রাষ্ট্রীয় প্রচেষ্টায় গত দুই দশকে সড়ক ব্যবস্থার লক্ষণীয় উন্নয়ন হয়েছে। বিস্তৃতি ঘটেছে সড়ক-মহাসড়কের। কিন্তু একটা বড় সংকটের বিষয় হলো, সড়ক নির্মাণ ব্যয় এখনো নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি। অন্য দেশগুলোর তুলনায় এখানে সড়ক অবকাঠামোর নির্মাণ ব্যয় অনেক বেশি। সময়ের ধারাবাহিকতায় এটি বরং আরো বেড়ে চলছে। ব্যয়বহুল অবকাঠামো নিয়ে কয়েক বছর ধরে নানা মহলে চলছে আলোচনা-সমালোচনা। খোদ সরকারি প্রতিষ্ঠান সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সাম্প্রতিক এক সেমিনারেও বিষয়টি উঠে এসেছে। আলোচ্য সেমিনারে যোগাযোগ অবকাঠামোর নির্মাণ ব্যয় কমানোর তাগিদ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। ব্যয় কমিয়ে আনতে প্রয়োজনে নীতিমালা প্রণয়ন বা গবেষণার ওপর জোর দিয়েছেন তারা। বিষয়টি আমলে নিয়ে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি।

বুয়েটের গবেষণার তথ্য বলছে, দেশে চার লেনের একটি মহাসড়কে কিলোমিটারপ্রতি গড়ে খরচ হওয়ার কথা ১২ থেকে ১৫ কোটি টাকা। বাস্তবে এর চেয়ে অনেক বেশি খরচ হচ্ছে। পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করার খরচ পড়েছে কিলোমিটারপ্রতি ২১ কোটি টাকা। জয়দেবপুর-ময়মনসিংহ চার লেনেও ব্যয় হয়েছে সমপরিমাণ। আবার রংপুর থেকে হাটিকুমরুল চার লেনে খরচ পড়েছে ৫৫ কোটি টাকা। সর্বশেষ ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে সড়কটির কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় ধরা হয়েছে ৮২ কোটি টাকা! অব্যাহতভাবে বাড়ছে সড়ক নির্মাণ ব্যয়। এর পেছনে বিভিন্ন ফ্যাক্টর দায়ী। সরকার থেকে শূন্য সহনশীলতা ঘোষণা করা হলেও প্রকল্প গ্রহণ থেকে বাস্তবায়ন সবখানে দুর্নীতি বিরাজমান। যথাযথভাবে সমীক্ষা না করে অনেক ক্ষেত্রে নেয়া হচ্ছে অবকাঠামো প্রকল্প। প্রকল্প নেয়ার আগেই অনেক সময় বেশি ব্যয় প্রাক্কলন করা হচ্ছে। উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে ঠিকাদার নির্বাচনের কথা থাকলেও সংশ্লিষ্টদের যোগসাজশে কাজ দেয়া হচ্ছে পছন্দের ঠিকাদারকে। ক্ষেত্রবিশেষে এখানে রাজনৈতিক বিবেচনাও কাজ করছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সেটি হচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী ও ঠিকাদারদের যোগসাজশে প্রকল্প ঝুলিয়ে রাখা হচ্ছে। এরপর বলা হচ্ছে নির্মাণসামগ্রীর দাম, ভূমি অধিগ্রহণ ব্যয় ও পরামর্শকের ভাতা বাড়ছে, তাই বাড়াতে হবে ব্যয়। আছে তদারকিজনিত দুর্বলতাও। প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থার প্রস্তাবিত ব্যয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ঠিকভাবে করা হচ্ছে না, নজরদারি করা হচ্ছে না। এ দুর্বলতার সুযোগে ব্যয় বাড়ানো হচ্ছে। সব মিলিয়ে বেড়ে চলছে সড়ক নির্মাণ ব্যয়।

বিশ্বব্যাংকের পর্যালোচনা ও বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে, চার লেনের মহাসড়ক নির্মাণে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে কিলোমিটারপ্রতি খরচ হচ্ছে গড়ে ২৯-৩০ কোটি টাকা। ভারতে খরচ হচ্ছে সর্বোচ্চ সাড়ে ১০ কোটি টাকা। চীনে খরচ হচ্ছে ১২ থেকে সাড়ে ১৩ কোটি টাকা। বলা চলে, আমাদের তুলনায় দেশগুলোয় সড়ক নির্মাণ ব্যয় অনেক কম। উল্লিখিত দেশগুলোয় প্রতিটি ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বিরাজমান। কোনো প্রকল্প নেয়া হলে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করা হয়। সম্ভাব্য সব দিক খতিয়ে দেখেই নিরূপণ করা হয় ব্যয়। উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে অতীত অভিজ্ঞতা দেখে দক্ষ অথচ ব্যয়সাশ্রয়ী ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেয়া হয়। প্রাক্কলিত ব্যয়ের মধ্যে যথাসময়ে শেষ করার জন্য নিশ্চিত করা হয় নিয়মিত নজরদারি। নির্মাণকাজে ব্যবহার করা হয় অত্যাধুনিক প্রযুক্তি। সবচেয়ে বড় কথা, দেশগুলোয় রয়েছে একটি সুষ্ঠু পেশাদারি কর্মসংস্কৃতি। সব মিলিয়ে দেশগুলো সড়ক নির্মাণ ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখতে সমর্থ হয়েছে। তাদের কর্মপ্রক্রিয়া ও অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য অনুসরণীয়।

সরকারি মহল থেকে দাবি করা হয়, জমি নিচু ও অধিগ্রহণ ব্যয় বেশি হওয়ার কারণে নির্মাণ খরচ বেশি পড়ে। তাদের এ যুক্তি আংশিক সত্য হতে পারে, পুরো সত্য নয়। বাংলাদেশে অধিগ্রহণ করা জমির দাম কিছুটা বেশি হলেও শ্রম অনেক সস্তা। আবার নির্মাণের জন্য দেশী উপকরণও তুলনামূলক কম দামে পাওয়া যায়। কাজেই সড়ক কিংবা সেতুর নির্মাণ ব্যয় অস্বাভাবিক বেশি হওয়ার কারণ নেই, যদি সেখানে দুর্নীতি সংঘটিত না হয়। দুর্নীতি বন্ধে প্রক্রিয়াগত ত্রুটি ও দুর্বলতাগুলো দূর করতে হবে। সবখানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তদারকি ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। কোনো ধরনের অনিয়ম পেলে সঙ্গে সঙ্গেই ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রস্তাবিত ব্যয় যাচাইয়ের জন্য তৃতীয় কোনো প্রতিষ্ঠান দিয়ে নিরীক্ষার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ। এটা আমলে নেয়া যেতে পারে।

সন্দেহ নেই, ভৌগোলিক কারণে সড়ক নির্মাণ ব্যয় একেক দেশে একেক রকম হবে। তবে এ ব্যবধান কখনো ১০-৩০ শতাংশের  বেশি হতে পারে না। বাংলাদেশে বর্তমানে যে হারে কিলোমিটারপ্রতি সড়ক নির্মাণ ব্যয় বাড়ছে, তা প্রতিবেশী কিংবা অন্য দেশগুলোর তুলনায় অতিমাত্রায় বৈসাদৃশ্যপূর্ণ। এটা বাস্তবতার সঙ্গে মোটেই সংগতিপূর্ণ নয়। একদিকে আমরা বেশি ব্যয়ে সড়ক নির্মাণ করছি, তেমনি এর কাঙ্ক্ষিত মানও নিশ্চিত করতে পারছি না। আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক মানের সড়ক অনেক কম। মাত্রাতিরিক্তি খরচ বাড়লেও  দেশে আন্তর্জাতিক মানের সড়ক  তৈরি হচ্ছে না। এটা হতাশাজনক। সময় এসেছে সড়ক নির্মাণ ব্যয় নিয়ন্ত্রণে আনার। সংশ্লিষ্ট সেমিনারে ব্যয় কমিয়ে আনতে নীতিমালা বেঁধে দেয়া বা গবেষণার যে প্রস্তাব এসেছে, তা সময়োপযোগী। এটিকে বাস্তবে রূপ দিতে সরকারের সক্রিয়তা দরকার।

২০৪১ সালের মধ্যে দেশে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করতে বদ্ধপরিকর সরকার। এ প্রেক্ষাপটে অর্থনীতিতে গতি যোগ করতে স্বভাবত রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব সড়ক অবকাঠামোকে গুরুত্ব দিয়ে আসছে। এ খাতে প্রতি বছরই বাড়ানো হচ্ছে বরাদ্দ। এটা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। কিন্তু সড়ক নির্মাণে যে প্রকৃত ব্যয়ের চেয়ে অনেক বেশি খরচ হচ্ছে, তা রাষ্ট্রীয় কোষাগার ব্যবস্থাপনার জায়গা থেকে ভীষণ দুশ্চিন্তার। সময় এসেছে এতে রাশ টানার। প্রক্রিয়াগত ত্রুটি ও তদারকি দুর্বলতা দূর করে এক্ষেত্রে দৃশ্যমান উন্নতি এখন সময়ের দাবি।