কোনো প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের তৈরি করা আর্থিক প্রতিবেদন প্রচলিত আইন, বিধিবিধান ও আন্তর্জাতিক নিরীক্ষা মান অনুসরণ করে তৈরি করা হয়েছে কিনা, তা প্রত্যয়ন করাই নিরীক্ষকের দায়িত্ব। পাশাপাশি আর্থিক প্রতিবেদনে কোনো ধরনের অসংগতি আছে কিনা, সেটি খতিয়ে দেখাও নিরীক্ষকের কাজের মধ্যে পড়ে। কিন্তু তা না করে উল্টো কোম্পানির অনিয়ম আড়াল করার কাজে সহায়তা করছে কিছু নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান; যা নিরীক্ষকদের পেশাদারিত্বকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে। এতদিন এসব ঘটনা আড়ালে থাকলেও সম্প্রতি নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর কড়া নজরদারির কারণে বেরিয়ে আসছে অনেক কিছুই। এমন পরিপ্রেক্ষিতে আর্থিক প্রতিবেদন নিরীক্ষায় অনিয়মের সঙ্গে জড়িত নিরীক্ষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএবি)। দেশের নিরীক্ষা ব্যবস্থাকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে এ উদ্যোগ কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে প্রত্যাশা। তদন্ত শেষে দায়ীদের বিরুদ্ধে যথাযথ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে অযথা কেউ যেন হয়রানির শিকার না হয়, সেদিকেও দৃষ্টি রাখতে হবে।
দেশের নিরীক্ষা পেশার ও আর্থিক প্রতিবেদনের মানোন্নয়ন প্রয়োজন। এমন নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন বিরল নয়, যার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত আর্থিক অবস্থা অসংগতিপূর্ণ এবং তা বিনিয়োগকারী ও সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা পূরণে সক্ষম নয়। সাধারণত কোনো প্রতিষ্ঠানের আর্থিক প্রতিবেদন প্রস্তুত করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের। আইসিএবি কর্তৃক সনদ প্রদানকৃত নিরীক্ষা ফার্মগুলো যেসব আর্থিক প্রতিবেদন নিরীক্ষা করে সেগুলো যথাযথ কিনা, তার প্রত্যয়ন দেয়। এক্ষেত্রে নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবহেলা বা ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকলে সংশ্লিষ্ট নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান যেমন দায়ী, তেমনিভাবে আইসিএবিরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। সে কারণে কোনো নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানকে নিরীক্ষা পেশা চর্চার অনুমোদন দেয়ার সময় যেমন নানা দিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়, তেমনি নির্দিষ্ট সময় অন্তর এসব প্রতিষ্ঠান সরেজমিন পরিদর্শন করে সক্ষমতা যাচাই করা হয়। এসব ক্ষেত্রে কোনো অসংগতি পেলে নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর সনদ স্থগিতকরণ, সংশ্লিষ্ট নিরীক্ষককে নিরীক্ষা কাজ থেকে বিরত রাখা, আর্থিক জরিমানাসহ নানা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ একান্ত প্রয়োজন। একই সঙ্গে যেসব কোম্পানি আর্থিক প্রতিবেদনে জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে রাজস্ব ফাঁকি বা ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণের মতো অবৈধ সুযোগ নিয়েছে, তাদেরও শাস্তি দিতে হবে। নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন ছাড়া ঋণ গ্রহণ বা রাজস্ব গ্রহণ না করার বিধান চালু করা আবশ্যক। এক্ষেত্রে সবার প্রত্যাশা আর্থিক প্রতিবেদন জালিয়াতি করে অবৈধ সুবিধা গ্রহণ বন্ধে সংশ্লিষ্ট সবাই কার্যকর উদ্যোগ নেবেন। আর্থিক খাতে জালিয়াতি বন্ধ ও টেকসইত্ব নিশ্চিতে এটি অনেক বেশি জরুরি। এতে কোম্পানিতে সুশাসন নিশ্চিত করা সহজ হবে। আর্থিক প্রতিবেদনসংক্রান্ত অনিয়ম শনাক্ত ও তা রোধে বাংলাদেশ ব্যাংক, ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল, রাজস্ব বোর্ড, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড একচেঞ্জ কমিশন ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের একসঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে আর্থিক প্রতিবেদন জালিয়াতি করে বাড়তি অর্থ তুলে নেয়া এবং বিনিয়োগকারীদের ক্ষতিগ্রস্ত করার ঘটনা ঘটেছে। শুধু তাই নয়, আর্থিক প্রতিবেদন জালিয়াতি করে ব্যাংকঋণ নিয়ে উধাও হয়ে যাওয়ার খবরও রয়েছে। এমন প্রবণতা বন্ধে আর্থিক প্রতিবেদনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। আর কাজটির সঙ্গে যেহেতু নিরীক্ষক জড়িত, তাই তাদেরও জবাবদিহিতার আওতায় আনা প্রয়োজন।
ভারতে কোম্পানি আইন ২০১৩ পাসের আগে নিরীক্ষাসংক্রান্ত বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রণ করত বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহৎ অ্যাকাউন্টিং সংস্থা আইসিএআই। কিন্তু কোম্পানি আইন পাসের পর অ্যাকাউন্ট ও অডিটের বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির দায়িত্ব ন্যস্ত করা হয় ন্যাশনাল ফাইন্যান্স রিপোর্টিং অথরিটি অব ইন্ডিয়ার (এনএফআরএ) ওপর, যেটি সরকারের স্বাধীন স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে এর পরিবর্তিত রূপ এনএসিএএস। দেশে নিরীক্ষার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য ২০১৫ সালে ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং আইন প্রণয়ন করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় পরবর্তী সময়ে ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল (এফআরসি) গঠন করা হয়। যদিও এখন পর্যন্ত দেশের নিরীক্ষক ও নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিতের মূল দায়িত্ব ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশের (আইসিএবি) কাছেই রয়েছে। পাশাপাশি দেশের আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মধ্যে ব্যাংক ও ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রক সংস্থা হচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর নিয়ন্ত্রক হিসেবে কাজ করছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। বীমা খাতের নিয়ন্ত্রকের দায়িত্বে রয়েছে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)। সরকারের রাজস্ব আহরণ কার্যক্রমের দায়িত্বে থাকা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডও (এনবিআর) ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক কার্যক্রমের ওপর নজর দাবি করে। ক্ষুদ্র ঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে কাজ করছে মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি (এমআরএ)। সার্বিকভাবে দেশের নিরীক্ষা মান এখনো সন্তোষজনক পর্যায়ে আসেনি। এক্ষেত্রে নিরীক্ষকদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত ও কাজে স্বচ্ছতা আনতে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। ভারতের মতো বাংলাদেশেও এফআরসিকে নিরীক্ষকদের তদারকিতে শক্তিশালী করে গড়ে তোলা প্রয়োজন।
আশার কথা হলো, পেশাদার নিরীক্ষকদের সংগঠন আইসিএবি পেশাগত উন্নয়ন এবং আর্থিক প্রতিবেদন জালিয়াতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি জাল আর্থিক প্রতিবেদন শনাক্ত করার জন্য ডকুমেন্ট ভেরিফিকেশন সিস্টেম (ডিভিএস) প্রবর্তন করেছে। এরই মধ্যে সিস্টেমটি ব্যবহারের জন্য এনবিআর ও এফআরসির সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে আইসিএবি। এ সিস্টেমের মাধ্যমে সহজেই আইসিএবির সনদপ্রাপ্ত নিরীক্ষকদের মাধ্যমে আর্থিক প্রতিবেদন প্রত্যয়ন করা হয়েছে কিনা তা জানা যাবে। তাছাড়া সংগঠনটি হিসাব ও নিরীক্ষাসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সব ধরনের গাইডলাইন ও স্ট্যান্ডার্ডের বিষয়ে তাদের সদস্যদের আপ টু ডেট রাখতে সদস্যদের জন্য সেমিনারসহ প্রচার-প্রচারণার উদ্যোগ নিয়েছে। এছাড়া আর্থিক প্রতিবেদন নিরীক্ষায় অনিয়মের সঙ্গে জড়িত নিরীক্ষকদের বিরুদ্ধে আইসিএবির ব্যবস্থা নেয়ার উদ্যোগের বাস্তব রূপ দেয়া আবশ্যক।
তালিকাভুক্ত বা তালিকাবহির্ভূত সব কোম্পানির ক্ষেত্রেই আর্থিক প্রতিবেদন একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। আর্থিক প্রতিবেদনের ওপর নির্ভর করে ব্যাংক ঋণ দেয়, রাজস্ব নির্ধারিত হয়, এমনকি শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীরাও বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু দেখা যাচ্ছে কিছু কোম্পানি আর্থিক প্রতিবেদন তৈরিতে নানা কারসাজি ও অনিয়মের আশ্রয় নিচ্ছে। একাধিক আর্থিক প্রতিবেদন তৈরির প্রমাণও মিলেছে। একটি আর্থিক প্রতিবেদন দেখিয়ে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছেন আবার ভিন্ন প্রতিবেদন দেখিয়ে রাজস্ব দিয়েছেন কম। শেয়ারবাজার থেকে অর্থ তুলে নিতেও আর্থিক প্রতিবেদনে কারসাজির উদাহরণ মিলেছে। ভিন্ন উদ্দেশ্যে ভিন্ন আর্থিক প্রতিবেদন তৈরির সংস্কৃতি দেশের করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অনেক দিন ধরেই চলে আসছে। অনেক কোম্পানি আছে, যারা অডিট না করেই অডিট রিপোর্ট জমা দিচ্ছে। কোম্পানি নানা কাজে ব্যবহারে একই বছরের জন্য তিন-চারটি পর্যন্ত অডিট রিপোর্ট জমা দেয়। কিছু ক্ষেত্রে এমন জালিয়াতির সঙ্গে আইসিএবির সদস্য চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টদের নাম জড়িয়ে যাচ্ছে। কিছু ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে বটে কিন্তু তার প্রভাব সামান্যই। আর্থিক প্রতিবেদনকেন্দ্রিক জালিয়াতি রোধে এফআরসি কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে প্রযুক্তি ব্যবহারপূর্বক আর্থিক প্রতিবেদন যাচাইয়ের উদ্যোগ নিয়েছে তদারকি সংস্থা। এর কার্যকর বাস্তবায়ন প্রয়োজন।
উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোয় নিরীক্ষকদের জন্য সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড রয়েছে। নিরীক্ষকদের কাজের মূল্যায়নপূর্বক তাদের নম্বর দেয়ার ব্যবস্থাও আছে। এতে কোম্পানিগুলো নিরীক্ষক বাছাইয়ের ক্ষেত্রে নম্বর দেখে যাচাই করতে পারে। একই সঙ্গে উচ্চনম্বরধারীদের ফিও বেশি হয়। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, নিরীক্ষকদের পেশাদারিত্ব দেখভালের জন্য সংশ্লিষ্ট দেশগুলোয় শক্তিশালী স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান রয়েছে। দেরিতে হলেও সরকার এফআরসি গঠন করে। প্রতিষ্ঠানটি কাজ শুরুর পর বেশকিছু অনিয়ম উদ্ঘাটনের পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, নিরীক্ষা কার্যক্রমের তদারকি আরো বাড়াতে হবে। সাম্প্রতিক কয়েকটি আর্থিক ও ঋণ কেলেঙ্কারিতে নিরীক্ষকদের জড়িত হওয়ার বিষয়টি উদ্বেগজনক। বাংলাদেশ ব্যাংক অনেকের আর্থিক নিরীক্ষার লাইসেন্স বাতিল করেছে। একই ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে বিএসইসি। এফআরসিও তাদের সক্ষমতা অনুযায়ী আর্থিক জালিয়াতি প্রতিরোধ ও তদন্ত করছে। এক্ষেত্রে আইসিএবির সক্রিয় ভূমিকা প্রত্যাশিত।










