগ বিস্তৃত করার জন্য কূটনৈতিক তত্পরতার পাশাপাশি কর্মী প্রেরণে স্বচ্ছতার বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি। বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনকারী জনশক্তি খাতের দিকে বিশেষ দৃষ্টি দেয়ার তাগিদ নানা মহল থেকে বারবার দেয়া হলেও অসাধুদের অপতত্পরতা বন্ধ করা যায়নি। জাপানে যে সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে, তা যাতে কোনো স্বার্থান্বেষী মহলের কারণে ব্যাহত না হয়, এ ব্যাপারে সতর্কতার বিকল্প নেই। প্রবাসে কর্মরত কিছু বাংলাদেশীর বিরুদ্ধে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগও নতুন নয়। কাজেই এসব ব্যাপারেও অধিকতর সতর্কতা প্রয়োজন। একই সঙ্গে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর কাজে স্বচ্ছতা আনা এবং তাদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখাও জরুরি বলে আমরা মনে করি। জনশক্তি রফতানি আমাদের অর্থনীতির এক বড় চালিকাশক্তি। রেমিট্যান্সের কারণেই বাংলাদেশে গত বিশ্বমন্দার আঁচড় পড়েনি। মানবসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা ও নতুন নতুন শ্রমবাজার সন্ধানে দৃষ্টি প্রসারিত করাও সমভাবেই জরুরি।










